দেশে মরণব্যাধি ক্যান্সারের বিস্তার ঘটছে আশঙ্কাজনক মাত্রায়। বিশেষত গ্রামীণ ও নগর দরিদ্রদের মধ্যে রোগটির প্রকোপ বাড়ছে দ্রুতগতিতে। তথ্য বলছে, মোট ক্যান্সার আক্রান্তের প্রায় ৮৪ শতাংশই দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, যাদের বেশির ভাগই স্বাক্ষরজ্ঞানহীন ও স্বল্পশিক্ষিত। জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে বর্তমানে এটা একটা বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামনের দিনে নানা কারণে এর ব্যাপকতা আরো বাড়বে। কাজেই ক্যান্সারের বিস্তার রোধে প্রতিরোধ ও প্রতিকারমূলক উভয় ধরনের ব্যবস্থার দিকে দৃষ্টি দেয়া জরুরি। এজন্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনাচার বদলে যেমন সচেতনতা বাড়াতে হবে, তেমনি সুলভে চিকিৎসা সুবিধাও আরো বাড়াতে হবে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচেষ্টতা কাম্য।

ক্যান্সার আগেও ছিল কিন্তু সময়ান্তরে ক্রমেই এর ব্যাপকতা বাড়ছে। আর এতে বেশি ভুগছে শহরের দরিদ্র, গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। অন্যদের তুলনায় উল্লিখিত জনগোষ্ঠী যে উচ্চহারে ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে, তার পেছনে নানা কারণ দায়ী। অপরিকল্পিত নগরায়ণে শহরে বাড়ছে দূষণ। বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার অপ্রতুলতায় নগর দরিদ্ররা অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করছে। আর্থিক হতাশা থেকে তাদের মধ্যে বাড়ছে ধূমপানসহ মাদকে আসক্তি। তদুপরি এ জনগোষ্ঠীর বড় একটা অংশ শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। স্বভাবত স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাস বিষয়ে তাদের রয়েছে যথেষ্ট সচেতনতার ঘাটতি। শুধু নগর দরিদ্র নয়, দেশে ক্যান্সার আক্রান্তদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ গ্রামীণ দরিদ্র কৃষক। যথোপযুক্ত শিক্ষা না থাকায় সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম) ও উত্তম কৃষিচর্চা (জিএপি) সম্পর্কে তেমন ধারণা নেই তাদের। তাদের মধ্যে কীটনাশকসহ কৃষি রাসায়নিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের প্রবণতাও বেশি। আবার এসবের প্রয়োগ হচ্ছে কোনো ধরনের নিরাপত্তা সরঞ্জাম বা উপকরণ ছাড়াই। দেহে প্রবেশ করছে রাসায়নিক ও কীটনাশকের মারাত্মক ও ক্ষতিকর সূক্ষ্ম উপাদান। হয়ে উঠছে মরণব্যাধির কারণ। একই সঙ্গে হ্রাস করছে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। কৃষকের মতো দিনমজুররাও ক্যান্সারে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। জীবিকার জন্য নানা ধরনের কাজ করতে গিয়ে অনেক সময়ই পরিবেশের দূষিত পদার্থগুলোর কাছাকাছি আসতে হয় তাদের। খাদ্যাভ্যাসও অস্বাস্থ্যকর। সব মিলিয়ে গ্রামীণ ও নগর দরিদ্রদের মধ্যে বাড়ছে ক্যান্সারের প্রকোপ।

গত দুই দশকে দেশে সরকারি খাতে ক্যান্সার চিকিৎসার আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির সন্নিবেশ ঘটেছে লক্ষণীয়ভাবে। ঢাকার মহাখালীতে জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালকে ৫০ থেকে ৩০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। রেডিওথেরাপির আধুনিক যন্ত্রপাতি এসেছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও ঢাকার বাইরে বগুড়ায় শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেডিওথেরাপির সর্বাধুনিক লিনিয়ার এক্সিলারেটর মেশিন সংযুক্ত হয়েছে। বেসরকারি খাতে কয়েকটি বড় হাসপাতালে রেডিওথেরাপিসহ ক্যান্সার চিকিৎসা চালু হয়েছে। সর্বশেষ প্রযুক্তির মেশিনও তাদের কাছে রয়েছে। বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি মিলে ১৯টি হাসপাতালে ক্যান্সার চিকিৎসার সুযোগ আছে। পরিধি ও সক্ষমতা বাড়ায় ক্যান্সারের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এখন দেশেই সম্ভব হচ্ছে। সচ্ছল রোগীরা দেশে চিকিৎসা নিতে পারছে। এটা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। কিন্তু সাধারণ মানুষ দেশে এখনো ক্যান্সার চিকিৎসা ব্যবস্থার নাগালের বাইরে। কাজেই তাদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করাটাই বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, বাংলাদেশে ক্যান্সার চিকিৎসায় সাধারণভাবে তিনটি পন্থা অবলম্বন করা হয়। অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি। সব সরকারি হাসপাতালে একবার রেডিওথেরাপির জন্য ২৫ হাজার, একবার কেমোথেরাপির জন্য ২০ হাজার এবং অস্ত্রোপচারে ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়। এক গবেষণার তথ্য বলছে, ৫০ শতাংশ ক্যান্সার রোগীর অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি তিনটি পদ্ধতিরই দরকার হয়। ২০ শতাংশের দুটি পদ্ধতির দরকার হয়। বাকি ৩০ শতাংশের দরকার হয় অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপির যেকোনো একটি পদ্ধতির। তবে এসব চিকিৎসা যদি বেসরকারি হাসপাতালে হয় তাহলে খরচ আরো অনেক বেশি। স্বভাবত উচ্চব্যয়ের কারণে অনেক দরিদ্র মানুষই ক্যান্সারের যথাযথ চিকিৎসা পায় না। সুতরাং তাদের জন্য চিকিৎসা কীভাবে সুলভ করা যায়, তার উপায় সন্ধান জরুরি। বিশ্বব্যাপী ক্যান্সারের চিকিৎসা তুলনামূলক বেশি। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। আমরা দেখছি যুক্তরাষ্ট্র, ভারতসহ কিছু দেশ ক্যান্সার চিকিৎসাকে বীমা ব্যবস্থার আওতায় এনেছে। ফলে চিকিৎসাজনিত আর্থিক চাপটা অনেকটা সাধারণ্যের নাগালের মধ্যে এসেছে। বর্তমানে দেশে ক্যান্সার চিকিৎসার খরচ কমানোর সহজ কোনো উপায় নেই। সুতরাং এখানেও ক্যান্সার চিকিৎসাকে বীমার আওতায় আনার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। কেউ কেউ ক্যান্সার চিকিৎসার অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি আমদানিতে কর কমানোর কথা বলছেন। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য চিকিৎসা সুলভ ও সাশ্রয়ী করতে এসব পরামর্শ আমলে নেয়া যেতে পারে।

যেকোনো রোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধই শ্রেয়। কাজেই প্রতিরোধেই আমাদের অধিক মনোযোগ দিতে হবে। এক্ষেত্রে সর্বাগ্রে প্রয়োজন সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্যান্সার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো। এজন্য গণমাধ্যমে প্রচারণাসহ সচেতনতামূলক বিভিন্ন কর্মসূচি নিতে হবে। জীবনাচার ও খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। গ্রাম-শহর নির্বিশেষে সবখানে দূষণ কমাতে হবে। মানমাত্রা অনুযায়ী যেন কৃষি রাসায়নিকের দায়িত্বশীল ব্যবহার করা যায়, তার জন্য কৃষককে প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে। নগর দরিদ্রদের যথোপযুক্ত শিক্ষা ও সচেতনতা ঘাটতি দূর করতে হবে। সর্বোপরি, পরিবেশ ও প্রতিবেশগত স্থায়িত্বশীলতা ফিরিয়ে আনতে হবে।

জাতিসংঘ ঘোষিত ও সরকার স্বীকৃত সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার মূল নির্যাস হলো, আর্থিক সক্ষমতা নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের রোগ থেকে সুরক্ষা ও চিকিৎসাসেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। ক্যান্সারে আক্রান্ত মানুষেরও আছে সুস্থ হওয়ার অধিকার। এটা তার মৌলিক অধিকার। সুতরাং সবার জন্য সুলভে ক্যান্সারের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে রোগী যে হারে বাড়ছে তার তুলনায় চিকিৎসা সুবিধা অপ্রতুল। তাই এটা আরো বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে সচেতনতা বাড়াতেও জোর দিতে হবে অত্যধিক। এক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করতে হবে স্বাস্থ্য বিভাগকে। প্রতিরোধমূলক ও প্রতিকারমূলক ব্যবস্থায় জোরালো পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশে ক্যান্সারের প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে প্রত্যাশা।