ছোটবেলায় যখনই ক্লাসে কোনো শিক্ষক জিজ্ঞেস করতেন, তোমার বাবার নাম কি? বলতাম প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম। বলতেন কি? তুমি প্রিন্সিপাল কাসেম সাহেবের মেয়ে? অবাক হয়ে যেতেন।

সেই যে একটা প্রচণ্ড সম্মান পেয়ে নিজেকে গর্বিতভাবে বড় করেছি, বুঝতেই পারিনি কেন এত নামি আমার বাবা, শুধু বুঝতাম এটাই আমার প্রাপ্য সম্মান।

মায়ের খুব নেউটা ছিলাম। বাবাকে কিছুটা ভয়ও পেতাম বোধ হয়। তার পরও অন্য ভাই-বোনদের দেখে বাবার কাছে যেতে চেষ্টা করতাম। একদিন মাকে বললাম, বাবার কাছে ঘুমাব। কিন্তু কিছু সময় যেতেই মায়ের কাছে ফিরে এলাম।

একবার আব্বু জয়দেবপুর যাবেন, আম্মু যাবেন না, কিন্তু আমি অন্যদের সঙ্গে বায়না ধরলাম আব্বুর সঙ্গে যাব, ওয়াদা করতে হলো মায়ের জন্য কাঁদব না। কিন্তু যথারীতি দিনের বেলায় খেলাধুলা করে কাটিয়ে দিলেও রাতে একবার বুয়া, একবার আব্বু—এ করে রাতে কাউকে ঘুমাতে দিলাম না। খুব ভোরে আব্বু আমাকে নিয়ে রওনা দিলেন ঢাকার উদ্দেশে।

আব্বুর নিয়ম ছিল খুব কড়া, সবাই আব্বুর কথা একবাক্যে মেনে নিতেন। কিন্তু আব্বু আমাকে কোনো ব্যাপারে জোর করতেন না। মাঝে মাঝে আম্মুকে বলতেন, খুব বেশি আদর কর, পরে অনেক কষ্ট পাবে। মাঝে মাঝে দুষ্টুমি করে বলতেন, যদি চাঁদ চায় তোমার মেয়ে সেটাও মনে হয় এনে দিবা।

আব্বু যখন হজে গেলেন খুব ছোট ছিলাম। বুঝতাম না কোথায় গিয়েছেন। কিন্তু কোনো প্লেন গেলেই আমরা ভাই-বোনরা আব্বু আব্বু বলে চিত্কার করতাম। মক্কা থেকে আব্বু আমাদের সবার জন্য নিজের হাতে কার্ডে কবিতা লিখে পাঠিয়েছেন।

সপ্তাহে একদিন বাসায় জ্ঞানের আসর বসত। সেখানে আমাদের সবার স্বাধীনতা ছিল, নিজেদের যা কিছু প্রশ্ন ছিল তা জিজ্ঞেস করার। আব্বু চেষ্টা করতেন সবার প্রশ্নের উত্তর দেয়ার।

আব্বু এত বেশি দেশের কাজ, বই লেখার কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন, আমি সন্তান হিসেবে ছোট বেলায় আব্বুকে খুব কমই পেয়েছি।

আমি যখন ক্লাস ফোরে পড়ি, তখন আব্বুর স্ট্রোক হয়, এরপর থেকে আব্বুকে আমরা কাছে পাই। আব্বুকে আম্মু এরপর থেকে যে সেবা করেছেন, তার কোনো তুলনা হয় না।

ক্লাস ফোরে একবার একটা রূপকথার গল্প লিখে আব্বুকে দেখাই। আব্বু খুবই খুশি হন সেটা দেখে। এরপর কিছু কবিতা লিখি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে পড়ালেখার চাপে লেখা থেকে সরে আসি। এজন্য আব্বু প্রায়ই বলতেন তোর লেখার হাত খুব ভালো, কেন লিখিস না।

আমাদের অসুখ বা কোনো সমস্যা আম্মুই সবসময় সমাধান করেছেন, কিন্তু পরীক্ষার সময় যখন টেনশন করতাম, তখন মনে হতো আব্বুর মতো কেউ আমাকে বুঝতে পারছে না। যখনই বলতাম তখনই আব্বু আমাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে দিতেন, পড়ার জন্য সেটা যত রাতই হোক।

আব্বুর কাছে মাঝে মাঝে পড়া বুঝতে যেতাম এমনভাবে বোঝাতেন, পানির মতো সহজ হয়ে যেত বিশেষ করে পদার্থবিদ্যা আর অংক। বাংলার কঠিন ব্যাকরণ দেখে আব্বু প্রায়ই বলতেন, এত কঠিন করে শেখানোর দরকার ছিল না।

খাওয়ার সময় আব্বু চাইতেন আমরা যেন সব খাবার খাই, কোনো বাছাবাছি না করি। কোন খাবারে কোন পুষ্টি আছে, সবসময় বলতেন। কখনো শুনিনি কোনো রান্না খারাপ হয়েছে এমন মন্তব্য করতে। সবসময় বিসমিল্লাহ্ বলে খাবার খেতেন এবং খাওয়ার পর বলতেন আলহামদুলিল্লাহ্।

আব্বু ছিলেন খুবই মিতব্যয়ী। তিনি চাইতেন আমরাও যেন কোনো অপচয় না করি। এজন্য সব সময় আমাদের হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর উদাহরণ দিতেন। বলতেন, নবী ছেঁড়া কাপড় সেলাই করে পরতেন। কিন্তু পরিষ্কার কাপড় পরতেন। আমরাও যেন সেভাবে চলতে চেষ্টা করি।

আমাদের স্কুলে টিফিন দেয়া হতো। সেজন্য আব্বু আমাদের কোনো অতিরিক্ত টাকা দিতেন না, বলতেন বাইরের খাবার খাওয়া ভালো না। স্কুল কাছেই ছিল তাই রিকশা ভাড়াও দিতেন না। বলতেন, হাঁটলে শরীর ভালো থাকে। সে সময় এসবের কোনো মানে বুঝিনি। কিন্তু এখন বুঝি আব্বু ডাক্তার না হয়েও আমাদের কত সঠিক পথে চালিয়েছেন।

আমি ছোটবেলায় রান্নাঘরে খুব কাজ করতে চাইতাম। কিন্তু আম্মু দিতেন না, ভাবতেন আমার কষ্ট হবে। কিন্তু আব্বু চাইতেন আমরা কাজ করি, তাই আম্মুকে বলতেন, মেয়েকে কাজ শেখাচ্ছো না, পরে কষ্ট পাবে।

আব্বু প্রায়ই বলতেন আমার এ মেয়েটার মাথা খুব ভালো। আমার মায়ের মতো কর্মঠ আর মায়ের মতোই খাদ্যাভাস।

আমি খুব পড়ুয়া ছিলাম, আব্বু পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় বলতেন, আমার মেয়েদের পড়তে বলতে হয় না।

আব্বু বেঁচে থাকতে আমাদের মেয়েদের অন্যরকম সম্মান ছিল। মেয়ে বলে আমাদের কোনো কিছুতে বঞ্চিত হতে হয়নি, বরং মেয়েদের ওপর আব্বুর ছিল অগাধ বিশ্বাস ও আস্থা। আব্বু মেয়েদের লেখাপড়ার ব্যাপারে ছিলেন খুবই ইতিবাচক।

আমি যখন ইন্টার পাস করে সিলেট মেডিকেলে এমবিবিএস পড়তে যাই, তখন খুব হোম সিকনেসে ভুগতাম। এজন্য আব্বু এত অসুস্থতার মধ্যেও প্রতি সপ্তাহে একটি করে চিঠি লিখতেন। আমার মনে হয়, এত চিঠি তিনি আর কারো কাছে লেখেননি।

যখন পরীক্ষার সময় খুব কষ্ট পেতাম, তখন আব্বু সবসময় আল্লাহর ওপর ভরসা করতে বলতেন। বলতেন, ‘মা’ জীবনটাই একটা পরীক্ষা। এরপর বাবা মারা যাবে, মা মারা যাবে, সবই সহ্য করতে হবে। আমার বাবা এই যে মেডিকেলে পড়ার পাঁচ-ছয়টা বছর আমাকে সান্ত্বনা দিয়েছেন, তিনি আমার ডাক্তার হওয়া দেখেছেন, কিন্তু বিসিএসে সুযোগ পাওয়া, ডিজিও, এমএস, এফসিপিএস পাস করা এবং গাইনি ও অব্সবিষয়ক অধ্যাপক হওয়া এসব দেখে যেতে পারেননি। কিন্তু আমার মনে হয়, পৃথিবীতে একমাত্র তিনিই সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন, সেটা আমি সবসময় মিস করি।

আব্বু ডাক্তারি পেশা খুব পছন্দ করতেন। আজ আব্বুর তিন মেয়ে, চার জামাই, আট নাতি-নাতনি ডাক্তার, এক মেয়ে ফার্মাসিস্ট, দুই ছেলে ইঞ্জিনিয়ার। এর মধ্যে চার মেয়ে অধ্যাপক ও দুই মেয়ের জামাই অধ্যাপক ।

আব্বু ছিলেন খুবই বিনয়ী। কখনো কারো কাছে নিজের ব্যাপারে জাহির করতেন না এবং আমাদেরও সেভাবে শেখাতেন।

আব্বু কখনও ধনী, গরিব এসব দেখে মানুষের সঙ্গে আলাদা ব্যবহার করতেন না। গরিবদের সঙ্গে উনি খুবই অমায়িক ব্যবহার করতেন। সবসময় মুরব্বিদের সঙ্গে ভালো ব্যবহারের জন্য আমাদের বলতেন। এ ব্যাপারে উনি ছিলেন খুবই কড়া।

আব্বু খেলাধুলা খুব পছন্দ করতেন। এজন্য বাসায় সব ধরনের খেলাধুলার ব্যবস্থা ছিল। বারান্দার ফ্লোরে লুডুর কোর্ট, ষোলগুঁটির কোর্ট মোজাইক দিয়ে আঁকা ছিল। বাসায় টেবিল টেনিসের ব্যবস্থা ছিল। কোনো সময় বিকালে বাসায় বসে থাকলে বলতেন, খেলতে যাও।

আব্বু যৌতুক নেয়া-দেয়ার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন, ধূমপান, দুর্নীতি, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন। এজন্য তার কোনো মেয়ের বিয়েতে তিনি যৌতুক দেননি ও ছেলেদের বিয়েতে যৌতুক নেননি। এজন্য আমরাও কোনো দুঃখ পাইনি বরং গর্ববোধ করেছি তার মেয়ে হিসেবে।

আমাদের বিয়ের ব্যাপারে ছেলের আর্থিক অবস্থা খুব ভালো হতে হবে—এমন কোনো চাহিদা আব্বুর ছিল না, বরং শিক্ষিত, ভদ্র ছেলেই ছিল আব্বুর প্রথম পছন্দ। আর সবসময় ছেলে সিগারেট খায় কিনা সেটা খোঁজ নিতেন।

জয়দেবপুরে (গাজীপুর) আমাদের একটা বাগানবাড়ি ছিল। সেখানে সব ধরনের ফলের, ফুলের বাগান ছিল। হাঁস-মুরগি, কবুতর, গরু, ছাগল, কুকুর, বিড়াল, পুকুর ভরা মাছ—কোনো কিছুরই কমতি ছিল না। এজন্য আমাদের ছোটবেলাটা ছিল খুবই রঙিন। স্কুল ছুটি পেলেই দলবেঁধে সবাই জয়দেবপুরে যেতাম। সঙ্গে আত্মীয়-স্বজনও যেতেন।

ভোরে উঠে শেফালী ফুল তোলা, খেতের টমেটো, মরিচ তোলা, মাটি দিয়ে খেলনা বানানো, পুকুরে কলাগাছ নিয়ে গোসল, বিকালে গ্রামের ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে খেলাধুলা, ঝড়ের দিনে আম কুড়ানো—আনন্দেরই কমতি ছিল না। আমরা জয়দেবপুরে গেলেই সাহেববাড়ির বাচ্চাদের দেখতে সবাই ভিড় জমাত। আমাদের গাছের ফল, সবজি সবার জন্য ছিল উন্মুক্ত। এমনকি আব্বু গাড়ি করে বস্তায় বস্তায় কাঁঠাল, আম, কলা, সবজি এনে আজিমপুরে প্রতিবেশীদের পাঠাতেন। 

জয়দেবপুরে আব্বু আমাদের ভাইবোন সবাইকে একটা করে গরু দিয়ে গরুগুলোর নাম রাখতেন। আমি একটা ছোট লাল গরু (যার শিং ছোট ছিল) বেছে নিয়েছিলাম। আব্বু তার নাম দিয়েছিলেন পুঁটি। অন্য গরুগুলোর নাম ছিল ধবলা, মন্টু ইত্যাদি। এত রঙিন সাদামাটা ছোটবেলা খুব কম বাচ্চাদেরই থাকে।

ইসলামী অনুষ্ঠানগুলো আমাদের বাসায় খুব সুন্দরভাবে পালন করা হতো। শবেবরাত, শবেকদরে আব্বু দাদী ও আত্মীয়দের কবর জেয়ারত করতে যেতেন। শুক্রবার ১২টার আগেই গোসল করে পরিষ্কার কাপড় পরে নামাজের জন্য তৈরি হয়ে যেতেন। আমরা সবাই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ছি কিনা, রোজা রাখছি কিনা খেয়াল রাখতেন। বাসায় হুজুর এসে আমাদের ছোটদের কোরআন শরীফ পড়াতেন। সেখানে আব্বু কিছু গরিব আত্মীয়ের বাচ্চাদেরও আমাদের সঙ্গে পড়ার জন্য হুজুর নিয়োগ দিয়েছিলেন।

ঈদের সময় সকালে উঠে গোসল করে আমরা আব্বুর সঙ্গে নামাজ পড়তে যেতাম। সেখানে আব্বু আমাদের পয়সা দিতেন গরিবদের দেয়ার জন্য। নামাজের পর সবাইকে বেলুন কিনে দিতেন। এরপর আত্মীয়-স্বজন সবার বাসায় গিয়ে সেমাই খেয়ে বাসায় ফিরতাম।

আব্বু ছিলেন খুবই মনভোলা। আমার নাসির ভাই ছোটবেলায় ছিলেন খুবই আব্বুভক্ত। আব্বুর লেখার রুমে আব্বুর জন্য অপেক্ষা করতেন, কখন আব্বুর সঙ্গে ঘুমাতে যাবেন।

আব্বুর বন্ধুর কাছে শুনেছি, আব্বু ছিলেন প্রচণ্ড মেধাবী, ক্লাসে ছেলেদের পাঠ শুনেই আব্বুর সেটা মুখস্থ হয়ে যেত। আব্বু নিজের ক্লাসের ছেলেদেরও টিউশনি করে পড়িয়েছেন।

আব্বু ছিলেন খুবই স্বল্পভাষী। হাসতেন খুব মৃদুভাবে। কখনো কোনো দিন জোরে কাঁদতেও দেখিনি। আব্বু খুব ভালো গান করতেন, বাঁশি বাজাতে পারতেন। মাঝে মাঝে দেখতাম নিজের লেখা ইসলামিক গান গাইতে।

আব্বুকে কেউ কোনো উপহার দিলে খুশি মনে সেটা পরতেন, কোনো কিছু রান্না করে খাওয়ালে খুব খুশি মনে সেটা খেতেন।

যুদ্ধের সময় আমরা গাজীপুরে পালিয়ে গিয়েছিলাম। গাজীপুরের বাসায় পাকিস্তানিরা বোমা মারা শুরু করলে আমরা আরো দূরে পালিয়ে যাই। যুদ্ধের সময় আমরা ঢাকায় আসি। সেখানে পাকিস্তানি সেনারা আব্বুকে ধরতে আসে। কিন্তু আল্লাহর রহমতে আব্বু পালিয়ে থাকতে সমর্থ হন। সে সময় অনেক পরিবার আমাদের বাসায় আশ্রয় নেয়, আব্বু তাদের সবার থাকার ও খাবার-দাবারের ব্যবস্থা করেন।

আমাদের বাসার নিচতলায় একটা প্রেস ছিল। আমরা ছোটবেলা থেকেই সারারাত সারাদিন সেই প্রেস চালু থাকতে দেখেছি। পরে বড় হয়ে বুঝেছি, সেখানে আব্বুর লেখা বই ছাপা হয়েছে। আব্বুর লেখা পদার্থ, রসায়ন, অংক, পাঠ্যবইগুলো খুবই জনপ্রিয় ছিল।

পরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সবাই যখন স্মৃতিচারণ করেছেন তখন জেনেছি, দেশের জন্য আব্বুর অবদান, আব্বুর ত্যাগ স্বীকার। কিন্তু কখনো আব্বুকে আমাদের কাছে তার কাজের অহঙ্কার করতে শুনিনি। এজন্য আমার জানতে অনেক দেরি হয়েছে।

ছোটবেলায় দেখতাম আব্বু দোতলায় একটা বড় হলরুমে বই লিখতেন আর মাঝে মাঝে অনেক লোক নিয়ে মিটিং করতেন। আজ জানি আমার বাবা বাংলা ভাষার জন্য, শিক্ষার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছেন।

 

ডা. সেতারা বিনেত কাসেম: অধ্যাপক (গাইনি ও অব্স) ঢাকা মেডিকেল কলেজ:  প্রিন্সিপাল আবুল কাসেমের কন্যা