হাওরাঞ্চলের কৃষকের অন্যতম ঝুঁকি পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির কারণে সৃষ্ট বন্যা, যা প্রয়োজনীয় বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের মাধ্যমে দূর করা অনেকাংশেই সম্ভব। গত চার বছর বন্যা হয়নি। ভালো ফসল হয়েছে। চলতি বছর আগাম বৃষ্টি শুরুর কারণে এ অঞ্চলের কৃষকরা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলেন। অনেকে বন্যার আশঙ্কাও করেছিলেন। কৃষকের এ আশঙ্কাই এখন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। উজানের ঢল আর প্রবল বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট পানির চাপে হাওরের বাঁধ ভেঙে তলিয়ে যাচ্ছে ফসলি জমি। কৃষকের বাড়তি আশঙ্কা ঢলের পানি এভাবে বাড়তে থাকলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সুনামগঞ্জ উপজেলার ২১ হাজার হেক্টর জমির ফসলই তলিয়ে যাবে। এ অবস্থায় নির্ধারিত সময়ে হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ কার্যক্রমে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) অবহেলাকে দায়ী করছেন অনেকে। এক্ষেত্রে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি ফসল রক্ষায় যথাযথ পদক্ষেপও প্রত্যাশিত।

নীতিমালা অনুযায়ী নভেম্বরের মধ্যে প্রকল্প নির্ধারণ, পিআইসি গঠন এবং হাওরাঞ্চলে বাঁধ নির্মাণকাজ শুরুর কথা ১৫ ডিসেম্বর থেকে। গত ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, হাওরে এখনো শুরু হয়নি অনেক পিআইসির কাজ। পিআইসি গঠন না হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে বাঁধ নির্মাণ বা সংস্কারও পিছিয়ে যায়। আবার কোথাও কোথাও দায়সারাভাবে কাজের অভিযোগও মেলে। নদীতীরবর্তী বাঁধ নির্মাণকাজে অসন্তোষ প্রকাশ করে দ্রুত ও সঠিকভাবে কাজের নির্দেশনা দিয়েছেন খোদ প্রধানমন্ত্রীও। তিনি বলেছেন, বাঁধের এক পাশের কাজ শেষ না হতেই অন্য পাশ যেন না ভাঙে। যে কাজটাই করা হোক না কেন, সেটি দ্রুত ও টেকসইভাবে করতে হবে। প্রতি বছর আগাম বন্যার হাত থেকে হাওরের ফসল বাঁচাতে কোটি কোটি টাকা খরচ করে হাতে নেয়া হয় ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প। যথাযথ তদারকির অভাব, সিন্ডিকেট করে কাজ নেয়া, জনপ্রতিনিধিদের সরাসরি হস্তক্ষেপসহ নানা কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে প্রকল্পটি। ফলে বন্যার পানিতে ফসল রক্ষার বদলে উল্টো বাঁধ তলিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে।

দেশের ফসলের ২০ ভাগ আসে হাওরাঞ্চল থেকে। হাওরে বোরোর ফসলহানি ঘটলে স্বাভাবিকভাবে হুমকিতে পড়ে যায় খাদ্যনিরাপত্তাও। চালের বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। এ অবস্থায় হাওরের অব্যবস্থাপনা ও অসংগতিগুলো দূর করার বিকল্প নেই। নিয়ম রয়েছে ১৩ সদস্যের পিআইসিতে দাপ্তরিক কর্মকর্তা ছাড়াও একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি, গণমাধ্যম প্রতিনিধি, এনজিও প্রতিনিধি, নারী প্রতিনিধি, কৃষক প্রতিনিধি, মত্স্যজীবী প্রতিনিধি থাকার। অভিযোগ রয়েছে প্রতি বছরই কমিটিতে একই মানুষ বা একই পরিবারের সদস্যদের রাখা হয়। এভাবে দিন দিন স্থানীয় সিন্ডিকেটই শক্তিশালী হচ্ছে। এসব সিন্ডিকেট এতই শক্তিশালী যে তাদের তৈরি করা কমিটি পিআইসিতে অন্তর্ভুক্ত না করলে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। শুধু পিআইসি নয়, তদারক কমিটি গঠনেও পক্ষপাতিত্ব দৃশ্যমান। যারা কমিটিতে থাকার যোগ্য, তাদের না রেখে প্রভাবশালীদের রাখা হচ্ছে। ফলে তদারকি ব্যবস্থায় থেকে যাচ্ছে দুর্বলতা। কাজেই স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কমিটি গঠনের পাশাপাশি তদারকি ব্যবস্থাও জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে পিআইসি যেন নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করে তাও নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন করে সময়মতো অর্থছাড় করতে হবে। বলা হচ্ছে, কোথায় বাঁধ হবে এবং কত টাকা খরচ হবে সে বিষয়গুলো নির্ধারণ করেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীরা। সেক্ষেত্রেও বিস্তর অভিযোগ মেলে। একদিকে নির্মাণ অপ্রয়োজনীয় বাঁধ, অন্যদিকে বাঁধ হওয়া দরকার এমন সব জায়গায় তা হয় না। কোথাও অতিরিক্ত বরাদ্দ দেয়ার অভিযোগও রয়েছে। তাই প্রকল্প নির্ধারণে জনঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের বন্যায় হাওরে ফসলহানির পর বাঁধ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ঠিকাদারি পদ্ধতি বাতিল করে পিআইসির মাধ্যমে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয়। বাঁধ নির্মাণে নতুন নীতিমালা করে ঠিকাদারি প্রথা বাতিল করে সরাসরি যুক্ত করা হয় জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে। এখন তারাও যদি ব্যর্থ হয় তাহলে তা হতাশাজনকই বটে। সাংগঠনিক দুর্বলতার পাশাপাশি হাওরে বাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রকৌশলগত ঘাটতিও বিরাজমান। নিয়ম অনুযায়ী বাঁধের ৫০ মিটার দূর থেকে মাটি কাটার কথা থাকলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বাঁধের পাড় থেকে মাটি কেটে বাঁধ দেয়া হয়। এভাবে নির্মাণের ফলে বাঁধ দুর্বল হয়। বাঁধে একটি নির্দিষ্ট ঢাল থাকার কথা (২:১), কিন্তু অনেক বাঁধই খাড়া থাকায় পানির তোড়ে সহজেই ভেঙে যায়। ড্রেজার মেশিনে বাঁধের কাছ থেকে মাটি কেটে বাঁধ নির্মাণের কারণেও অনেক বাঁধ দুর্বল হয় এবং সহজেই ভেঙে যায়। হাওর এলাকা এমনিতেই নিচু। বছর বছর বাঁধের জন্য মাটি কাটার ফলে যেসব জায়গা একটু উঁচু ছিল, তাও নিচু হয়ে যাচ্ছে। তাই এখন অনেক হাওরে বাঁধ নির্মাণের জন্য এর ধারেকাছে মাটি পাওয়া যায় না। দূর থেকে নৌকায় করে মাটি আনতে হয়। এতে সময় যেমন বেশি লাগে, খরচও তেমন বেশি হয়। এ সংকট নিরসনে জুতসই বিকল্প উপায়ের সন্ধান করতে হবে।

দেশের বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চল গড়ে উঠেছে প্রাকৃতিকভাবে। এখানে বসবাস করতে গিয়ে মানুষ নানাভাবে হাওরের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করছে। অপরিকল্পিত ও অসমন্বিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে হাওরের জীববৈচিত্র্য। এ বাস্তবতায় হাওর এলাকার জন্য উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও সেসব বাস্তবায়ন করতে হবে প্রকৃতিকে গুরুত্ব দিয়ে। হাওর বাঁচাতে হলে বিদ্যমান বাঁধগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ, প্রয়োজনে পানিপ্রবাহে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী বাঁধগুলো অপসারণ করে পুনরায় পরিকল্পনামাফিক বাঁধ নির্মাণ করার বিষয়টি বিবেচনা করার কথা উঠে আসছে বারবার। যেসব বাঁধ নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে, সেগুলোর ডিজাইন পুনরায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তারপর অনুমোদন দেয়ার বিষয়টিও বিবেচ্য।

আকস্মিক বন্যা হাওর এলাকাকে তছনছ করে দেয়। বন্যাকবলিত মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়ে যায় তারা। হাওর অঞ্চলের বেশির ভাগটাই একফসলি জমি। এখানে উন্নতি করে যদি হাওর অঞ্চল থেকে শস্য উৎপাদন বাড়ানো যায় তাহলে তা দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে ভূমিকা রাখবে। পুরো বাংলাদেশের যে ইকোসিস্টেম, সেখানে হাওর অঞ্চলটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে উন্নয়নের সুযোগ আছে। কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ আছে। তাই হাওরের সমস্যার দ্রুত ও টেকসই সমাধান জরুরি।