চলমান করোনা মহামারীতে রীতিমত টালমাটাল অবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের। প্রাণঘাতী এ ভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যু- দুই ক্ষেত্রেই সবাইকে ছাড়িয়ে শীর্ষে অবস্থান করছে দেশটি। লকডাউন শিথিল করায় জনবহুল অঙ্গরাজ্যগুলো করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের ঝুঁকিতে পরেছে। অবস্থা দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতেও দেশটিতে অভিবাসন নীতিমালা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। মহামারীর মধ্যে দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একের পর এক পরিকল্পনা ও ঘোষণা অভিবাসন ইস্যুর পুরনো বিতর্কগুলো ফের সামনে নিয়ে এসেছে।

করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে। দেশটিতে ঘরে বসেই শিক্ষার্থীরা ভার্চুয়াল ক্লাস করতে পারছে, পরীক্ষা দিতে পারছে; সব ঠিকঠাকই চলছিল। হঠাৎ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এক ঘোষণা বিতর্ক উসকে দিয়েছে।

ট্রাম্প ঘোষণা দিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বসে কোন বিদেশী শিক্ষার্থী দেশটির কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত থাকতে পারবে না। ক্লাস-পরীক্ষা চালিয়ে নিতে হলে তাদের নিজ নিজ দেশে ফিরে যেতে হবে। যদিও তাদের যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করার বৈধ কাগজপত্র রয়েছে। রয়েছে স্টুডেন্ট ভিসাও। যদি কোন শিক্ষার্থী নিজ দেশে ফিরতে না চায় তাকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের করে দেয়া হবে, ফিরতে বাধ্য করা হবে বলেও হুমকি দেন ট্রাম্প। 

আকস্মিক এ হুমকিতে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করা ১০ লাখের বেশি বিদেশী শিক্ষার্থীর মাথায় হাত পড়েছে। ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বেগে পড়েছেন তারা। বিরোধী ডেমোক্র্যাট থেকে শুরু করে রিপাবলিকান দলের উদারপন্থী- সবাই একবাক্যে এ নীতির সমালোচনা করেছেন। তবে ট্রাম্প তার এ নীতিতে অনড়। 

হ্যাঁ, নানামুখী সমালোচনার পরও ট্রাম্পকে এক বিন্দু টলানো যায়নি। অবশেষে আদালতের হস্তক্ষেপে বিতর্কিত এ নীতি বাস্তবায়ন থেকে সরে এসেছেন তিনি। কার্যত সরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। বিদেশি শিক্ষার্থীদের পক্ষে প্রস্তাবিত এ নীতি বাতিলের জন্য আদালতে যায় ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) ও হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি। আদালত জানিয়ে দেন, কোনভাবেই বিদেশি শিক্ষার্থীদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের করে দেয়া যাবে না। মহামারীর কারণে তারা যুক্তরাষ্ট্রে বসেই ভার্চুয়াল ক্লাসে অংশ নিতে পারবেন। বৈধ স্টুডেন্ট ভিসায় দেশটিতে অবস্থান করতে পারবেন। 

তবে আদালতের চাপে কার্যত নতি স্বীকার করলেও নতুন করে বোমা ফাটিয়েছেন ট্রাম্প। আগামী নভেম্বরে দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচনে লড়বেন ট্রাম্প। তার আগের যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান অভিবাসন আইনে সংস্কার আনার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। 

যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন পাওয়ার ক্ষেত্রে যে বিষয়টি অগ্রাধিকার পেয়ে আসছে তা হলো, পরিবারের সদস্য কিংবা আত্মীয়স্বজনের দীর্ঘদিন ধরে দেশটিতে বসবাস করা। অর্থাত্ আপনার পরিবারের সদস্য কিংবা আত্মীয়ের কেউ দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন, এরই মধ্যে দেশটিতে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি কিংবা নাগরিকত্ব পেয়েছেন তবে অভিবাসনের ক্ষেত্রে আপনি অগ্রাধিকার পাবেন। ট্রাম্প এ নীতি আমূল বদলে দিতে চান। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের ক্ষেত্রে মেধা, দক্ষতা এবং শিক্ষাগত যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দিতে চান। 

ট্রাম্পের এ ইচ্ছা অবশ্য নতুন নয়। প্রেসিডেন্ট হবার পর থেকেই তিনি ওবামা আমলের এ নীতি বদলে ফেলার কথা বিভিন্ন সময় জানিয়েছেন। তবে সময় বেধে দিয়ে নতুন আইন প্রণয়নের ঘোষণা এবারই প্রথম দিলেন। এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, নির্বাচনের চার মাসের কম সময় বাকি থাকতে ট্রাম্প কেন এ ইস্যুটি নিয়ে মাঠে নামলেন?  

এর কারণে হতে পারে নির্বাচনী লড়াইয়ে কিছুটা হলেও এগিয়ে থাকা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অভিবাসন ইস্যু সবসময় হট টপিক হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেননা ইস্যুটি সরাসরি অর্থনীতি ও সমৃদ্ধির সাথে জড়িত। বলা হয়, মার্কিন অর্থনীতির ভিত্তি অভিবাসীদের হাতে গড়া। তাই এ ইস্যুতে স্বচ্ছ ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে পারার মতো অবস্থান ট্রাম্পকে ভোটের মঞ্চে নিঃসন্দেহে এগিয়ে রাখবে।

করোনা মহামারীর কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ভীষণ চাপের মুখে রয়েছে। চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ জন্ম দিচ্ছে। কর্মসংস্থান খাতকে চাঙ্গা রাখার চেষ্টা করে ক্রম ভঙ্গুর অর্থনীতির লাগাম কোনরকমে টেনে ধরে রেখেছেন ট্রাম্প। তার ওপর ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ শীর্ষক নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল ট্রাম্পের। এ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তার সফলতা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। চার বছরে তার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের মতো মানুষ ভালো করেই জানেন আসন্ন নির্বাচনে এসব পুরনো ইস্যু সামনে আসবে। তাই সময় থাকতেই রাজনীতিবিদ, সুশীল সমাজ সর্বোপরি গণমাধ্যমের হাতে অভিবাসন আইন সংস্কারের প্রশ্নটি তুলে দিতে পারলে, নির্বাচনের তরী পার হওয়া অনেকটা সহজ হতে পারে। 

ট্রাম্প দক্ষ ও মেধাবীদের অভিবাসনের পক্ষে মত দিয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই এ নীতি বাস্তবায়ন হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে মেধাবী ও দক্ষ শ্রম শক্তি যুক্ত হবে। ক্রম ভঙ্গুর অর্থনীতিকে মজবুত করতে সহায়ক হবে এ নীতি, যা ট্রাম্পের আমেরিকাকে নতুন করে গ্রেট বানাবে। নির্বাচনের প্রাক্কালে বিরোধী পক্ষও এ নীতির সমালোচনার সুযোগ পাবে না। রাজনীতিতে তুলনামূলক নতুন হলেও ঝানু ব্যবসায়ী ট্রাম্প নিজের ও দেশের স্বার্থ না দেখে নির্বাচনের মাস কয়েক আগে বড় কোন পদক্ষেপ নিবেন, সেটা আশা করা যায় না। 

যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীদের বেশিরভাগ এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার মানুষ। ভাগ্য ফেরাতে তাদের অনেকেই মার্কিন মুলুকে পাড়ি জমিয়েছেন, জমান। তাদের থাকে অদম্য সাহস, ইচ্ছাশক্তি ও পরিশ্রম করার মানসিকতা। এসব মানবিক গুণ মার্কিন শ্রম বাজারে সরাসরি যুক্ত হয়ে আর্থিক লাভ হিসেবে বেরিয়ে আসে। ব্যক্তিক উন্নতির সাথে সাথে সমৃদ্ধ হয় অর্থনীতিও। এটাই মার্কিন অর্থনীতির স্বতন্ত্র্যতা।

সাম্প্রতিক দশকগুলোয় মার্কিন অর্থনীতির বড় ভিত্তি হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে প্রযুক্তি খাত। ট্রাম্পের মেধাভিত্তিক অভিবাসন নীতি প্রযুক্তি খাতের বিকাশে সহায়ক। কেননা এ খাতের বেশির ভাগ কর্মী এশিয়ান-আফ্রিকান অভিবাসী ও নিজেদের কাজে দক্ষ। ক্রমবর্ধমান এ বাজারে চাকরির সুযোগও ক্রমশ বাড়ছে। ফলে মেধা ও দক্ষতার ভিত্তিতে অভিবাসনের সুযোগ দিলে প্রযুক্তির মতো দক্ষতা নির্ভর খাতে অভিবাসীরা বেশি বেশি সুযোগ পাবেন। 

এতে যুক্তরাষ্ট্র যেমন লাভবান হবে, তেমনি লাভবান হবেন এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার দেশগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানো অভিবাসী ও তাদের নিজ দেশের অর্থনীতি। তবে অমূল্য এ শ্রমবাজার ধরতে এসব দেশকে অবশ্যই মেধাবী ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলায় জোর দিতে হবে। জোর দিতে হবে ইংরেজি ভাষা শিক্ষায়। 

বাংলাদেশ এর বাইরে নয়। আমাদের দেশ থেকেও এরই মধ্যে অনেক মানুষ পরিবারের সদস্য কিংবা আত্মীয়দের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হিসেবে গেছেন। তাদের অনেককেই সেখানে তুলনামূলক নিম্নমানের ও কম দক্ষতার কাজে যুক্ত রয়েছেন। ভাষাগত দূর্বলতাও তাদের পিছিয়ে রাখে। এতে আয় তুলনামূলক কম হয়। জীবনযুদ্ধ প্রলম্বিত হয়। 

অনেকেই অভিবাসী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানোর স্বপ্ন দেখছেন। তাদের একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে। করোনা পরবর্তী বিশ্বে প্রতিযোগিতা বাড়বে। কাজের ক্ষেত্র বদলে যাবে। বাড়বে প্রযুক্তির ব্যবহার। ফলে শুধুমাত্র কায়িক শ্রম নয়, বরং নানাবিধ দক্ষতার বাড়তি কদর থাকবে। ফলে প্রতিযোগিতামূলক শ্রম বাজারে ভালো করতে হলে দক্ষতা বাড়াতে হবে। কারিগরি জ্ঞান বৃদ্ধির বিকল্প নেই। ঠিকঠাক ইংরেজি ভাষা জানতে হবে।

আর এ বিষয়টি উপলব্ধি করেই ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিতে আমূল পরিবর্তন আনছেন। মার্কিন মুলুকে মেধাবী ও দক্ষ শ্রম শক্তির সমাবেশ ঘটাতে চাইছেন। এখন আমাদের মতো দেশগুলো এ নীতি বদলের সুযোগ কতোটা কাজে লাগাতে পারবে, সেটা নির্ভর করবে আগাম পরিকল্পনার মাধ্যমে দক্ষ ও কর্মক্ষম মানবসম্পদ গড়ে তোলার ওপর। মানুষ দিন বদলের স্বপ্ন দেখবে। উন্নত জীবনের আশায় বিদেশে পাড়ি জমাবে। তবে তাদের স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে দিতে হবে আমাদেরই। সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হবে সময়োপযোগী ও কার্যকর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে।  

লেখক: সাংবাদিক