বাংলাদেশের ৫০ বছরপূর্তিতে এ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নানা কারণে বিশেষ মনোযোগ লাভ করেছে। কারণ এ পাঁচ দশকে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, নীতি, কর্মকৌশল নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের দর্শনগত নানা বিষয়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিধারাকে প্রভাবিত করেছে। ফলে এ দেশের বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পায়ন, সেবা খাত, সর্বোপরি মানুষের কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন, জীবনযাত্রার মান সবকিছুই নানা পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে গিয়েছে। আর এ পরিবর্তনে চড়াই-উতরাই থাকলেও ইতিবাচক ফলাফল পরিলক্ষিত হয়েছে বেশি। এ দেশের জাতীয় উৎপাদনের প্রবৃদ্ধির গতি, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার মান সবকিছুই দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আলোচনার বিষয়। বাংলাদেশের এ উন্নয়ন কীভাবে সম্ভব হলো; এ পথের চ্যালেঞ্জ কোথায় ছিল; এ মুহূর্তে কোথায় বাধা-বিপত্তি রয়েছে; আর ভবিষ্যতে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার সম্ভাবনা কতটুকু; কোন দিকে ধাবিত হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি—এসব ব্যাপারে নিরন্তর কৌতূহল শুধু অর্থনীতিবিদদের নয়, আরো অনেকেরই। আর এ কৌতূহল সামনে রেখে গবেষণালব্ধ, উপাত্তনির্ভর নানা বিষয়ে পর্যালোচনার সমাবেশ ঘটেছে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড থেকে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিধারা: সুবর্ণজয়ন্তীতে ফিরে দেখা’ নামক গ্রন্থটিতে। এ বই পড়ার ব্যাপারে আমার আগ্রহ জন্মেছে মূলত তিনটি কারণে: বাংলাদেশের ৫০ বছরের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘিরে বাংলা ভাষায় রচিত অর্থনৈতিক পর্যালোচনামূলক বই কেমন হবে এ-সংক্রান্ত কৌতূহল, বইটির সূচিপত্রে উল্লিখিত বিষয়গুলোর শিরোনাম এবং সর্বোপরি এ বইয়ের লেখকরা। বইটি তিনজন লেখকের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। তিনজনই তাদের স্বনামে প্রতিষ্ঠিত অর্থনীতিবিদ। অর্থনীতির নানা বিষয়ে তাদের গবেষণা, নানা বই, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত তাদের লেখার সঙ্গে আমি পরিচিত। এমন তিনজন প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ রুশিদান ইসলাম রহমান, রিজওয়ানুল ইসলাম ও কাজী সাহাবউদ্দিন একত্রে মিলে যখন একটি বই লিখেছেন, তখন সে বইয়ের পর্যালোচনায় ৫০ বছরের বাংলাদেশকে কোন চোখে তারা দেখেছেন, ভবিষ্যতের বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ কোনদিকে দেখতে পান সে ব্যাপারে আমার সহজাত কৌতূহল জন্মানোটাই স্বাভাবিক। কারণ আমার মতো যারা তাদের লেখার সঙ্গে পরিচিত আছেন তারা জানেন এ তিনজন অর্থনীতিবিদই সিরিয়াস গবেষক, অর্থনৈতিক তত্ত্ব মেনে, সঠিক পদ্ধতিতে সংগৃহীত তথ্য-উপাত্তের ওপর ভিত্তি করেই তারা তাদের পর্যালোচনা দিয়ে থাকেন। স্বভাবতই আমার মনে হয়েছিল এ বইয়ের ক্ষেত্রেও ব্যত্যয় হবে না এবং বাংলাদেশের ৫০ বছরের অর্থনৈতিক ইতিহাসের শক্তিশালী যুক্তিনির্ভর পর্যালোচনা আমি পাব। তারা আমাকে নিরাশ করেননি। বরং বাড়তি পাওনা হিসেবে বাংলাদেশের অর্থনীতির আগামীতে কী চ্যালেঞ্জ রয়েছে তার পর্যালোচনাও দেখছি এই একই বইয়ে।

পড়ার পর মনে হয়েছে বইটি আরো অনেকের পড়া দরকার। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের গবেষক, শিক্ষক, অর্থনৈতিক বিশ্লেষক এবং ছাত্রছাত্রীরা এ বই পড়ে বাংলাদেশের অগ্রগতির বিভিন্ন দিকের একটি তথ্য-উপাত্তনির্ভর পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাবেন।

দশটি অধ্যায়ের বইটিতে সূচনা ও উপসংহারের দুটি অধ্যায় বাদ দিলে বাকি অধ্যায়গুলোয় খাতভিত্তিক পর্যালোচনা যেমন রয়েছে, তেমনি সার্বিকভাবে সামষ্টিক অর্থনৈতিক সাফল্য ও ঝুঁকির আলোচনা, কৃষি শিল্পসেবা খাতের আলোচনা, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের উন্নয়ন, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ইত্যাদি নানা বিষয়ের সন্নিবেশ ঘটেছে। প্রতিটি অধ্যায়ের জন্য লেখকরা সংশ্লিষ্ট কয়েকটি গবেষণা প্রশ্ন রেখেছেন অধ্যায়ের শুরুতেই। ফলে পাঠক খুব সহজে বুঝতে পারবে এ অধ্যায়ের আলোচনায় কোন কোন প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে। আবার প্রতিটি ক্ষেত্রে করোনা অতিমারীর প্রভাব কী হয়েছে তার পর্যালোচনাও আছে। ফলে প্রতিটি ক্ষেত্রে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ সব দিকের পর্যালোচনা স্বাদ পাওয়া যায়। যেমন ‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি: সাফল্য, ঝুঁকি এবং সম্ভাবনা’ শীর্ষক দ্বিতীয় অধ্যায়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের চিত্রটি কেমন এবং কোথায় সাফল্য-ব্যর্থতা তার বর্ণনা যেমন আছে, তেমনি এ সাফল্যের প্রধান চালিকাশক্তিগুলোর কথা বলা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় সাফল্য ও সীমাবদ্ধতার কথা এসেছে। আবার ২০৩১ সালে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত দেশ হতে হলে প্রবৃদ্ধি কেমন হতে হবে বা এর বাস্তবতা কতটুকু সে আলোচনাও আছে।


তথ্য-উপাত্ত এবং চিত্রের মাধ্যমে এ বইয়ে আলোচিত হয়েছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাফল্যের পেছনের মূল তিনটি স্তম্ভ কৃষি, শিল্প উৎপাদন এবং রেমিট্যান্স কীভাবে কাজ করেছে। আর এর তত্ত্বগত ভিত্তি হিসেবে শ্রম ও পুঁজি এবং প্রকৌশলগত অগ্রগতি—এ তিন উপাদান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে কী করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে তার সুন্দর আলোচনাও এখানে আছে। তবে এ উন্নয়নের অগ্রযাত্রা যে চ্যালেঞ্জমুক্ত নয় এবং সেক্ষেত্রে করোনা পরবর্তী বিশ্বে নতুন ধরনের ঝুঁকি কীভাবে সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো আরো ঘনীভূত করেছে, তা থেকে পুনরুদ্ধারের উপায়ই বা কী সেই আলোচনাও যথেষ্ট গুছিয়ে করা হয়েছে।

লেখকরা বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার পথে সাধারণভাবে যে ধরনের চ্যালেঞ্জ আছে তার সঙ্গে আচমকা আঘাত থেকে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলার প্রস্তুতির ওপর জোর দিয়েছেন। এক্ষেত্রে বিনিয়োগের সম্ভাবনা, সে বিনিয়োগের পথে বাধাগুলো চিহ্নিত করে তা দূর করার প্রস্তুতি গ্রহণ; শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন; দক্ষতার সঙ্গে ব্যয় সাশ্রয়ী উপায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে গিয়ে এ বইয়ে বাংলাদেশকে কেবল দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার সঙ্গে তুলনা করা হয়নি, বরং দক্ষিণ-পূর্ব এবং পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ বিশেষ করে কোরিয়া, মালয়েশিয়া, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড এবং ভিয়েতনামের অগ্রগতির প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করা হয়েছে। ফলে আমার দেশের চেয়ে যারা পিছিয়ে আছে শুধু তাদের সঙ্গে তুলনা করে আত্মতৃপ্তির ঢেকুর না তুলে, যারা আমাদের চেয়ে এগিয়ে গেছে কিন্তু যাদের অগ্রগতির মতো এগিয়ে যাওয়া আমাদের পক্ষে অসম্ভব, সেসব দেশের অর্থনৈতিক সূচকের সঙ্গে আমাদের তুলনামূলক আলোচনার ফলে ভবিষ্যতে এগিয়ে চলায় কোথায় মনোযোগ দিতে হবে সে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়েছে।

এ বইয়ে শিল্প খাতের আলোচনায় নানামুখী শিল্পের অবস্থা, সেই শিল্প-কলকারখানা জন্য প্রয়োজনীয় শ্রমশক্তি গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা, শিল্প খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার কমে যাওয়া ইত্যাদি বিষয় আলোচিত হয়েছে। সেসঙ্গে নতুন শিল্প গড়ে তোলা এবং প্রযুক্তি ও প্রকৌশলগত উন্নয়নের সঙ্গে শিল্পায়নের সম্ভাবনা, শিল্পের গুণগত মান বৃদ্ধি, বহুমুখীকরণ, দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ প্রভৃতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা দেয়া হয়েছে।

একটি বইয়ের লেখক হিসেবে ড. কাজী সাহাবুদ্দিন আছেন, আর সে বইয়ে কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে কোনো লেখা থাকবে না, তা তো হতেই পারে না। কারণ তার পেশাগত জীবনে গবেষণায় কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট নানা বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে। কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা আলোচনাটি বাংলাদেশের জমির অনাধিক্য এবং জনসংখ্যার বাহুল্য এ দুয়ের পরিপ্রেক্ষিতে করা হয়েছে। শিল্পান্নয়নের জন্য কৃষিজমি কমে যাওয়া, অন্যদিকে উচ্চফলনশীল কৃষি কীভাবে খাদ্যনিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পদক্ষেপ প্রভাবিত করেছে সে সংক্রান্ত আলোচনা বিশেষ প্রশংসার দাবি রাখে।

বাংলাদেশের উন্নয়ন সংক্রান্ত আলোচনায় প্রায়ই বলা হয়, এ উন্নয়নে কর্মসংস্থান পর্যাপ্ত নয়। কোনো বিষয়ের পর্যালোচনা এ বইয়ের কর্মসংস্থান শ্রমবাজারে বেকারত্ব বিষয়ে অধ্যায় বিস্তারিতভাবে করা হয়েছে। খাতভিত্তিক ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতিমালা কীভাবে শ্রমঘন শিল্প স্থাপন এবং তার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে পারে সে পর্যালোচনা সুনিপুণভাবে করা হয়েছে এ বইয়ে।

যেহেতু বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকৌশলের মূল লক্ষ্য দারিদ্র্য বিমোচন, তাই এ বইয়েও দারিদ্র্য পরিমাপের নানা বিষয় বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এ পর্যালোচনা অর্থনীতির ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বিশেষ কাজে লাগবে বলে মনে করি।

এ বইয়ের লেখকদের বিশেষভাবে ধন্যবাদ দিতে হয় নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের বিষয়টি আলাদাভাবে একটি অধ্যায়ে পর্যালোচনা করার জন্য। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীরা বিশেষ ভূমিকা রেখেছে এবং এখনো যেহেতু অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে নারীরা পিছিয়ে আছে, কাজেই নারীদের ক্ষমতায়িত করতে পারলে আগামীর অর্থনৈতিক উন্নয়ন কতটা সহজ হবে সে আলোচনা চাহিদা ও জোগান উভয় দিক থেকেই করা হয়েছে, যা এ আলোচনাকে একটা বিশেষ মাত্রা দিয়েছে।

আমার মতে, ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিধারা: সুবর্ণজয়ন্তীতে ফিরে দেখা’ বইটি সময়োপযোগী উদ্যোগ, বাংলা ভাষায় রচিত তথ্য-উপাত্তনির্ভর অর্থনৈতিক পর্যালোচনামূলক বইয়ের দীনতা ঘোচানোর সফল প্রয়াস। তবে বইটির কিছু আলোচনা ইংরেজি ভাষা থেকে বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান এবং সেক্ষেত্রে বাংলায় যে ধরনের শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তা পাঠকের জন্য কঠিন মনে হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে সহজ বাংলা শব্দ ব্যবহার করলে সংশ্লিষ্ট আলোচনা আরো সুখপাঠ্য হতো। এরূপ দু-একটি দুর্বল বিষয় বাদ দিলে এক কথায় বলা যায় বইটি গবেষক, শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী, অর্থনীতি বিশ্লেষক ছাড়াও নীতিনির্ধারক, রাজনীতিবিদ এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তাদের জন্য বিশেষ উপকারে আসবে। সারা দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ছাত্রছাত্রীদের জন্য এ বই রেফারেন্স বই হিসেবে অনেক কাজে লাগবে। বাংলা ভাষায় এমন একটি তথ্যসমৃদ্ধ পর্যালোচনামূলক বই উপহার দেয়ার জন্য লেখকদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা রইল। নিঃসন্দেহে এ বই যেন এক মলাটে গত পাঁচ দশকের অর্থনৈতিক উন্নয়নের খতিয়ান।

 

নাজনীন আহমেদ: কান্ট্রি ইকোনমিস্ট, ইউএনডিপি, বাংলাদেশ