দেশের প্রধান রফতানিমুখী শিল্প তৈরি পোশাক। তথ্য বলছে, মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৮১-৮২ শতাংশের উৎস এটি। রফতানিতে স্থানীয় মূল্য সংযোজনের বিপরীতে নগদ সহায়তা পান এ শিল্পের উদ্যোক্তারা। কিছুদিন আগে মূল্য সংযোজনের শর্তে পরিবর্তন আনা হয়। পরিবর্তিত শর্তে নগদ সহায়তা পেতে দেশীয় মূল্য সংযোজনের হার ন্যূনতম ৩০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। তবে শিল্প মালিকদের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে পুরনো হারে (২০ শতাংশ মূল্য সংযোজন) ফিরে যেতে সম্মত হয়েছেন নীতিনির্ধারকরা। বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ পরিবর্তিত বাস্তবতায় স্থানীয় মূল্য সংযোজনের প্রয়োজনীয়তা আরো বেশি মাত্রায় দেখা দিয়েছে। প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্যই এটা প্রয়োজন। এ অবস্থায় পুরনো হারে ফিরে যাওয়াটা কতটা যৌক্তিক, তা বিবেচনার দাবি রাখে।
তিন দশকের বেশি সময় আগে দেশে পোশাক শিল্পের যাত্রা শুরু হয়েছে। সময়ান্তরে রফতানি বাড়লেও পোশাকে স্থানীয় মূল্য সংযোজন আশানুরূপ নয়। কাঁচামালের উল্লেখযোগ্য অংশ আমদানি করে দেশে পোশাক উৎপাদন এবং তা রফতানি করা হচ্ছে। নিট পোশাকে বর্তমানে ৯০ শতাংশের বেশি স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার হলেও ওভেনে অবস্থা খুব একটা সন্তোষজনক নয়। ওভেন পোশাকের জন্য এখনো বেশির ভাগ কাঁচামাল আমদানি করতে হচ্ছে। এতে সার্বিকভাবে দেশের অর্থনীতি খুব একটা লাভবান হচ্ছে না। কাঁচামালে আমদানিনির্ভরতার বড় কারণ স্থানীয় সক্ষমতার ঘাটতি। স্থানীয় কাঁচামাল সরবরাহকারী, অর্থাৎ পশ্চাত্সংযোগ খাত হিসেবে স্থানীয় সুতা ও কাপড় এখনো প্রয়োজনীয় সক্ষমতা দেখাতে পারছে না। বিশেষ করে উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে এ ঘাটতি প্রবল। বাংলাদেশ থেকে ক্রেতারা ধীরে ধীরে উচ্চমূল্যের পোশাক নিতে চায়। দেশে এ ধরনের পোশাক উৎপাদনে উপযোগী কাপড়-সুতার জোগান কম থাকায় অনেক ক্রেতা নির্দিষ্ট বিদেশী প্রতিষ্ঠান থেকে সেগুলো আমদানির শর্ত দেয়, যা দেশীয় মূল্য সংযোজন বৃদ্ধিতে অন্তরায়।
আমরা দেখছি অর্থনৈতিক সুফল সর্বোচ্চকরণে আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলো পোশাক খাতে স্থানীয় মূল্য সংযোজন বাড়িয়েছে উল্লেখযোগ্য মাত্রায়। সুতা, কাপড় ও প্রয়োজনীয় অন্য উপকরণে আত্মনির্ভরতা বাড়াতে গড়ে তুলেছে টেকসই পশ্চাত্সংযোগ শিল্প। চীন তো সব দিক থেকে অনেকটাই স্বয়ংসম্পূর্ণ। ভারত ও ভিয়েতনামও নিজেদের প্রায় শতভাগ উপকরণ ব্যবহার করছে পোশাক উৎপাদনে। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি রফতানিও করছে বিভিন্ন দেশে। এটা সম্ভব হয়েছে পশ্চাত্সংযোগ শিল্পে স্থানীয় সক্ষমতা বাড়ানোর কারণে। কম্বোডিয়াও এদিকে দৃষ্টি দিয়েছে। দেশগুলো এখন কৃত্রিম ফাইবারেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তাদের পথ ও কর্মপ্রক্রিয়া আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।
শিল্প মালিকরা বলছেন, দেশের পোশাক শিল্প একটা ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কভিডের অভিঘাত থেকে এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি খাতটি। এ অবস্থায় নগদ সহায়তা তাদের জন্য আরো কিছুদিন প্রয়োজন। কিন্তু যে শর্তে নগদ সহায়তা দেয়ার কথা বলা হচ্ছে, তা পূরণ তাদের পক্ষে কঠিন হবে। দেখা যাচ্ছে বিশেষ করে ওভেনে অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী ৮০ শতাংশ কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। কাজেই ৩০ শতাংশ দেশীয় মূল্য সংযোজনের শর্তারোপ করা হলে সব ক্ষেত্রে রফতানি প্রণোদনা পাওয়ার যোগ্যতা পূরণ করা সম্ভব হবে না। আবার কর্মীদের মজুরি বাড়ায় সার্বিকভাবে পরিচালন ব্যয় ও পোশাক উৎপাদন খরচও নাকি বেড়েছে। সব মিলিয়ে নগদ সহায়তা প্রাপ্তিতে তারা দেশীয় মূল্য সংযোজন ২০ শতাংশে ফিরতে চায়। এরই মধ্যে এ ব্যাপারে নীতিনির্ধারকরা সম্মত হয়েছেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিষয়টি জানিয়ে চিঠিও দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংককে। তবে সময়ের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এখনো সবার ক্ষেত্রে মূল্য সংযোজনের পুরনো শর্ত প্রযোজ্য হওয়া উচিত কিনা, তা নিয়ে রয়ে যায় সংশয়। এটা নিয়ে আরো আলোচনা-পর্যালোচনা প্রয়োজন।
দেশ স্বল্পোন্নত থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। ২০২৬ সালে উন্নয়নশীল দেশে পদার্পণের পর অপেক্ষাকৃত কম মূল্য সংযোজন নিয়ে ইউরোপে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা পেতে বিপাকে পড়বে। ইইউর প্রস্তাবিত নতুন জেনারেলাইজড স্কিম অব প্রেফারেন্স তথা জিএসপি কাঠামোয় অন্তর্ভুক্তির যোগ্য হতে হলে বাংলাদেশী পোশাক প্রস্তুতকারকদের ‘দ্বিগুণ রূপান্তরের’ কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ স্থানীয় পর্যায়ে মূল্য সংযোজনের হার ৪০ শতাংশ হতে হবে। শুধু ইউরোপ নয়, দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আওতায় প্রতিবেশী ভারত, এমনকি চীনেও রফতানি করতে ৪০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের দরকার হবে। এ অবস্থায় নগদ প্রণোদনা পাওয়ার ন্যূনতম মূল্য সংযোজন ২০ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবি অনেকটা উল্টো যাত্রা বলা চলে। প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, দেশের নিট পোশাক উৎপাদকরা এরই মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ে ৪০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করে ফেলেছেন। কিন্তু এক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছেন ওভেন পোশাক উৎপাদকরা। শিল্প বিশ্লেষকদের পরামর্শ হলো, নগদ প্রণোদনা সবার জন্য প্রযোজ্য হওয়া উচিত নয়। যেসব প্রতিষ্ঠান তাদের পণ্য উৎপাদনে স্থানীয় মূল্য সংযোজনে ব্যর্থ হবে, তাদের প্রণোদনার তালিকা থেকে বাদ দেয়াই হবে যথাযথ পদক্ষেপ। কেবল নতুন পণ্য, বিশেষ করে কৃত্রিম ফ্যাব্রিকভিত্তিক আইটেমগুলোর জন্য ২০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্ত অনুমোদন করা যেতে পারে। অন্য সব ক্ষেত্রে নয়। এ পরামর্শ আমলে নেয়া যেতে পারে।
সামনের দিনে দেশের পোশাক রফতানি আরো প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে। সেক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। মানের পাশাপাশি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান দেশীয় মূল্য সংযোজন। পরিবর্তিত বাস্তবতায় দেশের পোশাক খাতে মূল্য সংযোজনের প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। একদিকে প্রতিটি কাঁচামালের দরবৃদ্ধির কারণে এ শিল্পের উদ্যোক্তাদের বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে, অন্যদিকে উৎপাদিত পণ্যের দামও সেভাবে বাড়ছে না। এ অবস্থায় টেকসই পশ্চাত্সংযোগ শিল্প গড়ে তুলতে বিনিয়োগ বাড়ানো সময়ের দাবি।










