প্রতিটি একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের প্রিয় বাংলা বিকশিত করার দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়। তবে সেই দায়িত্ব পূরণের জন্য আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য মনে রাখতে হবে—ভাষা বেঁচে থাকা ও তার বিকাশ নির্ভর করে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রযুক্তিতে ভাষাটি কতটা মানিয়ে নিজের করে নিতে পেরেছে তার ওপর।
পৃথিবীতে ভাষার সংখ্যা প্রায় আট হাজার। তবে বহুল ব্যবহৃত ভাষার সংখ্যা মাত্র ৪ শতাংশ। বাংলা পৃথিবীর সপ্তম সর্বাধিক কথিত ভাষা; বাংলা সাহিত্যের কাজের মান, পরিমাণ ও ব্যাপ্তি গুনলে এটি প্রথম সারিতে থাকবে। তবে আমাদের বাংলা ভাষা আজ আসলে কোথায় যাচ্ছে? ডিজিটাল যুগে বাংলা শুধু নামে টিকে থাকবে নাকি ভাষাটির সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ আছে—এটা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। ভাষা গবেষকদের মতে, ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাভাষীর সংখ্যা দাঁড়াবে ৩১ কোটি ৬০ লাখ। এ সাফল্যের অন্যতম কারণ হতে পারে বাংলা ভাষাকে প্রযুক্তিবান্ধব ও ইন্টারনেটে সংযুক্ত করা। বাংলা ভাষার প্রতি শুধু আবেগীয় ভালোবাসা দিয়ে ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। একটি ভাষার বেঁচে থাকা নির্ভর করে এর বাস্তব উপযোগিতার ওপর। ইউনেস্কোর ভাষ্যমতে, একটি ভাষা তখনই হারায়, যখন এ ভাষায় কথা বলা মানুষ অন্য ভাষা গ্রহণ করে বা নিজেদের ভাষা পরিত্যাগ করে। বাইরের নানা শক্তির চাপ, যেমন সামাজিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক বা শিক্ষার আধিপত্যবাদের কারণেও ভাষা কোণঠাসা হয়ে পড়ে। আবার কখনো কখনো নিজেদের ভাষার প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিও একটি ভাষার মৃত্যুর কারণ হতে পারে। আবার ওই ভাষায় কথা বলা লোকদের মৃত্যুর মধ্য দিয়েও ভাষাটি হারিয়ে যেতে পারে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে বিশাল প্রতিশ্রুতি এবং চ্যালেঞ্জ উভয়ই আমাদের সামনে রয়েছে। আজকের দিনে শুধু সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভাষা ও সংস্কৃতি বিকশিত হয় না, এখানে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও সমন্বয় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিশ্বের সার্বিক ও গুণগত মান উন্নয়নে তথ্যপ্রযুক্তি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি লাভে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার তখনই কার্যকর হবে যখন বাংলাকে সব প্রযুক্তির সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হবে। তবে দুঃখের বিষয়, ডিজিটাল তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বাংলা ভাষার সমন্বিত প্রয়োগ খুবই সীমিত। দেশে তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে এক দশকে যেসব কাজ হয়েছে সেসব হচ্ছে ই-গভর্ন্যান্স, শিক্ষা ক্ষেত্রে বাংলায় ডিজিটালাইজেশন, ব্যবসা-বাণিজ্যে বাংলায় ডিজিটাল রূপান্তর, মোবাইল সেবা ও মোবাইল ব্যাংকিং ইত্যাদি। তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলার ব্যবহার তুলনামূলক হারে বেড়েছে। তবে এটা বাংলাকে সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। ইউনেস্কোর তথ্যমতে, পৃথিবীতে প্রতি ১৪ দিনে একটি ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের ২০১৮ সালের এক গবেষণা অনুসারে বাংলাদেশেও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের ব্যবহৃত ৪১টি ভাষার মধ্যে ১৪টি প্রায় মুমূর্ষু। এগুলোর মধ্যে কোনো কোনো ভাষায় কথা বলা লোকের সংখ্যা ১০-১২ জনে এসে ঠেকেছে। এটি প্রায়ই দেখা যায় যে শক্তিশালী ভাষার পেছনে শক্তিশালী জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি বিদ্যমান। ইংরেজির দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দুর্দমনীয় বিস্তৃতির কারণেই বিশ্বে ইংরেজি আজ অন্যতম প্রচলিত ভাষা। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে, বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ফলে বাংলা ভাষাও আজ ব্যাপক চাপের মধ্যে রয়েছে। প্রতিদিন নতুন সব প্রযুক্তির জন্ম হচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসবে ব্যবহৃত হচ্ছে ইংরেজি ভাষা এবং প্রযুক্তির সূতিকাগার হিসেবে পাশ্চাত্যের দেশগুলোর শক্ত উপস্থিতির কারণে ইংরেজি হয়েছে প্রযুক্তিপণ্যের ভাষা। বিভিন্ন সফটওয়্যার, ওয়েবসাইট, অ্যাপের ভাষা ইংরেজি হওয়ায় বাংলায় কথা বলা লোকেরা তথ্য, পণ্য ও সেবা গ্রহণ নিয়ে বেশ সমস্যায় পড়ে থাকে। আবার আমাদের মধ্যে ইংরেজি ব্যবহারের প্রবণতাও বাড়ছে। এখন তথ্যের অবাধ প্রবাহের যুগে প্রতিদিনই ইন্টারনেটে তথ্য খোঁজার সংখ্যা বাড়ছে। তবে ডিজিটাল জগতে সার্চ করে বাংলায় পাওয়া তথ্যের পরিমাণ খুব সীমিত। যে কারণে বাংলাভাষীদেরও ইংরেজিতে তথ্য খুঁজতে হয়। একইভাবে বাংলায় কনটেন্টের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। এছাড়া যেসব বিষয়ে কনটেন্ট রচিত হয়েছে সেগুলো এখনো হার্ডকপির মধ্যেই থেকে যায়, ডিজিটাল রূপান্তর যথাযথভাবে হয় না। বাংলায় কিছু ডিজিটাল কনটেন্ট পাওয়া গেলেও তা যথেষ্ট আকারে নেই। বাংলায় কনটেন্ট যেখানে অপ্রতুল, ইংরেজিতে সেখানে কনটেন্টের অভাব নেই। আবার ইংরেজিতে প্রাপ্ত কনটেন্টগুলোকে বাংলা ভাষায় অনুবাদের সংখ্যাটাও পরিমাণে স্বল্প। আরো একটি সমস্যা হলো, বাংলা ভাষার ব্যবহার ও উন্নয়নের জন্য উন্নতমানের সফটওয়্যার বা অ্যাপ এখনো খুব একটা তৈরি হয়নি। যে কয়েকটি রয়েছে বিভিন্ন প্রোগ্রামে, যেমন মাইক্রোসফট অফিসে বাংলার বানান, ব্যাকরণ, শব্দভাণ্ডারের উপস্থিতি নেই। সঙ্গে ফন্ট ও ভাষার মানজনিত সমস্যাও রয়েছে। ফন্টজনিত সমস্যার কারণে ইন্টারনেটে সবসময় বাংলা ভাষায় লিখিত তথ্য খুঁজে বের করা সম্ভব হয় না।
এখনো নানা সমস্যা রয়ে গেলেও বাংলাদেশ এসব সমস্যা থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করছে। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ থেকে বাংলাদেশ নতুন মাইলফলক ঠিক করেছে। সেটা হলো ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে প্রযুক্তি খাতে প্রাধান্য দিয়ে নানা উদ্যোগ নিচ্ছে বর্তমান সরকার। বেসিসের তথ্যমতে, শুধু অ্যাপ নিয়ে কাজ করছে শখানেক আইটি প্রতিষ্ঠান। সেসব কাজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি অ্যাপ হচ্ছে ‘একুশ আমার’, ‘ই-তথ্য কোষ’, ‘বাংলা ব্লগস’, ‘বাংলা এসএমএস’, ‘বাংলা অভিধান’, ‘বাংলাদেশের সংবিধান’, বর্ণ শিক্ষার ‘হাতেখড়ি’, ‘জি-শ্লেট বাংলা’ ইত্যাদি বাংলা অ্যাপ। এছাড়া বাংলা বানান ও ব্যাকরণ সঠিকভাবে লেখার জন্য রয়েছে অ্যাপ ‘সঠিক’। জনসাধারণের মনোভাব বিশ্লেষণের জন্য ‘জনমত’, বাংলা ওসিআর ‘বর্ণ’ বাংলা মেশিন ট্রান্সলেটর উন্নয়ন, স্ক্রিন রিডার সফটওয়্যারসহ বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে। তবে এসব কাজে উন্নয়নের গতি অত্যন্ত ধীর। এখানে আমাদের সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাত ও স্বেচ্ছাসেবীদের এগিয়ে আসতে হবে। সবার প্রচেষ্টায় প্রযুক্তিবিশ্বে বাংলা ভাষার উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়বে। বাংলা ভাষা দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে। প্রযুক্তিতে বাংলার ব্যবহার বাড়ানোর জন্য উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের এগিয়ে আসতে হবে। সরকারকে প্রযুক্তিতে বাংলার ব্যবহারে প্রণোদনা নীতিমালা তৈরি করতে হবে। তাহলেই গড়ে তোলা সম্ভব হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল অর্থনীতি।
মো. আবিদ মঈন খান: সাংবাদিক










