বিগত কয়েক বছরে কক্সবাজারে বন উজাড় হওয়া ত্বরান্বিত হয়েছে। এর জন্য বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের দায়ী করে আসা হচ্ছিল দীর্ঘদিন ধরে। কিন্তু সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় গতানুগতিক এ চিন্তার বিপরীত তথ্য উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, তিন বছরে কক্সবাজারে ২৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ বন উজাড় হয়েছে। এর মধ্যে রোহিঙ্গাদের হাতে হয়েছে মাত্র ১০ শতাংশ, বাকি ৯০ শতাংশ হয়েছে স্থানীয়দের মাধ্যমে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাইরে ক্রমেই স্থানীয়রা এসে বসতি গড়তে থাকে। এদের হাতেই এক-তৃতীয়াংশ বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে গবেষণায় দাবি করা হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটের সুযোগে কিছু বাংলাদেশী বনভূমি উজাড়ে সক্রিয় হয়েছে বলেও খবর মিলছে। এক্ষেত্রে রোহিঙ্গা বা স্থানীয় যাদের হাতেই বনভূমি উজাড় হোক না কেন, সেটি রোধ করার দায়িত্ব প্রশাসনেরই। সংরক্ষিত বন হলে সেটা থাকে বন বিভাগের নামে আর প্রটেকটেড বনভূমির দায়িত্ব জেলা প্রশাসকের। এটা প্রমাণিত যে বনভূমি রক্ষায় প্রশাসন দায়িত্ব পালন করেনি। এক্ষেত্রে অবশিষ্ট প্রাকৃতিক বনভূমি রক্ষায় বন বিভাগ ও জেলা প্রশাসনের সক্রিয়তা প্রয়োজন। নইলে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে পড়বে।

প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে বন ও বনভূমির গুরুত্ব অপরিসীম হলেও তা সংরক্ষণ ও উন্নয়নে কার্যকর ব্যবস্থার ঘাটতি দৃশ্যমান। বরং বনের জমিতে অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা, বনের আশপাশের জমি সরকারি ও বেসরকারি শিল্প-কারখানা এবং স্থাপনা তৈরিতে বরাদ্দ প্রদান, বনকেন্দ্রিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও বনের জমি জবরদখলের মাধ্যমে বন ধ্বংসের বহুমুখী ঝুঁকি তৈরি করা হয়েছে। এতে বনজ সম্পদ ও বনভূমির অবক্ষয় ক্রমে বাড়ছে এবং বন্যপ্রাণী হুমকির মুখে পড়েছে, যা জীববৈচিত্র্য ধ্বংসসহ পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। নিত্যনতুন পদ্ধতিতে বনের জমি জবরদখল হচ্ছে। কোথাও বনভূমি কেটে সমতল করে পাকা দালান থেকে শুরু করে পোলট্রি ফার্ম ও নানা স্থাপনাসহ বনভূমির প্রায় সিংহভাগ জায়গায় দখলবাজরা নিয়মিত পাহাড় কেটে পাকা ঘর নির্মাণ ও পাহাড়ি মাটি অবৈধভাবে বিক্রি করছে। বনভূমি ধবংসের সঙ্গে পশু শিকারের পাশাপাশি তাদের চলাচলের পথ ও আবাসস্থল নষ্ট করা হচ্ছে। বেশির ভাগই মানুষের হাতে মারা পড়ছে। কক্সবাজারে বন উজাড়ের প্রক্রিয়া বন ও বনভূমি সুরক্ষায় বাংলাদেশ বন অধিদপ্তরের অদক্ষতা ও অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার প্রমাণ। বন সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় বন অধিদপ্তরের ভূমিকা সত্যিকার অর্থেই হতাশাব্যঞ্জক। বন অধিদপ্তর কর্তৃক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বনকেন্দ্রিক দুর্নীতিতে অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশ ও অদক্ষতা টেকসই বন উন্নয়নের অন্যতম প্রতিবন্ধক হিসেবে দাঁড়িয়েছে। রাষ্ট্রীয় বনভূমির সুরক্ষা ও বনের জনগোষ্ঠীর প্রথাগত ভূমি অধিকার নিশ্চিত করতে বন অধিদপ্তরের ওপর অর্পিত যে ক্ষমতা এবং সক্ষমতা রয়েছে, দুটোরই তারা কার্যকর ও ন্যায়সংগত ব্যবহার করতে পারছে না। আবার এ কথাও সত্য, রোহিঙ্গাদের আগমনের সুযোগ নিয়ে স্থানীয়রা বনভূমি উজাড়ে আরো সক্রিয় হয়েছে। সবকিছুর মূলে রোহিঙ্গা সংকট। যত দ্রুত এ সংকটের সুরাহা হবে তত দ্রুতই প্রশাসন সংশ্লিষ্ট এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বনভূমি পুনরুদ্ধারে পদক্ষেপ নিতে পারবে। স্থানীয়দের বনভূমি উজাড় বন্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগই প্রত্যাশিত।

বন আইনের বিধিমালার অনুপস্থিতি এবং ৯৪ বছরের পুরনো আইনে বন, বনভূমি এবং বনজ সম্পদ সংরক্ষণে আইন প্রয়োগে যেমন বিবিধ চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তেমনি আইনগুলোর কার্যকর প্রয়োগে বন অধিদপ্তরের সদিচ্ছার ঘাটতি রয়েছে। সম্প্রতি খসড়া বন আইন-২০১৯ প্রণয়ন করা হলেও বন বিশেষজ্ঞরা এটিকে ১৯২৭ সালের বন আইনের পুনর্মুদ্রণের নামান্তর বলে অভিহিত করেছেন। এ আইনের প্রস্তাবিত ২৮ নম্বর ধারার বিধানের ফলে যথেচ্ছভাবে সংরক্ষিত বনের জমি সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়নকাজের ব্যবহারের সুযোগ এবং ২৯ নম্বর ধারায় সংরক্ষিত বন তার অংশবিশেষের ওপর রাষ্ট্রের/সরকারের অধিকার গ্রামীণ সম্প্রদায়/সাধারণ জনগণ/কোম্পানির ওপর অর্পণ করার ফলে সংকটাপন্ন বনাঞ্চল আরো উজাড় হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ২৬, ৭৩ ও ৮০ ধারায় বন কর্মকর্তাকে অপরাধ আপস করার ক্ষমতা প্রদান এবং সরল বিশ্বাসে সম্পাদিত কার্যাদি সম্পাদন করার জন্য দায়মুক্তির বিধান, অবৈধ দখলদারিত্ব ও স্থাপনা উচ্ছেদে বন অধিদপ্তরের পর্যাপ্ত ক্ষমতা না দেয়ায় আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

মালয়েশিয়া, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশ বনভূমি সুরক্ষা করেই অর্থনৈতিক উন্নয়ন করতে সক্ষম হয়েছে। মালয়েশিয়ায় এখনো বনাঞ্চলের পরিমাণ দেশের মোট আয়তনের ৭৯ দশমিক ৭ শতাংশ। দক্ষিণ কোরিয়ায় এ হার ৬৭ দশমিক ৬ ও জাপানে ৬৩ শতাংশ। আর বাংলাদেশ শিল্প ও কৃষি উন্নয়নের অজুহাতে গাজীপুরের মতো জায়গায় গত এক দশকে ৭৯ শতাংশ বনাঞ্চল নির্মমভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। ২০০৬ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত উজাড় হওয়া বনের ৪০ শতাংশ কৃষিজমিতে রূপান্তর হয়েছে। পরিবেশ ধ্বংস করে যে উন্নয়ন টেকসই হয় না—এটা এখন সারা পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত সত্য। বাংলাদেশের উচিত বনভূমি ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান। প্রয়োজনে বন বিভাগকে ঢেলে সাজানো। বন রক্ষায় বন বিভাগ এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো সক্রিয় করে তোলা। দখলকৃত বনভূমি উদ্ধার করে সেখানে নতুন করে বন সৃজন করা। বৃক্ষ ও বন্যপ্রাণী হত্যা এবং পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন করে ব্যবস্থা গ্রহণ। শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে দখলই নয়, সরকারি পর্যায়েও বাংলাদেশ বনভূমির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও পুনর্বাসনের জন্য শত শত একর সংরক্ষিত বনভূমি ব্যবহার হচ্ছে। এমন প্রবণতা থেকে সরকার, এনজিও, বিদেশী সহায়তা সংস্থা ও বেসরকারি খাত সবাইকে বেরিয়ে আসতে হবে।

সরকারি কর্মকর্তারা কক্সবাজারে বনভূমি ধ্বংস হওয়া নিয়ে বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে একমত নন। অনেক গবেষকও ভিন্নমত পোষণ করছেন। তাদের মতে, প্রায় ১৩ হাজার হেক্টর বনাঞ্চল নষ্ট হওয়ার তথ্য সঠিক নয়। তবে যতটুকু নষ্ট হয়েছে, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তা মূলত রোহিঙ্গাদের কারণেই। রোহিঙ্গাদের দেয়া হয়েছে ৬ হাজার ৪২৪ একরের মতো ভূমি। শুরুতে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় গোটা বনাঞ্চল নষ্ট হয়েছে তাদের জন্য। এখন তারকাঁটা দিয়ে সীমানা নির্ধারণসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছে তাদের। প্রাথমিকভাবে রোহিঙ্গাদের বিচরণের ক্ষেত্র ছিল ৩০ হাজার একরজুড়ে। রোহিঙ্গারা বসতবাড়ি নির্মাণ ও জ্বালানি হিসেবে ব্যাপক বাঁশ ও গাছ ব্যবহার করে। প্রাথমিকভাবে এর সত্যতা পাওয়া গেলেও পরবর্তী সময়ে তা অনেকটাই কমে আসে। পরবর্তী সময়ে রোহিঙ্গা শিবিরে জ্বালানি হিসেবে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সরবরাহ করা হয়। ধীরে ধীরে জ্বালানি হিসেবে কাঠের ব্যবহার কমিয়ে আনা হয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে দেখা যাচ্ছে, বন উজাড়ে সরকারের ভূমিকা অধিক দায়ী। এক্ষেত্রে বড় ইজারা দেয়ার প্রথা বন্ধ করতে হবে সর্বাগ্রে।

বন সংরক্ষণের মাধ্যমেই শোভন ও পরিবেশবান্ধব জীবিকার ব্যবস্থা হতে পারে। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বন সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার করা গেলে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যাবে, সৃষ্টি হবে নতুন কর্মসংস্থান। বন সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারে দরকার স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্তকরণ ও ক্ষমতায়ন। সরকারি, বেসরকারি ও স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত প্রয়াসে বিভিন্ন বাস্তুসংস্থানের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রকল্প নেয়া যেতে পারে। সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে সারা দেশের বাস্তুসংস্থানে ঝুঁকি হ্রাস সম্ভব। মূলত নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থেই বন ও বনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা জরুরি। ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ এবং সুস্থ ও সুন্দর জীবনের জন্য বন সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের বিকল্প নেই। বিপর্যয় ও দুর্যোগ থেকে পরিবেশ রক্ষার একমাত্র উপায় দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে বনাঞ্চল সৃষ্টি করে প্রাকৃতিক ভারসাম্য অক্ষুণ্ন রাখা। এদিকে নজর না দিলে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হবে। সমস্যাটি আরো প্রকট হয়ে ওঠার আগেই যেখানে সম্ভব বনাঞ্চল তৈরি করতে হবে। অন্যথায় প্রাকৃতিক মহাবিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হবে।

নির্বিচারে বনভূমি ধ্বংস করার কারণে বন ও বন্যপ্রাণী হুমকির মুখে পড়েছে। গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচ ও জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির তথ্যমতে, এখনই সময় মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ককে পুনর্বিবেচনা করে সব কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দেয়ার। জীববৈচিত্র্য রক্ষা, প্রকৃতির সুরক্ষা নিশ্চিত করা, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস রোধে জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ সংরক্ষণ আইন বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করাসহ প্রাণ ও প্রকৃতি তথা জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় বিভিন্ন রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি রক্ষা এবং তার বাস্তবায়নে নাগরিকদের সোচ্চার হতে হবে। একই সঙ্গে বন্যপ্রাণীসহ বনজ ও প্রাণিজ সম্পদ ক্রয়-বিক্রয় নিয়ন্ত্রণে ভোক্তা, নাগরিক এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে আরো দায়িত্বশীল হতে হবে।