কভিড মহামারীর মধ্যেই চলেছে দেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর উদযাপন। আসছে ডিসেম্বরে উদযাপিত হবে বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী। দীর্ঘ এ ৫০ বছরের যাত্রায় আমাদের আর্থসামাজিক উন্নয়নের নানা সূচকে হয়েছে চমকপ্রদ অর্জন। এর পেছনে সমবায়েরও একটা ভূমিকা আছে। তবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করতে সমবায় ব্যবস্থা যেভাবে অবদান রাখতে পারত, সেভাবে পারছে না। এমনই এক প্রেক্ষাপটে দেশে পালিত হলো ৫০তম জাতীয় সমবায় দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য—‘বঙ্গবন্ধুর দর্শন, সমবায়ে উন্নয়ন’। এটি অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ ও সময়োপযোগী। জাতির পিতার স্বপ্নের সঙ্গেও এটি বিশেষভাবে সংগতিপূর্ণ। তিনি চেয়েছিলেন সমবায়ের মাধ্যমে একটি ক্ষুধা, দারিদ্র্যমুক্ত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে। কাজেই বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সমবায় ব্যবস্থাকে আরো কার্যকর করে তোলা জরুরি।
দেশে সমবায়ের যাত্রা ব্রিটিশ আমলে। জেলে, কৃষক ও কারিগর শ্রেণীকে মহাজনী ব্যবস্থার নিষ্পেষণ থেকে পরিত্রাণ দেয়াই ছিল এটি সূচনার উদ্দেশ্য। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান আমলে সমবায় নতুন মাত্রা পায়। ১৯৫৯ সালে বাংলাদেশ একাডেমি ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট (বার্ড) প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সমবায় আন্দোলনে নতুন দিক উন্মোচন হয়। পল্লী উন্নয়নে এটি সমবায় আন্দোলনের নতুন মডেল হিসেবে উপস্থাপিত হয়, যা কুমিল্লা মডেল নামে সমধিক পরিচিত। মডেলটি কৃষি মন্ত্রণালয়, সমবায় বিভাগ ও বৈদেশিক উৎসগুলো থেকে নানাভাবে সমর্থন পায়। এখানে অর্জিত সাফল্যে সরকার ৩০ হাজার কৃষকের সমবায় সংগঠিত করে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সব ক্ষেত্রে সমবায়ীদের প্রতি পূর্ণ সমর্থনের অঙ্গীকার করে। সরকারি সমর্থনের ফলে সমবায় সমিতিগুলোর সংখ্যা ক্রমেই বাড়তে থাকে। তবে মুক্তিযুদ্ধের সময় সমবায় উদ্যোগগুলো প্রবল বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে এ ধরনের উদ্যোগগুলোকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হয়। গুরুত্ব বিবেচনা করে সংবিধানে সমবায়কে সম্পদের মালিকানার দ্বিতীয় খাত হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। এ দেশের গণমানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য জাতির পিতা গণমুখী সমবায় আন্দোলনের ডাক দেন। গড়ে তোলেন মিল্ক ভিটার মতো সফল সমবায় প্রতিষ্ঠান। এরই ধারাবাহিকতায় সময়ান্তরে চিরায়ত পদ্ধতি ও কুমিল্লা মডেল নীতি অনুসরণ করে সারা দেশে বিপুলসংখ্যক সমবায় সমিতি গড়ে ওঠে এবং গ্রামীণ উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখে। তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত সমবায় সমিতির সংখ্যা ১ লাখ ৯৬ হাজার। এর সদস্য সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ। দুঃখজনকভাবে সমবায় সমিতির ৩০ শতাংশই অকার্যকর। অবশিষ্ট ৭০ শতাংশ সমিতির মধ্যে প্রায় অর্ধেক অকার্যকর না হলেও কার্যক্রমের পরিধি ক্রমসংকুচিত। এর পেছনে জনবলস্বল্পতা ও সমিতি ব্যবস্থাপনায় অনাকাঙ্ক্ষিত স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব দায়ী। ফলে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় অবদান রাখতে পারছে না সমিতিগুলো। এর বদল এখন সময়ের দাবি।
বিশ্বের অনেক দেশেই সমবায় বিদ্যমান। তার মধ্যে ব্রাজিল, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, নেপাল, ফিলিপাইন, ভারত, রাশিয়া, চীন, নরওয়ে, ডেনমার্ক প্রভৃতি দেশে সমবায় ব্যবস্থা বেশ শক্তিশালী। ওইসব দেশে সদস্যদের ভোটে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত পর্ষদের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে সমবায়গুলো। কাজ করছে বিদ্যুতায়ন, কৃষি, শিল্পোন্নয়ন, গ্রামীণ উন্নয়নসহ অর্থনীতির নানা খাতে। বিদ্যমান ধনবাদী অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যেও সমবায় পদ্ধতিতে উৎপাদনের মাধ্যমে সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক বণ্টন নিশ্চিতে অনেকাংশে ভূমিকা রাখছে সময়বায়গুলো। ওইসব দেশের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।
কৃষিসহ দেশের অর্থনীতির নানা খাতে কিছু চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছে। কৃষিজমি ক্রমেই কমছে। ফসল কাটার মৌসুমে শ্রমিক সংকটের প্রেক্ষাপটে কৃষক তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য উৎপাদন ও বিপণনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। কিন্তু কৃষি সমবায় সমিতির অকার্যকারিতায় এক্ষেত্রে আশানুরূপ উন্নতি হচ্ছে না। আশির দশকেও কৃষি সমবায়গুলো বেশ কার্যকর ছিল। বর্তমানে সেগুলো অনেকটাই নিষ্ক্রিয়। এখন কৃষি যান্ত্রিকীকরণের কথা বলা হচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হিসেবে হাজির হয়েছে জমির খণ্ড-বিখণ্ডায়ন। এ অবস্থায় কৃষি সমবায় সমিতিগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। সমবায় পদ্ধতিতে সম্মিলিতভাবে চাষাবাদ হলে বড় কৃষিযন্ত্র ব্যবহার যেমন সহজ হবে, তেমনি বিপণন ও বণ্টন ব্যবস্থাও আরো ন্যায্য ও গতিশীল হবে। একইভাবে জেলে, তাঁতি, নারী পরিবহন, আবাসন, ক্ষুদ্র ব্যবসাসহ অন্য খাতের সমবায় সমিতিগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে, কার্যকর করে তুলতে হবে; যাতে সমতামূলক উন্নয়ন নিশ্চিত হয়। কিছু সমবায়ের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎসহ নানা প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে। ফলে সমবায়ের বিরুদ্ধে সমাজে এক ধরনের আস্থাহীনতাও সৃষ্টি হচ্ছে। এটা দীর্ঘমেয়াদের জন্য ক্ষতিকর। কাজেই এ ধরনের প্রতারণা বন্ধে চাই কঠোর ব্যবস্থা।
বর্তমান সরকার অবশ্য সমবায়কে গুরুত্ব দিচ্ছে। সমবায় কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা আনতে সমবায় সমিতি আইন, ২০০১ এবং পরবর্তী সময়ে সমবায় সমিতি (সংশোধন) আইন, ২০১৩ প্রণয়ন করা হয়েছে। সমবায় খাতে বাজেট বৃদ্ধিসহ প্রশিক্ষণ, আর্থিক ও উপকরণ সহায়তা জোগানো হচ্ছে। এরই মধ্যে জাতির পিতার গণমুখী সমবায় ভাবনার আলোকে ‘বঙ্গবন্ধু মডেল ভিলেজ’ করার উদ্যোগ হাতে নেয়ার খবর মিলছে। আপাতত এটি নয় জেলার মধ্যে সীমিত থাকলেও পরবর্তী সময়ে তা সবখানে ছড়িয়ে দেয়া হবে। এটা ইতিবাচক। এছাড়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ‘আমার গ্রাম, আমার শহর’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এটি গ্রাম ও শহরকে এক সুতায় বাঁধার প্রকল্প। এর সঙ্গে সমবায় ব্যবস্থাকে অঙ্গীভূত করতে হবে। নইলে কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না।
রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ গড়তে দৃঢ়সংকল্প। সেই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। সন্দেহ নেই, এ লক্ষ্যে সমবায় সংগঠনগুলো ভূমিকা রাখতে পারে। সেজন্য সর্বাগ্রে বিরাজমান দুর্বলতা, বিশেষ করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অনুপস্থিতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের মতো সমস্যাগুলো দূর করতে হবে। একটি ন্যায্য ও সমতামূলক বণ্টন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সমবায়গুলোকে সর্বতোভাবে কাজে লাগাতে হবে। টেকসই অংশীদারিত্বমূলক প্রক্রিয়া হিসেবে সমবায় ব্যবস্থা রাষ্ট্রের উন্নয়ন দর্শনে সর্বোচ্চ প্রাধিকার পাক—এটিই প্রত্যাশা।










