আগামী বাজেটে কর্মহীনদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর জোর দেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। রোববার এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্লাটফর্ম বাংলাদেশ আয়োজিত এক সংলাপে আলোচকরা আবারো বিষয়টি তুলে ধরেন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সাফল্য অর্জিত হলেও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি আশানুরূপ সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ক্রমাগত বাড়লেও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার কমেছে। করোনা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলে এবং সে সময় অনেকেই কর্ম হারিয়েছেন। এ ধাক্কা এখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। তাই স্বাভাবিকভাবেই আগামী অর্থবছরের বাজেটেও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অধিক গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। দুঃখজনক বিষয় হলো, প্রতি বছর উচ্চশিক্ষা নিয়ে বাজারে আসা শিক্ষার্থীদের অর্ধেক বেকার থাকছেন অথবা যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পাচ্ছেন না। তাছাড়া করোনায় আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক খাতের বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্ম হারিয়েছেন। তাদের অধিকাংশের আয়ের ওপর পরিবার নির্ভরশীল। আয় কমে যাওয়ায় অনেকে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন বলেও বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। এমন প্রেক্ষাপটে আগামী বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। শুধু প্রতিশ্রুতি বা কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবেও তার প্রতিফলন থাকতে হবে।
দেশে বেকার সমস্যা বড় আকার ধারণ করেছে। সন্তোষজনক চাকরি পাওয়া নিয়ে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে ক্রমেই হতাশা বাড়ছে। কেউ চাকরি না পেলে ভেবে নিচ্ছেন তার যোগ্যতার ঘাটতি রয়েছে। আবার যারা চাহিদা অনুযায়ী বেতন পাচ্ছেন না, তাদের বলা হচ্ছে যোগ্যতা ও দক্ষতার অভাবে তারা বেতন কম পাচ্ছেন। আসলেই কি তাই? বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় উঠে এসেছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন স্নাতক পাস ৬৬ শতাংশ শিক্ষার্থী বেকার থাকছেন। মূলত তিনটি কারণে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। প্রথমত, চাকরির বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের সমন্বয়হীনতা। চাকরির বাজারে যে ধরনের লোকের চাহিদা রয়েছে, সে ধরনের লোক তৈরি হচ্ছে না। আবার প্রতি বছর যেসব শিক্ষিত লোক চাকরির বাজারে যুক্ত হচ্ছেন, তাদের উপযোগী চাকরি নেই। গত ১০ বছরে দেশে স্নাতক পাস শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। কারণ দেশে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ছে। ১০ বছর আগেও বছরে দুই-আড়াই লাখ শিক্ষার্থী স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পাস করে চাকরির বাজারে যুক্ত হতেন। এখন সেই সংখ্যা বেড়ে চার-পাঁচ লাখে উন্নীত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, দেশে বর্তমানে চাকরির সুযোগ বাড়ছে উৎপাদনশীল ও কৃষি খাতে। এ দুটি খাতে আবার স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পাস তরুণদের কাজের সুযোগ কম। এ দুটি খাতে দক্ষ লোকের চাহিদা বেশি। শিক্ষিত যুবক যারা চাকরির বাজারে রয়েছেন, তারা এসব কাজে নিজেদের যুক্ত করতে চান না। এছাড়া করোনার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে যেসব শিক্ষিত যুবক ছোটখাটো ব্যবসার মাধ্যমে স্বকর্মসংস্থানে যুক্ত ছিলেন, তারাও বেকার হয়ে পড়েছেন। দেশে শিক্ষিত বেকার বেড়ে যাওয়ার তৃতীয় কারণ সরকারি চাকরিতে যেভাবে সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হয়েছে, বেসরকারি খাত সেভাবে এগোয়নি।
অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষমতা কমে গিয়েছে নাকি শ্রমের উৎপাদিকা শক্তি বেড়েছে? ১৯৯৫-৯৬ থেকে ১৯৯৯-২০০০ সময়ে প্রতি ১ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির বিপরীতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার ছিল শূন্য দশমিক ৫৩৯২। কিন্তু ২০১০ থেকে ২০১৬-১৭ সময়ে সংখ্যাটি নেমে যায় শূন্য দশমিক ২৮৬১-এ। এ কারণে বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছিলেন, বাংলাদেশে কি কর্মসংস্থানবিহীন প্রবৃদ্ধি হচ্ছে? কেউ কেউ আবার বলছেন, শ্রমের উৎপাদিকা বাড়ছে। বাংলাদেশে শ্রমের উৎপাদিকা কম বলে যাদের দুশ্চিন্তা, তাদের জন্য এটা অবশ্যই ভালো খবর (যদি সত্যি তা-ই হয়)। তবে যতদিন পর্যন্ত উদ্বৃত্ত শ্রম শেষ না হয় ততদিন উৎপাদিকা ও কর্মসংস্থান দুই-ই বাড়াতে হবে। পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যেসব দেশ উচ্চপ্রবৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে উদ্বৃত্ত শ্রমের সদ্ব্যবহার করতে পেরেছে (যেমন দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, চীন, তাইওয়ান ইত্যাদি), তাদের অভিজ্ঞতা থেকে এমনটিই ধারণা করা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে উদ্বৃত্ত শ্রম শেষ হওয়ার আগেই কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার কমে গেল কেন? কয়েকটি কারণে এটি হয়ে থাকতে পারে। প্রথমত, কৃষিতে সবুজ বিপ্লবের সময় শ্রম নিয়োজন বেড়েছিল, কারণ উচ্চফলনশীল ফসলের চাষে শ্রমের প্রয়োজন হয় বেশি। কিন্তু এখন কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। এখানেও কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে। রফতানিমুখী শ্রমঘন শিল্প বলতে একমাত্র তৈরি পোশাক শিল্পই গড়ে উঠেছে। এ শিল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সেখানে বিভিন্ন কারণে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার কমে গেছে। অনেক সময় বলা হয়, বাংলাদেশে তৈরি পোশাক বাদেও অন্যান্য শিল্পের বিকাশ ঘটেছে। সে প্রসঙ্গে ওষুধ, জাহাজ নির্মাণ ইত্যাদির কথা উল্লেখ করা হয়। কিন্তু এ শিল্পগুলো শিল্প খাতের সার্বিক আয়তনের তুলনায় এখনো অনেক ছোট রয়ে গিয়েছে। তাছাড়া এর কোনোটিই শ্রমঘন নয়। এক্ষেত্রে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হলে সরকারকে গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে চিন্তা করতে হবে।
কর্মে ইচ্ছুক থাকলেও কর্ম পাচ্ছে না—এমন জনগোষ্ঠীর জন্য বেকার ভাতা চালুর প্রস্তাব রেখে ‘কর্মসংস্থান নীতি-২০২২’ শিরোনামের খসড়া চূড়ান্ত করেছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। এ নীতির আলোকে দক্ষ জনশক্তি ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে ‘কর্মসংস্থান অধিদপ্তর’ ও ‘জাতীয় ক্যারিয়ার গাইডেন্স কাউন্সিল’ গড়ে তোলা হবে। অর্থনীতিবিদরা অবশ্য মনে করেন, সরকারি বিনিয়োগ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে খুব একটা অবদান রাখতে পারে না। তাই কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য সবার আগে প্রয়োজন ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে উদ্যোগ গ্রহণ। আর কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় দারিদ্র্য বিমোচন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। অবশ্য শুধু ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমেই যে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়, তা সবসময় না-ও হতে পারে। অন্য নানা উপায়েও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে। তবে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যত সহজ, অন্য কোনো উপায়ে তা সম্ভব হয় না।
পাঁচ দশকের শিল্পায়নের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, হাতেগোনা কয়েকটি শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আশি ও নব্বইয়ের দশকে তৈরি পোশাক ও ওষুধ শিল্পের যাত্রার মাধ্যমে যে পরিবর্তন সূচিত হয়েছিল, তারপর সার্বিকভাবে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো কাঠামোগত পরিবর্তন হয়নি। যেসব নতুন শিল্পের কথা ওপরে বলা হলো, এর কোনো কোনোটিতে উচ্চপ্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও মোট উৎপাদন বা কর্মসংস্থানে এদের অংশ এখনো বেশ কম। শিল্প খাতের মোট উৎপাদন বা মূল্য সংযোজন ও কর্মসংস্থানে বিভিন্ন খাতের অংশের দিকে তাকালে কথাটি আরো পরিষ্কার হয়। সার্বিকভাবে শিল্প খাতের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধির হার কমেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশের অর্জন উল্লেখযোগ্য হলেও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে তা আশানুরূপ হয়নি। শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং উদ্বৃত্ত শ্রমের সদ্ব্যবহার হবে—এমনটি আশা করা হলেও তা হয়েছে সীমিত পরিমাণে। একটিমাত্র শ্রমঘন রফতানিমুখী শিল্পের ওপর নির্ভরশীলতা এর প্রধান কারণ। নব্বইয়ের দশকের পর শিল্প খাতের কাঠামোয় উল্লেখযোগ্য কোনো রূপান্তর ঘটেনি। আর কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার কমতে শুরু করেছিল এমন সময়, যখন উৎপাদন বৃদ্ধির হার বাড়ছিল। অন্যদিকে শ্রমিকের প্রকৃত মজুরি কোনো কোনো বছর বাড়লেও সেই বৃদ্ধির ধারা টেকসই হয়নি। উচ্চপ্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার কমে যাওয়া এবং শ্রমের উৎপাদিকা বৃদ্ধি সত্ত্বেও প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধির হার টেকসই না হওয়া ছিল প্রাক-কভিড সময়ের উন্নয়ন অভিজ্ঞতায় হতাশার জায়গা।
উদ্বেগের বিষয়, বাংলাদেশে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যেই বেকারত্বের হার বেশি। আবার শ্রমবাজারে যে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনশক্তির চাহিদা আছে, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা তার জোগান দিতে পারছে না। এ কারণে অনেক শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে দক্ষ শ্রমশক্তি আমদানি করে। এ বাস্তবতা আমাদের উন্নয়ন কর্মপরিকল্পনা ও শিক্ষা ব্যবস্থা পুনর্বিন্যাসের দাবি রাখে। এসডিজি অর্জন করতে হলে দেশে উচ্চপ্রবৃদ্ধির হার ধরে রাখার পাশাপাশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। যাদের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করা যাবে না, তাদের জন্য সন্তোষজনক বেকার ভাতা চালু করা দরকার। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য দক্ষ জনবল সৃষ্টির লক্ষ্যে শিক্ষানীতিসহ অনান্য নীতিতে দ্রুত প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে। দেশে কর্মক্ষম মানুষকে সময়মতো উপযুক্ত শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ দেয়া না হলে ভবিষ্যতে কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা কমে যাবে, যা দেশের প্রবৃদ্ধির জন্য হুমকিস্বরূপ।










