সাম্প্রতিক কালের মোটর ইন্স্যুরেন্স নিয়ে যে জটিলতা দেখা দিয়েছে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবাই উদ্যোগ নিয়েছেন; যাতে ইন্স্যুরেন্স সেক্টরে আশার আলো দেখা দিচ্ছে। তাই এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট যারা সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন, তারা অবশ্যই ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। কেননা ২০১৮ সালে মোটর ইন্স্যুরেন্স থার্ড পার্টি বাতিলসংক্রান্ত যে আইনটি পাস হলো এবং তার আগে যে আলাপ-আলোচনা হচ্ছিল, সে বিষয়ে বীমাসংশ্লিষ্টদের আলাপ-আলোচনা বা বাদ-প্রতিবাদ তেমন একটা খুঁজে পাওয়া যায় না বা এ বিষয়ে খুব একটা দেনদরবার হয়েছে, বীমাসংশ্লিষ্টদের কর্তৃক তারও জুতসই প্রমাণ নেই। ফলে আইনটি পাস আর পরবর্তী সময়ে প্রয়োগ যখন শুরু হলো আর ইন্স্যুরেন্স মার্কেটে নেতিবাচক প্রভাব পড়ল, তখনই বীমাসংশ্লিষ্টদের টনক নড়ে উঠল। বিশেষ করে যখন বিআরটিএ ঘোষণা দিল যে গাড়ির মালিককে ইন্স্যুরেন্স করা বাধ্যতামূলক নয়। আর যখন মোটর ইন্স্যুরেন্স পলিসি না থাকায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক আর জরিমানা করা হচ্ছে না, ফলে অধিকাংশ গাড়ির মালিক তাদের গাড়ির বীমা করছেন না, তখন মোটর প্রিমিয়াম খাতে বিশাল অংকের আয়ে ঘাটতি দেখা দিল। ফলে অনেক ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির শাখা অফিসগুলোর আয় ব্যাপক হারে কমে গিয়ে শাখা অফিস বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম, তখন সংশ্লিষ্ট সবাই একটু নড়েচড়ে বসলেন বলে মনে হয়। তাছাড়া ২০২০-২১ বা ২০২১-২২ সালে সরকারের এক্সচেকারও মোটর বীমার আয় থেকে উপার্জিত ট্যাক্স থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং হবে যদি না মোটর বীমা বাধ্যতামূলক করা হয়।

সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, যখন আইনটি পাস হলো মোটর মালিক সমিতি আর মোটর শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর উদ্যোগে আর চাপে, তখন কিন্তু এ খাতের স্টেকহোল্ডারদের একটি প্রধান অংশ হিসেবে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিত্বকে তেমন গুরুত্ব দেয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করেন। তখন যদি তা করা হতো, তবে মনে হয় এ পরিস্থিতির উদ্ভব না-ও হতে পারত বলে সংশ্লিষ্ট অনেকেই ধারণা করেন। কেননা মাথাব্যথা বলে মাথা না কেটে বিকল্প একটি ব্যবস্থা বের করতে পারত মোটর বীমারই আওতায় ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলোর মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ) বীমা শিল্পের একমাত্র এপেক্স বডি হিসেবে।

শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর অনেক দেশ, বিশেষ করে অনুন্নত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোয় ইন্স্যুরেন্স বাধ্যতামূলক না করলে কেউ করতে চায় না। তাই কর্তৃপক্ষ দেশকে সভ্যতার মানদণ্ডে নেয়ার জন্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইন্স্যুরেন্সকে বাধ্যতামূলক করতে বাধ্য হয়। তেমনি বাংলাদেশসহ আমাদের আশেপাশের সার্কভুক্ত দেশ ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, ভুটান, নেপাল, অর্থাৎ এ উপমহাদেশের দেশগুলো ছাড়াও ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় মোটর ইন্স্যুরেন্স বাধ্যতামূলক, অন্ততপক্ষে মোটর থার্ড পার্টি ইন্স্যুরেন্স ছাড়া রাস্তায় গাড়ি চালানো যায় না।

সভ্য সমাজের অনেক মানদণ্ডের একটি ও প্রধান মানদণ্ড হচ্ছে দায়বদ্ধতা। নিজের এবং অন্যের প্রতি দায়বদ্ধতা। যে দেশের জনগণ ও সমাজের দায়বদ্ধতা বেশি, সেই দেশ তত সুসভ্য। আর এ দায়বদ্ধতা পালনকে সহজীকরণে লায়াবিলিটি ইন্স্যুরেন্সের উদ্ভব হয়েছে আধুনিক অর্থনীতি চালনায়। তাই প্রথমে আমাদের এই মর্মে একমত হতে হবে যে নিজেকে সভ্য সমাজের অংশ হিসেবে দাবিদার হতে হলে, রাস্তায় গাড়ি চালাতে হলে আমরা আমাদের দায়বদ্ধতা এড়াতে পারি না, বিশেষ করে গাড়ি চালাতে গিয়ে সাধারণ মানুষ আর তৃতীয় পক্ষের সম্পদের হেফাজতকে মাথায় রেখে চালাতে হবে। তাই গাড়ির যেকোনো দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ বা সম্পদের ক্ষতিপূরণ গাড়ির মালিককে বহন করতে হবে। আর গাড়ির মালিক এ ক্ষতি আধুনিক অর্থনীতির মেকানিজম ইন্স্যুরেন্স দ্বারা পূরণ করবেন! সেই কারণে রাস্তায় গাড়ি নামাতে বা চালাতে হলে মোটর বীমা বাধ্যতামূলক করতে হবে। এখন বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে মোটর কম্প্রিহেনসিভ ইন্স্যুরেন্স করতে না পারলেও অন্ততপক্ষে মোটর লায়াবিলিটি ইন্স্যুরেন্স বাধ্যতামূলককে আবার সংযোজন করা উচিত বলে মনে করা হচ্ছে।

আর বাংলাদেশে কোনো মোটর দুর্ঘটনার পর সবচেয়ে যে পক্ষের বেশি সম্পৃক্ততা, তারা হচ্ছে থার্ড পার্টি। মানে আমজনতা। তারা গাড়ি ভাংচুর করবে কিন্তু নিজেদের হিস্যা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়। তাই এ ব্যাপারে সচেতনতা বাড়াতে হবে। দুর্ঘটনার পর যাত্রী বা রাস্তার লোকদের ক্ষতিপূরণ। মৃত্যুজনিত বা চিকিৎসাজনিত খরচ, আশেপাশের ক্ষতিগ্রস্ত সম্পত্তির ক্ষতিপূরণ ইত্যাদির ব্যাপারে যদি জানা থাকে, তবে আস্তে আস্তে গাড়ি ভাংচুরের ঘটনা কমে যাবে। যার দরুন পালাতে গিয়ে ড্রাইভার আরো অ্যাকসিডেন্ট করে বসেন। তাই লায়াবিলিটি মোটর বীমার প্রতি বেশি জোর দিতে হবে বা বাধ্যতামূলক করতে হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

যদি রাস্তায় অথবা অন্য যেকোনো স্থানে মোটরচালিত যানবাহন-পণ্যবাহন নিয়ে যান (মালিক অথবা ড্রাইভার অথবা দুটোই), তাহলে সম্ভাব্য দুটো ‘দায়’ (লায়াবিলিটি) থাকবে। কোনো দুর্ঘটনায় যানবাহন-পণ্যবাহন পতিত হলেই মালিক বা ড্রাইভার হিসেবে একক অথবা যৌথভাবে ক্রিমিনাল, সিভিল অথবা এ দুটোতেই লায়াবল হতে পারে। দুর্ঘটনায় পতিত যানবাহন অথবা পণ্যবাহন অন্য মানুষের (যাত্রী, বাইরের সাধারণ মানুষ) প্রাণহানি বা অঙ্গহানি বা আহত করতে পারে। তাছাড়া অন্যের সম্পত্তির (বাড়ি, গাড়ি, পণ্য) ক্ষতিসাধন করতে পারে।

আদালত সিভিল লায়াবিলিটির বিপরীতে আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং ক্রিমিনাল লায়াবিলিটির বিপরীতে জেল বা আর্থিক ক্ষতিপূরণ অথবা দুটোর রায়ই দিতে পারেন। ক্রিমিনাল লায়াবিলিটি থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নেই। পক্ষান্তরে সিভিল লায়াবিলিটি থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য বীমার ব্যবস্থা আছে।

যানবাহনের মালিক/অপারেটর হিসেবে না দেখে এর ব্যবহারকারী অথবা ভিকটিম হিসেবে এ লায়াবিলিটি আর তার ক্ষতিপূরণের দিক আছে। যদি সচেতন মালিক অথবা অপারেটর হয়ে থাকেন, তাহলে বিষয়টাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা দায়িত্ব। সবার আগে এ দায়িত্ব সরকারের। সরকারকে দায়িত্ব পালনে বাধ্য করা বা সহায়তা করা জনগণের দায়িত্ব। সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলো এজন্য সোচ্চার না হলে এবং একটা আইনগত ফয়সালা না হলে প্রতিটা মানুষ, বিশেষ করে রাস্তায় বের হওয়ার আগে নিজেকে মনে করিয়ে দেবে যে যদি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় অথবা আহত হয় বা সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয় কারো দোষে, তাহলে কারো দায় নেই বা দায় মেটানোর দায় নেই।

যানবাহন বা পণ্যবাহনের দুই ধরনের বীমাপত্র (পলিসি) বিক্রি হয়। একটা হলো শুধু চালক, যাত্রী, রাস্তার বা বাইরের সাধারণ মানুষের জান আর মাল। একে বলা হয় থার্ড পার্টি লায়াবিলিটি ইন্স্যুরেন্স। দ্বিতীয় ধরনের বীমাপত্রকে কম্প্র্রিহেনসিভ ইন্স্যুরেন্স বলা হয়। এতে থার্ড পার্টি লায়াবিলিটির সঙ্গে সঙ্গে আপনার যানবাহন বা পণ্যবাহনের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা আছে। আপনি কম্প্রিহেনসিভ ইন্স্যুরেন্স কিনলে আর থার্ড পার্টি ইন্স্যুরেন্স কেনার দরকার নেই।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ধারা ৬০-এর উপধারা ১, ২, ৩ মতে, তৃতীয় পক্ষ বীমা বা থার্ড পার্টি লায়াবিলিটি ইন্স্যুরেন্স নেয়া বাধ্যতামূলক নয়। কথাটা খুব সম্ভব ঠিক নয়। কেননা এ আইনের ধারা-উপধারার ভুল ব্যাখ্যা করা হচ্ছে বলে অনেক বীমা বিশেষজ্ঞ মনে করেন।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ধারা ৬০ মোটরযানের ‘দুর্ঘটনার জন্য ক্ষতিপূরণ, চিকিৎসা এবং বীমা’-সংক্রান্ত। এ ধারায় মোট চারটি উপধারা আছে, যা নিম্নরূপ—

(১) কোনো মোটরযানের মালিক বা প্রতিষ্ঠান ইচ্ছা করিলে তাহার মালিকানাধীন যেকোনো মোটরযানের জন্য যে-সংখ্যক যাত্রী পরিবহনের জন্য নির্দিষ্টকৃত তাহাদের জীবন ও সম্পদের বীমা করিতে পারিবে। (২) মোটরযানের মালিক বা প্রতিষ্ঠান উহার অধীন পরিচালিত মোটরযানের জন্য যথানিয়মে বীমা করিবেন এবং মোটরযানের ক্ষতি বা নষ্ট হওয়ার বিষয়টি বীমার আওতাভুক্ত থাকিবে এবং বীমাকারী কর্তৃক উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পাইবার অধিকারী হইবেন। (৩) মোটরযান দুর্ঘটনায় পতিত হইলে বা ক্ষতিগ্রস্ত হইলে বা নষ্ট হইলে উক্ত মোটরযানের জন্য ধারা ৫৩-এর অধীন গঠিত আর্থিক সহায়তা তহবিল হইতে কোনো ক্ষতিপূরণ দাবি করা যাইবে না। (৪) বীমার শর্ত, বীমার দায়দায়িত্বের সীমা, বীমার দেউলিয়াত্ব, বীমা-দাবি পরিশোধ, বিরোধ নিষ্পত্তি, বীমা সনদের কার্যকারিতা ও উহা হস্তান্তর এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য বিষয় বিধি দ্বারা নির্ধারিত হইবে।

উপধারা ১ ও ২-এ বীমাপত্র কেনা বাধ্যতামূলক কিনা, যদি বাধ্যতামূলক হয় তাহলে কোন ধরনের বীমাপত্র কেনা বাধ্যতামূলক আর বাধ্যতামূলক না হলে কোন ধরনের বীমাপত্র কেনা বাধ্যতামূলক নয়, তা বলা আছে।

সম্প্রতি বিআরটিএ কর্তৃক জারীকৃত ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২০ তারিখের প্রজ্ঞাপনের চিঠিতে উল্লিখিত ৬০ ধারার ব্যাখ্যা দিয়ে ‘সুস্পষ্ট’ করা হয়েছে যে ‘থার্ড পার্টি লায়াবিলিটি’ ইন্স্যুরেন্স কেনা ‘বাধ্যতামূলক নয়’। আর সেজন্য কারো থার্ড পার্টি লায়াবিলিটি ইন্স্যুরেন্স না থাকলে তার বিরুদ্ধে ‘মামলা দেয়ার সুযোগ’ নেই। ফলে একটা যানবাহন বা পণ্যবাহন আপনাকে অথবা আপনার প্রপার্টি দুমড়েমুচড়ে দিলেও ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগ নেই। আগে তবুও মারা গেলে ২০ হাজার টাকা পাওয়া যেত আর থার্ড পার্টির সম্পদের ক্ষতিতে ৫০ হাজার টাকা।

বিআরটিএ এ প্রজ্ঞাপনের কপি দিয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর সচিব, পুলিশের আইজি, হাইওয়ে পুলিশের এআইজিসহ অনেককেই। অর্থাৎ রাস্তায় আপনাকে আর পুলিশ ইন্স্যুরেন্সের জন্য হয়রানি/মামলা করতে পারবে না।

উপধারা ১-এ বলা হয়েছে, কোনো মোটরযানের মালিক ‘ইচ্ছা করিলে’ যতটা সিট সেই মোটরযানের যাত্রীর জন্য ‘নির্দিষ্ট করা’ (অর্থাৎ সিটিং ক্যাপাসিটি ৬০ জন, ১০০ জন ইত্যাদি), তাহাদের ‘জীবন ও সম্পদের বীমা’ করিতে পারিবে।

এ ধারাটা অসম্পূর্ণ। এতে ‘যাত্রীর জান, মালের’ বীমা করাকে ‘বাধ্যতামূলক করা হয়নি’। মালিক যদি ‘ইচ্ছে করেন’ যাত্রীর জান, মালের বীমাপত্র নিতে পারেন। এ উপধারাকে রেফারেন্স টেনে বিআরটিএ তার প্রজ্ঞাপনে বলেছে, থার্ড পার্টি লায়াবিলিটি ইন্স্যুরেন্স কেনা সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ মোতাবেক ‘বাধ্যতামূলক না’।

এ উপধারার অসম্পূর্ণতা হলো, এতে শুধু যাত্রীর জান, মালের বীমাপত্র নিয়ে বলা হয়েছে। থার্ড পার্টি লায়াবিলিটি ইন্স্যুরেন্স শুধু যাত্রীর জান ও মালের বীমাপত্র নয়। এতে এ যাত্রীসহ বাইরের সাধারণ মানুষ (যেমন কোনো পথচারীকে ধাক্কা দিয়ে বা চাকায় পিষে মেরে ফেলে) এবং তাদের সম্পত্তির (যেমন দোকান বা বাড়ি বা অন্য মোটরযান বা অন্য কোনো কিছুকে ধাক্কা দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করে), তাও থার্ড পার্টি লায়াবিলিটির আওতাভুক্ত। সুতরাং এ ধারা এককভাবে অসম্পূর্ণ। 

উপধারা ২-তে বলা হয়েছে, মোটরযানের মালিক তার মোটরযানের ‘যথানিয়মে’ বীমা করিবেন। ‘যথানিয়ম’ বলতে কোন নিয়ম বা কী নিয়ম, তা পরিষ্কার করে বলা হয়নি। এটা লিটারেল মিনিং ধরে বলা যায়, এখানে বীমা করাকে ‘বাধ্যতামূলক’ করা হয়েছে। এখানে ইচ্ছার আর কোনো অপশন নেই, যা আছে উপধারা ১-এ।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ‘কী বীমা’ করবে? এ উপধারায় বলা হচ্ছে, ‘মোটরযানের ক্ষতি বা নষ্ট হওয়ার বিষয়টি বীমার আওতাভুক্ত থাকিবে।’ এটা পরিষ্কার করেই বলা হচ্ছে, কম্প্রিহেনসিভ ইন্স্যুরেন্স ‘নিতে হবে’। কম্প্রিহেনসিভ ইন্স্যুরেন্স নিলে ‘থার্ড পার্টি লায়াবিলিটি ইন্স্যুরেন্সে’ অটোমেটিক নেয়া হয়ে গেল। আর তখন উপধারা ১-এ দেয়া ‘আংশিক’ থার্ড পার্টি লায়াবিলিটি ইন্স্যুরেন্সে আর অপশনাল থাকে না।

সরকার বা অন্য কোনো অথরিটি কাউকে তার সম্পত্তির ‘নিজস্ব ক্ষতির’ বীমা নিতে ‘বাধ্য’ করার ‘ক্ষমতা রাখে না’ (কিছু চুক্তিতে সম্পত্তি ইন্স্যুরেন্সে নেয়ার শর্ত থাকে, তার ভিন্ন উদ্দেশ্য। এটা করা হয় যাতে কোনো দুর্ঘটনায় সম্পত্তির ক্ষতি হলে তা দ্রুত রিইন্সটেট করা যায় আর তাতে চুক্তির কাজ সম্পাদনে সময়ক্ষেপণ না হয়)। ইচ্ছে হলে যানবাহন বা সম্পত্তির বীমা নেব, ইচ্ছে না হলে নেব না। একজন বিলিয়নেয়ার একটা গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট করে চ্যাপ্টা হয়ে গেলে সেটা ফেলে দিয়ে নতুন একটা কিনবে। তার বাড়ি আগুন লেগে পুড়ে গেলে আরেকটা বানাবে। যার টাকা আছে। সরকার বা অন্য কেউ বাধ্য করার ক্ষমতা রাখে না। কিন্তু আমাকে থার্ড পার্টি লায়াবিলিটি ইন্স্যুরেন্স নিতে বাধ্য করতে পারে সরকার বা নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কারণ তাতে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট আছে।

এ উপধারা ২-এর উপরোক্ত ব্যাখ্যা থেকে বলা যায় থার্ড পার্টি লায়াবিলিটি ইন্স্যুরেন্স নেয়া অপশনাল নয়। অপশনাল করতে হলে ‘যাত্রীর জান আর মালের’ সঙ্গে অন্য থার্ড পার্টি ও তাদের সম্পত্তিকে উল্লেখ করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে উপধারা ২-কে পরিষ্কার করতে হবে যথাযথ নিয়ম বলতে কোন নিয়মকে বলা হয়েছে। কম্প্রিহেনসিভ ইন্স্যুরেন্সে ‘বাধ্যতামূলক’-কে পাল্টাতে হবে।

যদি উপধারা ১ অপশনাল না হয়, তাহলে বিআরটিএর আলোচ্য প্রজ্ঞাপনের ভিত্তি থাকে না আর তাদের তখন তার সংশোধনী দেয়া জরুরি হয়ে পড়ে।

উপরন্তু সরকার, বিআরটিএ বা অন্য কোনো অথরিটি কি যানবাহনের বা পণ্যবাহনের সিভিল লায়াবিলিটি (লায়াবিলিটি আন্ডার টর্ট) রদ বা রহিত করতে পারে না? যদি করে তবে ভিকটিমের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সোর্স কী, সে প্রশ্ন থেকে যায়।

খুব সহজভাবে যদি আমরা সরলীকরণ করি উল্লিখিত কথাগুলোকে তাহলে বলতে হয়:

১. মোটর বীমা বাধ্যতামূলক করা, ২. কম্প্রিহেন্সিভ মোটর বীমা যদি বাধ্যতামূলক করা হয়, তবে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় রেখে প্রিমিয়াম, কম্পেনসেশন ও অন্যান্য বিষয় সামনে এনে তাদের ক্রয়ক্ষমতাকে প্রাধান্য দিয়ে একটি রুলস অব বিজনেসের নির্দেশনা দিতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক।

৩. কম্প্রিহেনসিভ মোটর বীমাকে বাধ্যতামূলক না করে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ব্যবস্থা বিবেচনায় এনে এবং পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর আদলে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ) প্রস্তাবিত নতুন পরিকল্প অর্থাত্ মোটর লায়াবিলিটি ইন্স্যুরেন্সকে বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। যেন মিনিমাম বীমা পলিসি নিয়ে মোটর মালিক তার দায়বদ্ধতা সামাল দিতে পারেন।

৪. আর বিআইএ কর্তৃক মোটর লায়াবিলিটি ইন্স্যুরেন্স পরিকল্পটি বাধ্যতামূলক করতে হলে—ক. বর্তমান প্রিমিয়ামের পরিমাণ বাড়াতে হবে। খ. বর্তমান ক্ষতিপূরণের অংক বাড়াতে হবে। গ. ক্ষতি বা দাবি পূরণের প্রক্রিয়া সহজীকরণ করতে হবে। সেক্ষেত্রে আদালতে স্থায়ী বেঞ্চ গঠন করে ক্ষতিগ্রস্তদের যথাশিগগির ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে।

ঘ. নির্ধারিত লিমিটের পরও আদালতের ডিক্রির ওপর প্রাধান্য দিয়ে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে কেস টু কেস বেসিস।

বাংলাদেশের মোটরযান বীমা প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মনোভাব বা দৃষ্টিভঙ্গি বিচার করলেই এ বিষয়ে মানসিক দৈন্য সহজেই অনুমেয়। একজন প্রাইভেট কারের মালিকের মন্তব্য হলো, ‘একটা’ ইন্স্যুরেন্স নিতে হয়, তাই থার্ড পার্টি ইন্স্যুরেন্স নিয়ে থাকেন, যা না থাকলেও চলে—শুধু শুধু পয়সা নষ্ট। ড্রাইভাররা আরো ভালো বলেন, ইন্স্যুরেন্সের প্রিমিয়াম ৩৬০ টাকা, ইন্স্যুরেন্স না থাকলে জরিমানা ১ হাজার ৫০০ টাকা। তাই ইন্স্যুরেন্স করা, তা না হলে দরকার কী  ইন্স্যুরেন্স নেয়ার! নিজ সমাজের ‘দায়’ সম্পর্কে কী রকম অবজ্ঞা থাকলে এমনই ভাবতে পারে দেশের জনগণ।

চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদের সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার মামলায় ক্ষতিপূরণ ধার্য করে আদালত রায় দেন—৪ কোটি ৬১ লাখ টাকা। গাড়ির মালিক এই ভদ্রলোক যদি এ রায় সম্পর্কে জানতেন, তাহলে না খেয়ে হলেও ইন্স্যুরেন্স কিনতেন। কাল যদি, আল্লাহ না করুক, এমন আরেক তারেক মাসুদ তার গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা খান, তখন কী হবে? যদি ইন্স্যুরেন্স থাকে, তার ক্ষতিপূরণ সম্ভব। কেননা আদালতের রায় বীমা কোম্পানি ও পুনঃবীমা কোম্পানিকে মানতে বাধ্য করতে আইন করা উচিত বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।

আবার সম্প্রতি বাংলাদেশে ফেরি দুর্ঘটনায় যে যানবাহনের ক্ষতি হলো, তাদের যদি সঠিকভাবে মোটর ইন্স্যুরেন্স করা থাকত, তারা অব্যশই তার ক্ষতিপূরণ পেতে পারত, যেখানে ক্ষতিগ্রস্ত যানবাহনের মালিক হায়-হুতাশ করছেন, এমনকি অনেকে ব্যবসার পুঁজি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন বলে নিজেকে অভিসম্পাত করেছেন। এ পরিস্থিতি হয়েছে শুধু মোটর বীমা না থাকার ফলে।

সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকলে সমাজে শৃঙ্খলা বজায় থাকে। পারস্পরিক দায়বদ্ধতাজনিত যে দায়দায়িত্বের উদ্ভব হয়, তা লাঘবের জন্য উত্পত্তি হয়েছে দায় বীমার (লায়াবিলিটি ইন্স্যুরেন্স)। রাস্তায় যানবাহন বা গাড়ি পরিচালনা করতে গিয়ে অনেক সময় নানা দুর্ঘটনায় পড়তে হয়। দুর্ঘটনাজনিত গাড়ির নিজস্ব ক্ষয়ক্ষতির সঙ্গে সঙ্গে তৃতীয় পক্ষের জানমালেরও ক্ষতি সংঘটিত হয়, যা ব্যক্তি পর্যায় থেকে জাতীয় অর্থনীতিতেও বিরূপ প্রভাব তৈরি করে। দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ি দ্বারা তৃতীয় পক্ষের জানমালের দায়দায়িত্ব গাড়ির মালিককে বহন করতে হয়। তাছাড়া ব্যক্তিক পর্যায়ে ব্যবহার্য গাড়ি দ্বারা অন্যের ক্ষতি সংঘটন এবং ক্ষতিপুরণ প্রক্রিয়া-ব্যবস্থা প্রায় সব দেশেই রয়েছে। আর ক্ষতিপূরণের প্রক্রিয়া-ব্যবস্থার বিজ্ঞানসম্মত উপায় হচ্ছে বীমা।

বীমা ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রাহক ও তৃতীয় পক্ষের ক্ষতিপূরণ সম্ভব। বর্তমানে আমাদের দেশে মোটর ভেহিকলের বিপরীতে কোনো ধরনের বীমার বাধ্যবাধকতা নেই। তাই মোটর বীমা বাধ্যতামূলক করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। জানমালের নিরাপত্তায় এবং জাতীয় অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখার প্রত্যয়ে ব্যাপক ঝুঁকি-সংবলিত মোটর কম্প্রিহেনসিভ ইন্স্যুরেন্সে বাধ্য করা যেতে পারে। আর্থসামাজিক অবস্থা বিবেচনায় কম্প্রিহেনসিভ বীমা বাধ্যতামূলক করা সময়োপযোগী না হলেও নিম্নরূপ ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে—

 মোটর লায়াবিলিটি ইন্স্যুরেন্স বিআইএ কর্তৃক প্রস্তাবিত পরিকল্প বাধ্যতামূলক করা।

পরিকল্পটির এ প্রিমিয়াম ও ক্ষতিপূরণের অংক বৃদ্ধি করা।

ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা সহজীকরণ ও দ্রুত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল বিবেচনায় এনে মোটর কম্প্রিহেনসিভ প্যাকেজ ইন্স্যুরেন্স প্রবর্তন করা।

মোটর ভেহিকল কম্প্রিহেনসিভ ইন্স্যুরেন্স পলিসিকে যুগোপযোগী করতে এরই মধ্যে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সাব কমিটি গঠন করা হয়েছে। সাব কমিটির সভায় তিনটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, যা নিম্নরূপ:

সিদ্ধান্ত নং ১: সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী মোটর ভেহিকল কম্প্রিহেনসিভ ইন্স্যুরেন্স ঐচ্ছিক থাকায় প্যাকেজটিকে আরো আকর্ষণীয় করে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন গ্রহণ করতে হবে।

সিদ্ধান্ত নং ২: সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী  মোটর থার্ড পার্টি লায়াবিলিটি বাদ দেয়ায় তা যুগোপযোগী করে পুনরায় সংযোজনের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন গ্রহণ করতে হবে। এ ব্যাপারে বিআইএ কর্তৃক মোটর লায়াবিলিটি ইন্স্যুরেন্স পরিকল্পটির জন্য আইন পাস করতে হবে।

সিদ্ধান্ত নং ৩: মোটর ভেহিকল ইন্স্যুরেন্স পলিসি গ্রাহকের নিরূপিত ক্ষতি দ্রুততার সঙ্গে নিষ্পত্তিতে বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যে মোটর অ্যাক্সিডেন্ট ট্রাইব্যুনাল চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

 তাই উল্লিখিত পর্যালোচনা ও প্রস্তাবনা অনুযায়ী মোটর বীমা বাধ্যতামূলক করলে—

 বিপুল পরিমাণে প্রিমিয়াম আয় বৃদ্ধি পাবে। ফলে বৃদ্ধি পাবে বীমা পেনিট্রেশন।

প্রিমিয়াম বৃদ্ধির ফলে সরকারি কোষাগারে অর্থ জমার হারও বৃদ্ধি পাবে বহুগুণ।

তাছাড়া জনগণের জানমালের সঠিক নিরাপত্তা দেয়া সম্ভব হবে, যা সভ্য সমাজের দায়বদ্ধতা রক্ষা করে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে এগিয়ে যেতে সহযোগিতা করবে, যার জন্য বর্তমান সরকার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

বীমা একটি সমন্বিত অর্থ ব্যবস্থা, তাই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এবং জাতীয় অর্থনীতিকে সহায়তার লক্ষ্যে উদীয়মান অর্থনীতির তালিকায় থাকা বাংলাদেশের ‘মোটর ভেহিকল ইন্স্যুরেন্স পরিকল্প/পলিসি’ যুগোপযোগী করে জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে মোটর বীমার বাধ্যবাধকতা প্রয়োজন।


এ কে এম মনিরুল হক: চেয়ারম্যান, নিটল ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড