সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সরকারের
ঋণ দ্রুতগতিতে
বেড়েছে, এমনকি
জিডিপি প্রবৃদ্ধির
চেয়েও এর গতি ছিল বেশি। গতকাল
বণিক বার্তায়
প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের
ঋণ এখন জিডিপির ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা
সরকারি ঋণের পরিমাণ নিয়ে যতটা না চিন্তিত, তার চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন বৃদ্ধির
গতি নিয়ে।
২০১৭-১৮ অর্থবছরেও জিডিপির
অনুপাতে সরকারের
ঋণ ছিল ৩৪ দশমিক
৬ শতাংশ।
চার বছরের
ব্যবধানে ৮ শতাংশ পয়েন্ট
বৃদ্ধিকে অবশ্যই
বিবেচনায় নিতে হবে। এ কথা সত্য, বেশকিছু মেগা প্রকল্প চলমান
ও করোনার
কারণে সরকারের
বাড়তি ব্যয়ের
চাপও ছিল এ সময়ে।
সব দেশেই
জাতীয় বাজেটে
কর রাজস্ব
ও করবহির্ভূত
রাজস্ব এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মুনাফা ও সরকারি
সেবা ফি ইত্যাদি দিয়ে সরকারের ব্যয় নির্বাহ করা হয়। তবে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এসব উৎস থেকে প্রতি
বছর যে পরিমাণ অর্থ আসে, তা দেশ পরিচালনার
জন্য যথেষ্ট
হয় না। ফলে সরকারকে
অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে।
তবে সবসময়ই
এর নিয়ন্ত্রণ
থাকা প্রয়োজন।
ভুললে চলবে না, অর্থনীতির
সামর্থ্যের অতিরিক্ত
ঋণের বোঝা চাপলে সেটি পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
এমন অবস্থায়
ঋণ গ্রহণ
ও এর ব্যবহারে সরকারকে
দক্ষতা ও সতর্কতার পরিচয়
দিতে হবে। বাড়তি ব্যয় মেটাতে রাজস্ব
আহরণ জোরদার
এবং ঋণ গ্রহণে স্বল্প
ব্যয়ের উৎসের
দিকে দৃষ্টি
থাকা আবশ্যক।
প্রকল্পে বাড়তি
ব্যয়ও রোধ করতে হবে। একই সঙ্গে
কোথা থেকে কী সুদে ঋণ নিয়ে কোথায় বিনিয়োগ
করা হচ্ছে,
সেটিও স্পষ্ট
হওয়া প্রয়োজন।
বিনিয়োগের রিটার্নও
হিসাবে নিতে হবে।
সরকারের ঋণ গ্রহণ একটি স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু ঋণ গ্রহণের মাত্রা এবং এর ব্যবহার যদি সঠিক না হয়, তাহলেই বিষয়টি আর স্বাভাবিক থাকে না। তাতে সরকার ও জনগণকে নানামুখী সংকটের মধ্যে পড়তে হয়। সরকার অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিলে ব্যক্তি খাতে ঋণের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন ব্যাংকের তারল্যের একটা বড় অংশ যখন সরকারের কাছে ঋণ হিসেবে চলে যায় তখন ব্যক্তি খাতে ঋণ কমে যায়। এটাকে বলে ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট। সঙ্গে সঙ্গে সুদের হারও বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হচ্ছে, ব্যাংকঋণের বর্তমান তারল্য মোটামুটি সন্তোষজনক। কিন্তু অর্থনীতির গতিশীলতা বাড়াতে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এছাড়া ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নের কাজ চলমান। এগুলো চালু হলে ব্যক্তি খাতের জন্য আরো অর্থায়নের প্রয়োজন পড়বে। সেটি নিশ্চিত করতে হলে সরকারের ব্যাংকঋণ সীমার মধ্যে রাখা বাঞ্ছনীয়। কভিড থেকে অর্থনৈতিক উত্তরণের জন্য প্যাকেজের আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংক সিআরআর (ক্যাশ রিজার্ভ অনুপাত) কমিয়েছে, এসএলআরের (বিধিবদ্ধ আমানত জমা রাখা) পরিমাণ কমিয়েছে, রেপো রেট (আর্থিক খাতকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থ প্রদান) কমিয়েছে এবং রিভার্স রেপো রেটও (অর্থ উঠিয়ে নেয়ার হার) কমিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় অর্থ সরবরাহ বাড়িয়েছে। সেজন্যই ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট এখনো বেশি অনুভূত হচ্ছে না। তবে বর্তমান অবস্থা থেকে সরকারের ঋণ যদি বাড়তে থাকে, তাহলে অর্থনীতিতে প্রভাব পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার ঋণ-জিডিপির অনুপাত সর্বকালের সর্বোচ্চ। যেসব দেশে ঋণ-জিডিপির অনুপাত রেকর্ড সর্বোচ্চে পৌঁছেছে সেগুলো হচ্ছে বেলজিয়াম, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, লেবানন, নিউজিল্যান্ড, নাইজেরিয়া, নরওয়ে, সুইডেন ও সুইজারল্যান্ড। ভারত সরকারের মোট ঋণ তার জিডিপির ৫০ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ তাদের জিডিপির প্রায় ৯৮ শতাংশ। যুক্তরাজ্যের আরো বেশি ১১৫ শতাংশ এবং সিঙ্গাপুরের ১০৯ শতাংশ। সিঙ্গাপুরকে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিতে হয় এবং তারা দ্রুত শোধ করে। তাদের সক্ষমতা এমনই। সক্ষমতার প্রশ্নটি এ কারণেই আসে, যাতে বাংলাদেশ ঋণের ওপর বেশি নির্ভর না করে। বাংলাদেশের বরং আওতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করে রাজস্ব আয় বাড়ানোর দিকে বেশি মনোনিবেশ করা উচিত। দুঃখজনক হলেও সত্য, গত কয়েক বছরে জিডিপি ও রাজস্ব অনুপাত না বেড়ে বরং কমছে, ১১ শতাংশ থেকে সেটি ৮ শতাংশে নেমে এসেছে। সরকারের সংস্থার মুনাফা বা লভ্যাংশ এবং দিন দিন বিস্তৃত হওয়া সরকারি সেবার বিপরীতে যথাযথভাবে ফি আদায় করার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশ বিমান, রেলওয়ে, বিদ্যুৎ-গ্যাস, পেট্রোলিয়াম করপোরেশনসহ অনেক প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ আসা দূরের কথা, বরং ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। ভর্তুকি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বাড়তি চাপ তৈরি করছে। এটি কমিয়ে আনা গেলে সরকারের ঋণও কমে আসবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা যাচ্ছে না বলে ঋণের পরিমাণটা দ্রুত বাড়তে দেয়া যুক্তিযুক্ত হবে না।
ঋণ নেয়ার প্রবণতা
বাড়লেও এতে বাংলাদেশের উচ্চঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা কম বলে সরকার
দাবি করছে।
কর্তৃপক্ষ বলছে, বাংলাদেশ এখনো স্বল্প ঋণগ্রস্ত
দেশ। ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাও
ভালো। ঋণ নিয়ে দেশ এখনো সংকট তৈরির পর্যায়ে
পৌঁছেনি। বর্তমানে
ঋণের জন্য যে পরিমাণ
সুদ পরিশোধ
করতে হয়, সেটাও কম। করোনার কারণে
রেমিট্যান্স কমে যাবে, এ ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু
রেমিট্যান্স বেড়েছে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক
মুদ্রার রিজার্ভও
ভালো। সার্বিক
বিবেচনায় উচ্চঝুঁকির
প্রশ্নই ওঠে না, এমনকি
মধ্যম ঝুঁকির
সম্ভাবনাও কম। তবে আত্মতুষ্টিতে যেকোনো জায়গা থেকে যেকোনো সুদে সরকার ঋণ নেবে, এমনটিও
ঠিক হবে না। আবার রিটার্ন কম বা আর্থসামাজিক উপযোগ নেই এমন প্রকল্পে অর্থায়নও
যৌক্তিক নয়। বাড়তি ব্যয়ও
প্রতিরোধ করা প্রয়োজন। কারণ ঋণ নিয়ে অপচয় করলে সেটা ভবিষ্যতে
দেশকে ভোগাবে।
স্পেন, গ্রিস,
শ্রীলংকাসহ বিশ্বের
বিভিন্ন দেশের
উদাহরণ বাংলাদেশের
সামনে রয়েছে।
এখন না থাকলেও
বাংলাদেশ সামনের
দিনগুলোয় ঋণের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ২০২৬ সাল পর্যন্ত
বাংলাদেশ ঋণের উচ্চঝুঁকিতে নেই। এটা যেমন সত্য, তেমনি
২০২৬ সালের
পর এ ঝুঁকি যে বাড়ার শঙ্কা
তৈরি হচ্ছে
তাও সত্য।
কেননা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশ
উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হতে যাচ্ছে। তখন খরচ বেড়ে যাবে। এ খরচ মেটানোর
জন্য প্রয়োজন
হবে বিদেশী
ঋণ। এখন হয়তো ঋণ নেয়ার হার বাড়ছে না কিন্তু ঋণের অংকটি বড় হচ্ছে। তাই সঠিকভাবে এ ঋণ ব্যবহারে
মনোযোগী হতে হবে। রফতানি,
রেমিট্যান্সের মতো খাতগুলো থেকেও
ঘাটতি মোকাবেলার
দিকে মনোযোগী
হতে হবে। সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে রাজস্ব
আহরণ বাড়ানোর
দিকে। সঞ্চয়পত্রে
সুদের হার হ্রাস ও বিধিনিষেধ আরোপ করায় এরই মধ্যে এ উৎস থেকে সরকারের ঋণ কমে এসেছে।
আপাতদৃষ্টিতে এটা সরকারের জন্য গ্রহণযোগ্য মনে হলেও সার্বিক
বিবেচনায় ব্যাংকের
ওপর সরকারের
অতিরিক্ত নির্ভরশীল
হওয়া যুক্তিযুক্ত হবে না। কারণ বেসরকারি খাতে ঋণের প্রয়োজন
রয়েছে। এখন পর্যন্ত বৈদেশিক
ঋণের স্থিতি
সহনীয় পর্যায়ে
থাকলেও লক্ষ রাখতে হবে সরকারি ঋণ যেন ভবিষ্যৎ
প্রজন্মের ওপর বোঝা হয়ে না দাঁড়ায়।
অর্থাৎ সক্ষমতার
বাইরে ঋণ নেয়া ঠিক হবে না। বাজেটের বড় অংশ কিন্তু
সুদাসল পরিশোধে
খরচ করতে হচ্ছে এখনই, এটি বিবেচনা
করেই সরকারকে
ঋণ নিতে হবে। ভবিষ্যতে
ঋণের পরিমাণ
বাড়লে সেটি পরিশোধের সক্ষমতা
কতটা রয়েছে,
তাও খতিয়ে
দেখা প্রয়োজন।
সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনা উন্নত
করার লক্ষ্যে
নতুন আইন প্রণয়নের কাজ চলছে। দ্রুতই
সেটি পাস করা প্রয়োজন।
ঋণের প্রধান প্রত্যাশা হলো, এ অর্থ যেন যথাযথ ব্যবহার করা হয়। সরকার যেসব প্রকল্প গ্রহণ করে সেগুলোর জন-উপযোগিতা যথাযথভাবে যাচাই করতে হবে। বিশাল অংকের ঘাটতি পূরণের জন্য বেশি প্রকল্প গ্রহণ এবং প্রকল্পের সময়ক্ষেপণ করার মতো অবস্থা বাংলাদেশের নেই। অথচ এটাই হচ্ছে বেশি। অবশ্যই বড় বড় প্রকল্পের প্রয়োজন আছে কিন্তু যথাসময়ে ঋণের অর্থ ব্যবহার না করলে তা জনগণের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়, প্রত্যক্ষভাবে দেশের মুদ্রাবাজারকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং শেষমেশ ব্যক্তি খাতের ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় না হওয়া ও সুষ্ঠু ঋণ ব্যবস্থাপনার অভাবে প্রতি বছর সরকারের ঋণ বেড়েই চলেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দায়দেনা পরিশোধের ক্ষেত্রে দেশের আর্থিক খাত ও সরকার বড় ধরনের চাপে পড়বে। বাজেটে ঋণের সুদাসল পরিশোধে বড় অংকের বরাদ্দ রাখতে হচ্ছে। ভবিষ্যতে এটি আরো বেড়ে উঠলে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই এখন থেকেই সরকারি ঋণ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনাকে আরো সুষ্ঠু, কার্যকর ও যৌক্তিক করতে হবে।










