নারকেল বাংলাদেশের একটি অন্যতম অর্থকরী ফসল এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারকেলের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। বাংলাদেশে সাদা মাছির আক্রমণের পর থেকে নারকেলের উৎপাদন দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে এবং সাদা মাছির ব্যাপক আক্রমণের কারণে আমাদের বিশাল নারকেল শিল্প আজ হুমকির মুখে। তাই দেশব্যাপী জরিপের ফলাফল, নারকেল শিল্পের ওপর এ পোকার সম্ভাব্য হুমকি এবং দীর্ঘদিনের গবেষণার আলোকে তা দমনে করণীয় সম্পর্কে জানাতেই আজকের এ নিবন্ধ।

রুগোস স্পাইরালিং হোয়াইটফ্লাই, যা নারকেলের সাদা মাছি নামেও পরিচিত। এটি একটি এক্সোটিকইনসেক্ট বা বিদেশী পোকা। ২০১৯ সালে বাংলাদেশে এটি প্রথম শনাক্ত করা হয়। সম্প্রতি কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের (কেজিএফ) অর্থায়নে সারা দেশে এ পোকার বিস্তৃতি, পোষক উদ্ভিদ, ক্ষতির মাত্রা, পোকা দমনে পেস্টিসাইড প্রয়োগের বর্তমান চিত্র, নারকেলের ফলন ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য সাত মাসব্যাপী একটি বেসলাইন জরিপ পরিচালনা করা হয়। এছাড়া বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো এ পোকার জীবনচক্র ও বিভিন্ন তাপমাত্রায় মোট জীবনকাল নিয়ে গবেষণা করা হয়। গবেষণাটিতে অর্থায়ন করেছে কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন (কেজিএফ)।

বাংলাদেশে অনেক প্রজাতির সাদা মাছি রয়েছে, তবে নারকেলের এ সাদা মাছিটি আমাদের দেশীয় নয়। প্রায় চার বছর আগে বাইরের কোনো দেশ থেকে আমাদের দেশে এটি প্রবেশ করে। অর্থাৎ এটি একটি এক্সোটিকইনসেক্ট বা বিদেশী পোকা। ইংরেজিতে পোকাটির নাম রুগোস স্পাইরালিং হোয়াইটফ্লাই। এটি হেমিপ্টেরা বর্গের অ্যালিউরোডিডি পরিবারের একটি পোকা এবং এর বৈজ্ঞানিক নাম অ্যালিউরোডিকাস রুগিওপারকিউলেটাস। এর জীবনচক্রে তিনটি ধাপ রয়েছে। যেমন ডিম, নিম্ফ ও পূর্ণাঙ্গ পোকা। পূর্ণাঙ্গ পোকা দেখতে সাদা এবং স্ত্রী মাছি স্পাইরাল বা সর্পিলাকারে ডিম পাড়ে। রুগোস একটি লাতিন শব্দ, যার অর্থ কুঁচকানো বা উঁচু-নিচু। ডিমের সর্পিলটি দেখতে উঁচু-নিচু বা কুঁচকানো, যা লাতিন শব্দ রুগোস থেকে এসেছে। সেজন্য পোকাটির নাম রুগোস স্পাইরালিং হোয়াইটফ্লাই। নারকেল গাছ হচ্ছে এ পোকার প্রধান পোষক উদ্ভিদ। সেজন্য পোকাটি আমাদের এ অঞ্চলে নারকেলের সাদা মাছি নামে পরিচিত।

নারকেলের সাদা মাছি প্রথম শনাক্ত করা হয় ২০০৪ সালে ক্যারিবিয়ান দেশ বেলিজে। এরপর মধ্য আমেরিকার দেশ ফ্লোরিডায় ২০০৯ সালে এ আক্রমণাত্মক পোকাটি শনাক্ত করা হয়। নারকেল উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত ভারতের তামিলনাড়ুতে এ পোকা ২০১৬ সালে শনাক্ত করা হয়। এরপর নারকেল উৎপাদনকারী পার্শ্ববর্তী অন্যান্য প্রদেশ, যেমন কেরালা, কর্ণাটক, অন্ধ্র প্রদেশ, পুদুচেরি ইত্যাদি প্রদেশে পোকাটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এর দুই বছর পর অর্থাৎ ২০১৮ সালে এটি বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী ভারতের দুটি প্রদেশ পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে শনাক্ত করা হয়। এর কিছুদিন পরই অর্থাৎ ২০১৯ সালের প্রথম দিকে বাংলাদেশের যশোর জেলায় (আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট) নারকেল গাছে পোকাটি প্রথম শনাক্ত করা হয়।

ক্ষতির প্রকৃতি

নারকেলের সাদা মাছি হেমিপটেরা বর্গের একটি পোকা। তাই এ পোকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ দুভাবে ক্ষতি করে। নিম্ফ ও পূর্ণাঙ্গ পোকা উভয়েই ক্ষতিকারক এবং পোষক উদ্ভিদ থেকে রস শোষণ করে নেয়। অবিরত রস শোষণের ফলে পোষক উদ্ভিদের পাতা হলুদ হয়ে যায়, সালোকসংশ্লেষণ ক্ষমতা হ্রাস পায়, গাছের সজীবতা মারাত্মকভাবে কমে যায় এবং আক্রান্ত গাছ অনেক ক্ষেত্রেই মারা যায়। এটিই হচ্ছে প্রত্যক্ষ ক্ষতি। অন্যদিকে এ পোকা পাতার উপরিস্তরে হানি ডিউ নামের এক ধরনের মিষ্টি দ্রব্য নিঃসরণ করে। পরবর্তী সময়ে বাতাসে থাকা স্যুটি মোল্ড নামের ছত্রাক এ মিষ্টি দ্রব্যের ওপর জন্মায় এবং দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে পাতার ওপর ভারী কালো স্তর তৈরি করে। এ কালো স্তর তৈরি হওয়ার কারণে আক্রান্ত গাছের সালোক সংশ্লেষণ ক্ষমতা হ্রাস পায়। এটি হচ্ছে পরোক্ষ ক্ষতি। একই গাছ একই সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আক্রান্ত হওয়ার কারণে গাছের সজীবতা ও প্রতিরোধ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়, ফুল ও ফল ধারণক্ষমতা কমে যায়, ফুল ও ফল ঝরে পড়ে এবং আক্রান্ত গাছ অনেকাংশে মারা যায়। এ পোকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এরা নারকেল পাতার নিচের দিকে মোম ও তুলার আস্তরণ তৈরি করে, যা রাতের অন্ধকারে দেখলে মনে হবে পাতার নিচে চুনের প্রলেপ দেয়া হয়েছে। 

জীবনচক্র

বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো নারকেলের সাদা মাছির জীবনচক্র অধ্যয়ন করা হয় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যলয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগে। দেশী ও বিদেশী খাটো জাতের (সিয়াম গ্রিন ও সিয়াম ব্লু) নারকেল গাছে সাদা মাছির জীবনচক্র অধ্যয়ন করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে ৩০±১.২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় দেশী ও বিদেশী খাটো জাতের (সিয়াম গ্রিন ও সিয়াম ব্লু) নারকেল গাছে সাদা মাছির একটি জীবনচক্র সম্পূর্ণ করতে প্রায় ৩৫-৩৬ দিন সময় লাগে। ধারাবাহিক উচ্চ তাপমাত্রা (৩৫-৪০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বা তার ওপরে) সাদা মাছির ডিমের বৃদ্ধি ও বেঁচে থাকার জন্য অনুকূল নয়। অন্যদিকে ২০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় এ পোকার একটি জীবনচক্র সম্পূর্ণ করতে প্রায় ৪৫ দিন সময়ের প্রয়োজন হয়। গবেষণায় আরো দেখা গেছে ২৫-৩০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা এ পোকার ডিম, নিম্ফ ও পূর্ণাঙ্গ পোকার বৃদ্ধি ও বেঁচে থাকার জন্য খুবই সহায়ক। যেহেতু বাংলাদেশে বছরের অধিকাংশ সময়ই তাপমাত্রা সাধারণত ২৫-৩০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের মধ্যে থাকে, তাই এ অনুকূল তাপমাত্রা সাদা মাছি কর্তৃক ক্ষতির মাত্রাকে আরো ত্বরান্বিত ও দীর্ঘায়িত করে।

নারকেলের সাদা মাছির পোষক উদ্ভিদ ও ক্ষতির মাত্রা

বাংলাদেশের ৪৪টি জেলায় প্রায় সাত মাসব্যাপী নিবিড়ভাবে জরিপ পরিচালনা করা হয়। এ জরিপের মাধ্যমে মোট ৬১টি পোষক উদ্ভিদ শনাক্ত করা হয়েছে, যাদের প্রায় অর্ধেকই ফলদ গাছ। এসব ফলদ গাছের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো নারকেল, কলা, পেয়ারা, মাল্টা,  ম্যান্ডারিন, লেবু, আম, কাঁঠাল, লিচু, আমড়া, জলপাই, পেঁপে, জামরুল ইত্যাদি। এছাড়া প্রায় ২১ শতাংশ অর্নামেন্টাল বা শোভাবর্ধনকারী এবং ফুল গাছ, ৮ শতাংশ মাঠ ফসল, ৮ শতাংশ বনজ উদ্ভিদ এবং প্রায় ১৩ শতাংশ অন্যান্য প্রজাতির পোষক উদ্ভিদ শনাক্ত করা হয়। মাঠ ফসলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো শিম, সয়াবিন, কচু, মরিচ ও আখ। জরিপকৃত  সব জেলাতেই নারকেল (দেশী ও বিদেশী খাটো জাত উভয়ই) গাছে সাদা মাছির আক্রমণ দেখা যায় এবং আক্রমণের তীব্রতা অঞ্চলভেদে মাঝারি থেকে খুবই মারাত্মক। জরিপকৃত সব জেলা থেকে তথ্য সংগ্রহের পর দেশী ও বিদেশী খাটো জাতের নারকেল গাছে ক্ষতির মাত্রা পরিমাপ করা হয়। জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, গড়ে প্রায় ৮৬ শতাংশ দেশী এবং ৮১ শতাংশ খাটো জাতের নারকেল গাছ সাদা মাছি দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। অঞ্চলভেদে এ আক্রমণের তীব্রতা ছিল ২০-১০০ শতাংশ। দেশী জাতের নারকেল গাছের তুলনায় খাটো জাতের নারকেল গাছে আক্রান্ত ফ্রন্ড ও পত্রফলক তুলনামূলকভাবে কম পাওয়া যায়। এছাড়া দেশী নারকেল গাছের তুলনায় খাটো জাতের নারকেল গাছের প্রতি পত্রফলকে পূর্ণাঙ্গ পোকা ও স্পাইরাল তুলনামূলকভাবে কম লক্ষ করা গেছে। খাটো জাতের নারকেল গাছে ঘন ঘন কীটনাশক প্রয়োগের কারণে দেশী জাতের তুলনায় খাটো জাতের নারকেল গাছে পোকার সংখ্যা ও ক্ষতির মাত্রা কিছুটা কম হওয়ার একটি অন্যতম কারণ। নারকেলের পরেই বেশি আক্রমণ দেখা যায় কলা ও পেয়ারা গাছে এবং কম-বেশি ৩৬টি জেলায় এ আক্রমণ শনাক্ত করা হয়। কলা ও পেয়ারা গাছে আক্রমণের তীব্রতা কম থেকে মাঝারি বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা মারাত্মক। মাঠ ফসল যেমন শিম, সয়াবিন, কচু, মরিচ ও আখে কম ইনফেস্টেশন পাওয়া যায়। চা, কফি, সুপারি ইত্যাদিসহ অন্যান্য পোষক উদ্ভিদেও মোটামুটি কম ইনফেস্টেশন লক্ষ করা গেছে। 

বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় সাদা মাছির উপস্থিতি

বাংলাদেশে নারকেলের সাদা মাছির উপস্থিতি এবং আক্রমণের তীব্রতা নিরূপণের জন্য ৪৪টি জেলায় প্রায় সাত মাসব্যাপী সরাসরি জরিপ পরিচালনা করা হয়। বাকি ২০টি জেলা থেকেও বিভিন্ন উৎসের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, পুরো বাংলাদেশ নারকেলের সাদা মাছি দ্বারা আক্রান্ত। তবে আক্রমণের তীব্রতা কোথাও কম আবার কোথাও মারাত্মক। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনা করে পুরো বাংলাদেশকে মোট নয়টি অঞ্চলে ভাগ করে ইনফেস্টেশনের তীব্রতা শনাক্ত করা হয়। এই নয়টি অঞ্চল হলো পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব, দক্ষিণ-পশ্চিম, উত্তর-পূর্ব, উত্তর-পশ্চিম ও দেশের মধ্যাঞ্চল। জরিপের ফলে দেখা যায়, দেশের পশ্চিম, দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্ব অঞ্চল (যেমন খুলনা, বাগেরহাট, বরিশাল, পিরোজপুর, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, ময়মনসিংহ, জামালপুর ও শেরপুর) সাদা মাছি দ্বারা খুব মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হয়েছে, যেখানে তুলনামূলকভাবে কম আক্রমণ লক্ষ করা গেছে দেশের মধ্যভাগে (যেমন ঢাকাও তার পার্শ্ববর্তী কিছু জেলা) এবং দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে (যেমন কক্সবাজার, বান্দরবান ও চট্টগ্রাম)। তবে বর্তমানে আক্রমণের এ তীব্রতা অঞ্চলভেদে পরিবর্তন হতে পারে।

নারকেলের সাদা মাছি দমনে পেস্টিসাইড প্রয়োগের বর্তমান চিত্র ও ভবিষ্যৎ উদ্বেগ

জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, নারকেলচাষীরা (অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিদেশী খাটো জাতের নারকেল গাছে) বিভিন্ন গ্রুপের প্রায় ২৯ ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করেছেন এবং এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কার্বোফুরান, কার্বোসালফান, সাইপারমেথ্রিন, আলফা-সাইপারমেথ্রিন, এসিফ্যাট, ফ্লুবেনডায়ামাইড, ডেল্টামেথ্রিন, প্রোফেনোফস ও ল্যাম্বডা-সাইহালোথ্রিন। অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করা গেছে সাদা মাছি দমনের জন্য নারকেলচাষীরা এ কীটনাশকগুলো প্রায় নিয়মিতভাবে ও অতিরিক্ত মাত্রায় প্রয়োগ করেন। এছাড়া কৃষকদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ইমিডাক্লোপ্রিড, অ্যাসিটামিপ্রিড, থায়াক্লোপ্রিড, এমামেকটিন বেনজয়েট, স্পিনেটোরাম, থায়ামেথক্সাম ইত্যাদির মতো বেশকিছু নতুন প্রজন্মের কীটনাশক প্রয়োগ করছেন কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তারা এ কীটনাশকগুলো খুব ঘন ঘন এবং অতিরিক্ত মাত্রায় প্রয়োগ করছেন। নির্বিচারে কীটনাশক ব্যবহারের কারণে এ পোকার গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক শত্রু (কিছু বিটল প্রজাতি এবং এপিলিনিডি পরিবারের কিছু প্যারাসিটয়েড, বিশেষ করে এনকারসিয়া জেনাসের কিছু প্রজাতি) প্রতিনিয়ত ধ্বংস হচ্ছে। অন্যদিকে স্যুটি মোল্ড ছত্রাক পাতার উপরিভাগে জমা হয়ে কালো পুরু আস্তরণ তৈরি করে, যার কারণে গাছের সালোক সংশ্লেষণ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করা গেছে, অধিকাংশ নারকেলচাষী এই স্যুটি মোল্ড ছত্রাক দমনের জন্য বিভিন্ন গ্রুপের ছত্রাকনাশক ঘন ঘন ও অতিরিক্ত মাত্রায় প্রয়োগ করছেন। এটি সম্পূর্ণরূপে ছত্রাকনাশকের অপব্যবহার। কারণ সফলভাবে সাদা মাছি দমন করতে পারলে ছত্রাকের কালো স্তর আর তৈরি হবে না এবং স্বাভাবিকভাবেই ছত্রাকনাশকেরও আর প্রয়োজন হবে না। বাস্তবিকভাবে, ভিয়েতনাম ও কেরালা থেকে আমদানীকৃত খাটো জাতের নারকেল গাছে কীটনাশক ও ছত্রাকনাশকের নির্বিচার প্রয়োগ খুবই উদ্বেগজনক। এই নির্বিচার ব্যবহার চলতে থাকলে পোকাটি বেশির ভাগ প্রতিশ্রুতিশীল কীটনাশকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে, যা ভবিষ্যতে এর কার্যকর ও টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য একটি বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। তাই এককভাবে কীটনাশক প্রয়োগ না করে একটি সমন্বিত ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই ক্ষতিকর পোকা দমন করা সম্ভব।

নারকেলের ফলন হ্রাস

নারকেল বাংলাদেশের একটি অন্যতম অর্থকরী ফসল। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। এটা লক্ষণীয়, বাংলাদেশে সাদা মাছির আক্রমণের পর থেকেই নারকেলের ফলন দিন দিন কমছে এবং ফলন কমার কারণে ডাব ও নারকেলের দামও দিন দিন বাড়ছে। বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলো নারকেল উৎপাদনের জন্য প্রসিদ্ধ এবং দেশে নারকেল ও ডাবের চাহিদা মেটাতে এ জেলাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু গত তিন-চার বছরে এসব জেলায় নারকেলের উৎপাদন লক্ষণীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং আমাদের জরিপের ফলেও সেটি প্রতীয়মান হয়েছে। জরিপকৃত অন্যান্য জেলা ও হর্টিকালচার সেন্টার থেকেও মোটামুটি একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। জরিপের ফলাফলে সার্বিকভাবে দেখা গেছে, এ পোকার আক্রমণে গত তিন-চার বছরে নারকেলের ফলন প্রায় ৩০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। সঠিক ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ পোকা দমন করতে না পারলে আমাদের বিশাল নারকেল শিল্প এবং গ্রামীণ অর্থনীতি হুমকির মধ্যে পড়তে পারে। 

করণীয়

বাংলাদেশের বিশাল নারকেল শিল্পকে সুরক্ষার জন্য, হাজার হাজার নারকেলচাষীর জীবনমান উন্নয়নের জন্য, জরিপকালীন নারকেল চাষী বা বাগান মালিকদের কাছ থেকে প্রাপ্ত মতামত এবং জরিপের অভিজ্ঞতাকে বিবেচনায় নিয়ে কিছু সুপারিশ করা হলো:

l নারকেলের সাদা মাছি দমনের জন্য খাটো জাতের নারকেল গাছে কীটনাশক ও ছত্রাকনাশকের নির্বিচার ব্যবহার বন্ধ করা।

l নারকেলচাষীদের পাশাপাশি সম্প্রসারণ কর্মীদের জন্য মাঠ পর্যায়ে কার্যকর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, যাতে তারা সঠিক ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ পোকা দমন করতে পারে ।

l নারকেলের সাদা মাছি দমনের জন্য এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো আইপিএম গাইডলাইন (ইন্টিগ্রেটেড পেস্ট ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইন) তৈরি হয়নি, যা নারকেলচাষীরা অনুসরণ করতে পারেন। দ্রুত একটি আইপিএম গাইডলাইন তৈরি করে তা নারকেলচাষীদের মধ্যে সরবরাহ করা।

l ফল গাছের পাশাপাশি এ পোকা কয়েকটি মাঠ ফসলে ও পাওয়া গেছে, যা খুবই উদ্বেগজনক। সেজন্য এখন থেকেই মাঠ ফসলের ওপর নিবিড় মনিটরিং ব্যবস্থা শুরু করা, যাতে শুরুতেই এ পোকার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া যায়।

l বিদেশ থেকে কোনো উদ্ভিদ বা উদ্ভিদের অংশ আমাদের দেশে আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান কোয়ারেন্টিন নিয়মগুলো কঠোরভাবে অনুসরণ করা।

l উদ্ভিদ বা উদ্ভিদ অঙ্গের মাধ্যমে ভবিষ্যতে নতুন কোনো পোকার আগমন বন্ধ করার জন্য কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন এবং তা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা।

l বাংলাদেশের বিশাল নারকেল শিল্পকে রক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

 

ড. গোপাল দাস: অধ্যাপক, কীটতত্ত্ব বিভাগ

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়