যুদ্ধ সবসময় ভয়াবহ, তা যেভাবেই সংঘটিত হোক না কেন। কোনো ধরনের উসকানি ব্যতীত ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার হামলা, দেশটির সাধারণ নাগরিকদের হত্যা ও তাদের গৃহহীন অবস্থার দৃশ্য দেখার পর নিঃসন্দেহে রাশিয়ার বিরোধিতাই করতে হয়। এদিকে ইউক্রেনকে সামরিক অস্ত্র সরবরাহের পাশাপাশি বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রের সরকারগুলো রাশিয়ার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অস্ত্রও ব্যবহার করছে। অর্থনৈতিকভাবে শক্তিধর রাষ্ট্র হওয়ার পাশাপাশি রাশিয়া কিন্তু সামরিকভাবেও শক্তিশালী। তাই বিশ্বনেতাদের দেশটির বিপরীতে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের মতো উদ্যোগ গ্রহণের সময় নিঃসন্দেহে এ ঝুঁকি নিতে হয়েছিল যে রাশিয়া চাইলে নিজেদের সামরিক অস্ত্র ব্যবহার করে বিশ্বের যেকোনো ভূখণ্ডে আঘাত করতে পারে।

তবে রাশিয়ার নির্বিচার বোমা হামলার তুলনায় অর্থনৈতিক অস্ত্র আরোপ খুব বেশি ক্ষিপ্রতার সঙ্গে মানুষকে হত্যা বা দৃশ্যমান ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি ও ভয় সৃষ্টি করছে না। কিন্তু রাশিয়ার বিরুদ্ধে যে নজিরবিহীন অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে দেশটিকে যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেবে। রাশিয়ার কেন্দ্রীয় বাংকের ওপর আরোপিত কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে রুবলের মানের অবমূল্যায়ন ঘটেছে। তাছাড়া ক্রস বর্ডার পেমেন্ট এবং অর্থায়নের ওপর আরোপিত নতুন বিধিনিষেধও প্রভাব ফেলেছে তাত্ক্ষণিকভাবে। রাশিয়ার ব্যাংকগুলোর প্রতি আস্থা দুর্বল করেছে। বাণিজ্য অবরোধের (যেমন রাশিয়া থেকে উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ আমদানি ও রফতানির কোনোটাই করা যাবে না এবং বিশেষ বিশেষ পণ্য রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা) ফলে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো রাশিয়া থেকে বেরিয়ে যাবে। এতে তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া না হলেও ক্রমে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হ্রাস পাবে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেকারত্ব বাড়তে থাকবে। যদি এমনটা হয় তাহলে ক্রমে রাশিয়ার মানুষের জীবনযাত্রার মান কমতে থাকবে। তাদের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্য ভেঙে পড়বে। অনেক বেশি সাধারণ নাগরিক অপুষ্টিতে আক্রান্ত হয়ে মারা যাবে।

পৃথিবীর আজকের দুর্দশাগ্রস্ত পরিণতি ব্যাপক রাজনৈতিক ভাঙনের প্রতিফলন। অনেক শক্তিশালী দেশ এখন কর্তৃত্ববাদী শাসকদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। জাতীয়তাবাদের ওপর নির্ভরতা তাদের আন্তর্জাতিকভাবে আপস করতে অনাগ্রহী করে তোলে। তাছাড়া তাদের আচরণগুলো অভ্যন্তরীণ অবরোধের সম্মুখীনও হয়। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের আগ্রাসনকে যদি প্রতিরোধ না করা হয়, তবে ইউক্রেন যুদ্ধের মতো এ ধরনের আগ্রাসন চালানোর বিষয়গুলো অনেকটাই অনিবার্য হয়ে উঠবে। যেকোনো ক্ষমতাধর দেশ চাইলে অন্যকে আক্রান্ত করতে পারবে।

এদিকে আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলগুলোও সমান সমস্যাযুক্ত। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র—এর কোনোটির বিরুদ্ধেও বৈধভাবে কাজ করতে পারে না। সংগঠনটির বন্ধ্যত্ব আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি লঙ্ঘনকারী শক্তিশালী ব্যক্তিদের দায় মুক্তিরই প্রতিচ্ছবি। তদুপরি জাতিসংঘ যদি একটি সামরিক প্রতিরোধের অনুমোদন করতে পারে, তবে একটি নির্ধারিত পারমাণবিক শক্তিকে সামরিকভাবে মোকাবেলা করার ইচ্ছার সম্ভবত অভাব হবে।

বিশ্বব্যাপী সমঝোতার মাধ্যমে রাশিয়ার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ নামক অস্ত্র ব্যবহার সম্ভব হয়েছে—এ ধরনের বার্তা একটি পক্ষাঘাতগ্রস্ত বিশ্ব শাসন ব্যবস্থাকে পাশ কাটানোর পথ বাতলে দেয়। যা অন্য শক্তিকে একটি কার্যকরী (বেদনাদায়ক) কিন্তু সভ্য উপায়ে আগ্রাসন ও বর্বরতার জবাব দেয়ার অনুমতি দেয়।

এ ধরনের অর্থনৈতিক অস্ত্র ব্যবহারের কিন্তু ঝুঁকি কোনোভাবেই কম নয়। নিষেধাজ্ঞাগুলোও এক ধরনের গণবিধ্বংসী অস্ত্র। এগুলো বাড়ি-ঘর ভেঙে ফেলতে পারে না বা ব্রিজ উড়িয়ে দিতে পারে না, কিন্তু তারা কোম্পানি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, জীবিকা এবং এমনকি জীবনকে ধ্বংস করে। সামরিক ডব্লিউএমডিএস (উইপেন অব মাস ডিসট্রাংকশন) বা গণবিধ্বংসী অস্ত্রের মতোই এ নিষেধাজ্ঞাগুলো নির্বিচারে যন্ত্রণা দেয়, দোষী এবং নির্দোষ উভয়কেই আঘাত করে এবং এগুলোকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হলে তা তারা বিশ্বায়নের প্রক্রিয়াকে উল্টে দিতে পারে। বিশ্বায়নের প্রক্রিয়া, যা আধুনিক বিশ্বকে সমৃদ্ধ করে।

তাছাড়া এখানে বেশকিছু উদ্বেগ আছে, যেগুলো একটির সঙ্গে অন্যটি সংযুক্ত। প্রথমত, অর্থনৈতিক অস্ত্রের আপাতদৃষ্টিতে রক্তহীন প্রকৃতি এবং নিয়ন্ত্রণকারী বিধিবিধানের অভাবের কারণে এগুলোকে অত্যধিক ব্যবহার করা হতে পারে। কথাটি কিন্তু নিছক অনুমানমূলক নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনো কিউবার বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা বজায় রেখেছে, যদিও পৃথিবীতে আরো অনেক খারাপ শাসন ব্যবস্থা রয়েছে। কভিড-১৯-এর উৎস সম্পর্কে সম্পূর্ণ তদন্তের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে চীন সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার ওপর রফতানি অবরোধ আরোপ করেছে প্রতিশোধের অংশ হিসেবে।

একইভাবে নির্দিষ্ট দেশে ব্যবসা বন্ধ করার জন্য করপোরেশনের ওপর ক্রমবর্ধমান সরকারি চাপ সমানভাবে উদ্বেগজনক। নীতিনির্ধারকদের অভিপ্রায় ছাড়িয়ে এ নিষেধাজ্ঞাগুলো সম্প্রসারিত হতে পারে। যেমন গর্ভপাত বা জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে সরকারের অবস্থানের কারণে একটি দেশ অর্থনৈতিক যুদ্ধের শিকার হচ্ছে, এমনটা কল্পনা করা অসম্ভব নয়।

এটা মনে রাখা জরুরি যে নির্বিচারে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ব্যাপক সংশয় থেকে দেশগুলো অনেক বেশি প্রতিরক্ষামূলক আচরণের দিকে পরিচালিত হবে। যেমন রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিরুদ্ধে গৃহীত পদক্ষেপ গ্রহণ কাণ্ডের পর চীন, ভারত এবং অন্য অনেক দেশ এখন স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ প্রকাশ করবে যে তাদের নিজস্ব বৈদেশিক বিনিময় হোল্ডিং (উন্নত অর্থনীতির ঋণ) অব্যবহারযোগ্য প্রমাণিত হতে পারে, যদি কয়েকটি দেশ মিলে তাদের সম্পদ জব্দ করার সিদ্ধান্ত নেয়। সেক্ষেত্রে দেশগুলো রিজার্ভ হোল্ডিংয়ের প্রয়োজন পড়ে এমন কার্যকলাপকে সীমিত করতে শুরু করবে, যেমন ক্রস বর্ডার করপোরেট ঋণ গ্রহণ।

উপরন্তু, দেশগুলো সুইফটের বিকল্প অন্বেষণ শুরু করতে পারে, যা সম্ভাব্যভাবে বিশ্বব্যাপী অর্থ প্রদান ব্যবস্থাকে বিভক্ত করার দিকে পরিচালিত করবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধগুলো ধারণ করে না, এমন দেশে বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে বেসরকারি সংস্থাগুলো অনেক বেশি সতর্ক হয়ে উঠতে পারে।

রাষ্ট্রগুলো যদি অর্থনৈতিক অস্ত্রের জন্য নতুন পাল্টা ব্যবস্থা তৈরি করে, সেক্ষেত্রে জিরো-সাম স্ট্র্যাটেজিক বিহেভিয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। জিরো-সাম স্ট্র্যাটেজিক বিহেভিয়ার হচ্ছে গেম থিওরির এমন একটি পরিস্থিতি, যেখানে একজন ব্যক্তির লাভ অন্যের ক্ষতির সমান, তাই সম্পদ বা সুবিধার নেট পরিবর্তন শূন্য। উদাহরণস্বরূপ, সম্পদ ও মূলধন নিজ দেশে জিম্মি করে রাখার উদ্দেশ্যে একটি দেশ বিদেশী ব্যাংকগুলোকে তার বাজারে আমন্ত্রণ জানাতে পারে এবং বিপরীতভাবে, উল্লিখিত হুমকিগুলো এড়াতে ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম তারা সীমিত করে দিতে পারে। এক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক মিথস্ক্রিয়া সংকুচিত হবে।

রাশিয়ার আগ্রাসনের প্রতিক্রিয়ায় অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা অর্থনৈতিক অস্ত্র প্রয়োগ বিশ্বকে একটি পক্ষাঘাতগ্রস্ত বিশ্ব শাসন ব্যবস্থাকে বাইপাস করতে সাহায্য করলেও ভবিষ্যতে নতুন সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেছে। অন্যথায় আমরা একটি অর্থনৈতিকভাবে বলকানাইজড (কোনো অঞ্চলকে ছোট ছোট শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্রে বিভক্ত করা) এবং দরিদ্র বিশ্ব তৈরির ঝুঁকি নিচ্ছি।

আমাদের এ বিষয় মনে রাখা জরুরি যে অর্থনৈতিক অস্ত্রগুলো যেকোনো একটি দেশের হাতে ছেড়ে দেয়ার পক্ষে খুব শক্তিশালী, তাই তাদের ব্যবহার একটি ন্যূনতম ঐকমত্যের প্রয়োজনের সাপেক্ষে হওয়া উচিত। যেহেতু অনেক দেশের অংশগ্রহণ নিষেধাজ্ঞাগুলোকে আরো বেশি কার্যকর করে তোলে, তাই প্রক্রিয়াটি আগে থেকেই অন্তর্নির্িমত হতে পারে। তবুও প্রধান রাষ্ট্রগুলো গৌণ নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়ে অনিচ্ছুক দেশগুলোকেও সহযোগিতা করতে বাধ্য করতে পারে। তাই স্বেচ্ছাসেবী ঐকমত্যের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত। অর্থনৈতিক অস্ত্র প্রয়োগের মাত্রা যত বেশি ধ্বংসাত্মক হবে, সে-বিষয়ক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় ঐকমত্যে পৌঁছানো দেশের সংখ্যা তত বেশি হওয়া উচিত। নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে নয়।

একইভাবে অর্থনৈতিক অবরোধ প্রয়োগের মাত্রাবিন্যাস হওয়া উচিত। সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত যে দেশ আগ্রাসন পরিচালনা করছে, সে দেশের অভিজাতদের সম্পদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়টি। এক্ষেত্রে ঐকমত্যে পৌঁছানোর প্রয়োজনীয়তাকে খুব বেশি গুরুত্ব দেয়া যাবে না। উন্নত অর্থনীতির উচিত তাদের এখতিয়ারের মধ্যে থাকা কর ফাঁকি, দুর্নীতি ও চুরির উপার্জনগুলোকে প্রশ্রয় না দেয়া। দুর্নীতির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ থেকে আয় করা অর্থের সুরক্ষা প্রদানের ব্যাপারে উন্নত অর্থনীতিগুলোর চোখ বন্ধ রাখার ভূমিকার অবসান ঘটানো জরুরি।

বিপরীতভাবে, আগ্রাসন পরিচালনাকারী রাষ্ট্রের মুদ্রার অবমাননা বা তার আর্থিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করার পদক্ষেপ ক্ষুব্ধ জাতীয়তাবাদকে উসকে দিতে পারে, তাই বিষয়টি আরো বিচক্ষণতা ও সর্বাধিক ঐকমত্যের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

উন্নত অর্থনীতিগুলো হয়তো স্বাভাবিকভাবে তাদের নিজস্ব নব্য আবিষ্কৃত ক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপের ক্ষেত্রে অনিচ্ছুক হবে। কিন্তু তাদের স্বীকার করা উচিত যে একটি বলকানাইজড বিশ্ব অর্থনীতি সবাইকে আঘাত করবে। তবুও ‘অর্থনৈতিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ’ বিষয়ে আলোচনা করা ভগ্ন ও বিভক্ত বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে ঠিক করার দিকে প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে। যত যাই হোক না কেন, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সবসময়ই যুদ্ধের চেয়ে শ্রেয়।

[স্বত্ব:
প্রজেক্টসিন্ডিকেট
]

 

রঘুরাম রাজন: রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (আরবিআই) সাবেক গভর্নর ও শিকাগোর বুথ স্কুল অব বিজনেসের অধ্যাপক

ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস