ঢাকা মহানগরীর অন্যতম সমস্যা যানজট। যানজটের কারণে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ক্ষতির শিকার হচ্ছে দেশ। এ সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে বিগত দিনগুলোয় বিপুল ব্যয়ে পরিবহন পরিকল্পনা ও নগর পরিকল্পনার নানা উদ্যোগ এবং বিভিন্ন সড়ক ও অবকাঠামোগত প্রকল্প নেয়া হলেও এর সুফল তেমন একটা দৃশ্যমান হচ্ছে না। তার মধ্যেই উচ্চাভিলাষী পাতাল রেল প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। ঢাকায় পাতাল রেল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ‘ফিজিবিলিটি স্টাডি অ্যান্ড প্রিলিমিনারি ডিজাইন ফর কনস্ট্রাকশন অব ঢাকা সাবওয়ে’ শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। এজন্য ব্যয় হচ্ছে ৩২১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। এদিকে নগর বিশেষজ্ঞরা ঢাকার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রেক্ষাপটে পাতাল রেল (সাবওয়ে) উপযোগী নয় বলে মনে করছেন। শুক্রবার অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় তারা বলেছেন, দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিবেচনায় এ প্রকল্পের অতি উচ্চ বিনিয়োগ ও পরিচালন ব্যয়ের কারণে এটি ঢাকা শহরের জন্য বাস্তবসম্মত নয়। মেট্রোরেল ও বিআরটির কাজ চলছে। এর ওপর পাতাল রেলের মতো উচ্চাভিলাষী প্রকল্প গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে। এমন উদাহরণ কিন্তু আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ শ্রীলংকাতেই রয়েছে। ফলে প্রত্যাশা থাকবে সময় থাকতেই সরকার বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ আমলে নিয়ে আরো যাচাই-বাছাই করেই প্রকল্প গ্রহণ করবে। ব্যয়বহুল প্রকল্প গ্রহণের বিলাসিতা নয়, গণপরিবহন ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে।

ঢাকায় টেকসই যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে ২০০৫ সালে ঢাকা কৌশলগত পরিকল্পনা তৈরি করা হয়; যার আলোকে মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে, বিআরটি প্রকল্পগুলো ঢাকা নগরীতে বাস্তবায়ন হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে এ পরিকল্পনা পরিমার্জন করে সংশোধিত ঢাকা কৌশলগত পরিকল্পনা ২০১৬ সালে প্রস্তুত করা হয়, যার আলোকে সরকার মেট্রোরেলের নতুন রুট তৈরিসহ অন্যান্য উদ্যোগ গ্রহণ করছে। ‘ঢাকা পাতাল রেল (সাবওয়ে) প্রকল্প’ নগরের টেকসই পরিবহন পরিকল্পনার প্রাসঙ্গিকতায় কতটুকু উপযোগী এবং পরিবহন পরিকল্পনা ও নগর পরিকল্পনায় এ প্রকল্পের সামগ্রিক অর্থনৈতিক-সামাজিক-ভৌত-পরিকল্পনাগত-পরিবেশগত প্রভাব বিশ্লেষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা সত্ত্বেও সাবওয়ে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনে এ বিষয়গুলোর অধিকাংশই সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে। নগরের বিদ্যমান পরিবহন পরিকল্পনা ও নগর পরিকল্পনার অন্যান্য দলিলের সঙ্গে সাবওয়ে পরিকল্পনার মৌলিক দূরত্ব এবং এ পরিকল্পনা প্রণয়নে অন্যান্য নগর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যথাযথ ও বিশদ আলোচনার অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ মিলছে। সার্বিক বিবেচনায় পাতাল রেল প্রকল্পের মতো ব্যয়নির্ভর, ঝুঁকিপূর্ণ ও উচ্চাভিলাষী প্রস্তাব নিয়ে পরিকল্পনা করার জন্য ঢাকা নগরী এখন প্রস্তুত নয়; বরং ঢাকার যানজট সমস্যা নিরসনসহ টেকসই পরিবহন পরিকল্পনা গড়ে তোলার জন্য কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি), সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (আরএসটিপি), ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ) প্রদেয় প্রস্তাবনাগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ বেগবান করা দরকার।

মেট্রোরেল ও পাতাল রেল সমজাতীয় যোগাযোগ অবকাঠামো। পাতাল রেল সাধারণত মাটির নিচে গড়ে তোলা হয়। নির্মাণে ব্যবহার করা হয় অত্যাধুনিক সব প্রযুক্তি। স্বভাবতই এর নির্মাণ ব্যয়ও হয় অনেক বেশি। সাধারণত এক কিলোমিটার পাতাল রেল নির্মাণে অন্তত ৩০০ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে নির্মিত সিঙ্গাপুর, হংকংয়ের মতো দেশ ও প্রশাসনিক অঞ্চলগুলোয় পাতাল রেলের নির্মাণ ব্যয় আরো বেশি। সিঙ্গাপুরের ডাউনটাউন এমআরটি লাইন (পুরোটাই পাতালপথে) নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি খরচ হয়েছে ৪৯৩ মিলিয়ন ডলার। আর হংকংয়ের শা তিন সেন্ট্রাল লিংক নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি খরচ হয়েছে ৫৮৬ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশে এমনিতেই প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধিতে বিশ্বরেকর্ড রয়েছে। পাতাল রেল নির্মাণেও এর ব্যতিক্রম হবে না বলেই ধারণা, যা সরকারের জন্য বড় ধরনের বোঝায় পরিণত হতে পারে। উচ্চ আয়ের দেশগুলোয় সীমিতসংখ্যক কিছু শহরে সাবওয়ে নির্মিত হলেও এটি অতি ব্যয়বহুল প্রকল্প। ফলে বিশ্বের অতিধনী দেশগুলোও এখন নতুন করে নগরের বিস্তৃত নেটওয়ার্কজুড়ে সাবওয়ে নির্মাণের মতো উচ্চাভিলাষী প্রকল্প নেয়ার পরিকল্পনা নিচ্ছে না। বাংলাদেশ যদিও মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার যাত্রাপথে আছে, আমাদের মাথাপিছু আয় উন্নত দেশের তুলনায় এখনো অতি অল্প। বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় যেখানে প্রায় ২ হাজার ডলার, সেখানে আমেরিকায় ৭০ হাজার (বাংলাদেশের ৩৫ গুণ), সিঙ্গাপুরে ৬৫ হাজার (৩৩ গুণ), জার্মানিতে ৫০ হাজার (২৫ গুণ), ইংল্যান্ডে ৪৫ হাজার (২৩ গুণ), জাপানে ৪০ হাজার ডলার (বাংলাদেশের ২০ গুণ)। ফলে সাবওয়ে নির্মাণের মতো অর্থনৈতিক শক্তি বাংলাদেশের নেই বললেই চলে। বৈশ্বিক বিবেচনায় সাবওয়ে নির্মাণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং প্রকল্পের শুরুতে প্রাক্কলিত ব্যয় বাস্তবায়নের সময় অনেক বেড়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতায় সাবওয়ে নির্মাণে আমাদের প্রাক্কলিত ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাবে বাস্তবায়নকালে। ফলে প্রকল্পের ধারণাপত্র ও সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনে যে ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধার কথা উপস্থাপন করা হয়, সে ধরনের বাস্তবতা ভবিষ্যতে পরিলক্ষিত হবে না। তাই এখনই সতর্ক হওয়া চাই।

সাবওয়ে প্রকল্পের মতো অতিগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনে পেশাজীবীদের সত্যতা ও সততার নির্মোহ প্রকাশ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, দেশের অনেক প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন প্রকল্প অনুমোদন দেয়ার লক্ষ্য নিয়েই তৈরি করা হয়। সাবওয়ে প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক বিদেশী পরামর্শকের বাংলাদেশ ও ঢাকা মহানগরীর পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বাস্তবতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণার অভাব রয়েছে। পাতাল রেল প্রকল্প বা এ ধরনের অতিব্যয়নির্ভর অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগের পরিবর্তে দেশের জেলা শহরগুলোর উন্নয়নে ব্যয় করা হলে ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর চাপ কমে আসবে। শুধু তা-ই নয়, সাবওয়ে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য অর্থ অপচয় না করে ঢাকা শহরে মানসম্মত বাস নামালেও ট্রাফিক সমস্যার সমাধান হতে পারে। পাশাপাশি বাস রুট রেশনালাইজেশনের উদ্যোগ পুরো ঢাকা শহরে দ্রুত বাস্তবায়ন ও পথচারীবান্ধব নগর তৈরির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। ঢাকার পরিবহন পরিকল্পনা ও নগর পরিকল্পনার মূল দলিলগুলোয় পাতাল রেলের প্রস্তাবনা না থাকার পরেও কীভাবে এ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে বিশাল পরিমাণ ব্যয় করা হলো, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ঢাকার কেন্দ্রীয় অঞ্চল পাতাল রেল নির্মাণের জন্য উপযুক্ত হলেও আশপাশের অন্যান্য অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য সাবওয়ে নির্মাণের জন্য যথাযথ নয় বলে একাধিক গবেষক মত দিয়েছেন। সরকার বিষয়টি বিবেচনায় নিক।

রাজধানীর যানজট নিরসনে আগে নাগরিকদের প্রাধান্য দেয়া উচিত। এ শহরে অনেক মানুষ হেঁটে গন্তব্যে যায়। তাদের জন্য আগে ফুটপাত তৈরি করা দরকার। এরপর গণপরিবহনের ওপর জোর দিতে হবে। ঢাকার পরিবহন পরিকল্পনা ও বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় প্রস্তাবিত রিং রোড, রেডিয়াল রোড, বৃত্তাকার রেলপথ প্রভৃতি উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে টেকসই পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। ঢাকার পরিবহন পরিকল্পনার দায়িত্বে থাকা বিভিন্ন সংস্থাকে সমন্বয় না করতে পারলে এবং কোনো একটি সুনির্দিষ্ট সংস্থাকে এর অভিভাবকত্ব না দিতে পারলে এ ধরনের সমন্বয়হীন উদ্যোগ ও জনগণের করের অর্থের অপচয় হতেই থাকবে। পাতাল রেল প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনে পরিবেশগত প্রভাবের যথাযথ আলোচনা অনুপস্থিত বলে খবর মিলছে। এ ধরনের নির্মাণযজ্ঞে ঢাকার পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর কেমন প্রভাব পড়বে তার বিশ্লেষণ করেই এ প্রকল্পের সার্বিক উপযোগিতা নির্ণয় করা যেতে পারে। শুধু অর্থনৈতিক আলোচনা দিয়ে এ ধরনের প্রকল্পকে অনুমোদন দিলে দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। সাবওয়ে প্রকল্প গ্রহণের আগে যোগাযোগ ও পরিবহন পরিকল্পনার অন্যান্য সমাধান, যেমন কমিউটার ট্রেন, লাইট রেল ট্রানজিট (এলআরটি), বিআরটি, মানসম্মত বাস সার্ভিস প্রভৃতি তুলনামূলকভাবে ব্যয়সাশ্রয়ী উদ্যোগকে আন্তরিকভাবে বিবেচনায় নেয়া দরকার; যা দেশের আর্থসামাজিক ও পরিকল্পনাগত বিবেচনায় সহজে বাস্তবায়নযোগ্য। উচ্চব্যয়সম্পন্ন পরিবহন ও যোগাযোগ প্রকল্প গ্রহণের আগে গণশুনানির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মতামতও নেয়া প্রয়োজন।