মহাসড়ক বলতে সেই সড়ককেই বোঝায়, যেখানে দ্রুতগতিতে এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে গাড়ি চলাচল করতে পারে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, দেশে এমন সড়ক খুব কমই আছে, যেগুলোয় বাধাহীন বা নিরবচ্ছিন্নভাবে গাড়ি চলাচল করতে পারে। বেশির ভাগ সড়কেই বাধাহীনভাবে গাড়ি চালানো যায় না। এর প্রধান কারণ অবৈধ হাটবাজার এবং বাস ও ট্রাকস্ট্যান্ড। সড়কের ওপর এসব হাটবাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। আবার ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদ থেকেও মহসড়কের পাশে হাট বসানোর জন্য ইজারা দেয়া হয়েছে। হাইওয়ে পুলিশের তথ্য বলছে, দেশের মহাসড়কে ২৫৬টি অবৈধ হাটবাজার রয়েছে। এতে গাড়ি চলাচল বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনাও বাড়ছে, যা বন্ধ হওয়া জরুরি। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে যানবাহনের গতিও বাড়বে। এক্ষেত্রে পরিবহনের বাধাহীন চলাচল নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা নেবে বলে প্রত্যাশা।

মহাসড়ক বা হাইওয়ে হওয়ার কথা নির্বিঘ্ন যোগাযোগের ধমনির মতো। কিন্তু দেশে অনেক মহাসড়কের পাশে হাটবাজারের মতো প্রতিবন্ধক তৈরি হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, দুর্ঘটনা কমানো ও যানবাহনের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে বাজার এড়িয়ে বাইপাস তৈরি করা হলে সেই বাইপাস ঘিরেও গড়ে উঠছে হাটবাজার। বাস্তবসম্মত ও কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে মহাসড়কগুলো কার্যত মহাসড়ক হয়ে উঠতে পারছে না। বর্তমানে সারা দেশের জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে ছোট-বড় হাজার হাজার দোকান নিয়ে কয়েকশ স্থায়ী, অস্থায়ী ও অবৈধ হাটবাজার গড়ে উঠেছে। এসব হাটবাজারকেন্দ্রিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে যানবাহনের গতি কমে যাচ্ছে। এছাড়া যত্রতত্র মানুষের রাস্তা পারাপারের কারণে ঘটছে দুর্ঘটনা, বাড়ছে যানজট। এতে একদিকে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে হচ্ছে সময়ের অপচয়। কাজেই এ অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। বিভিন্ন সময়ে মহাসড়কসংলগ্ন দোকানপাট উচ্ছেদ করা হলেও কিছুদিন পরই তা আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। এ ধরনের নিষ্ফল অভিযানের কারণে দখলদাররা আরো বেশি উৎসাহিত হয়। মহাসড়কের পাশে যেকোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ আইন ও নৈতিকতার পরিপন্থী। কিন্তু তার পরও থেমে নেই স্থাপনা নির্মাণের প্রবণতা। মহাসড়কগুলো যাতে স্থানীয় সড়কের মতো হয়ে না যায়, সেজন্য যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে দেশের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। স্থানীয় লোকেরা মহাসড়কে যানবাহন চলাচলকে কাজে লাগিয়ে নানা রকম অবৈধ বাণিজ্যও করতে চায়। এসব সমস্যার সমাধানে স্থানীয় প্রশাসনকে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে লক্ষ রাখতে হবে স্থানীয় প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তি যেন অবৈধ দখলদারদের পক্ষে কাজ করতে না পারেন। বস্তুত, মহাসড়কের ওপর বা পাশে হাটবাজার বসানোর কোনো সুযোগ নেই। বাধাহীনভাবে গাড়ি চলার ক্ষেত্রে অন্তরায় সৃষ্টি হলে সেই সড়ককে মহাসড়ক বলা যায় না। মহাসড়কে চাইলেই যেকোনো যানবাহনের প্রবেশের সুযোগ থাকার কথা নয়। যেহেতু এ সড়কে গাড়ি চলে উচ্চগতিতে ও বাধাহীনভাবে, সেহেতু সেখানে অযান্ত্রিক যানবাহন প্রবেশেরও সুযোগ থাকা উচিত নয়। কিন্তু বাস্তবে লক্ষ করা যায়, মহাসড়কের যত্রতত্র অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচল করছে। এসব বন্ধ করা জরুরি।

ভারতে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এ হাইওয়েগুলো। ভারত হাইওয়েগুলোকে সর্বাধুনিক, নিরাপদ ও যাত্রীবান্ধব করে গড়ে তুলছে। এ হাইওয়েগুলোয় ১০০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টায় নিরবচ্ছিন্নভাবে গাড়ি চলতে পারে। এক মুহূর্তের জন্য অধিকাংশ হাইওয়েতে গাড়ি দাঁড়ায় না। সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে শক্ত আইন রয়েছে, রয়েছে আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থা। এছাড়া পথে পথে ট্রাফিক পুলিশ প্যাট্রোলিং, চেকিং করা হয়। উন্নত সড়ক নির্মাণ ও মহাসড়কে সবুজায়ন প্রকল্পগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সম্পন্ন হচ্ছে। প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে ভরপুর আর্জেন্টিনার মহাসড়কগুলো মহাপরিকল্পনার অনন্য ফসল। আর্জেন্টিনার নদী, পাহাড়, রুক্ষ, দুর্গম অঞ্চল মহাসড়ক নির্মাণে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। কিন্তু সেসব ভালোভাবেই সামাল দিয়েছে সড়ক ও পরিবহন মন্ত্রণালয়। আর্জেন্টিনার অন্তত ১৫টি মহাসড়ক বিশ্বজুড়েই আলোচিত ও প্রশংসিত। দেশটির বিখ্যাত হাইওয়ের কথা এলে অনেকেই ‘রুতে ফোরটি’র কথা বলেন। পশ্চিম আর্জেন্টিনার গর্ব এ মহাসড়ক। পুনা থেকে কাবো ভার্জিন পর্যন্ত দীর্ঘ হাইওয়েটি পাড়ি দিয়েছে ৩ হাজার ৪৫ মাইল! রীতিমতো অবিশ্বাস্য দৈর্ঘ্যের এ মহাসড়ক আর্জেন্টিনার সবচেয়ে দীর্ঘ মহাসড়ক।

বিশ্বের প্রায় সব দেশেই মহাসড়কগুলোয় নিরবচ্ছিন্ন গতিতে ছুটে চলে গাড়ি। ঘণ্টায় ১০০ মাইল বেগে ছুটে পাড়ি দেয় শত শত কিলোমিটার। বাংলাদেশের মহাসড়কের চিত্র পুরো উল্টো। রাজধানী ঢাকাকে কেন্দ্র করে দেশের প্রধান মহাসড়কগুলো চলে গেছে বিভাগীয় শহরে। ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থার একমাত্র মহাসড়কগুলোর অবস্থা সঙ্গিন। মহাসড়কে যানজটের চিত্র ঈদ মৌসুমে ভয়াবহ আকার ধারণ করে। দেশের মহাসড়কগুলো যাত্রী চাপ সামলাতে পারছে না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ের বর্ষণ ও বন্যা। বিধ্বস্ত মহাসড়কগুলোয় চলছে সংস্কারকাজ। নিয়ম ভেঙে মহাসড়কে গাড়ি চলার উৎসব চলে। ট্রাফিক অব্যবস্থাপনা ও ফিটনেসবিহীন গাড়ি মহাসড়কে নেমে অবস্থা আরো শোচনীয় করে তোলে। মহাসড়কে পণ্যবাহী ট্রাকসহ যানবাহনের অতিরিক্ত চাপ, বৃষ্টির কারণে খানাখন্দ, ফিটনেসবিহীন যানবাহন বিকল হয়ে পড়া যানজটের মূল কারণ। প্রধান মহাসড়কের কয়েকটি পয়েন্টে যানজটের তীব্রতা এতটাই বেশি হয় যে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে।

বাংলাদেশে মহাসড়কের ওপর বা নিয়ন্ত্রণ রেখার মধ্যে হাটবাজারসহ কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ নেই। ২০২১ সালের মহাসড়ক আইনে এ বিষয়ে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। মহাসড়কের নিয়ন্ত্রণ রেখার মধ্যে হাটবাজার স্থাপনে বিধিনিষেধ ছিল ১৯২৫ সালের হাইওয়ে অ্যাক্টেও। কিন্তু এসব বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে মহাসড়কের ওপর এবং নিয়ন্ত্রণ রেখার মধ্যে গড়ে উঠেছে অসংখ্য হাটবাজার। আইন বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সবাই দায়িত্বশীলতার পরিচয় না দিলে এ সমস্যা থেকে সহজে পরিত্রাণ মিলবে কিনা, সে বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। এলজিইডির হাতে দেশের সড়ক ও জনপথসহ বেশির ভাগ সড়ক ও মহাসড়ক থাকলেও তাদের অধীনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ম্যাজিস্ট্রেট বা পুলিশ নেই। নিজস্ব কোনো বাহিনী না থাকায় অনেক সময় চাইলেই পুলিশ পাওয়া যায় না। এজন্য মহাসড়ক দখলমুক্ত করার ক্ষেত্রে এটি বিরাট প্রতিবন্ধকতা। এর বাইরে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের কারণেও মহাসড়ক দখলমুক্ত করা যায় না।

মহাসড়কের চরিত্র নিশ্চিত করতে হলে এর সাধারণ শর্তগুলো মানতে হবে। এটা মনে রাখতে হবে যে একটি কার্যকর মহাসড়ক শুধু রাস্তা চওড়া করার ওপর নির্ভর করে না। একে বাধাহীন রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত দেশের দিকে যাত্রার অন্যতম পূর্বশর্ত হলো, উন্নত ও কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা। সেটা নিশ্চিত করতে হলে সড়ক হাটবাজারমুক্ত করতে হবে। যারা অবৈধভাবে হাটবাজার বা বাসস্ট্যান্ড নির্মাণ করছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। সড়ক-মহাসড়কের মতো অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনায় সবার আগে অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা ভূমি ব্যবস্থাপনা। কিন্তু দেশে যারা সড়ক-মহাসড়ক তৈরির দায়িত্বে আছেন, তারা কখনই বিষয়টি পরিকল্পনার মধ্যে রাখেননি। পৃথিবীর কোথাও মহাসড়কের ধারেকাছে হাটবাজার তো দূরের কথা, কোনো আবাসিক এলাকাও থাকে না। ভূমি ব্যবস্থাপনাটি সরকারের পরিকল্পনার সঙ্গে কখনই সমন্বিতভাবে করা হয়নি। মহাসড়কের ওপর এবং আশপাশে গড়ে ওঠা হাটবাজারগুলো দ্রুত অপসারণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নে সমন্বিতভাবে ভূমি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে হাইওয়ে পুলিশ, স্থানীয় জনপ্রশাসন, সরকারকে আন্তরিকতার সঙ্গে পদক্ষেপ নিতে হবে।