দেশের ৫০ বছরের যাত্রায় নানা ক্ষেত্রে নারীরা অনেক এগিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে অর্থনীতিতে, দেশের অগ্রগতিতে। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে এখনো নারীদের বঞ্চনার জায়গা রয়ে গেছে। তার মধ্যে একটি হলো উত্তরাধিকার সম্পত্তি প্রাপ্তিতে বৈষম্য। এটা নিয়ে অনেক দিন ধরে আলোচনা চলছে। নিয়মিত বিরতিতে সেমিনার-সিম্পোজিয়াম হচ্ছে। শনিবার সাংগাত ও বণিক বার্তার যৌথ উদ্যোগেও এ-সংক্রান্ত এক অনলাইন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাতে উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারীর সমান অধিকার নিশ্চিতে আইন পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন বক্তারা। অভিন্ন পারিবারিক আইন করার কথা বলেছেন তারা। বিষয়টি আমলে নিয়ে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ দরকার।
সমাজের বহু যুগের অর্গল ভেঙে আমাদের নারীরা প্রতিনিয়ত সামনে এগিয়ে চলছে। শিক্ষায় তাদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। শুধু প্রাথমিক বা মাধ্যমিক নয়, উচ্চশিক্ষায়ও তাদের এখন সদর্প উপস্থিতি। শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে বিপুলসংখ্যক নারী। কর্মক্ষেত্রে কমছে নারী-পুরুষ বৈষম্য। একসময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাসহ বিভিন্ন বাহিনীতে উচ্চপদে নিয়োগ পেলেও সৈনিক বা কনস্টেবলের মতো পদে নারীরা ছিলেন না। গত কয়েক বছরে সেই অর্গলও ভাঙা সম্ভব হয়েছে। গত আড়াই দশকের বেশি সময় ধরে একটানা নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা পেয়ে এসেছে দেশ। বর্তমান সংসদে স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালনও করছেন একজন নারী। সংসদ, মন্ত্রিসভা, প্রশাসনেও নারীর অংশগ্রহণ তৃতীয় বিশ্বের বাস্তবতায় যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক। সব মিলিয়ে নারীর ক্ষমতায়ন অনেকটা দৃশ্যমান। তবে সম্পত্তিতে নারীর অধিকারহীনতা এখনো বড় উদ্বেগের ক্ষেত্র হিসেবে রয়ে গেছে। সংবিধানের দৃষ্টিতে নারী-পুরুষ সমান হলেও বাস্তবে তা দৃশ্যমান নয়। উত্তরাধিকার সম্পত্তি পুরুষের চেয়ে কম পাচ্ছে তারা। কিছু ক্ষেত্রে তারা আদৌ কোনো সম্পত্তিই পাচ্ছে না। এক্ষেত্রে কয়েকটি ফ্যাক্টর কাজ করছে। অনেক নারীই সম্পত্তি প্রাপ্তির নিয়মকানুনগুলো সম্পর্কে যথাযথভাবে জানেন না। সামগ্রিক বিষয়-আশয়গুলো নিয়ে তাদের মধ্যে বড় ধরনের সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। আছে আইনি বৈষম্যও। ধর্মীয় অনুশাসনের ভিত্তিতে প্রণীত পারিবারিক আইন একেক ধর্মের বেলায় একেক রকম। বড় চার ধর্মের মধ্যে খ্রিস্টানদের পারিবারিক আইনে নারীদের সম্পত্তি প্রাপ্তি সমান। অন্য ধর্মগুলোর পারিবারিক আইনে তারতম্য রয়েছে অনেক। ধর্মভেদে পারিবারিক আইনের এ ভিন্নতা সম্পত্তিতে নারীর সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার অন্তরায়। আবার কিছু ক্ষেত্রে আইনে সমতা থাকলেও বাস্তবে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণেও নারী অধিকার ব্যাহত হচ্ছে। যেমন আইন অনুসারে খ্রিস্টান নারী সম্পত্তির সমান ভাগীদার হলেও বাস্তবে পাচ্ছে না। বিরাজমান পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার কারণে এমনটি হচ্ছে। বলা চলে নানা কারণে সম্পত্তিতে নারীর সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা এখনো দুরূহ।
অনেক দেশই নারীর সম্পত্তি অধিকারের ক্ষেত্রে ধর্মীয় ও প্রথাভিত্তিক আইন থেকে বেরিয়ে এসেছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, সুইডেন, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, জার্মানিসহ ইউরোপীয় দেশগুলো এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলোয় অভিন্ন পারিবারিক আইন করা হয়েছে। আইনিভাবে সম্পত্তিতে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এ ধরনের আইন কোথাও ইউনিভার্সাল ইনহেরিট্যান্স অ্যান্ড প্রপার্টি ল, আবার কোথাও কমন ল নামে পরিচিত। ওইসিডিভুক্ত দেশগুলোতেও অভিন্ন পারিবারিক আইনের ক্ষেত্রে হয়েছে যথেষ্ট উন্নতি। ফলে ওইসব দেশে সম্পত্তিতে নারীর ন্যায্য হিস্যা তৈরি হয়েছে। কাজেই উল্লিখিত দেশগুলোর আইনি পদক্ষেপগুলো আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।
সরকার নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করার জন্য সিডও সনদসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সনদে সই করেছে। আমাদের সংবিধানমতেও প্রতিটি মানুষ সমান। সেদিক থেকে সব ক্ষেত্রে নারীর সমানাধিকার নিশ্চিতে রাষ্ট্র অঙ্গীকারবদ্ধ। আমরা দেখছি, দেশের বাণিজ্য আইন, ফৌজদারি আইন এবং সিভিল আইন ধর্মীয় বিশ্বাসে পরিচালিত হচ্ছে না। ধর্মীয় পরিচয় যা-ই হোক না কেন প্রতিটি নাগরিকের জন্য এসব সমানভাবে প্রযোজ্য। এখানে বৈষম্যের কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু পারিবারিক আইনের বেলায় অনেক ক্ষেত্রে ধর্মীয় রীতি-নীতির প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। ধর্মীয় অনুশাসনের দোহাই দিয়ে নারীদের কম সম্পত্তি দেয়া হচ্ছে। ফলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীরা যেভাবে মেলে ধরতে পারত, সেভাবে পারছে না। এ প্রেক্ষাপটে সম্পত্তি প্রাপ্তিতে নারীর সমান অধিকার নিশ্চিতে অভিন্ন পারিবারিক আইনের যে দাবিটি উঠেছে, তা যুক্তিসংগত। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নীতিনির্ধারকদের জোরালো উদ্যোগ চাই।
বিরাজমান ধর্ম ও প্রথানুগ পারিবারিক আইন ব্রিটিশদেরই তৈরি। একসময় হয়তো এর বাস্তবতা ছিল। কিন্তু এখনো সেটা অব্যাহত রাখাটা মোটেই সুবিবেচনাপ্রসূত নয়। সাম্য, মানবিকতা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাই হলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র। এর আলোকেই সংবিধানে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে। অথচ এখনো যে পর্যন্ত বৈষম্যমূলক পারিবারিক আইন রয়ে গেছে, তা দুঃখজনক। এটা মুক্তিযুদ্ধ, মৌলিক মানবাধিকার চেতনার পরিপন্থী। আরো লক্ষণীয় হলো, সংখ্যালঘু ধর্মীয় গোষ্ঠীর নারীদের সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইনে কিছুটা নির্দেশনা থাকলেও আদিবাসী নারীদের অধিকার আইনে অনেকটা অস্পষ্ট রয়ে গেছে। সুতরাং আইনি সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
চলছে এসডিজি বাস্তবায়নের কাজ। বৈশ্বিক এ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় নারীর প্রতি বৈষম্য রোধ ও সম্পত্তিতে নারীর অধিকার নিশ্চিতের কথা বলা হয়েছে। উত্তরাধিকার আইনে পরিবর্তন আনা না হলে আলোচ্য লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়। তাই অভিন্ন পারিবারিক আইন অবশ্যই প্রণয়ন করতে হবে। এ আইন শুধু মানবাধিকার আন্দোলনের নয়, রাষ্ট্রের এগিয়ে যাওয়ার প্রশ্নও। কাজেই এ আইন প্রণয়নে রাষ্ট্রকেই সর্বাগ্রে এগিয়ে আসতে হবে। শুধু আইন প্রণয়ন নয়, এর যথাযথ প্রয়োগ এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতেও পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজনীয় সমর্থনমূলক রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টায় সর্বক্ষেত্রে নারীর সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা পাবে—এটিই প্রত্যাশা।










