আ হ ম মুস্তফা কামাল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অর্থমন্ত্রী। এর আগে তিনি পরিকল্পনামন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে কুমিল্লা-১০ সংসদীয় আসন থেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচিত সংসদ সদস্য। এছাড়া মুস্তফা কামাল ২০১৪-১৫ মেয়াদে আইসিসির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। পেশায় চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট আ হ ম মুস্তফা কামাল এ পর্যন্ত চারবার জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেন। এর আগে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৭০ সালে তৎকালীন সমগ্র পাকিস্তানের চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধা তালিকায় প্রথম স্থান অর্জন করেন। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির নানা ইস্যু, রাজস্ব ও মুদ্রানীতি, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সংস্থাগুলোর কার্যক্রম, আগামী অর্থবছরের বাজেটসহ নানা বিষয় নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাইদ শাহীন

অর্থমন্ত্রীর কাছে মানুষ প্রত্যাশা করে, জনগণের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী?

জনগণের কাছে আমি সবসময়ই তাদের ভালোবাসা এবং তাদের বিশ্বাস ও আস্থা প্রত্যাশা করি। জাতির পিতার স্বপ্ন পূরণ করতে হবে, এ দেশকে সোনার বাংলা হিসেবে নির্মাণ করতে হবে। কাজটি করার জন্য দেশের মানুষকে আমি সবসময়ই পাশে চাই। স্বাধীনতার পরে আমাদের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। অনেকেই বাংলাদেশকে উপহাস করে বলেছিলেন, বাংলাদেশ নামের দেশটির সামনে কোনো স্বপ্ন নেই। এ দেশ কোনো দিন এগোতে পারবে না। তারা যদি এগোতে পারে তাহলে পৃথিবীর যেকোনো দেশ এগোতে পারবে। এখন পরিস্থিতি পুরোটাই পরিবর্তন হয়ে গেছে। অন্য দেশকে বলা হচ্ছে—বাংলাদেশকে দেখে শেখো। গত ৫০ বছরে এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন।

অর্থনীতিতে নতুন কোনো সংযোজন আছে কি? আগামী বছরগুলোয় বিশেষ কী অর্জন করতে চান?

আমাদের অর্থনীতির সব ক্ষেত্রে গৃহীত সংস্কার কার্যক্রম ও প্রদত্ত নীতি-সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি। রেমিট্যান্স আয়ে ২ শতাংশ প্রণোদনা চালু করা এবং তা ২ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা, তৈরি পোশাকের সব খাতে নগদ প্রণোদনা সহায়তা, খেলাপি ঋণ হ্রাস, ইসলামিক বন্ড সুকুক চালু, ব্যাংক সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনা, সঞ্চয়পত্র অটোমেশন, আর্থিক খাতের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য উচ্চ আদালতে পৃথক বেঞ্চ গঠন, রাজস্ব

খাতের অটোমেশন ইত্যাদি পদক্ষেপ আমাদের সংযোজন। বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি সংস্থার উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে ফিরিয়ে আনা, আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ব্যাংক-আর্থিক খাত ও রাজস্ব খাত সংস্কারের অংশ হিসেবে একাধিক বিদ্যমান আইন সংশোধন ও নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

কভিডপূর্ব বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ছিল অপেক্ষাকৃত দ্রুত। কভিডে এ গতি কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তার পরও অন্যান্য দেশের তুলনায় ভালো করছে বাংলাদেশ। সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি নিয়ে অর্থমন্ত্রী হিসেবে আপনি কতটা সন্তুষ্ট?

বর্তমান সরকারের শাসনামলে গত ১৩ বছর দেশের অর্থনৈতিক অর্জন যেকোনো বিবেচনায় শীর্ষে। আমাদের এ অর্জন সারা বিশ্ব স্বীকৃতি দিয়েছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মতে, উন্নয়ন অর্থনীতিতে বাংলাদেশ বিশ্বের ‘রোল মডেল’। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন, ‘বাংলাদেশ ইজ অ্যান একজাম্পল অব ইকোনমিক প্রগ্রেস’। গত এক যুগে বিশ্বের অর্থনীতি বিভিন্ন সময়ে কঠিন সময়ের মুখোমুখি হলেও আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতির মৌল ভিত্তিগুলো খুব একটা নিম্নগামী হয়নি। আমরা ‘প্রেক্ষিত পরিকল্পনা: ২০২১’-এর লক্ষ্য অর্জন করতে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা সাজিয়েছিলাম। সে অনুযায়ী দেশের অর্থনীতি ও জিডিপির প্রবৃদ্ধি উচ্চপর্যায়ে ছিল। ২০১৯-২০ অর্থবছরে জিডিপি অনুপাতে সরকারি বিনিয়োগের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। বিপরীতে অর্জিত হয়েছে ৮ দশমিক ১২ শতাংশ। সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ, সম্প্রসারিত অভ্যন্তরীণ চাহিদা, সম্প্রসারণমূলক রাজস্ব ও মুদ্রানীতির হাত ধরে আমাদের অর্থনীতি উত্তরোত্তর উচ্চতর প্রবৃদ্ধির দিকে ধাবিত হয়েছে।

গত এক যুগে আমাদের কৃষি উৎপাদন বেড়েছে, রফতানি আয় রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ছে, বিনিয়োগ বাড়ছে। ১০টি ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্পসহ মেগা প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে, সরকারি বিনিয়োগ ও বাজেট বাস্তবায়ন বেড়েছে, ভ্যাট আদায় বাড়ছে। ফলে ভোগের পরিমাণ বাড়ছে। কভিড সহনশীলতা র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশ সারা বিশ্বে ২৯তম ও দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম স্থানে রয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মতে, ২০৩৬ সালে বিশ্বের ২৪তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ হবে বাংলাদেশ। এখন আমাদের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি অর্জনের মাধ্যমে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত ও ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া এবং দেশের অর্থনীতির উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রেখে ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি জ্ঞানভিত্তিক উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশে উন্নীত করা।

আপনাদের সময়কালে রাজস্ব ও জিডিপি অনুপাত কমে সিঙ্গেল ডিজিটে নেমে এসেছে। অর্থনীতির এত অগ্রগতি সত্ত্বেও এক্ষেত্রে অবনমন কেন?

বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত ১৬-১৭ শতাংশ হওয়া প্রয়োজন। তবে এখানে শুধু অনুপাত দেখলে চলবে না। সরকারি আমদানির ক্ষেত্রে অনেক সময় শুল্ক ও ট্যাক্স ছাড় দেয়া হয়। এটি জনগণের স্বার্থেই করা হয়। বলা যায়, এক খাত থেকে অন্য খাতে সেটি প্রবাহিত করা হয়। এ ধরনের হিসাব আমলে নিলে ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত অনেক বেশি হবে বলেই আমার ধারণা। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে একটি নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। সেটি হলো, কর আদায় করা হবে এমনভাবে যেন করদাতা ক্ষতিগ্রস্ত না হন। এক যুগ আগে দেশের উন্নয়নের চালচিত্র যেমন দুর্বল ছিল, রাজস্ব আদায় পরিস্থিতিও একই রকম ছিল। এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ২০০৫-০৬ সালের ৩৪ হাজার কোটি টাকা থেকে আট গুণ বেড়ে ২০২০-২১ সালে ২ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। মোট রাজস্ব আয়ে আয়করের অংশ ২২ থেকে বেড়ে প্রায় ৩৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আগামী ১০ বছরের মধ্যে তা ৪৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং করদাতার সংখ্যা ১ কোটি ৬০ লাখে উন্নীত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। আমরা প্রত্যক্ষ কর আদায় বৃদ্ধির জন্য জনবল বাড়ানোসহ আয়কর আদায় কাঠামো আরো বিস্তৃত করার উদ্যোগ নিয়েছি।

২০১৯-২০ অর্থবছরে আমার প্রথম বাজেট বক্তৃতায় বলেছিলাম করনীতি হবে এমন, যেখানে সর্বোচ্চ কর আদায় করা হবে কিন্তু করদাতারা কোনোভাবেই চাপের মুখে পড়বেন না। এক্ষেত্রে আমি ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুইয়ের অর্থমন্ত্রী জ্যোঁ ব্যাপ্টিস্ট কোলবার্টের নীতি অনুসরণ করি। তিনি যেমন বলেছিলেন, ‘হাঁস থেকে যতগুলো সম্ভব ততগুলো পালকই ওঠানো যাবে। তবে সাবধান যেন কোনো হাঁস ব্যথা না পায়।’ করহার কমিয়ে সর্বাচ্চ কর আদায় করাই আমাদের লক্ষ্য। করোনা প্রাদুর্ভাবের মধ্যে গত ২০২০-২১ এবং চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে করহার কমিয়ে জনগণ ও ব্যবসায়ীদের স্বস্তির জায়গা তৈরি করা হয়েছে। করহার কমানোর ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়েছে এবং রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরেই সব স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে আলোচনা করে ভ্যাট আইন, ২০১২ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। পর্যায়ক্রমে সারা দেশে খুচরা ও পাইকারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে মেশিন স্থাপন করা হচ্ছে। ভ্যাট আদায় নিশ্চিত করতে মেশিনে ইস্যুকৃত চালান গ্রহণে ক্রেতাসাধারণকে উৎসাহিত করতে আমরা লটারির মাধ্যমে আর্থিক পুরস্কার দিচ্ছি। 

মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা কেন উন্মুক্ত করা হচ্ছে না? এতে কোনো ধরনের ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করছেন কি?

মুদ্রা বিনিময় হার কোনোভাবেই রেগুলেটেড (নিয়ন্ত্রিত) নয়। মাঝেমধ্যে আমরা বিনিময় হার অন্য কোনো ফলাফল আনছে কিনা, সেটি পর্যবেক্ষণ করি। মুদ্রা বিনিময় হার পরিবর্তন করলে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ে কিনা, সেটি দেখা হয়। আমাদের রাজস্ব নীতি ও মুদ্রানীতি একসূত্রে গাঁথা। তাছাড়া বিদ্যমান বিনিময় হার আর কার্ভ মার্কেটের হার প্রায় কাছাকাছি থাকে। দেশে বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্য ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি করা হয়। ফলে মুদ্রা বিনিময় হার যা আছে, সেটি যৌক্তিকভাবেই আছে।

ব্যাংকের সুদ এক অংকে নামিয়ে আনার কারণে ব্যাংকের এনপিএল বাড়বে কি?

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুসারে ব্যাংকের সুদহার একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আনার কারণে দেশের অর্থনীতি মহাবিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। মহামারীর মধ্যে সুদহার বেশি থাকলে শিল্প ও বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হতো। তাছাড়া উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে হয়। বাংলাদেশে সুদহার অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি থাকায় আমরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছিলাম। সুদহার কমানোর মাধ্যমে এখন আমরা প্রতিযোগিতার সক্ষমতা অর্জন করেছি। ঋণখেলাপি বাড়ার একটা কারণ ছিল উচ্চ সুদহার। যখন আমরা ঋণের সুদের সর্বোচ্চ হার ৯ শতাংশে বেঁধে দিলাম তখন কিন্তু একা একা এ সিদ্ধান্ত নিইনি। ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং সব স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যাংকের সুবিধামতো সময়ে এটি বাস্তবায়ন করেছি। ঋণের গড় সুদহার প্রায় ৭ শতাংশে নেমে এসেছে। দেশে এ করোনা পরিস্থিতিতে যদি ১৬-১৭ শতাংশ সুদে ঋণ গ্রহণ করতে হতো তাহলে কোনো ব্যবসায়ী ঋণ গ্রহণ করতেন না, আর যারা গ্রহণ করতেন তারা সংগত কারণেই ঋণখেলাপি হতেন। দেশের অর্থনীতি আরো বিপর্যস্ত হয়ে পড়ত। ব্যাংকিং খাতের ঋণপ্রবাহ ঠিক রাখতে করোনাকালীন গৃহীত প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন এ কারণেই সহজতর হয়েছে। ঋণপ্রবাহ বাড়াতে, ব্যাংকে তারল্য ধরে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন নীতি সুদহার কমানো হয়েছে।

আমানত ও ঋণের সুদহারের পার্থক্যও ৫ শতাংশ থেকে ৩ শতাংশে নেমে এসেছে। এর মাধ্যমে ব্যাংক খাতের দক্ষতাও বেড়েছে। ঋণের সুদহার কমানোর কারণে ব্যাংক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। ২০২০ সালে করোনার মধ্যেও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মুনাফা ২ শতাংশ বেড়েছিল। ব্যাংক খাত থেকে আমরা গত ২০২০-২১ অর্থবছরে করপোরেট ট্যাক্স পেয়েছি প্রায় ৮ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা। সরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মুনাফা অর্জিত না হলেও ব্যাংকগুলোকে সরকারি তহবিল থেকে রিফাইন্যান্সিংও করতে হয়নি। আমরা আগে দেখতাম প্রতি বছরের বাজেটেই সরকারি অর্থে ব্যাংকগুলোর ক্যাপিটাল রিফাইন্যান্সিং করা হতো। আমরা এটি না করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে নিজেদের ব্যবসার মডেল নতুন করে সাজিয়ে ব্যাংকিং কার্যক্রম চালাতে বলেছি। তারা এখন ক্রমেই আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠছে। করোনা পরিস্থিতিতেও ব্যাংক খাতে অনেক সংস্কার আনতে সক্ষম হয়েছি। যে আইনগুলো সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তা শেষ করতে পারলে আমাদের ব্যাংক খাতের ভিত্তি আরো মজবুত হবে।

ব্যাংক খাত সংস্কারে অর্থ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ কি যথেষ্ট মনে করছেন?

আমি ২০১৯ সালে যখন অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করি তখন ব্যাংক খাত নিয়ে অনেকেরই দুশ্চিন্তা ছিল, সমালোচনা ছিল। খেলাপি ঋণ নিয়ে অনেকেই অনেক রকম বক্তব্য দিয়েছেন। ঋণগ্রহীতা ব্যবসায়ী বলতেই মনে করা হতো তারা টাকা হাতিয়ে নেবেন। যারা যৌক্তিক কারণে ঋণখেলাপি হয়েছেন কিন্তু তাদের ব্যবসা চালিয়ে নিতে চান, তাদের ব্যবসার সুযোগ করে দেয়া সরকারের দায়িত্ব। আর যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণখেলাপি হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে সব প্রকার আইনি ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ২০০৬ সালে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১৩ দশমিক ২ শতাংশ। এখন তা ৮ দশমিক ১ শতাংশে নেমে এসেছে। খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে এবং প্রকৃৃত ব্যবসায়ীদের ব্যবসা সহজতর করতে আমরা ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ঋণ পুনঃতফসিল ও এককালীন এক্সিট-সংক্রান্ত বিশেষ নীতিমালা জারি করেছিলাম। এর সুযোগ গ্রহণ করে ১৩ হাজার ৩০৭ জন ঋণগ্রহীতা ঋণ নিয়মিত করেছেন। এতে ওই ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা নতুন ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারছেন। এর বড় প্রাপ্তি হচ্ছে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ হ্রাস পাওয়া।

কৃষি ও জ্বালানি খাতের ভর্তুকি সরকারের রাজস্বে চাপ তৈরি করছে কি?

সারে ভর্তুকি দেয়ার অন্যতম কারণ হলো কৃষকের ওপর যাতে চাপ না পড়ে। ভোক্তারা যেন সঠিক দামে পণ্য পেতে পারেন। সাধারণ মানুষ যেন অতিমাত্রায় চাপের মধ্যে না পড়ে। এজন্য কিছুটা চাপ ভোক্তা বহন করবেন, কিছুটা সরকার বহন করবে—এভাবে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করা হয়। আবার জ্বালানি খাতে ভর্তুকি দেয়ায় দেশের শতভাগ মানুষ বিদ্যুতের আওতায় এসেছে। সব ধরনের ভর্তুকির ক্ষেত্রে আমাদের নীতি হলো সংশ্লিষ্টরা কিছু বহন করবেন আর সরকার বহন করার মাধ্যমে ভারসাম্য আনবে। সব খাতেই জ্বালানির ব্যবহার বেড়েছে। ফলে ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে।

অনেকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেশি দেখানোর অভিযোগ করছেন। অর্থনৈতিক নানা সূচকের ক্ষেত্রে বড় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। সব মিলিয়ে সরকারের তথ্যের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে কেন?

সরকারের দেয়া তথ্যের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্যের পার্থক্য হয়। এর কারণ বিদেশীদের বছর একটা, আমাদের অর্থবছর আরেকটি। আমরা যে তারিখে তথ্য প্রকাশ করি, তারা ভিন্ন তারিখে প্রকাশ করে। কিন্তু মোটাদাগে সরকারি তথ্যের কোনো অমিল নেই। আমাদের অর্থনীতির প্রধান দুটি চালিকাশক্তি রফতানি আয় ও রেমিট্যান্সপ্রবাহ। এর হাত ধরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সব রেকর্ড ভেঙে গত বছরের আগস্টে ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছিল। এখন যা প্রায় ৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ বছর রেমিট্যান্সপ্রবাহের পরিমাণ যেন আরো কিছুটা বৃদ্ধি পায়, সে লক্ষ্যে চলতি বছরের জন্য রেমিট্যান্স প্রণোদনা বাড়িয়ে ২ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। এ বছর ২২-২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স অর্জিত হবে বলে আশা করছি। রফতানি খাতে যে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, তার সঙ্গে রেমিট্যান্স আয়ের লক্ষ্য অর্জিত হলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চলতি অর্থবছরে ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের  মাইলফলক স্পর্শ করবে।

আপনি বলেছিলেন, অর্থ পাচার রোধে সক্রিয় ভূমিকা রাখবেন। আগামী বাজেটে কী ধরনের পদক্ষেপ থাকছে? 

আমার চিন্তাভাবনা হলো অর্থ পাচার কমানো। দেশের অর্থ যেন অবৈধভাবে বিদেশে পাচার না হয়, তা রোধে পদক্ষেপ নেয়া। এ কারণে বৈধভাবে বিদেশে ব্যবসা করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। সরকার মানুষের চাহিদা পূরণে কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলো যে নীতি অনুসরণ করছে, তাদের সঙ্গে মিল রেখেই আমাদের এগোতে হবে। এ কথা সত্য, আমরা অন্য দেশকে অনুসরণ করি না। আমাদের যে সামর্থ্য, সেটা নিজেদের মতো করে নিয়েই এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। আমদানি শুল্ক আদায়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আমরা শতভাগ আমদানি-রফতানি স্ক্যানিং করার উদ্যোগ নিয়েছি। এটি সফল হলে আমাদের আমদানি-রফতানির আড়ালে কোনো মানি লন্ডারিং হবে না, আমদানি শুল্ক ফাঁকি কমে যাবে, মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে রফতানি বন্ধ হবে। গুরুত্বপূর্ণ কাস্টম হাউজ/কাস্টমস স্টেশনগুলোয় চলতি অর্থবছরে ছয়টি এবং আগামী অর্থবছরে সাতটি, মোট ১৩টি নন-ইন্ট্রুসিভ ইন্সপেকশন সিস্টেম উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছি। এসব ডিজিটাল ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা হলে রাজস্ব আদায়ে বড় বিপ্লব আসবে।

সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ইস্যুতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) মধ্যে মতপার্থক্য দেখা যায়। এটি নিরসনে অর্থ মন্ত্রণালয় কী পদক্ষেপ নিয়েছে?

পুঁজিবাজারে যে ইনস্ট্রুমেন্ট ট্রেড হচ্ছে, তার সবগুলো খুব স্পর্শকাতর বিষয়। এটা কোনো জিনিসপত্র নয়। পুঁজিবাজার অন্য দুটি বাজারের মতো নয়। আমরা যখন দেখি শেয়ারদর বেড়ে গেছে তখন কিছুটা সমন্বয় করে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। অন্য বাজারগুলোর যে মৌলিক নীতি, পুঁজিবাজারেও সেই একই মৌলিক নীতিতে পরিচালিত হয়। পুঁজিবাজার অমূলক কোনো ধারণার ওপরে চলে না। পরিবেশ-পরিস্থিতি, উন্নয়ন, অর্থনীতিতে আমাদের অবস্থান, পুঁজি মূল্যায়ন করে পুঁজিবাজার চলে। এটিকে ভালো রাখার সব ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে সংশ্লিষ্ট সংস্থা। সঠিক পথেই দেশের পুঁজিবাজার এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসির মধ্যে মতপার্থক্য থাকার কোনো কারণ নেই। কোনো ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে। সেটি মন্ত্রণালয় দ্রুতই অবসান করেছে।

পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানির শেয়ারের সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। ভালো কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে নিয়ে আসা আদৌ সম্ভব হবে কি?

অনেক দিন ধরেই পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানি নিয়ে আসার চেষ্টা করা হচ্ছে। পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানি আসবে। পুঁজিবাজার নিয়ে মানুষের মধ্যে যে আস্থা আসা দরকার, তা এসে গেছে। দীর্ঘদিন ট্রেড করতে করতে তারা বুঝেছে। তার পরও সবাইকে সাবধান থাকতে হবে। পুঁজিবাজার আমাদের অর্থনীতির একটি প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ। প্রত্যেক দেশের পুঁজিবাজার অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে। আমাদের অর্থনীতি মজবুত হয়েছে। সরকারের প্রতি মানুষের আস্থার কারণে অর্থনীতি মজবুত রয়েছে। উন্নয়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের পুঁজিবাজারের এগিয়ে যাওয়া দরকার।

অর্থনীতিকে কভিডপূর্ব ধারায় ফিরিয়ে আনা কি সম্ভব? এক্ষেত্রে সরকার কী কৌশল গ্রহণ করছে?

কভিড অতিমারীর প্রভাবে সংঘটিত অর্থনৈতিক মন্দাকে এক যুগ আগে ঘটে যাওয়া অর্থনৈতিক মন্দার চেয়েও বড় এবং ১৯৩০-এর মহামন্দার পরে সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এমন সময়ে বাংলাদেশ ৩ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে এশিয়ায় সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধির দেশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছি। করোনার প্রাথমিক অভিঘাত মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী একের পর এক প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। দ্রুতগতিতে সেগুলোর বাস্তবায়ন শুরু করি।

সব শ্রেণী-পেশার মানুষের অর্থনৈতিক চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে গত দুটি বাজেটে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকার মোট ২৮টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। ১ লাখ ১০ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন হয়েছে। আমাদের অর্থনীতি পূর্ণোদ্যমে আগের সফলতার ধারায় ফিরে আসছে। এটিকে টেকসই করতে এবং আগামী দিনে প্রবৃদ্ধির ধারা বেগবান রাখতে ভবিষ্যৎ চাহিদা অনুযায়ী প্রণোদনা প্যাকেজ সম্প্রসারণ এবং বরাদ্দ বাড়ানো হবে।

২০২০-২১ অর্থবছরটি আমাদের জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ সময় ছিল। যুগপত্ভাবে আমরা বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী, স্বাধীনতা ও বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী পালন করেছি। এ দুটি ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে ২০২১ সালেই যুক্ত হয়েছে বাঙালি জাতির একটি অসাধারণ অর্জন—স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ। অনেক অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে আমরা ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে। বাংলাদেশ আজ ৪১তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ, সেখানে পাকিস্তানের অবস্থান ৪৭তম। জিডিপির আকারে, মাথাপিছু জাতীয় আয়, ক্রয়ক্ষমতার মানদণ্ড, গড় আয়ু, শিশুমৃত্যু হার, সামাজিক নিরাপত্তা বলয় সম্প্রসারণে পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে বাংলাদেশ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে পাকিস্তানকে পেছনে ফেলেছে। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে সগৌরবে ভারত, চীন, মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হবে। কেবল এলডিসি থেকে উত্তরণ নয়, বাংলাদেশ এর আগে ২০১৫ সালেই বিশ্বব্যাংকের হিসাবে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জাতিকে ভিশন দিয়েছিলেন, আমরা ২০২০ সালে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হব। সেটা আমরা নির্ধারিত সময়ের আগেই অর্জন করতে পেরেছি।

ঋণগ্রহীতা দেশ থেকে ঋণদাতা দেশে পরিণত হওয়ার পরিকল্পনা কি ঝুঁকিপূর্ণ নয়?

আমাদের ঋণ-জিডিপির অনুপাত এবং অর্থনীতির সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়েই আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলাম, আমরা কেবল ঋণ গ্রহণ করব না; প্রয়োজনে অন্য দেশকে ঋণ দেব। আমরা যেসব দেশ থেকে ঋণ নিই, তাদের সবার ঋণ-জিডিপি অনুপাত আমাদের চেয়ে বেশি। আমাদের ঋণ-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৩৩ শতাংশ। আমাদের মুদ্রা বিনিময় হারও স্থিতিশীল। আমাদের মৌল অর্থনীতির ভিত যথেষ্ট শক্তিশালী, তাই বাংলাদেশ ব্যাংক বন্ধুপ্রতিম দেশ শ্রীলংকার কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ দিয়েছে। আমরা যখন ঋণ দেয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছি, নিশ্চয়ই অদূরভবিষ্যতে চীন-ভারতের মতো বাংলাদেশও বিশ্বে ঋণ প্রদানকারী দেশ হিসেবে পরিচিতি পাবে।

অর্থনৈতিক উন্নয়নের মৌলিক কারণ কী কী বলে আপনি মনে করেন?

মৌলিক ১০টি কারণ উল্লেখ করতে চাই। তার মধ্যে সবার আগে আসবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক সরকারের অধীনে রাষ্ট্র পরিচালনা। এটিই হলো অর্থনৈতিক সাফল্যের মূল কারণ। এতে আমাদের গৃহীত সব অর্থনৈতিক উন্নয়ন নীতির ধারাবাহিকতা ও গণমুখিতা নিশ্চিত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, রূপকল্প ২০২১ অনুযায়ী সত্যিকার অর্থে দেশকে সফলভাবে ডিজিটাল বাংলাদেশে রূপান্তর। তৃতীয়ত, ১০টি বিশেষ উদ্যোগ দেশের আর্থসামাজিক ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এনেছে। তার মধ্যে আশ্রয়ণ তথা সবার জন্য বাসস্থান, আমার বাড়ি আমার খামার প্রভৃতি দেশের দারিদ্র্য নিরসনে বড় ভূমিকা রেখেছে। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় কয়েক গুণ সম্প্রসারণ করে দেশের প্রায় সব দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে কোনো না কোনো কর্মসূচির আওতায় আনা এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। নারীর ক্ষমতায়ন, সেটা স্কুল পর্যায়ে মেয়েদের শিক্ষা থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি ও নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টি করেছে। চতুর্থত, দেশের সব জনগণকে বিদ্যুেসবার আওতায় আনা। পঞ্চমত. ভৌত অবকাঠামো ও সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়নে বিপুলসংখ্যক প্রকল্প সাফল্যের সঙ্গে বাস্তবায়ন করা, যেগুলোর হাত ধরে আমাদের প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়েছে। সামনের দিনে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, বঙ্গবন্ধু টানেল, গভীর সমুদ্রবন্দরসহ সব মেগা প্রকল্পের সুফল এবং ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল দেশের অর্থনীতিতে আরো গতিসঞ্চার করবে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি দুই অংকের ঘরে পৌঁছবে। ষষ্ঠত, সরকার সবসময় প্রুডেন্ট রাজস্ব নীতি গ্রহণ করেছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি বজায় রেখেছে। যার কারণে দেশে ব্যক্তি খাতের ঋণপ্রবাহ স্বাভাবিক ছিল। সপ্তমত, ব্যবসা-বাণিজ্যকে সহজ করতে ব্যাংকঋণের সুদহার এক অংকের ঘরে নামিয়ে আনা, ফলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ যেমন কমে এসেছে, তেমনি তাদের মুনাফাও বেড়েছে। অষ্টমত, নানা চাপের মুখেও টাকার মান অবমূল্যায়ন না করা। ফলে দেশে আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতি বাড়েনি। রফতানিমুখী শিল্পের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আমাদের প্রণোদনা যথেষ্ট সহযোগিতা করেছে। নবমত. রেমিট্যান্সের পরিমাণ বৃদ্ধির জন্য ২ শতাংশ প্রণোদনা প্রদান। দশমত, দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর বয়স ২৫ বছরের নিচে। এ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড ও তারুণ্যের উদ্ভাবনী শক্তি অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত করছে। এছাড়া শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে গুরুত্বারোপ করে ব্যয় বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি খাতের উন্নয়নে প্রকল্প গ্রহণ, কর ব্যবস্থাকে প্রগতিশীল করে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা, কর্মসৃজনমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন, কারিগরি শিক্ষার বিস্তার ইত্যাদি বিষয়ের কথা উল্লেখ করা যায়। এসব কারণেই আজকে আমরা বিশ্বের কাছে উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত হয়েছি।