বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট আয়োজিত নুরুল মতিন মেমোরিয়াল লেকচার অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ব্যাংকিংয়ে নৈতিকতার চর্চা গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় অর্থনীতিবিদ ড. সাদিক আহমেদ দেশের ব্যাংকিংয়ের নৈতিকতার চর্চা আগের চেয়ে বাড়ালেও সুশাসনের অভাব, খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি এবং ব্যাংকে অনিয়মের নতুন নতুন মাত্রা সম্পর্কে সতর্কপূর্বক এসব দূরীকরণে ব্যাংকের তদারকি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। অর্থনীতির উন্নয়নের জন্য নৈতিকতার সঙ্গে ব্যাংকিংয়ের কোনো বিকল্প নেই। দক্ষ ব্যবস্থাপনার ওপর যেমন সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অনেকাংশে নির্ভরশীল, তেমনি দক্ষ ব্যবস্থাপনাও নৈতিকতার ওপর নির্ভরশীল। ব্যাংক খাতে নৈতিকতার চর্চা লঙ্ঘন হওয়ার কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু তা-ই নয়, উচ্চপর্যায় থেকে নিম্নপর্যায়ের ব্যাংক কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও বিভিন্ন অর্থ কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন।

ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রণ কাঠামো শক্তিশালী ও ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেও তদারকি বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশে ব্যাংক খাতে নৈতিকতার চর্চা জোরদার করতে রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক শক্তিশালী হওয়া বাঞ্ছনীয়। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক শক্তিশালী হওয়া জরুরি। নজরদারি না বাড়লে করপোরেট গভর্ন্যান্স প্রতিষ্ঠিত হবে না। অর্থনীতির আকারের তুলনায় ব্যাংক বেশি হয়ে যাওয়ায় এ খাতে অসম প্রতিযোগিতা বাড়ছে। নতুন ব্যাংক ভালো গ্রাহক না পেয়ে অন্য ব্যাংকের গ্রাহক আকর্ষণে অনৈতিক চর্চায় লিপ্ত। কোনো কোনো ব্যাংক অন্য ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কিনে নিচ্ছে। আর্থিকভাবে প্রভাবশালী গ্রুপের পেছনে ছুটছে সব ব্যাংক। এতে কখনো কখনো প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ঋণ পেয়ে যাচ্ছেন অনেক গ্রাহক। এ অর্থ অনুৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে। পরে ওই অর্থ ফেরত দিতে আগ্রহ বোধ করছেন না গ্রহীতারা। আরেকটি পক্ষ ভালো উদ্যোগেও ঋণ পাচ্ছে না। এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে, কেবল মুনাফা বাড়ানোর লক্ষ্যে সব কর্মকাণ্ড পরিচালিত করার মানসিকতা পরিহার করতে হবে। কার্যক্রমের সব পর্যায়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত ও স্বল্পমেয়াদে মুনাফার লক্ষ্য অর্জনের জন্য যেকোনো ধরনের ঝুঁকি নেয়ার চেষ্টা থেকে বিরত থাকতে হবে। সাধারণ আমানতকারীদের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতি লক্ষ রেখে দেশ, সমাজ ও অর্থনীতিতে অবদান রাখার জন্য নৈতিক ব্যবসা পরিচালনা করাই ব্যাংকের দায়িত্ব। আর এ কারণেই অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের তুলনায় ব্যাংকের ওপর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট কঠোর ও নিবিড়। মূলত নৈতিকতাবিরোধী কাজের জন্য ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও ব্যাংকারদের ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমারেখা নির্ধারণ করা উচিত। প্রথাগত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় কেবল উচ্চবিত্ত মুষ্টিমেয় গ্রহীতার মধ্যে ঋণ সুবিধা সীমিত রাখা, সহায়ক জামানতবিহীন সাধারণ মানুষ ও দরিদ্রদের জন্য ঋণ গ্রহণের সুযোগ না রাখা, মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে মাত্রাতিরিক্ত ঝুঁকি গ্রহণ করে ব্যাংককে বিপদগ্রস্ত করা কিংবা দেশ ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর কোনো উদ্যোগে ঋণ সুবিধা দেয়াই ব্যাংক খাতের অনৈতিক কর্ম বলে চিহ্নিত করা যায়। আবার ব্যাংক কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত অনৈতিক কর্ম ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চাপ এড়াতে না পেরে অনৈতিকতার সঙ্গে জড়িয়ে পড়া—এসবের মধ্যেও পার্থক্য নির্ণয় করা উচিত। 

ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর ব্যাংক ব্যবস্থাকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর পেছনে রয়েছে কঠোর বিধিনিষেধ ও শক্তিশালী তদারক ব্যবস্থা। ইউরোপে ব্যাংকিং পেশাকে উচ্চ নৈতিকতাসম্পন্ন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার ব্যাংক খাত শক্তিশালী তদারক ব্যবস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত। এখানে জালিয়াতি সংঘটনের সঙ্গে পেশাজীবী বা ব্যাংকের সম্পৃক্ততা খুবই কম থাকে। এর কারণ অবশ্য প্রযুক্তি। এসব দেশে ব্যাংকের কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের সংস্পর্শে না গিয়েই অধিকাংশ সেবা মেলে। নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে কাউকে কোনো সুযোগ পাইয়ে দেয়ার ব্যবস্থা না থাকায় তাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থা এত শক্তিশালী। তাছাড়া সময়ে সময়ে নীতিনির্ধারণ ব্যবস্থা পর্যালোচনাপূর্বক ব্যবস্থা নেয়া হয়। উন্নত দেশগুলোয় রাজনীতি থেকে আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে আলাদা করার সুফল তারা পাচ্ছে। ব্যাংকিংয়ে নৈতিকতার চর্চা বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে নির্দেশনা ও সাকুর্লার দিয়ে আসছে। সাম্প্রতিক সময়েও বেশকিছু নির্দেশনা দিয়েছে, যার মধ্যে ব্যক্তির হিসাবের তথ্য তৃতীয় পক্ষের কাছে প্রকাশ না করাসংক্রান্ত বিষয়ও রয়েছে। ঋণ প্রদান থেকে শুরু করে প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কিত নানা বিষয়ে নির্দেশনা দেয়ার মাধ্যমে ব্যাংকের নৈতিকতার চর্চা বাড়াতে সচেষ্ট রয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তার পরও বেশকিছু ফাঁকফোকর রয়ে গেছে, যার সুযোগ নিয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকে অনৈতিক চর্চা চলছে। তবে নিয়ম ভঙ্গের ঘটনা ধরা পড়লে শাস্তিও হচ্ছে। প্রকৃত বিষয় হলো, ব্যাংকিংয়ে নৈতিকতার চর্চা একটি বিস্তৃত বিষয় এবং অনেক কিছুর সমন্বয়ে এটি পরিচালিত হয়। দেশের প্রায় প্রতিটি ব্যাংকেই এ-সংক্রান্ত নির্দেশনাবলি রয়েছে। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে সেটি মানা হয় না। এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ তদারক ব্যবস্থা শক্তিশালী করা প্রয়োজন। এটি করা দরকার তাদের স্বার্থেই। কারণ ব্যাংক পরিচালিত হয় মানুষের আস্থার ওপর ভিত্তি করে। এক্ষেত্রে কোনো চিড় ধরলে পুরো আর্থিক খাতে বিপর্যয় নেমে আসবে, যা টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য সুখকর নয়। 

খেলাপি ঋণ আদায়ে দুর্বলতাগুলো থেকেই যাচ্ছে। ব্যাংক খাতে আস্থা প্রতিষ্ঠায় যে আধুনিক উদ্যোগ এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে যে সক্রিয়তার প্রয়োজন, তার অভাব ক্রমে দৃশ্যমান হচ্ছে। খেলাপি ঋণ আদায়ে দীর্ঘসূত্রতা বা আদায় না হওয়া বিনিয়োগের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ কারণে আর্থসামাজিক উন্নয়নে ও টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনে ব্যাংক খাত কাঙ্ক্ষিত অবদান রাখতে সক্ষম কিনা, এ প্রশ্ন উঠে আসছে। আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও সুশাসন শক্তিশালী করতে হলে বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। যেহেতু আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, সেহেতু যারা ভালো ঋণ গ্রাহক, তারা এক ধরনের নৈতিক বিপত্তির মধ্যে পড়ছেন। বাংলাদেশে আর্থিক খাতে খেলাপি সংস্কৃতি সুস্থ নৈতিকতার অনুশীলনে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। খেলাপি ঋণ সম্পর্কে আইন ও বিধিগুলো প্রতিনিয়ত পর্যালোচনা, হালনাগাদ ও শক্তিশালী করতে হবে। মানসম্পন্ন ব্যবস্থাপনাই হচ্ছে ব্যাংকের আর্থিক ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় প্রতিষেধক। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যাংকে সুশাসনের ঘাটতির মূল কারণ বোর্ড সদস্যদের অযোগ্যতা নয় (যদিও উন্নয়নশীল দেশগুলোয় সমস্যাটি অনেক বেশি প্রকট), শীর্ষ ব্যবস্থাপনার জন্য যে লক্ষ্য নির্ধারিত হয়, তা অবাস্তব ও অযৌক্তিক। উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোয় অনেক মালিক ব্যাংককে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে চান এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় শীর্ষস্থানীয় নির্বাহীদের রাজনৈতিক নেতাদের তোয়াজ করে ব্যাংক চালাতে হয়, যা বন্ধ হওয়া জরুরি। 

ব্যাংক ব্যবস্থায় নৈতিক দায়িত্ব তিনভাবে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। প্রথমত, অনেক ক্ষেত্রে আইন, বিধি, প্রবিধি বা নৈতিক চাপ সৃষ্টি করে রাষ্ট্র এবং তার অধীন প্রতিষ্ঠানগুলো নৈতিকতার চর্চা বাড়াতে পারে। দ্বিতীয়ত, নৈতিক দায়িত্ব বাস্তবায়নের জন্য কোনো ব্যাংক একা অথবা কিছু ব্যাংক একত্রে আচরণ বিধিমালা প্রণয়ন করতে পারে। তৃতীয়ত, আইন ও আচরণবিধি প্রণয়নই যথেষ্ট নয়; নৈতিকতা চর্চা নিশ্চিত করার জন্য তাড়না থাকতে হবে। আইন ও আচরণবিধি বাস্তবায়ন করেন ব্যক্তি। কাজেই চূড়ান্ত বিচারে নৈতিক বাধ্যবাধকতা মেনে চলার মূল দায়িত্ব হলো ব্যাংক যারা চালান তাদের। কোনো একটি বিশেষ ব্যবস্থাই আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নৈতিকতা চর্চা বাড়ানোর জন্য যথেষ্ট নয়। ব্যাংক ব্যবস্থার নৈতিকতা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন করপোরেট, যৌথ ও ব্যক্তি পর্যায়ে যৌথ উদ্যোগ এবং আর্থিক লেনদেনের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা এবং স্পষ্ট অবিচার নিরসনে সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া।

ব্যাংকগুলোর আর্থিক সুস্বাস্থ্য শুধু নৈতিক দিক থেকেই নয়, অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং ব্যাংকের নিরাপত্তার বিষয়টি শুধু মালিক ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনার হাতে ছেড়ে দেয়া যায় না। বিশ্বের সব দেশেই বিস্তারিত নিয়ন্ত্রণে আর্থিক খাতে শক্তিশালী কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অন্যান্য তত্ত্বাবধায়ক সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এসব সত্ত্বেও ব্যাংকের অনিয়ম, অর্থ হাতিয়ে নেয়া, ঋণখেলাপি, যাচাই-বাছাই ছাড়া ঋণ প্রদানের মতো বিষয় বন্ধ করা যায়নি। শুধু আইন দিয়ে ব্যাংক ব্যবস্থার ঝুঁকি হ্রাস করা যায় না। যারা ব্যাংক চালাচ্ছেন, তাদের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। আর্থিক প্রতারণা ও ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, আমানত বীমা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের মান উন্নীত করার লক্ষ্যে পরিচালকদের যোগ্যতার শর্ত কঠোরতর করা এবং রাজনীতিবিদদের পরিচালক পদের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করা, ব্যাংক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য উপযুক্ত আচরণবিধি বলবৎ করা এবং ব্যাংকের গ্রাহকদের অভিযোগের ভিত্তিতে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সঠিক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন।