বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি চীন। আর বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতি। উভয় দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক সম্পর্ক বেশ ভালো। দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের তৃতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার বাংলাদেশ। দেশের অর্থনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে চীনের প্রভাব আরো দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে চীন বড় ভূমিকা রাখছে। এছাড়া বাংলাদেশের মোট আমদানির প্রায় ২০ শতাংশই আসে চীন থেকে। বিপরীতে বাংলাদেশ দেশটিতে রফতানি করে ১ শতাংশেরও কম। উভয় দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়লেও রফতানি বৃদ্ধির হার অপেক্ষাকৃত ধীর। এর কারণ হিসেবে বেইজিংয়ে বাংলাদেশের কমার্শিয়াল উইংয়ের পর্যবেক্ষণ হলো, প্রচলিত পণ্য দিয়ে চীনের বাজার দখল সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে চীনের বিনিয়োগ এবং চীন থেকে বেরিয়ে যাওয়া বিনিয়োগ আকর্ষণেও বাংলাদেশকে সচেষ্ট হতে হবে। একই সঙ্গে চীনের জনগণ ও বাজার চাহিদা বিবেচনায় রেখে সংশ্লিষ্ট পণ্য সুলভে সরবরাহের পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। চীনে রফতানি বাড়াতে গবেষণা জোরদার, পণ্যে বৈচিত্র্য আনা, নতুন পণ্য তৈরি এবং চীনের জনগণের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহে দৃষ্টি দিতে হবে। নতুন পণ্য দিয়ে বাজার ধরতে বেসরকারি খাতের পাশাপাশি সরকারকেও বড় উদ্যোগ নিতে হবে।

পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে ২০২১ সালে চীনের মোট আমদানির প্রায় ১০ শতাংশ এসেছে তাইওয়ান থেকে। এছাড়া জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, ইতালি, কানাডা ও দক্ষিণ আফ্রিকা চীনের অন্যতম রফতানিকারক দেশ। চীনের প্রধান আমদানি পণ্যের মধ্যে ইলেকট্রনিক সার্কিট, ক্রুড অয়েল, মোটর কার, ফোন সিস্টেম ডিভাইসসহ প্রযুক্তি পণ্যের সংখ্যাই বেশি। এগুলোর কোনোটিই বাংলাদেশের পক্ষে বর্তমানে বা নিকট ভবিষ্যতে সরবরাহ করা সম্ভব নয়। তবে আশার কথা হলো, চীন পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে ও ইউরোপ থেকে কৃষিপণ্য ও ফল আমদানি করে থাকে। বাংলাদেশ এ বাজারে প্রবেশ করতে পারে। এছাড়া নতুন বাজারও তৈরি করে নিতে পারে। বাংলাদেশের কিছু কৃষি ও কৃষিজাত পণ্যের বেশ চাহিদা রয়েছে চীনে। এক্ষেত্রে যথাযথ স্যানিটেশন মান রক্ষা করা প্রয়োজন। চলতি বছরের শুরুতে ১৮ প্রকার খাদ্যপণ্য রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের অনলাইনে চীনা কাস্টমসের রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করেছে। বৈশ্বিক মহামারীর কারণে খাদ্যপণ্য আমদানির ক্ষেত্রে অধিক কড়াকড়ি এবং সতর্কতা অবলম্বন করছে। বিশেষ করে হিমায়িত খাদ্যপণ্য আমদানির ক্ষেতে এ প্রবণতা বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাংলাদেশকে তাই সতর্কতার সঙ্গে চীনে রফতানি পণ্য বাছাই করতে হবে। পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানির সম্ভাবনা রয়েছে।

চীনে বাংলাদেশের রফতানির মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, জীবন্ত মাছ, কাঁকড়া-কুঁচে, মসলা, সবজি, তামাক, রাসায়নিক বস্তুসহ প্রায় ৪০০ ধরনের পণ্য। বাংলাদেশের তুলনামূলক সুবিধা ‘তৈরি পোশাক’ খাতে রয়েছে। ফলে চীনের বাজার বিশ্লেষণ করে এ বাজারে পোশাক রফতানির হিসসা বাড়ানোর প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি দেশে কৃষিজাত পণ্যের রফতানি বৃদ্ধিতেও বিশেষ নজর দেয়া প্রয়োজন। সস্তা শ্রম ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি পোশাকের বাজার ধরতে বাংলাদেশকে সহায়তা করেছে। ঠিক একইভাবে চীনের বাজার অধিকারে আরো গবেষণা প্রয়োজন। যেসব পণ্য চীন আমদানি করে যেসবের তালিকা তৈরি এবং সরবরাহকারী দেশের চেয়ে কম দামে সে পণ্য উৎপাদনে বাংলাদেশের তুলনামূলক সুবিধা আছে কিনা, তা যাচাই করা জরুরি। চীন যেসব পণ্য আমদানি করে সেসব সরবরাহে তুলনামূলক সুবিধা থাকলেই বাংলাদেশ বিনিয়োগে যেতে পারে।

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য ব্যবধান বিপুল। এ ব্যবধান কমাতে হলে বেশ খানিকটা পরিশ্রম করতে হবে। বিপুল জনসংখ্যার দেশ চীন। সেই বিবেচনায় বাজারও অনেক বড়। বিগত বছরে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে লক্ষণীয় মাত্রায় ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে দেশটির জনগণের। ঘোষিত শুল্কমুক্ত সুবিধা ব্যবহার করে দেশটিতে রফতানি বাড়ানো গেলে তা বাংলাদেশের জন্য বিরাট সুফল বয়ে আনবে। সম্ভাবনাময় এ বাজার কাজে লাগানো গেলে সংশ্লিষ্ট পণ্যগুলোর রফতানি যেমন বাড়বে, তেমনি বিরাজমান বাণিজ্যবৈষম্যও অনেকটা কমে আসবে। অধুনা শিল্পনীতিতে চীন তার শিল্পসংক্রান্ত পরিপালন অনেক কঠোর করেছে। ফলে সেখানে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। এছাড়া দেশটি শিল্প খাতকে ধীরে ধীরে হালকা থেকে ভারী শিল্পের দিকে রূপান্তরে মনোযোগ দিয়েছে। এখন দেশটি সস্তা পণ্যের চেয়ে ব্যয়বহুল পণ্য উৎপাদনে আগ্রহী বেশি। এতে শ্রমব্যয় ও মূলধনি যন্ত্রপাতির ব্যয়ও বাড়ছে। এজন্য তারা অন্য দেশে কারখানা স্থানান্তরের পরিকল্পনা করছে এবং যারা বেশি সুযোগ দিচ্ছে, সেখানে বিনিয়োগের সুবিধা গ্রহণ করছে। বিশেষ করে যেসব দেশে শ্রমব্যয় কম, সেসব দেশকে এক্ষেত্রে তারা প্রাধিকার দিচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণেও তত্পর একটি দেশ। বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকার অভৌত ও ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নে অব্যাহতভাবে মনোযোগী। সেদিক থেকে বাংলাদেশ চীনা বিনিয়োগের একটি লাভজনক গন্তব্য হতে পারে। এখানে কারখানা স্থাপন বা বিনিয়োগ করলে তারা যেমন সস্তা শ্রমের সুবিধা পাবেন, তেমনি শূন্য শুল্কের সুবিধার অধীনে আবার এখানকার উৎপাদিত পণ্য দেশটি আমদানিও করতে পারবে। এতে পরোক্ষভাবে দেশটিও লাভবান হবে। একইভাবে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বাড়লে শিল্প-কারখানায় একদিকে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সম্মিলন ঘটবে, অন্যদিকে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

চীনে পণ্য রফতানি বাড়াতে প্রয়োজনে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে বিশেষজ্ঞ কমিটিও গঠন করা যেতে পারে। চীনে কী ধরনের পণ্যের চাহিদা রয়েছে বা বাংলাদেশ তাদের চাহিদা কীভাবে মেটাতে পারে তা অনুসন্ধান এবং দেশটির আমদানি প্রটোকল মেনে পণ্য রফতানির উদ্যোগ নিতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপে পণ্য রফতানিতে আমাদের যে সমস্যা ছিল বৈচিত্র্যকরণ ও মূল্য সংযোজনের অভাব, তা চীনে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রেও সত্য। ভুলে গেলে চলবে না, আমরা এমন এক দেশে পণ্য রফতানি করতে চাইছি, যারা অধিকাংশ পণ্য নিজেরাই তৈরি করে এবং সেখানে একই পণ্য বিভিন্ন মানে ও দামেও পাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে স্বল্পমূল্যে মানসম্পন্ন পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে সবার আগে। চীনের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প হিসেবেও বাংলাদেশ কাজ করতে পারে কিনা তা খতিয়ে দেখা যেতে পারে। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রপথে বাণিজ্যের সুবিধা কাজে লাগিয়ে স্বল্প ব্যয়ে পণ্য রফতানি করা যেতে পারে। চীন থেকে পণ্য নিয়ে আসা জাহাজে করে পণ্য রফতানি করা গেলে ব্যয়ও কমে আসবে। অন্যান্য দেশের হয়তো এ সুবিধা নেই। সস্তা শ্রমকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে চীনের বাজারে সুলভে তাদের জনগণের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য পাঠানো যায়, তা খতিয়ে দেখতে হবে।

চীনকে সারা বিশ্বের ফ্যাক্টরি বলা হয়। চীনে উৎপাদিত পণ্যের মানের বিচারে দাম অতুলনীয়ভাবে কম; ফলে সেখানে উৎপাদিত পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা খুবই চ্যালেঞ্জিং। বাংলাদেশের রফতানিযোগ্য অনেক পণ্যই চীনে উৎপাদন হয়। চীন ফুটওয়্যার, তৈরি পোশাকসহ অজস্র পণ্যের শীর্ষস্থানীয় রফতানিকারক দেশ। বাংলাদেশের অনেক রফতানি পণ্য এখন পর্যন্ত চীন তৈরি করে। তাই যতক্ষণ সেসব পণ্য তৈরিতে চীনের বিদ্যমান প্রাইস কম্পিটিটিভনেস বহাল থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত বাংলাদেশসহ অনেক উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে চীনের বাজারে সুবিধা করা কঠিন। এক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের যেমন ইনোভেশন দরকার তেমনি সরকারকেও উদ্যোগ নিতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে সহায়তার।

চীনের বাজার বড় হলেও প্রতিযোগিতামূলক। স্থানীয় উৎপাদক/ সরবরাহকারীদের সঙ্গে ভালো মানের বিদেশী কোম্পানিগুলোই সেখানে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে। তবে ভোক্তার আচারণ বিশ্লেষণ করে বলা হচ্ছে দেশটির অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে জনগণের চাহিদায়ও পরিবর্তন আসছে। বর্তমানে চীনের বাজারে রফতানি বাড়াতে মানসম্মত পণ্য রফতানিতে জোর দিতে হবে। মানসম্মত ও উন্নত প্যাকেটজাত পণ্য ছাড়া চীনের বাজারে সাধারণ মানের পণ্য দিয়ে কোনোভাবেই বাজার দখল করা সম্ভব নয়। চীনের বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের বাজার সৃষ্টির জন্য বাংলাদেশের ভালো ব্র্যান্ডের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি পণ্য অনলাইন প্লাটফর্ম ব্যবহার করে ভোক্তাদের কাছে জনপ্রিয় করার সুযোগ নেয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে চীনে বাংলাদেশের দুতাবাসের বাণিজ্যিক উইংকে আরো শক্তিশালী করে তুলতে হবে।