উন্নয়নের প্রতীক হিসেবেই সারা বিশ্বে রেলকে বিবেচনা করা হয়। যে দেশ যত উন্নত, তার রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনা তত উন্নত। সরকারও চেষ্টা করছে দেশের যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নত করতে। ২০১১ সালে পৃথক রেলপথ মন্ত্রণালয় গঠন এবং প্রতি বছর এর উন্নয়নে বিপুল বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। তবে এর অধিকাংশই অবকাঠামোগত প্রকল্প। কিন্তু এসব পদক্ষেপে রেলসেবার মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে উন্নীত হতে পারেনি। কারণ ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা। রেলওয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ধর্মঘটে প্রায়ই শিডিউল বিপর্যয় দেখা দিচ্ছে। সম্প্রতি ট্রেনচালক, সহকারী গার্ড ও টিকিট চেকারদের ধর্মঘটে টানা ৮ ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। এবারই প্রথম নয়, গত বছরেও এমন ধর্মঘটে রেলের শিডিউল বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। রেলের অনলাইন টিকিট বিক্রি নিয়েও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে যাত্রীদের। নতুন কোম্পানির কাছে অনলাইন টিকিট ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেয়া হলে জটিলতা আরো বেড়ে ওঠে। টিকিট কালোবাজারি, জনবলের সংকট, শিডিউল বিপর্যয়, পাথর নিক্ষেপে আহত, দুর্ঘটনা ইত্যাদি সমস্যা তো রয়েছেই। একের পর এক জটিলতায় রেলের গতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা দুঃখজনক। প্রয়োজন সুষ্ঠু পরিকল্পনার আলোকে রেলের উন্নয়ন ও এর ব্যবস্থাপনা উন্নত করে তোলা।

রেলকে সেবামূলক খাত বলা হলেও সেবা বাড়েনি। বরং ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়, জনবল সংকট, বারবার রেল দুর্ঘটনা, টিকিট কালোবাজারি, প্রকল্পে ধীরগতি এবং নানা ধরনের দুর্নীতি, রেলের বগি অপরিষ্কার, বাথরুমে পানি-আলো না থাকা, ট্রেনের সিট ভাঙা, বিনা টিকিটের যাত্রীদের দৌরাত্ম্য ইত্যাদি কারণে কাঙ্ক্ষিত সেবার মান বাড়ছে না। রেলে গত কয়েক বছরে যে পরিমাণ বিনিয়োগ ও প্রকল্প নেয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়নের মতো দক্ষ কর্মকর্তার অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে, যাত্রী সুবিধা বা আয়বর্ধক প্রকল্প না নিয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ কেনাকাটার প্রকল্প নেয়া। প্রকল্প নেয়ার ক্ষেত্রে পরিকল্পনার যে অভাব রয়েছে তা রেলওয়ের যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের চিত্র থেকেই স্পষ্ট। অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ কাজে মনোযোগ দেয়ায় গুরুত্ব হারাচ্ছে প্রধান কাজগুলো। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল আধুনিক ও মানসম্পন্ন সেবা নিশ্চিতে ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে পদক্ষেপ নেয়া। তা না করে গৌণ কাজে বেশি অর্থ ও সময় ব্যয় করা হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। বিপুল বিনিয়োগ সত্ত্বেও সেবার মানে উন্নতি না হওয়ার পেছনে এটিও একটি কারণ। রেলওয়েতে বিগত সময়ে বিনিয়োগ বাড়লেও তা সুপরিকল্পিত হয়নি। কেননা রেলপথে যাত্রী বাড়ানো, আয় বাড়ানো ও লাভজনক করা—এ তিন বিবেচনা প্রকল্পগুলোয় গুরুত্ব পায়নি। এ অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। অবকাঠামোগত উন্নয়নে অর্থ ব্যয়ের আগে উচিত সুষ্ঠু পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং প্রতিষ্ঠান হিসেবে সামর্থ্য বাড়াতে সচেষ্ট হওয়া। কর্তৃপক্ষকে অবকাঠামোগত উন্নয়নে জোর দেয়ার নীতি বদলাতে হবে। সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণ, দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার ওপরই রেলকে সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে।

ভারতেও একসময় রেলের অবস্থা খারাপ ছিল। ২০০৪ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে ভারতীয় রেলওয়ে ঘুরে দাঁড়ায়। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর প্রস্তাব অগ্রাহ্য করে দেশটি রেল যাত্রীভাড়া কমায়। প্রস্তাবিত কর্মচ্যুতির বদলে ২০ হাজার মানুষকে কর্মে নিয়োজন করে। কারখানা বেসরকারীকরণের বিপরীতে ডিজেল ও ইলেকট্রনিক ইঞ্জিন, চাকা, যাত্রীবাহী কোচ তৈরির সক্ষমতা বাড়ানোর পদক্ষেপ নেয়া হয়। নতুন কারখানা নির্মাণের পাশাপাশি রুগ্ণ কারখানা অধিগ্রহণ করা হয়। পণ্য পরিবহনের উন্নয়ন ঘটিয়ে রেলের আয় বাড়ানো হয় কয়েক গুণ। এটি সম্ভব হয়েছে সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের মাধ্যমে। ভারতের অভিজ্ঞতা অনুসরণ করে বাংলাদেশের রেল ব্যবস্থাপনাও ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। মনোযোগ দিতে হবে যাত্রীসেবার মান উন্নয়নে। একই সঙ্গে পণ্য পরিবহনে ব্যবসায়ীদের আকৃষ্ট করতে রেলে আধুনিক সুবিধাসংবলিত পণ্যবাহী কোচের সংযোজন ঘটাতে হবে। রেলওয়ের পর্যাপ্ত ভূসম্পত্তি থাকলেও তা রেল বিভাগের হাতছাড়া হয়েছে অনেক আগেই, যা দখলদাররা দখল করে রাখছে। বর্তমান সরকারের চিন্তা ও চেতনা যেহেতু রেলওয়ের উন্নয়নের দিকে, সেক্ষেত্রে বিশাল ভূসম্পত্তির মালিক রেলওয়ে বিভাগের সব সম্পত্তি দখলদারমুক্ত করে, এসব জায়গায় বহুতল ভবন নির্মাণ করে মার্কেট, আবাসিক ভবন, ব্যাংক ও বীমা এবং বেসরকারি অফিস-আদালতের জন্য ভাড়া দেয়া যায়। রাষ্ট্রীয় কোষাগারে এখান থেকে যে আয় আসবে তা দিয়ে গোটা সংস্থার ব্যয় নির্বাহ সম্ভব বলে অনেকেই মনে করেন।

ভারতে শুরু থেকে রেল ব্যবস্থাকে যতখানি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে এটি গড়ে তোলা হয়েছে, বাংলাদেশ তা করেনি। এটা বুঝতে হবে সড়কের ওপর চাপ কমানোর কোনো বিকল্প নেই। সেটা যদি করতেই হয় তাহলে রেলের পরিধি বৃদ্ধি ও ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে। চাহিদা অনুযায়ী রেল ব্যবসায় বিনিয়োগ এখন যথার্থই লাভজনক। যদি দুর্নীতি না থাকে তাহলে লোকসানের মুখ দেখার কোনো কারণ নেই। রেলওয়েতে যে টাকা ব্যয় করা হয়, তার পুরোটাই আসে জনগণের কর থেকে। তাই এর যথাযথ ব্যবহার জনগণ প্রত্যাশা করে এবং এ অধিকারও জনগণের আছে। আমরা চাইব নতুন নতুন প্রকল্প যেন উদ্বোধনের মাঝেই বিলীন হয়ে না যায়। উন্নত প্রযুক্তি আর অবকাঠামো, দ্রুতগতির ট্রেন, কঠোর সময়ানুবর্তিতার মতো বিষয়গুলোয় জোর দিয়ে উন্নত দেশগুলো যেখানে তাদের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার খোলনলচে বদলে দিচ্ছে, সেখানে এখনো পুরনো অবকাঠামোগুলোই ঠিকমতো ধরে রাখতে পারছে না বাংলাদেশ রেলওয়ে। সংস্কারের অভাবে দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে রেলপথ। জনবলের অভাবে বন্ধ থাকছে স্টেশন। যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়াই নতুন নতুন ট্রেন নামিয়ে বাড়ানো হচ্ছে শিডিউল বিপর্যয়। রেলপথ, রোলিংস্টক, সিগন্যাল ব্যবস্থা, জনবল, ট্রেন পরিচালনা ব্যবস্থা, যাত্রীসেবায় বছরের পর বছর ধরে কেবল লোকসানই গুনে যাচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়ে, যা কাম্য নয়।

কোনো পদক্ষেপের পেছনে যদি সুষ্ঠু পরিকল্পনা না থাকে তাহলে তাতে অর্থেরই কেবল অপচয় হয় না, এর সুফলও পায় না জনগণ। বাংলাদেশ রেলওয়ের হয়েছে সেই দশা। গত এক যুগে নতুন রেলপথ ও স্টেশন ভবন নির্মাণ, সিগন্যালিং ব্যবস্থার আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করেছে সরকার। দুঃখজনকভাবে এত বিনিয়োগ সত্ত্বেও যাত্রীসেবার মান বাড়েনি। শিডিউল বিপর্যয়, দুর্ঘটনা, অবকাঠামোগত দুর্বলতার বিষয়গুলো কাটিয়ে উঠতে পারেনি সংস্থাটি। এর অর্থ হচ্ছে, যে লক্ষ্য নিয়ে বিনিয়োগ করা হয়েছে, তা অর্জিত হয়নি। মূলত সমন্বয়হীনতা ও অব্যবস্থাপনার কারণেই রেলওয়ের জটিলতা পিছু ছাড়ছে না। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় প্রকল্পের চেয়ে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণের কারণেই যাত্রীসেবার মান বাড়ছে না। বেশির ভাগ প্রকল্প নেয়া হচ্ছে রাজনৈতিক বিবেচনায়। কোন কাজটি আগে করতে হবে, কোনটি পরে তা সঠিকভাবে নির্ধারণ করা হচ্ছে না। বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে গণপরিবহনের সবচেয়ে সুবিধাজনক ও কার্যকর মাধ্যম হতে পারত রেল পরিবহন, কিন্তু তা হয়নি। সমস্যাগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করে সমাধানের কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয় না; যা কিছু চেষ্টা করা হয়, তাও ফলপ্রসূ হয় না। এ অবস্থার উত্তরণে রেলওয়ের উচিত যাত্রীসেবার মান বাড়ানোর বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেয়া। রেল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে সবার আগে। সরকারকে খুঁজে দেখতে হবে তারা কী লক্ষ্য অর্জনে রেলে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। সেই লক্ষ্য কি অর্জিত হয়েছে? হলে কতটা তাও মূল্যায়ন করতে হবে।