বাংলাদেশ তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে উচ্চমূল্যে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানি শুরু করেছে। দেশীয় গ্যাস না পেলে এলএনজির ওপর নির্ভরশীলতা আরো বাড়বে। ফলে ভোক্তা পর্যায়ে গ্যাসের মূল্য বাড়বে, কেবল তা-ই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়বে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বিশেষজ্ঞরা স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে জোর দিতে বলছেন। এক্ষেত্রে ভোলার শাহবাজপুরে আবিষ্কৃত গ্যাসের মজুদ থেকে উত্তোলনের পরামর্শও দিচ্ছেন অনেকে। কিন্তু পাইপলাইন নাকি এলএনজিতে রূপান্তরপূর্বক এ গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ করা হবে—এমন সিদ্ধান্তহীনতায় আড়াই দশকেরও বেশি সময় ধরে অব্যবহূত থাকছে ভোলার গ্যাস। এর মূল্য দিতে হচ্ছে। আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ছে পুরো জ্বালানি খাত। এটি একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল। এমন অবস্থায় ভোলার গ্যাস দ্রুত উত্তোলন এবং তা ব্যবহারের কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

বর্তমান পর্যায়ে দেশে প্রমাণিত ও উত্তোলনযোগ্য গ্যাস মজুদের পরিমাণ কমে এসেছে। উপরন্তু, উৎপাদনরত গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে প্রতিদিন যে পরিমাণ গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে, তা দিয়ে দেশের প্রতিদিনের গড় চাহিদার দুই-তৃতীয়াংশও মেটানো যাচ্ছে না। ফলে গ্যাসের ঘাটতি মেটানোর জন্য এখন ক্রমবর্ধমান হারে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বে এলএনজির দামে প্রচণ্ড উল্লম্ফন ঘটে চলেছে, যার পরিপ্রেক্ষিতে এলএনজি আমদানির ব্যয়ভার এখন দেশের আমদানি বিলে ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করছে। গত দুই বছরে এলএনজির দাম বেড়েছে পাঁচ গুণেরও বেশি। ফলে এখন দেশের গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনেকগুলো বন্ধ রাখতে হচ্ছে, দেশের শিল্প খাতেও গ্যাস সরবরাহ কাটছাঁট করতে হচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে স্থানীয় পর্যায়ে আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্রগুলো ব্যবহার না করে ফেলে রাখা মোটেই সুবিবেচনাপ্রসূত নয়। ধারণা করা হচ্ছে, ভোলায় আবিষ্কার করা প্রাকৃতিক গ্যাস অতি উচ্চমানের। এর ভিত্তি হলো দেশের মোট বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রের মধ্যে যে কয়েকটি উপকূলের অদূরে, সেখানকার গ্যাসের বলতে গেলে পুরোটাই মিথেন ও সালফারযুক্ত। অধিকাংশ ক্ষেত্রের গ্যাসই শুকনো এবং উচ্চমান ও মাত্রার হাইড্রোকার্বনসমৃদ্ধ। দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলোর গ্যাস ভূভাগের জৈব পদার্থ থেকে উত্পন্ন বিধায় এর দাহ্য ক্ষমতা বেশি এবং ক্ষতিকর উপাদানের মাত্রা কম। আশা করা যায়, ভোলার গ্যাস এই ইতিবাচক গুণাবলির বাইরে যাবে না। গ্যাস অনেক থাকলে তরল ঘনীভবনের মাধ্যমে সিলিন্ডারজাত করার বিষয়টি উড়িয়ে দেয়া যায় না। পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে এটি যোগ করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে কস্ট বেনিফিট হিসাব করা প্রয়োজন। তবে সেটি পরের কথা। এখনকার বাস্তবতা হলো কূপগুলোর খননকাজ সন্তোষজনকভাবে এগিয়ে নেয়া এবং গ্যাসপ্রাপ্তি সাপেক্ষে তা উত্তোলনের প্রযুক্তিগত কার্যকৌশল বাস্তবায়ন করা। একটি কূপ খনন খুব সহজ কাজ নয়। এর চেয়েও বেশি কঠিন কাজটি হলো ভূতলের সেই গ্যাস পাইপলাইন বসিয়ে ওপরে উঠিয়ে নিয়ে আসা এবং সংগ্রহযোগ্য ডিপোয় ধারণ করা। গ্যাস তোলার কাজেও একটা বড় ধরনের ‘সিস্টেম লসের’ ব্যাপার থাকে। এই অনিবার্য অপচয় প্রশমনের মধ্যে নিহিত রয়েছে প্রকৌশলী ও ভূতত্ত্ববিদদের পটুত্ব বা মুনশিয়ানা। গত ১৫ বছরে দেশে গ্যাসের চাহিদা যে পরিমাণে বেড়েছে (বা বলা চলে বেড়ে চলেছে), তাতে দেখা যাচ্ছে দেশে মজুদ গ্যাস তোলা এবং নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে সাফল্যের মধ্যে বিস্তর ফারাক। কাজেই নতুন ক্ষেত্র খুঁজে বের করা এবং মজুদ চিহ্নিতকরণের অগ্রগতি নগণ্য মাত্রার। প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ন্যূনতম ভারসাম্য আনতে হলেও গ্যাস অনুসন্ধানের প্রকরণ ও পদ্ধতির সনাতন ধারা থেকে বেরিয়ে এসে আরো কার্যকর, টেকসই ও আধুনিক পথ ধরতে হবে।

পাইপলাইন অথবা এলএনজিতে রূপান্তর করে কী প্রক্রিয়ায় ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা যায়, সে বিষয়ে কাজ করতে পেট্রোবাংলাকে বলা হয়েছে। বিষয়টি প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও বলা হয়েছে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে। জ্বালানি বিভাগ বলছে, বিশাল নদী পেরিয়ে পাইপলাইন স্থাপনের মাধ্যমে ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা কঠিন ও ব্যয়বহুল হলেও তার উপায় খুঁজছে কর্তৃপক্ষ। পেট্রোবাংলার তথ্যানুযায়ী, ভোলায় প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ঘনফুট বা টিসিএফ গ্যাস আছে। এছাড়া বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স) ধারণা করছে ভোলায় আরো গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ১৯৯৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনোকল অয়েল কোম্পানি ভোলার গ্যাসের অতি উজ্জ্বল সম্ভাবনার আলোকে বাংলাদেশ সরকারের কাছে এ গ্যাসকে অবলম্বন করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য গ্যাস ও বিদ্যুৎ উন্নয়নের একটি দীর্ঘমেয়াদি সামগ্রিক প্রস্তাব পেশ করে, যা ওয়েস্টার্ন রিজিওনাল ইন্টিগ্রেটেড প্রজেক্ট নামে পরিচিত। কিন্তু সে সময় দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র বিদেশী কোম্পানিকে দেয়ার বিষয়ে জনগণের নেতিবাচক অবস্থানের কারণে সে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়নি। ভূতত্ত্ববিদরা বলছেন, ভোলার এ নজরকাড়ার ক্ষমতা ভূবিজ্ঞানের সূত্রমতেই হয়েছে। তাদের মতে, কেবল ভোলা দ্বীপের মূল ভূখণ্ডই নয়, বরং এর পার্শ্ববর্তী দ্বীপগুলো ও সাগরের অংশজুড়ে একটি গ্যাসবলয় থাকার সম্ভাবনা উজ্জ্বল। আর সেক্ষেত্রে জোরালো অনুসন্ধান কাজ ভোলাকে সিলেটে বেসিনের মতো অন্য একটি গ্যাসসমৃদ্ধ বেসিন হিসেবে উন্মোচন করতে পারে। আর এজন্য প্রয়োজন সরকারি তথা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উদার পৃষ্ঠপোষকতা।  বিদেশী কোম্পানি নয়, বরং দেশীয় সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে ভোলা দ্বীপের উজ্জ্বল গ্যাস সম্ভাবনা বাস্তবায়নে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

আমদানীকৃত এলএনজির দাম হবে গ্যাসের বর্তমান মূল্যের কয়েক গুণ। ফলে আমদানীকৃত এলএনজির ব্যবহারে পণ্যের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি নিয়ে উদ্যোক্তাদের উদ্বেগ বেড়েই চলেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বাড়লে তা দেশের অর্থনীতিতে কী সমস্যা সৃষ্টি করবে তা এখনই বিবেচনায় রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বাড়ার লক্ষণগুলো স্পষ্ট। আশঙ্কা করা হচ্ছে, আমদানীকৃত এলএনজি ব্যবহার করে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অনেক শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। এতে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বেন। শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের স্বার্থে আমদানীকৃত এলএনজির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে দেশের তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের ওপর জোর দেয়া উচিত। এক্ষেত্রে ভোলায় বিদ্যমান গ্যাস উত্তোলন এবং তা সদ্ব্যবহারে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। ভোলায় আবিষ্কৃত গ্যাস এলএনজিতে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের আগে সেখানে কত গ্যাস মজুদ আছে, সেটা পরিষ্কার হওয়া দরকার। মজুদ গ্যাসের মূল্য নির্ধারণের বিষয়টিও ভাবনায় রাখা দরকার। একটি এলএনজি প্রসেসিং প্লান্ট স্থাপনে কত খরচ পড়বে, যে পরিমাণ গ্যাস আছে তা উত্তোলন করে এলএনজি প্রসেসিং করে আবার সেটা জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা বাণিজ্যিকভাবে কতটা সফল হবে, বিবেচনায় রাখা দরকার সেগুলোও। পাইপলাইন স্থাপনের মাধ্যমে ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা বা পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে নেয়া কতটা সাশ্রয়ী তাও পর্যালোচনা প্রয়োজন।