গ্যাস সরবরাহ ঠিক রাখতে স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি করছে পেট্রোবাংলা। কিন্তু এজন্য প্রয়োজন অনুসারে অর্থ পাচ্ছে না সংস্থাটি। এ প্রেক্ষাপটে গ্যাস উন্নয়ন তহবিল (জিডিএফ) থেকে ঋণ গ্রহণের অনুমোদন চেয়ে অর্থ বিভাগে প্রস্তাব পাঠানো হয়। সম্প্রতি আলোচ্য প্রস্তাবের ভিত্তিতে সংস্থাটিকে তহবিলের ৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ হিসেবে ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে অর্থ বিভাগ। জিডিএফের অর্থ দেশের খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান, উন্নয়নকাজ তথা দেশীয় জ্বালানি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ব্যবহারের কথা। এ অর্থ দিয়ে এলএনজি বা অন্য কোনো জ্বালানি পণ্য আমদানির কোনো প্রবিধান নেই সংশ্লিষ্ট বিধিমালায়। অথচ নিয়মবহির্ভূতভাবে এলএনজি কিনতে আলোচ্য তহবিল থেকে ঋণ অনুমোদন দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন অদূরদর্শী পরিকল্পনা ও অত্যধিক আমদানিনির্ভরতায় আমাদের জ্বালানি খাতের অবস্থা বর্তমানে খুব একটা ভালো নয়; জাতীয় সক্ষমতা বাড়েনি কাঙ্ক্ষিত হারে। আলোচ্য পদক্ষেপে এ খাতের পরিস্থিতি আরো নাজুক হবে।

আগে জ্বালানি খাতের উন্নয়নে দাতা সংস্থা ও সরকারের বার্ষিক বাজেট থেকে বরাদ্দ রাখা হতো। এতে দেখা যেত তেল-গ্যাস অনুসন্ধান এবং উত্তোলনে প্রয়োজনীয় অর্থ মিলত না। এতে বছরের পর বছর উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থের জন্য অপেক্ষা করতে হতো। এ সংকট সমাধানে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ জোরদার করতে ২০০৯ সালে গঠন করা হয় গ্যাস উন্নয়ন তহবিল। এ তহবিলের টাকা খরচ করার জন্য ২০১২ সালে প্রণীত হয় গ্যাস উন্নয়ন তহবিল নীতিমালা। ১০ বছরের জন্য জারি করা নীতিমালাটির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন করে আরো ১০ বছর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। এর পেছনে মূল উদ্দেশ্য দেশীয় গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি, তেল-গ্যাসের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা, সর্বোপরি জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা হ্রাস। এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে তহবিলের অর্থ যথাযথভাবে খরচ করা প্রয়োজন। কিন্তু আমরা দেখছি পেট্রোবাংলা এ তহবিলের অর্থ ভিন্ন খাতে ব্যবহার করছে। শুধু সাম্প্রতিক পদক্ষেপ নয়। এর আগেও সংস্থাটি এ তহবিল থেকে অর্থ নিয়ে বিভিন্ন প্রকল্পে খরচ করেছে। এটা সমীচীন নয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে আলোচ্য তহবিলের আসল উদ্দেশ্যই ভেস্তে যাচ্ছে।

নীতিমালার অনুপস্থিতিতে প্রথম তিন বছরে তহবিলের টাকা ব্যবহার করা যায়নি। এরপর এ তহবিলের টাকায় অনেক প্রকল্প নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে বিদেশী কোম্পানি গ্যাজপ্রমকে দিয়ে কূপ খননের জন্যও এ তহবিলের টাকা ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ গ্রাহক তহবিলের টাকা শুধু দেশীয় কোম্পানির প্রকল্পে ব্যবহার করার কথা ছিল, যা স্পষ্টত বিধিমালার লঙ্ঘন। পরিসংখ্যান বলছে, গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের অর্থে এখন পর্যন্ত ৩৯টি প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। এর মধ্যে ২৫টি প্রকল্প শেষ হয়েছে। প্রকল্পগুলো মূলত বাপেক্স, বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানি (বিজিএফসিএল) ও সিলেট গ্যাস ফিল্ড কোম্পানির (এসজিএফসি)। দেখা যাচ্ছে, এ তহবিলের অর্থে গ্যাস খাতের নানা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে ঠিকই কিন্তু ফেরত দেয়ার ব্যাপারে কোনো প্রতিষ্ঠানের তেমন আগ্রহ নেই। অথচ নীতিমালা অনুযায়ী অর্থ ফেরত দেয়ার কথা। এমনকি প্রকল্প বাস্তবায়ন করে লাভ করা শুরু হলেও টাকা ফেরতের উদ্যোগ নেই কোম্পানিগুলোর। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) অর্থ ফেরত দিতে তাদের নির্দেশ দিয়েছে। বারবার তাগাদা দেয়া হচ্ছে। অর্থ ফেরত দিতে প্রতিষ্ঠানগুলোর তত্পরতা নেই। সন্দেহ নেই, প্রকল্পের জন্য অর্থ নিয়ে তা ফেরত না দিলে তহবিল শূন্য হয়ে যাবে। নিজস্ব অর্থে নিজস্ব প্রকল্প বাস্তবায়নের যে উদ্দেশ্যে এ তহবিল গঠন, এটি তখন আর বাস্তবায়ন হবে না। তাই লাভজনক প্রকল্প থেকে অর্থ ফেরত আনার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে বিইআরসির আরো সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোম্পানিগুলোরও আরো দায়িত্বশীলতা জরুরি।

প্রত্যেক মাসে গ্রাহক যে গ্যাস বিল দেন, সেখান থেকে একটা অংশ জমা রাখা হয়। জমা রাখার অংশ বাড়তি নেয়া হয়। আইন অনুযায়ী এ অর্থ গ্যাস অনুসন্ধান ও উন্নয়নে খরচ করার কথা। অথচ ভিন্নভাবে খরচ করা হচ্ছে। এর আগেও আমরা দেখেছি নিজেদের আয়ের উদ্বৃত্ত হিসেবে এ তহবিল থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা করে দিয়েছে পেট্রোবাংলা। এটি ফেরত দিতে চার দফায় পেট্রোবাংলাকে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। অনেক জটিলতার পর এর একটা সুরাহা হয়। এবার এলএনজি কিনতে সংস্থাটির জন্য আবার ৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন দেয়া হয়েছে। বারবার একই ধরনের আচরণের কারণে জ্বালানি খাতের সক্ষমতা উন্নয়ন আরো বাধাগ্রস্ত হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নীতিমালার বাইরে খরচ করা তহবিল তছরুপের মধ্যে পড়ে। গ্রাহকের তহবিল জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলা অন্য উদ্দেশ্যে খরচ করছে। কখনো এ তহবিলের টাকা খরচ করে বিদেশী কোম্পানিকে দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে। কখনো উদ্বৃত্ত দেখিয়ে সরকারি কোষাগারে জমা দেয়া হচ্ছে। আবার কখনো বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরত না দেয়ার ঘটনা ঘটছে। ফলে সংকটে পড়ছে খোদ তহবিলটিই। 

দেশে প্রধান জ্বালানি প্রাকৃতিক গ্যাস। এটি বাণিজ্যিক জ্বালানির প্রায় ৭৩ শতাংশ। দিন দিন দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে। ক্রমবর্ধমান চাহিদার বিপরীতে সরবরাহের ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে দেশে গ্যাস উৎপাদনরত আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর (আইওসি) ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে দেশীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠানগুলোর জ্বালানি খাতের সক্ষমতা বাড়াতেই গঠন করা হয় জিডিএফ। কিন্তু বিধিমালার বাইরে গিয়ে অব্যাহতভাবে এ তহবিল ব্যবহার করা হচ্ছে, এখান থেকে এলএনজি কিনতে ঋণ অনুমোদন দেয়ার বিষয়টি তারই আরেকটা নজির। এ ধরনের অনিয়মগুলো বন্ধ করতে হবে। জ্বালানি খাতের উন্নয়নের স্বার্থেই এটি প্রয়োজন।