গ্রাম
থেকে নাজমা জীবিকার সন্ধানে ঢাকা শহরে আসেন। এখানে শহরে আসার পরে জীবনধারণের উপায়
হিসেবে অন্য কোনো কাজ খুঁজে না পেয়ে তিনি মাসে ৬ হাজার টাকা বেতনে গৃহকর্মী হিসেবে
কাজ করতে শুরু করেন। এই সীমিত অর্থ দিয়ে তিনি শহরে নিজের এবং গ্রামে তার ওপর
নির্ভরশীল ছেলেমেয়ে ও বৃদ্ধ মায়ের ভরণপোষণ করেন। কিন্তু ১৮ মাস ধরে তিনি গ্রামে
নিয়মিত টাকা পাঠাতে পারেননি। কেননা করোনা মহামারীর কারণে বিশ্বের ৮০ শতাংশ
গৃহকর্মীর মতো তিনিও কাজ হারিয়েছেন। কাজ হারানোর পরে নাজমা নানাভাবে টিকে থাকতে
চেষ্টা করেছেন।
দফায়
দফায় দীর্ঘদিনের সাধারণ ছুটি ও লকডাউন নাজমার মতো দেশের প্রায় ২০ লাখ গৃহকর্মীর
জীবনকে প্রভাবিত করেছে। প্রথম আঘাত আসে তাদের জীবিকার ওপর। অধিকাংশ গৃহকর্মী
আকস্মিকভাবে তাদের কাজ হারান। অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তার কাছ থেকে বকেয়া বেতন বা
আপত্কালীন সহযোগিতাও তারা পাননি। আবার যেসব গৃহকর্মী কাজ হারাননি, তাদেরকেও দীর্ঘদিন বিনা বেতনে অপেক্ষা করিয়ে রাখা হয়। মহামারী শুরুর
কিছুদিনের মধ্যেই অপ্রাতিষ্ঠানিক এই কর্ম খাতে নিয়োজিত অসংখ্য গৃহকর্মী কর্মহীন
হয়ে পড়েন। আর এ সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হওয়ার একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে
মহামারীকালীন গৃহকর্মী এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের জন্য বিশেষ কোনো
আপত্কালীন সুরক্ষা নীতিমালা ও প্রণোদনা সহায়তা দেয়া হয়নি। যদিও
রাষ্ট্রীয় নীতিমালায় সব ধরনের শ্রমজীবীদের সুরক্ষা প্রদানের কথা উল্লেখ করা রয়েছে।
২০১৫
সালে প্রণীত ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা’র আওতায়
গৃহকর্মে নিয়োজিত কর্মীদের নিরাপত্তা প্রদানের সঙ্গে সঙ্গে তাদের ছুটি, প্রণোদনা এবং আপত্কালীন ও জরুরি সময়ে সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু
সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালায় নির্দেশনা দেয়া থাকলেও এই মহামারীকালীন গৃহকর্মীরা
কোনো ধরনের আয় এবং কর্মনিরাপত্তা পাননি। অন্যান্য অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত
কর্মীদের মতো গৃহকর্মীরাও জাতীয়ভাবে কোনো ধরনের সুরক্ষা ও প্রণোদনার আওতাভুক্ত
হননি। ফলে করোনাকালে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
তারা
পরিবারসমেত কোনো রকমে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন। আর এ তথ্যগুলো উঠে এসেছে জীবনযাত্রার
পরিবর্তন ও সংকট মোকাবেলা: নারী গৃহশ্রমিকদের করোনা মহামারীকালীন টিকে থাকা ‘লিভলিহুড ট্রানজিশনস অ্যান্ড কোপিং উইথ শকস্: উইমেন ইন দ্য ডমেস্টিক সার্ভিস সেক্টর কোপিং
উইথ কভিড ১৯’ শীর্ষক আমাদের একটি গুণগত গবেষণায়।
গবেষণায়
অংশ নেয়া ৩০ জন গৃহকর্মীর সবাই করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরু হওয়ার পরপরই কাজ হারিয়ে
অসহায় হয়ে পড়েন।
নুরজাহান (২৬) এ গবেষণায় অংশ নেয়া একজন গৃহকর্মী। করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরু হওয়ার
পর প্রতিদিনের মতো নুরজাহান যখন তার কাজে যান, তখন তার নিয়োগকর্ত্রী তাকে জানিয়ে দেন, ‘কাল থেকে কাজে এসো না। এখন করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরু
হয়েছে। তুমি বস্তি এলাকা থেকে আসো। তোমার মাধ্যমে আমাদের মধ্যে ভাইরাস ছড়াতে পারে।
আবার সবকিছু ঠিক হয়ে গেলে তোমাকে ডাকব।’ এই এককথায় তার দীর্ঘ তিন বছরের চাকরিটি চলে যায়। নুরজাহান আক্ষেপ করে
বলেন, ‘নিজের কথাডা কওনের সুযোগডাও পাই নাই! এই বিপদের সময়
কী করমু, কী খামু!’ এর পর থেকেই শুরু হয় নুরজাহানের মহামারীকালীন অভিযোজন এবং টিকে থাকার
প্রচেষ্টা।
আমাদের
এ গবেষণায় দেখা গেছে এই গৃহকর্মীদের অনেকেই কাজ হারানোর পরে টিকে থাকার কৌশল
হিসেবে গ্রামে ফিরে গিয়েছেন। এক্ষেত্রে প্রধান যুক্তি ছিল,
গ্রামে অন্তত তাদের দুমুঠো খাবারের সংস্থান হবে।
গ্রামে স্থানীয়ভাবে কুড়ানো শাকসবজি এবং আত্মীয়-পরিজনের কাছ
থেকে সংগৃহীত খাদ্যসামগ্রীর মাধ্যমে তাদের তাত্ক্ষণিক খাদ্য চাহিদা পূরণ হচ্ছে।
আর যেসব
গৃহকর্মী গ্রামে ফেরত যেতে পারেননি,
তাদের জন্য টিকে থাকা ছিল অনেক বেশি কঠিন। তাদের
খাদ্য সংকট ছিল তীব্র। শুরুর দিকে অনেকে বাজার থেকে কম দামে নিম্নমানের পণ্য ক্রয়
করে পরিবারের খাদ্য চাহিদা পূরণ করেছেন। আর যাদের ক্রয় সামর্থ্য ছিল না, তারা নিয়োগকর্তা এবং স্থানীয় সচ্ছল ব্যক্তিদের বাড়ি থেকে চেয়ে এনে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে বেঁচে যাওয়া বাসি খাবার দিয়ে পরিবারের চাহিদা পূরণ
করেছেন। কিন্তু লকডাউন যখন দীর্ঘস্থায়ী হয় তখন তারা সেই খাদ্য সহায়তাটুকুও
পাচ্ছিলেন না। বিশ্বব্যাংক কর্তৃক পরিচালিত জরিপ গবেষণার তথ্যমতে, ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরের ৬৯ শতাংশ গৃহস্থালিতে খাদ্যগ্রহণের পরিমাণ আগের
তুলনায় কমে গিয়েছিল। আমাদের গবেষণায়ও দেখা গেছে যে অধিকাংশ গৃহকর্মী আগের তুলনায়
বর্তমানে খাদ্যগ্রহণের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন এবং প্রায় সব গৃহকর্মী উল্লেখ করেছেন, এখন তারা শুধু ভাত ও আলুর মতো খাদ্যের ওপরই নির্ভরশীল ছিলেন। এতে গৃহকর্মীরা
বর্তমান পরিস্থিতিতে আরো বেশি অপুষ্টির শিকার হচ্ছেন। খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার কারণে
বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার চিন্তাও গৌণ হয়ে গিয়েছে।
খাদ্য
চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে কোনো কোনো গৃহকর্মীকে ঋণ নিতে হয়েছে। তবে এ সময়ে কেউ কাউকে
ঋণ সহায়তাও দেন না বলে উল্লেখ করেন অধিকাংশ গৃহকর্মী। ধারে পণ্য ক্রয় করা স্বল্প
আয়ের শ্রমজীবী মানুষ ও গৃহকর্মীর মধ্যে একটি স্বাভাবিক চর্চা, কিন্তু মহামারীকালে সেই ব্যবস্থাটিও অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ হয়ে যায় আয়ের
অনিশ্চয়তার কারণে।
গ্রামে যেতে না পারা গৃহকর্মীদের আরেকটা বড় সংকট
ছিল বাসস্থান টিকিয়ে রাখা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের ভাবনা ছিল—কিছুদিনের
মধ্যে কাজটি পেয়ে যাব, সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে তারা তাদের নিয়োগকর্তাদের কাছ থেকে
প্রাপ্ত সহযোগিতা, আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার করা টাকা এবং কিছু ক্ষেত্রে সামান্য সঞ্চয়
ব্যবহার করে বাড়িভাড়া পরিশোধ করেছেন।
এভাবেই
ভুক্তভোগী গৃহকর্মীরা করোনা মহামারীর প্রথম দিকে টিকে থাকতে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু
মহামরী দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় তাদের টিকে থাকার সংগ্রাম আরো কঠিন হয়ে উঠেছে। গৃহকর্মীর
মতো নিম্ন আয়ের মানুষের সঞ্চিত পুঁজির পরিমাণ খুবই সামান্য। করোনার প্রথম ধাক্কায়
তাদের এ সঞ্চয়টুকু দ্রুত ফুরিয়ে গেছে।
এ
পরিস্থিতিতে কোনো ধরনের রাষ্ট্রীয় বিধিবদ্ধ সুরক্ষা নীতিমালার সময় উপযোগী প্রয়োগ
ব্যতিরেকে গৃহকর্মীর মতো অপ্রাতিষ্ঠানিক পেশায় নিয়োজিত বিপুল জনগোষ্ঠী এবং তাদের
ওপর নির্ভরশীল মানুষগুলোর জীবন আরো দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
গৃহকর্মীদের
টিকে থাকার জন্য এ পেশার কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ এবং কাঠামোগত নীতিমালার আওতায় আনার
মাধ্যমে তাদেরকে ন্যূনতম সুরক্ষা দেয়া আবশ্যক। সুনির্দিষ্ট নীতিমালা এবং এগুলোর
যথাযথ প্রয়োগ হলে করোনাভাইরাস সংক্রমণসহ অন্যান্য আপত্কালীন সময়ে গৃহকর্মীরা
কিছুটা হলেও পেশাগত সুরক্ষা পাবেন। ফলে তাদের টিকে থাকার প্রক্রিয়াটি সহজ হবে।
২০১৮ সালে প্রণীত সংশোধিত শ্রম আইনে কৃষি শ্রমিকদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হলেও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত বিপুলসংখ্যক শ্রমিক এবং গৃহকর্মে নিয়োজিত শ্রমজীবীদের শ্রমিক হিসেবে গণ্য করা হয়নি। প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে কর্মরত শ্রমিকরা করোনা মহামারীকালীন ন্যূনতম হলেও জাতীয় সুরক্ষা নীতির আওতাভুক্ত হয়েছেন। কিন্তু গৃহকর্মীসহ অপ্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে কর্মরত শ্রমিকরা উল্লেখযোগ্য সুরক্ষা নীতিমালার আওতাভুক্ত হয়নি। ফলে কাজ হারিয়ে দিন দিন তারা দরিদ্র থেকে অতিদরিদ্রের দিকে ধাবিত হচ্ছেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের করা জরিপ তথ্য অনুসারে চলমান মহামারীর ফলে ২ দশমিক ১ কোটি লোক নতুন করে দরিদ্র হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষত গৃহকর্মীরা তাদের পেশার ধরনের কারণে রয়েছেন ঝুঁকির মুখে। তাই তাদেরকে আপত্কালীন গার্মেন্টকর্মীসহ অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক কর্মীর মতো বিশেষ সুরক্ষা ও সহায়তা দিতে হবে। কারণ দিন শেষে রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে আপত্কালীন পেশাগত জীবন এবং আয়ের সুরক্ষা গৃহকর্মীসহ সব খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের অধিকার।
তাসলিমা আকতার: গবেষক, বিআইজিডি, ব্র্যাক










