প্রশান্ত মহাসাগরের এক
গুরুত্বপূর্ণ বলয়ে অবস্থিত দক্ষিণ চীন সাগর। অর্থনীতি, কূটনীতি ও রাজনীতির দিক থেকে এই সাগর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীন দাবি করে, এই সাগরের ৯০ শতাংশ তাদের। যার আয়তন দাঁড়ায় ৩০ লাখ ৫০ হাজার
বর্গকিলোমিটার। এ ছাড়া ব্রুনাই, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান ও
ভিয়েতনাম ঘেঁষে রয়েছে দক্ষিণ চীন সাগর। সে সুবাদে এই সমুদ্রের প্রাপ্য মালিকানা তারাও দাবি করে। তাদের অভিযোগ, অনেক আগে থেকে এই সাগর নিয়ন্ত্রণে নেয়ার চেষ্টা করছে চীন।
চীনের আধিপত্যের নেপথ্য কারণ
আনাদোলু এজেন্সিকে দেয়া এক
সাক্ষাৎকারে টোকিওভিত্তিক সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো বনজি ওহারা
বলেছেন,
প্রান্তিক সমুদ্র চীনের নিরাপত্তার চাবিকাঠি। বেইজিং মূলত
তিনটি কারণে দক্ষিণ চীন সাগরে আধিপত্য চায়।
প্রথমত, চীনা পারমাণবিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সাবমেরিনের কৌশলগত
টহলের জন্য এই সাগর গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পারমাণবিক প্রতিরোধ ও
পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে প্রবেশে চীনকে এই সাগর দখলে রাখতে হবে।
দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ চীন সাগর চীনের জন্য একটি ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ হিসেবে কাজ করবে। এটি চীনের মূল ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের
সামরিক হামলার ঝুঁকি কমাবে।
তৃতীয়ত, চীনের নৌ পরিবহনের জন্য এই সমুদ্রপথ প্রয়োজন। বিশ্ব
সামুদ্রিক বাণিজ্যের অন্তত এক তৃতীয়াংশ দক্ষিণ চীন সাগরে পরিচালিত হয়। বলা হয়, এর তলদেশে বিশাল তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত রয়েছে। এটি
খাদ্য নিরাপত্তার জন্য মাছ ধরার জায়গা হিসেবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
চীন স্বীকার করে, এই সাগর ঘিরে সমস্যা রয়েছে এবং যে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা
মোকাবেলা করতেও প্রস্তুত তারা। তবে তাদের ভয় হলো, যদি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা প্রশান্ত মহাসাগর, দক্ষিণ চীন সাগর ও ভারত মহাসাগর হয়ে বেইজিংয়ের ওপর আক্রমণ
করতে আসে।
এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র কেন?
সম্প্রতি বিশ্বের শীর্ষ দুই
সামরিক বাহিনী (চীন-যুক্তরাষ্ট্র) দক্ষিণ চীন সাগর এবং বিশেষ করে তাইওয়ানে ‘অস্থিতিশীল’ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে। চীন অভিযোগ করে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি তৈরি করছে।
এরমধ্যে এশিয়া-প্রশান্ত
মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবেলা করতে অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও ভারতকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র চতুর্পাক্ষিক নিরাপত্তা
সংলাপ (কোয়াড) গঠন করেছে। এ জোটের দেশগুলোর মধ্যে নিয়মিত তথ্য বিনিময় ও সামরিক
মহড়া পরিচালিত হচ্ছে।
দক্ষিণ চীন ইস্যুতে যেসব দেশের
স্বার্থ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র তাদের পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। চীনঘনিষ্ট এই ‘সংবেদনশীল’ অঞ্চলকে
যুক্তরাষ্ট্র ক্ষমতা প্রদর্শনের সুযোগ হিসেবে দেখে। কারণ, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নৌ বাহিনী রয়েছে ওয়াশিংটনের।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন গত মে মাসে ইন্দো-প্যাসিফিক ইকোনমিক ফ্রেমওয়ার্ক
(আইপিইএফ) চালু করেন। ওয়াশিংটনের নেতৃত্বাধীন এই অর্থনৈতিক কাঠামোতে অস্ট্রেলিয়া, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানসহ ১৪টি দেশ রয়েছে। মূলত চীনের তৎপরতা
ঠেকাতে এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র নৌ বহর নিয়ে এই
রুটে মহড়াও দেয়। তবে চীন বরাবরই তাদের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নাক না গলাতে সতর্ক
করে আসছে। গত ৩০ ডিসেম্বর দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সামরিক যুদ্ধবিমানের কাছাকাছি
চলে এসেছিল মার্কিন যুদ্ধবিমান। পরে দুদেশই এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি বিবৃতি দেয়।
চীনের তৎপরতা
পশ্চিমা কর্মকর্তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক মহলের বাধা উপেক্ষা করে দক্ষিণ চীন সাগরে ‘ভূমি’ দখলদারিত্ব
চালিয়ে যাচ্ছে বেইজিং। ইতোমধ্যে তারা প্রবালপ্রাচীরে ঘেরা দ্বীপের এলাকা
কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দখল করেছে। দ্বীপগুলোতে তারা সামরিকীকরণ করে বন্দর, রানওয়ে, হেলিপ্যাড ও
বিমানঘাঁটির মতো অন্য অবকাঠামো স্থাপন করেছে। সেখানে যুদ্ধবিমান নামানোরও ব্যবস্থা
রাখা হয়েছে। গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত কয়েকটি স্যাটেলাইট ছবিতে সেসব চিত্র উঠে এসেছে।
দক্ষিণ চীন সাগরের ওই বিতর্কিত
অঞ্চলকে (স্প্রাটলি) নিজেদের বলে দাবি করে ব্রুনেই, তাইওয়ান, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, ইন্দেনেশিয়া
ও ভিয়েতনামের মতো দেশও। কয়েক বছর ধরে এ অঞ্চল ঘিরে তাদের মধ্যেও উত্তেজনা বিরাজ
করছে। চীন তাদের দাবি মোকাবেলায় ওই ঘাঁটিগুলো বানিয়েছে। কারণ, দক্ষিণ চীন সাগরের ওই অংশেই রয়েছে তেল ও গ্যাসের আধার।
স্প্রাটলি ছাড়াও পারাসেল দ্বীপেও চীন তার আধিপত্য কায়েম করেছে।
চীন যতই দাবি করুক, দক্ষিণ চীন সাগরে তাদের অধিকার সিংহভাগ। তবে ২০১৬ সালে হেগের আদালত তাদের সেই অধিকারকে সমর্থন দেয়নি। ২০১৩ সালে ফিলিপাইনের করা ওই মামলার রায়ে আদালত বলেছিল, চীন যে নাইন ড্যাশ লাইনের ঐতিহাসিক দাবি করে, তার আইনি কোনো ভিত্তি নেই।
সমুদ্র আইন কী বলে
জাতিসংঘের সমুদ্র আইন অনুযায়ী, যে কোনো স্বাধীন দেশ তাদের উপকূলীয় অঞ্চল থেকে ১২ নটিক্যাল
মাইল পর্যন্ত সামুদ্রিক অংশ দাবি করতে পারে। আর ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত অঞ্চলকে
বলা হয় এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন। অর্থাৎ এই অঞ্চলে উপকূলীয় যে কোনো দেশ প্রাকৃতিক
সম্পদ আরোহণ, এমনকি কৃত্রিম দ্বীপ
নির্মাণেরও স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে। এই আইন অনুযায়ী, চীনের যে দাবি তাতে ফাঁক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ চীন
সাগরের অংশীদারত্বগুলোর দাবি, চীন এই আইন
মানছে না। তবে চীনের দাবি, তারা
বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে কোনো বাধা সৃষ্টি করে না।
এদিকে এই সমুদ্র দাবিদার
দেশগুলো আশা করে, যুক্তরাষ্ট্র
তাদের অধিকার ফিরিয়ে দেবে। আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন বিষয়ে বিশ্লেষক মার্ক
ভ্যালেন্সিয়ার মতে, জাতিসংঘ
সমুদ্র আইন সনদে যুক্তরাষ্ট্র সই করেনি। সেটি না করেও স্বাধীনভাবে নৌযান চালানোর
সুবিধা ভোগ করার সুযোগ চাওয়া নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কথা বলার অধিকার নেই।
বাণিজ্যিক নির্ভরতা
শুধু চীন নয়, ব্রুনাই, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, তাইওয়ান ও ভিয়েতনাম বাণিজ্যিকভাবে চীন সাগরের ওপর নির্ভর
করে। বিশ্লেষকরা বাণিজ্যগত গুরুত্ব বিবেচনায় চীন ছাড়া পাঁচটি দেশের নাম সুপারিশ
করেছে- ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া।
ইউনাইটেড নেশনস কনফারেন্স অন
ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অনুসারে, ২০১৬ সালে দক্ষিণ চীন সাগরের মধ্য দিয়ে প্রায় ৩ দশমিক ৩৭
ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের বাণিজ্য হয়েছিল। যা বৈশ্বিক বাণিজ্যের ২১ শতাংশ।
২০২১ সালে ইউনাইটেড নেশনস
কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট জানায়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিমাণ ৪০ শতাংশের বেশি সমুদ্রপথে
হয়। শুধু এশিয়াতেই সামুদ্রিক বাণিজ্যের ৫৪ ভাগ পরিচালিত হয়।
ইতিহাসের চুম্বক অংশ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়
দক্ষিণ চীন সাগরের দ্বীপগুলো দখলে নিয়েছিল জাপান। ওই যুদ্ধে জাপানের পরাজয়ের পর
১৯৪৩ ও ১৯৪৫ সালে দ্বীপগুলো চীনের দখলে যায়। ১৯৪৭ সালে চীনের জাতীয়তাবাদী সরকার
আনুষ্ঠানিকভাবে ১৫৯ দ্বীপ, ক্ষুদ্রদ্বীপ
ও বালুচর রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের আওতাধীন করে নেয়। সেসময় কোনো পক্ষ আপত্তি করেনি।
এরপর থেকে দক্ষিণ চীন সাগর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, চীনকে ঠেকাতে মার্কিন কৌশলগুলো অকার্যকর। কারণ, এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক
সম্পর্ক রয়েছে। চীনের বিআরআই প্রজেক্টের শুরু এই দক্ষিণ চীন সাগর থেকেই। সেখানে
ওয়াশিংটনের চীন বিরুদ্ধ নীতি বাস্তবায়ন প্রায় অসম্ভব।
লেখক : সাংবাদিক










