চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে এক মর্মন্তুদ মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। শনিবার রাতে সেখানকার বিএম কনটেইনার ডিপোয় ভয়াবহ এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, অগ্নিকাণ্ডে এখন পর্যন্ত ৪৯ জন নিহত হয়েছেন। দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি চার শতাধিক। খবর মিলছে, এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আগুন, উত্তাপ ও ধোঁয়া প্রত্যক্ষভাবে ছড়িয়েছে আড়াই বর্গকিলোমিটারজুড়ে। আর এর দূরবর্তী প্রভাব পড়েছে ১০ বর্গকিলোমিটার এলাকায়। ফায়ার সার্ভিস ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা আগুন নেভানোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এখনো আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। নিহতদের মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের কর্মী, ডিপোয় কাজ করতে যাওয়া শ্রমিক, উত্সুক মানুষ অনেকে আছেন। রাসায়নিক আছে এমন তথ্য আগে থেকে না পেয়েই আগুন নেভাতে গিয়ে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন ফায়ার সার্ভিসের আট সদস্য। এ ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি স্বজন হারানো মানুষের গভীর মানসিক ক্ষতেরও সৃষ্টি হয়েছে। এর সুষ্ঠু তদন্ত জরুরি।

আমদানি-রফতানি পণ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ২৪ বছর আগে চট্টগ্রামে কনটেইনার ডিপো শিল্পের যাত্রা। এ শিল্পের যাত্রার পর চট্টগ্রামে এই প্রথম কোনো কনটেইনার ডিপোতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটল। এর আগে ডিপোতে ছোটখাটো অগ্নিকাণ্ড ঘটেছিল। কিন্তু সেসব ক্ষেত্রে খুব দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছিল। এবার আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজটি বেশ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। সহজে নেভানো যাচ্ছে না। সূত্রমতে, কনটেইনার ডিপোটিতে ‘হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড’ নামের বিপুল মজুদ ছিল। ডিপোর একটি কর্নারে টিন শেডের নিচে এ ধরনের দাহ্য রাসায়নিকের বেশ কয়েকটি কনটেইনার ছিল। এখান থেকেই ছড়িয়ে পড়ে আগুন। বিস্ফোরণে

পুরো এলাকায় রাসায়নিকের বিষাক্ত ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছে। এতে উদ্ধারকর্মীরা অসুস্থ

হয়ে পড়ছেন। আশপাশের জনবসতিতে বাসিন্দারা নাখ-মুখ ঢেকে চলাচল করছেন। বলা চলে বিস্ফোরণ, আগুন ও ধোঁয়ায় এক শ্বাসরুদ্ধকর এবং ট্র্যাজিক পরিস্থিতির মুখোমুখি এলাকাটির মানুষজন।

দাহ্য রাসায়নিকে অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঘটনা দেশে নতুন নয়। গত বছর পুরনো ঢাকার আরমানিটোলায় এ ধরনের অগ্নিকাণ্ডে চারজন নিহত হন। আহত হন আরো ২০ জনের মতো। এর আগে ২০১৯ সালে চুড়িহাট্টার ওয়াহিদ ম্যানশনে রাসায়নিকের গুদামে বিস্ফোরণে লাগা আগুনে পুড়ে মারা যায় ৭১ জন। আর ২০১০ সালে নিমতলীতে ভয়াবহ আগুনে মারা যায় ১২৫ জন। ওই বিস্ফোরণের কারণ ছিল রাসায়নিক দ্রব্য। প্রতিটি ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন হয়। তদন্ত শেষে মালিকপক্ষের অবহেলা এবং কর্তৃপক্ষের নজরদারির ঘাটতির বিষয়টি উঠে আসে এবং কিছু সুপারিশও দেয়া হয়নি। কিন্তু অবস্থা পরিবর্তনে খুব একটা অগ্রগতির খবর মেলে না, এটা হতাশাজনক।

সীতাকুণ্ডের ঘটনায়ও মালিকপক্ষের এক ধরনের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ উঠছে। বলা হচ্ছে, অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে দীর্ঘক্ষণ মালিকপক্ষের কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তারা কোথায় কেউ নিশ্চিত করতে পারছেন না কেউ। সেখানে আগুনের সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। এতে হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মালিকপক্ষের লোকজনের খোঁজ পেলে কোন কনটেইনারে কী ধরনের দ্রব্য আছে এবং কনটেইনার কতটা বিপজ্জনক, সেটি জানা যেত। কিন্তু যথাসময়ে তাদের খোঁজ না মেলায় উদ্ধারকাজ অনেকটা ব্যাহত হচ্ছে। জানা গেছে, ওই ডিপোটিতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পোশাক পণ্যের কনটেইনার থাকে। কথা হলো, হাউড্রোজেন পার-অক্সাইডসহ রাসায়নিক ভর্তি কনটেইনার কেন রাখা হয়েছিল, কী অবস্থায় রাখা হয়েছিল, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছিল কিনা, থাকলে সরকারি কোন সংস্থার অনুমোদন ছিল, সেগুলো পুঙ্খাপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি। ঠিক কী কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে কনটেইনার থেকেই আগুন ধরেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ যা-ই হোক, এর দায় নিতে হবে কর্তৃপক্ষকে। হতাহতদের পাশে থাকতে হবে তাদের। নিহতদের পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। আহতরা যেন সর্বোচ্চ চিকিৎসা পান, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। যথাযথভাবে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

দেশে বিশেষ করে আমদানির ক্ষেত্রে একটা খারাপ প্রবণতা বিদ্যমান। অনেক সময় দেখা যায়, যারা পণ্য নিয়ে আসে তারা ঘোষণা দেয় একটা, থাকে আরেকটা। এ ঘটনায় তেমনটি ঘটেছে কিনা, সেটি দেখতে হবে। বড় কথা, এ ধরনের পদার্থ তারা বৈধ নাকি অবৈধভাবে মজুদ করেছে, সেটি দেখতে হবে। তাদের উদ্দেশ্য কী ছিল, যাচাই করতে হবে। যদি বৈধভাবে করে থাকে, তাহলে এখানে যে বিপজ্জনক পণ্য আছে, সেটি কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করেছে কিনা। আর ঘোষণা করলে সেখানে যে বিশেষ ব্যবস্থা, প্রস্তুতি নেয়া ও জনবল থাকা দরকার, সেগুলো আছে কিনা। থাকলে সেগুলো কাজ করল না কেন? এসব প্রশ্নের উত্তর অন্বেষণ প্রয়োজন।

এরই মধ্যে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী শোক জানিয়েছেন। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী আগুন নিয়ন্ত্রণে এনে উদ্ধার তত্পরতা পরিচালনা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সর্বাত্মক সহযোগিতা দেয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দাফন, কাফন, সত্কার ও আহতদের চিকিৎসার জন্য ১ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান ডিপোটি পরিদর্শন করেছেন। ডিপোতে এখনো অক্ষত থাকা হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডসহ রাসায়নিক পণ্যভর্তি কয়েকটি কনটেইনার সরিয়ে নিতে নির্দেশনা দিয়েছেন। এটা আমলে নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, সীতাকুণ্ড শিল্পাঞ্চল। সেখানে হাজার হাজার শ্রমিকের বসবাস। এ ধরনের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় কীভাবে রাসায়নিকের ডিপো করা হয়েছে সে প্রশ্নও উঠছে। এরই মধ্যে বিস্ফোরণের ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এ কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে নিয়ে আলাদা করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে বলে জানা গেছে। তদন্তপূর্বক দায়ীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে হতাহত পরিবারকে যথাযথভাবে পুনর্বাসন করতে হবে।

সীতাকুণ্ডের ঘটনায় আহত ও নিহতের সংখ্যা বাড়ছে। হাসপাতালে স্বজনরা ভিড় করছেন। নিজের আত্মীয়-পরিজনদের খোঁজ করছেন। তাদের কান্না ও আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। এ ঘটনা আমাদের জন্য বড় শিক্ষা। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়াতে সংশ্লিষ্টরা সব দিক থেকে আরো সতর্ক ও সুসজ্জিত হবে, সেটিই প্রত্যাশা।