ডাটারিপোর্টালের তথ্যমতে, পৃথিবীর প্রায় ৪ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন মানুষ ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযুক্ত, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ। সাইবার দুনিয়ায় সংযুক্ত এ মানুষগুলোর ক্ষতি করার জন্য বিভিন্ন শ্রেণী বিভিন্নভাবে ওত পেতে থাকে। যেসব উপায়ে ডিজিটাল দুনিয়ায় মানুষের ক্ষতি হয়, তার মধ্যে সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অন্যতম।

সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নামটি দেখে পজিটিভ কিছু মনে হলেও বিষয়টি এই স্বয়ংক্রিয় পৃথিবীর সাপেক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর। সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং হলো মনস্তাত্ত্বিকভাবে কোনো ব্যক্তিকে প্রতারণা ও প্ররোচনার মাধ্যমে ম্যানিপুলেট করে ওই ব্যক্তির দৈনন্দিন কাজকে প্রভাবিত করার একটি মাধ্যম। এর মাধ্যমে সাইবার অপরাধীরা এমন কিছু কৌশল ব্যবহার করেন, যাতে ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযুক্ত ব্যবহারকারী তাদের গোপনীয় তথ্য দিতে বাধ্য হন। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানুষের স্বাভাবিক ও সর্বোত্তম যে নিরাপত্তা পদ্ধতি থাকে, তা ভেঙে তাদের সিস্টেমের অ্যাকসেস সাইবার অপরাধীরা নিয়ে নেয়।

সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়াররা তাদের লক্ষ্য ব্যক্তিকে ম্যানিপুলেট করার জন্য মানুষেরই কিছু মৌলিক প্রবণতা ব্যবহার করে। মনোবিজ্ঞানী রবার্ট সিয়ালডিনির মতে, মানুষের এ মৌলিক প্রবণতাগুলো ছয় রকমের হতে পারে। প্রথমত, মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা হচ্ছে কেউ যদি তাকে কোনো কিছুর জন্য অনুরোধ করে এবং সেই অনুরোধকারী ব্যক্তি যদি বোঝাতে পারে যে এ অনুরোধের জন্য সে অনুমোদিত তাহলে মানুষ সহজেই দরকারি তথ্য দিয়ে দেয়। দ্বিতীয়ত, পছন্দের সঙ্গে পছন্দ মেলানো। এটা মূলত কথোপকথনের মাধ্যমে ঘটে। বিষয়টা এ রকম যে অপরাধীরা তাদের লক্ষ্য—ব্যক্তির শখ, কাজের আগ্রহ বা স্কুলের নাম ইত্যাদি জিজ্ঞেস করে। ধরে নিন ব্যক্তি বলল, তার শখ বাগান করা। তখন অপরাধীও দাবি করবে তারও শখ বাগান করা। এভাবে কথা বলতে বলতে একসময় গোপনীয় তথ্যও দিয়ে দেয়। তৃতীয়ত, পরস্পর আদান-প্রদান করা। অনেক সময় অনেকে আমাদের উপহার হিসেবে বস্তুগত কিছু বা পরামর্শ বা সাহায্য করতে পারে। তখন আমরাও তাদের কিছু দেয়ার প্রবণতা অনুভব করি। চতুর্থত হলো প্রতিশ্রুতি। যদি কেউ কখনো কোনো কিছু করার প্রতিশ্রুতি দেয়, তাহলে সেটা মেনে চলার প্রবণতাও থাকে। একবার প্রতিশ্রুতি দিলে সেটা বাস্তবে করার চেষ্টা করে, যদিও তা অবিশ্বস্ত মানুষের জন্য হতে পারে বা অবাঞ্ছিত কিছুও হতে পারে। এরপর হলো সামাজিক বৈধতা বা প্রমাণ। ধরে নিন কেউ একজন কল দিয়ে বললেন, তিনি একটি সমীক্ষা পরিচালনা করছেন এবং আপনি যে বিভাগে কাজ করেন সেখানের অন্য ব্যক্তিরাও এরই মধ্যে তাকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। ভুক্তভোগী এ অনুরোধের সত্যতা যাচাই না করেই তথ্য প্রদান করতে সম্মত হয়ে যান। সর্বশেষ প্রবণতা হলো অভাব। এক্ষেত্রে আক্রমণকারী ই-মেইল পাঠিয়ে দাবি করে যে তাদের কোম্পানির নতুন ওয়েবসাইটে নিবন্ধন করা প্রথম ১০০ জন চমত্কার একটি  সিনেমার টিকিট বিনামূল্যে পাবে। যখন একজন সন্দেহাতীত ব্যক্তি নিবন্ধন করেন, তখন তিনি তার পাসওয়ার্ড দিতে পারেন, যা তিনি অন্যান্য ক্ষেত্রে ব্যবহার করেন। এভাবে সাইবার অপরাধী নিবন্ধন করানোর নামে বিভিন্ন সংবেদনশীল তথ্য নিয়ে নিতে পারে। আবার অনেক সময় লিংকের মাধ্যমে ম্যালওয়্যারও ছড়িয়ে দিতে পারে। এভাবে সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়াররা মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতাগুলো ব্যবহার করে সব ধরনের তথ্য সংগ্রহ করে এবং ব্যবহারকারীর ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত সব ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। একটা সময় তারা ভুক্তভোগীর দৈনন্দিন কাজের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে। সর্বশেষে অর্থনৈতিক কিছু দাবি করা, ব্ল্যাকমেইল করাসহ বিভিন্ন ধরনের মানসিক যন্ত্রণা দিতে থাকে। অনেকে সর্বস্বান্ত হয়ে যায়। আবার অনেকে বেছে নেয় আত্মহত্যার পথ।

সুতরাং সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়াররা প্রথমে বিভিন্নভাবে তথ্য সংগ্রহ করে ব্যবহারকারীদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে। এরপর তারা ভুক্তভোগীকে বিভিন্ন  দিক থেকে প্রভাবিত করতে শুরু করে। অবশেষে তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্যের বাস্তবায়ন করে।

এখন আমরা প্রযুক্তির যে যুগে বসবাস করছি, ১০ বছর আগে তা হয়তো কেউ ভাবতেও পারিনি। আবার ১০ বছর পরে কত উন্নত মানের প্রযুক্তি আসবে তা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। মনে রাখতে হবে ইন্টারনেটের সঙ্গে সম্পর্কিত যত উন্নত মানের প্রযুক্তি তৈরি হচ্ছে তত নিকৃষ্ট মানের সাইবার অপরাধীও বেড়ে উঠছে। সুতরাং সাইবার দুনিয়ায় নিজেদের সুরক্ষিত রাখা দিনে দিনে আমাদের জন্য হয়ে যাচ্ছে অধিক চ্যালেঞ্জের। উপরের আলোচনা থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা নিজেরাও জানি না সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ার দ্বারা আক্রান্ত কিনা!!

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ার বা সাইবার ক্রিমিনালদের থেকে আমরা কীভাবে বেঁচে থাকব! প্রথমত, অনুমোদিত কোনো ব্যক্তি ছাড়া কোনো মাধ্যমেই কারো সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বা সংবেদনশীল তথ্য আদান-প্রদান করা যাবে না। যাচাই-বাছাই না করে কাউকেই এবং কারো কোনো কথাতেই বিশ্বাস করা যাবে না। দ্বিতীয়ত, যেকোনো সোশ্যাল মিডিয়ায় ই-মেইলে বা মোবাইলের মেসেজে আসা লিংকে ক্লিক করা যাবে না, যদি না তার বৈধতা আপনার জানা থাকে। বিভিন্ন ওয়েবসাইটে ও অনলাইন গেমিংয়ে থাকা লিংকগুলোয় যাচাই-বাছাই না করে ক্লিক করা যাবে না। তৃতীয়ত, ই-মেইল নিরাপত্তা গেটওয়ে, ব্লক লিস্ট/স্প্যাম রিসোর্স চিহ্নিতকারক, সংযুক্তি সীমাবদ্ধতা, অ্যান্টিভাইরাস, অ্যান্টিম্যালওয়্যার, অনুপ্রবেশ শনাক্তকরণ/প্রতিরোধ ব্যবস্থা, উইন্ডোজ ফায়ারওয়াল, নেটওয়ার্ক নিরাপত্তা ইত্যাদি ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযুক্ত ডিভাইসে ব্যবহার করতে হবে। সর্বশেষ যেটার কোনো বিকল্প নেই, তা হলো সচেতনতা। আমাদের ব্যাপকভাবে সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে জানতে হবে এবং সবাইকে জানাতে হবে। আসুন, আমরা সবাই সাইবার অপরাধীদের থেকে বেঁচে থাকি এবং এই স্বয়ংক্রিয় দুনিয়ায় সুস্থ, সুন্দর ও স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করি।

 

মো. আলমগীর হোসেন: সিনিয়র লেকচারার, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ, প্রাইম ইউনিভার্সিটি, ঢাকা