বাংলাদেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলোয় গ্যাসের মজুদ ক্রমে কমে আসছে। দেশে বর্তমানে ৮ টিসিএফ গ্যাসের মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে দেশীয় কোম্পানির কাছে থাকা গ্যাসক্ষেত্রে রয়েছে ৭ টিসিএফ আর বিদেশী কোম্পানির কাছে আছে ১ টিসিএফ। কিন্তু আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, সংকটের এ সময়েও স্থানীয় কোম্পানিগুলো দেশে গ্যাসের চাহিদার মাত্র ৩৭ শতাংশ সরবরাহ করছে, বাকিটা করছে বিদেশী কোম্পানি। স্থানীয় কোম্পানির কাছে মজুদ বেশি থাকলেও সরবরাহ বেশি করতে না পারার পেছনে গ্যাস কূপ উন্নয়নে নেয়া পদক্ষেপের ঘাটতিকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। এক্ষেত্রে সরকার বিনিয়োগ করছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিদেশী কোম্পানিগুলো নিয়ম মেনে গ্যাস কূপ উন্নয়নে যথাযথ পদক্ষেপ নিচ্ছে, কম্প্রেসার স্থাপন থেকে শুরু করে অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগ করছে। বিপরীতে স্থানীয় কোম্পানিগুলো সেই পুরনো প্রযুক্তি ও স্বল্প যন্ত্রপাতি দিয়ে গ্যাস উত্তোলন করে যাচ্ছে বছরের পর বছর। ফলে বিদেশী কোম্পানিগুলো নিরবচ্ছিন্নভাবে একই পরিমাণ গ্যাস নিয়মিত সরবরাহ করে গেলেও স্থানীয় কোম্পানি উৎপাদন ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারছে না, যা খুবই উদ্বেগজনক। দেশের বিদ্যমান গ্যাস সংকট মেটাতে স্থানীয় কোম্পানির হাতে থাকা কূপ সংস্কার ও সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে জ্বালানি মন্ত্রণালয় যথাযথ পদক্ষেপ নেবে বলে প্রত্যাশা। হতাশাজনক বিষয় হলো, অপেক্ষাকৃত স্বল্প প্রয়োজনীয় বা অগুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রকল্প গ্রহণে সরকার যতটা উৎসাহী, ঠিক ততটা উৎসাহ স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান, উত্তোলন ও উন্নয়নে দেখা যাচ্ছে না। দেশের বাজেটের আকার ক্রমে বাড়ছে, মেগা প্রকল্প গ্রহণের প্রবণতাও বাড়ছে। কিন্তু জ্বালানির মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত বিনিয়োগের অভাবে অবহেলিত থাকবে, তা কাম্য নয়।
দেশে এখন গ্যাস উৎপাদন করছে দুটি বহুজাতিক ও তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি। বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) বলছে, দেশে একসময় দিনে ৩০০ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস উৎপাদন হয়েছে। বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে ২৩০ কোটি ঘনফুটের কিছু বেশি। যদিও ২৭৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস তোলার সক্ষমতা ছিল এক বছর আগেও। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া অবশ্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বর্তমানে ২০টি গ্যাসক্ষেত্রের বেশির ভাগ থেকেই আগের তুলনায় কম গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে। এটা সত্য, গ্যাসক্ষেত্রের মজুদ ধীরে ধীরে কমে যায়। একে ‘ন্যাচারাল ডিফিউশন’ বলে। এটা খনির ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য, গঠন ও প্রযুক্তিগত রক্ষণাবেক্ষণের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু কিছু বিষয় আছে, যেগুলো উন্নয়নের মাধ্যমে গ্যাস উৎপাদনের গতি কিছুটা হলেও ধরে রাখা এবং ক্ষেত্রবিশেষে বাড়ানোও সম্ভব। বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, কূপ সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে আরো বেশি গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব। বেশির ভাগ গ্যাসক্ষেত্রেই তা করা হয়নি। এমনও দেখা গেছে যে পরিত্যক্ত ঘোষণা দেয়া কূপেও পরবর্তী সময়ে গ্যাস পাওয়া গেছে। বিদেশী কোম্পানিগুলো গ্যাস উৎপাদনে উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর রিজার্ভার ম্যানেজমেন্ট করে, যাতে উৎপাদন ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়। অন্যদিকে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো অর্থ ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির স্বল্পতায় সংস্কার করা যাচ্ছে না। শুধু তা-ই নয়, উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার অভাবও রয়েছে সেখানে। এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান উন্নয়ন ঘটাতে হবে। মূলত বিনিয়োগের অভাবে দেশীয় কোম্পানির কাছে থাকা গ্যাসক্ষেত্র থেকে জোগান বাড়ছে না। এমন নয় যে সরকারের অর্থের অভাব রয়েছে। তবে অর্থ ব্যয়ে প্রাধান্য তালিকা প্রণয়নে দূরদর্শিতার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে অপ্রয়োজনীয় ও কম রিটার্নপ্রাপ্ত প্রকল্প গ্রহণ করছে সরকার। অথচ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জ্বালানি খাত উন্নয়ন উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে ভুল পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে জ্বালানি খাতকে ব্যয়বহুল আমদানিনির্ভর খাতে পরিণত করা হচ্ছে, যা অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত। অভিযোগ রয়েছে সরকার স্থানীয় গ্যাস সম্পদ উন্নয়নের চেয়ে আমদানিতে বেশি উৎসাহী। এতে জ্বালানি খাত আরো ব্যয়বহুল হয়ে পড়ছে। স্বল্পমেয়াদি সমাধান হিসেবে দ্রুতই দেশীয় কোম্পানির হাতে থাকা গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উত্তোলন জোরদারের কোনো বিকল্প নেই। সে সুযোগও আমাদের রয়েছে। সম্ভাবনাময় বিশাল সমুদ্রসীমা এখনো অনুসন্ধানের বাইরে রয়ে গেছে।
বিনিয়োগের মাধ্যমে বিদ্যমান কূপ থেকেই গ্যাসের উৎপাদন যে বাড়ানো সম্ভব, সেটির জন্য বিদেশে যাওয়ার দরকার নেই। দেশে কার্যরত শেভরন ও তাল্লোর দিকে দৃষ্টি দিলেই স্পষ্ট হয়ে উঠবে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সময়মতো কূপ সংস্কারের মাধ্যমে তারা গ্যাস উৎপাদনের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে। স্বীকার করতে হবে, এক্ষেত্রে তাদের ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত উন্নত মানের। তারা পাঁচ বছর ধরে গ্যাস উৎপাদন সক্ষমতা নির্দিষ্ট পর্যায়ে ধরে রেখেছে। গ্যাসকূপগুলো সময়মতো সংস্কার এবং নতুন কম্প্রেসার স্থাপনে কোনো ধরনের কালক্ষেপণ তারা করেনি। কোনো ধরনের সংকট তৈরি হওয়ার আগেই এবং ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় রেখে যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছে কোম্পানিগুলো। তাদের পরিকল্পনায়ও দূরদর্শিতার ছাপ স্পষ্ট। যদিও তাদের বিরুদ্ধে মাত্রাতিরিক্ত গ্যাস উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। তার পরও বড় ধরনের কোনো বিপর্যয় বা দুর্ঘটনা ব্যতিরেকে কোম্পানি দুটি মসৃণভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে চলছে, এটিও কম বড় পাওনা নয়। অথচ দেশীয় কোম্পানির অধীনে থাকা গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাসের উৎপাদন ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। এর পেছনে কূপ সংস্কারে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ অনীহাই দায়ী। দেশীয় কোম্পানিগুলোও বিদেশী কোম্পানির অভিজ্ঞতা ও কার্যপদ্ধতি অনুসরণ করতে পারে। এক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না করার যে অভিযোগ রয়েছে তা অবশ্যই আমলে নিতে হবে। জ্বালানি মন্ত্রণালয় দেশীয় কোম্পানিগুলোকে গ্যাসক্ষেত্র সংস্কার, কম্প্রেসার স্থাপন, সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে অর্থ সরবরাহে কার্পণ্য করবে না বলে আমাদের প্রত্যাশা। এক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয় সর্বোপরি সরকারের সুদৃষ্টি একান্তভাবে কাম্য।
দেশের চলমান গ্যাস সংকট মোকাবেলা ও ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে সরকার কিছু পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে বলে শোনা যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে বন্ধ হয়ে যাওয়া খনি ও কূপগুলোর আরো গভীরে অনুসন্ধান; একই সঙ্গে উন্নত প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে দেশের হাইপ্রেশার জোনগুলোয় অনুসন্ধান ও উত্তোলনে কূপ খনন করা। এসব কাজে দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী ও কার্যকর করে তোলা হবে। এসব পদক্ষেপের কথা এক যুগ আগেও বলা হয়েছিল কিন্তু পরে তার আর অগ্রগতি হয়নি। পরামর্শ ও সুপারিশ বা উদ্যোগ শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, বাস্তবেও তার প্রয়োগ ঘটাতে হবে। সরকার পরামর্শক নিয়োগ করে ২০১১ সালে ‘গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধিতে পরামর্শ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছিল। দুঃখজনক হলেও সত্য, সেই প্রতিবেদনের সুপারিশগুলোও মানা হয়নি। সুপারিশে বর্তমান কূপগুলো রক্ষণাবেক্ষণ বা ওভারহোলিং, সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারে রিস্ক বেজড পদ্ধতির ওপর জোর দিতে বলা হয়েছিল। উপকূলীয় অঞ্চল ও পার্বত্যাঞ্চলে গ্যাস অনুসন্ধানের ওপর অগ্রাধিকার দেয়ার কথাও বলা হয়েছিল। কেন সেটি মানা হয়নি তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে কারো অবহেলা বা গাফিলতি থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হোক।
প্রধানমন্ত্রী ২০৪১-এর যে উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন, সেখানে জ্বালানি নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এ নিরাপত্তার জন্য স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি নানা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। আশা করি, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সব ধরনের সংকট দূর করা সম্ভব হবে। গ্যাসের উৎপাদন ধীরে ধীরে কমতে থাকবে, এটা স্বাভাবিক। তবে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নকাজ চালিয়ে গেলে উৎপাদন ধরে রাখা যায়। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের অবহেলা বা উদাসীনতা কাম্য নয়। মনে রাখতে হবে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কৃষি ও শিল্পের প্রবৃদ্ধি সবকিছুই নির্ভর করছে টেকসই জ্বালানি খাতের ওপর। স্থানীয় সম্পদ আহরণ জোরদারের মাধ্যমেই সেটি অর্জন সম্ভব। আশা করি, কর্তৃপক্ষ এতদিনের ভুল বুঝতে পারবে এবং জ্বালানি খাত উন্নয়নে অভ্যন্তরীণ উৎসকে গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা সাজাবে এবং যথাযথ বিনিয়োগ নিশ্চিত করবে। কারণ জ্বালানির বৈশ্বিক বাজার খুবই দোদুল্যমান এবং মাঝে মধ্যেই সেটি অনেক ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে, যার চাপ বাংলাদেশের অর্থনীতির সামাল দেয়ার সক্ষমতা নেই। ফলে জ্বালানি খাত উন্নয়নে সরকার আরো মনোযোগী হবে বলে প্রত্যাশা।










