ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান। উন্নয়ন অন্বেষণের চেয়ারপারসন। স্নাতক পর্যায়ের পড়াশোনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। উন্নয়ন ও ফাইন্যান্সিয়াল ইকোনমিকসে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। সোয়াস ইউনিভার্সিটি থেকে অর্জন করেন পিএইচডি। তার আগ্রহের বিষয় সামষ্টিক অর্থনীতি, রাজস্ব ও মুদ্রানীতি, জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ-প্রতিবেশ। করোনার প্রভাব ও তা থেকে উত্তরণে করণীয়, রাজস্ব ও মুদ্রানীতি, সামাজিক সুরক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা বিষয় নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেন এ অর্থনীতিবিদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এম এম মুসা

কভিড অতিমারী মানুষের জীবনে যে পরিমাণ অভিঘাত রেখেছে, তা মন্দা-মহামন্দা ও সংকটের সব মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। বিরাজমান সংকটকে কীভাবে দেখছেন?

কভিড অতিমারী একদিকে যেমন আমাদের দুর্বলতাগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে, ঠিক তেমনি নতুন চিন্তাচেতনার সুযোগও তৈরি করেছে। সবারই জানা, কভিড অতিমারীর ফলে গত ৩০ বছরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্জিত সাফল্য আমরা একের পর এক হারিয়েছি, সেটি দারিদ্র্য মোচন হোক—শিক্ষা বা স্বাস্থ্য সেবা অথবা সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে। উন্নয়ন আলোচনায় বলা হতো, উন্নয়নশীল বিশ্বে রেজিলিয়েন্স বা ঝুঁকি মোকাবেলার সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোয় নতুন করে দারিদ্র্য বেড়েছে। কভিড পূর্ববর্তী সময়ে দারিদ্র্য কিছুটা কমছিল। কভিডের এক ধাক্কায় অর্জনগুলো হারিয়ে গেল। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। রেজিলিয়েন্স বা ঝুঁকি মোকাবেলার সক্ষমতা সম্পর্কে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। কভিড-১৯ চলার সময়েই ‘কভিড-১৯ এবং বাংলাদেশ’ শীর্ষক ইউপিএল থেকে আমার সম্পাদিত একটি গ্রন্থ প্রকাশ হয়েছে। সেখানে কতগুলো বিষয় আমাদের জানান দিচ্ছে। প্রথমত, কভিড পূর্বকালীন পরিস্থিতি বা প্রি-এক্সিটিং ফল্টলাইনগুলো আরো খারাপভাবে উন্মোচন করেছে। অর্থাৎ কর্মসংস্থানবিহীন প্রবৃদ্ধি। এর ফলে দারিদ্র্য হ্রাসের অধোগতি, প্রকৃত মজুরির নিম্নগতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আনুষ্ঠানিক খাতে ঋণাত্মক কর্মসংস্থানের কারণে অনানুষ্ঠানিক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা বেড়েছে। অন্যদিকে স্বাস্থ্য সেবায় দুরবস্থা, শিক্ষায় মানের অভাবে দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতায় ঘাটতি এবং সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় ন্যূনতম অভিযোজন ক্ষমতা। এসব কাঠামোগত সংকটই কভিডের অভিঘাতকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। আজ নতুন দারিদ্র্য তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয়ত, দেশের ভেতরে ও বিভিন্ন দেশের মধ্যে বৈষম্যকরণ প্রক্রিয়া বড় আকারে জারি হয়েছে। আমি আমার বিভিন্ন গবেষণায় বলার চেষ্টা করেছি পুনরুদ্ধার গতিপথ ক্রমে ইংরেজি ‘কে’ অক্ষরের চেহারা ধারণ করে অল্প কিছু মানুষের হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হচ্ছে এবং মানুষের আয় কমে দারিদ্র্য ও বৈষম্য বাড়ছে। এ প্রক্রিয়ায় সমাজে বিভেদ ও মেরুকরণ ত্বরান্বিত করে বৈষম্য ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারে। উপরের দিকে সম্পদের পুঞ্জীভবন ঘটছে এবং মধ্যবিত্তরা নিম্নমধ্যবিত্তে পরিণত হচ্ছে। নিম্নমধ্যবিত্তরা গরিবে পরিণত হচ্ছে। তার মানে একটা পোলারাইজেশন হচ্ছে এবং একটা ডিফারেনসিয়েশন হচ্ছে। এটা সবার সামনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এ আলোকে আমরা তিনটি নীতি কাঠামো নিয়ে কী করব? প্রথমত. ফিসক্যাল ও মনিটারি পলিসি। রাজস্ব ও আর্থিক নীতি কাঠামোয় কী ধরনের পরিবর্তন আমাদের আনতে হবে, যাতে আমাদের ঝুঁকির প্রশমন ঘটে, তারপর ঝুঁকি থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে আমরা পুনরুদ্ধার করতে পারি। দ্বিতীয়ত. শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নয়নে করণীয় কী এবং তৃতীয়ত. বিপন্ন পরিবেশ ও প্রতিবেশের ঝুঁকি কাটিয়ে কীভাবে রেজিলিয়েন্ট হতে পারি। এগুলো নিয়েই সাম্প্রতিককালে কাজগুলো করেছি।

ফিসক্যাল পলিসি বা রাজস্ব নীতি নিয়ে আপনার ভাবনা কী?

আমাদের ফিসক্যাল পলিসি নিয়ে আলোচনাগুলোর অধিকাংশই এসেছে উন্নত বিশ্বের বা উন্নত পুঁজিবাদী বিশ্বের সমস্যা সমাধান করার জন্য বিভিন্ন তাত্ত্বিক কাঠামো থেকে। সেই তাত্ত্বিক কাঠামোর আলোকেই বিভিন্ন নীতি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। যেমন আমরা জানি, ১৯৩০ সালের মহামন্দার পর মহামন্দা থেকে উত্তরণের জন্যই কেইনসীয় বিপ্লব ঘটেছিল। ঠিক একই কায়দায় পরবর্তী সময়ে ১৯৭০ সালের সংকটগুলোর সমাধানও আরেক ধরনের নীতিমালার মধ্য দিয়ে গেছে। যাকে মোটাদাগে নিওলিবারেলিজম বা নব্য উদারনীতিবাদ বলে। এর মাধ্যমে বেসরকারীকরণ, বিনিয়ন্ত্রণ ও উদারীকরণকে একটা নীতি কাঠামোর মধ্যে আনা হয়েছে। তখন বলার চেষ্টা করা হয়েছে যে অর্থনীতির মৌলিক পরিবর্তন ঘটানোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্র না, বাজারভিত্তিক সংস্কারের দিকে যেতে হবে। সেটাই মূল। সমাজ বা রাষ্ট্র বিষয় না, বাজার যদি ঠিকভাবে কাজ করে তাহলে গণতান্ত্রিকতাও প্রতিষ্ঠা পাবে। মনিটারিজমের ভূমিকা দেখেছি, পাবলিক চয়েস দেখেছি। একদিকে মিল্টন ফ্রিডম্যান আর পাবলিক চয়েসের ক্ষেত্রে জেমস বুকাননের প্রাধান্য লক্ষ করেছি, তার সঙ্গে সঙ্গে আমরা লক্ষ করেছি নিউ পাবলিক ম্যানেজমেন্ট।

২০০৭-০৮-এর আর্থিক সংকটকালে রাষ্ট্রের ভূমিকাকে বড় না করে কীভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোয় অর্থ সরবরাহ করা যায়, এ লক্ষ্য সামনে রেখে উন্নত পুঁজিবাদী বিশ্ব আধুনিক মুদ্রানীতির দিকে ঝুঁকেছে। একে বলা হচ্ছে, তারল্য প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছানো বা কোয়ান্টেটিভ ইজিং। অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে কয়েকটি দেশের ক্ষেত্রে আমরা এক ধরনের অগ্রগতি দেখেছি। তার মধ্যে অনেক এগিয়ে গেছে চীন; দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান এগিয়েছে। রাষ্ট্রের কার্যক্রমের কারণে এক ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। আমরা আসলে দেখছি না যে কীভাবে যেসব রাষ্ট্রে উপনিবেশ থেকে বি-উপনিবেশীকরণ ঘটেছে, তাদের রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতি কী হবে। ফলে ট্রান্সফরমেশন বা রূপান্তরটা কেমন হয়েছে। রাউটলেজ থেকে প্রকাশিত ‘ফিসক্যাল মনিটারি পলিসি ইন ডেভেলপমেন্ট কান্ট্রিজ: স্টেটস, সিটিজেন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন’ শীর্ষক পুস্তকে এগুলো আলোচনা করেছি। আমার সীমিত সাধ্যে দেখানোর চেষ্টা করেছি যে আসলে রূপান্তরের বাধাগুলো কী কী? লক্ষ করেছি রাষ্ট্র যেভাবে গঠিত হয়েছে এবং রাষ্ট্র গঠনের সঙ্গে অর্থনৈতিক যে নীতিমালা তৈরি হয়েছে, সেখানে বড় রকমের ফারাক রয়েছে। তখনই অর্থনৈতিক নীতিমালা কাজ করবে, তা মনিটারি বা ফিসক্যাল পলিসি হোক, যদি রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের ঐক্যতান তৈরি হয়। ঔপনিবেশিককালে দেখেছি যে রাষ্ট্র সবসময় এক্সট্রাকটিভ থেকেছে, ফিসক্যাল পলিসি এক্সট্রাকটিভ থেকেছে, নাগরিককেন্দ্রিক হয়নি। রাষ্ট্র শুধু রাজস্ব আহরণই করেছে। ব্রিটিশ শাসনকালে দেখেছি কীভাবে তার কেন্দ্রভূমি অর্থাৎ ব্রিটেনে টাকা পাঠানো যায়। ঔপনিবেশ-উত্তরকালে একই অবস্থা বিরাজমান। অন্যদিকে উন্নত দেশে নাগরিকদের সঙ্গে রাষ্ট্রের একটা মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে। যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে চেক অ্যান্ড ব্যালান্স আছে, যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে একটা কমন ল তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রকে কর দেয়া হবে এবং আর রাষ্ট্র নাগরিক অধিকার ও পরিষেবা নিশ্চিত করবে। অর্থাৎ ফিসক্যাল বা মনিটারি পলিসি তখনই কাজ করে যখন নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যে সমন্বয় সাধিত হয় এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে রাষ্ট্র ও নাগরিকের চুক্তি রূপান্তরের দিকে যেতে শুরু করে।

আমাদের দেশে কী ধরনের ফিসক্যাল পলিসি নেয়া দরকার?

আমরা লক্ষ করেছি, এক ধরনের প্রবৃদ্ধি অনেক দেশে হচ্ছে, কিন্তু কর্মযুক্ত প্রবৃদ্ধি হচ্ছে না। এগ্রিগেট ডিমান্ড অনেকভাবে বাড়ানো যায়। প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় বেড়ে গেলেও সার্বিক চাহিদা বেড়ে যেতে পারে। কিন্তু আসলে যেটা দরকার সেটা হচ্ছে প্রতিটা মানুষের ভোগ ব্যয় কীভাবে বাড়বে। এটি তখনই হবে যখন সবার জন্য অধিকারযুক্ত কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং উপযুক্ত জীবনধারণকারী মজুরির প্রাপ্তিযোগ থাকবে। আরেকটা বিষয় আমরা লক্ষ করেছি, মনিটারি পলিসির ক্ষেত্রে আমাদের ধারণা ছিল যে আমরা শুধু মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখাকে টার্গেট করব। অবশ্যই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখব, কিন্তু তার চেয়ে বড় বিষয় হওয়া দরকার যে আমরা কীভাবে কর্মসংস্থানযুক্ত প্রবৃদ্ধি সৃষ্টি করব এবং রূপান্তর সবুজবান্ধব করব। আমাদের একটা নতুন ধরনের চিন্তাচেতনা দিতে হবে। ডিইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন ঘটেছে, যার অর্থ শিল্প ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান ঋণাত্মক হয়েছে। অন্যদিকে অনানুষ্ঠানিক খাতের প্রাধান্য বেড়েছে। অধিকাংশ কর্মনিয়োজনই হচ্ছে অনানুষ্ঠানিক খাতে। তৃতীয়ত, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই ছোট, ক্ষুদ্র ও মাঝারি। এক্ষেত্রে পুরো ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশনকে জোর দিতে হবে। পালগ্রেভ ম্যাকমিলান থেকে এ বছরের মার্চে প্রকাশিত ‘নাম্বারস অ্যান্ড ন্যারেটিভস ইন বাংলাদেশ’জ ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট’ বইতে একটা রূপান্তরের কাঠামো দেয়ার চেষ্টা করেছি। প্রথমা থেকে প্রকাশিত ‘যুদ্ধোত্তর থেকে করোনাকাল—বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছরের রাজনৈতিক অর্থনীতি’ বইতে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কেন সর্বজনের, সর্বজনীন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হতে বারবার হোঁচট খেয়েছে বাংলাদেশ—এ মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। সূচকে পরিমাণগত অগ্রগতি সত্ত্বেও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীকালে ইতিহাসের আলোকে রাজনীতি ও অর্থনীতির উত্তর খোঁজা জরুরি।

সামাজিক নীতিতে কী ধরনের প্রবণতা দেখছেন?

সামাজিক দিক থেকে আমরা দুটো প্রবণতা লক্ষ করেছি। দারিদ্র্য বেড়েছে, তবে কোনো কোনো দেশে অভিঘাতটা মানুষের জীবনযাপনে তুলনামূলক কম ক্ষতি করেছে। এসব দেশে একটা সোস্যাল মডেল আছে, যেমন ইউরোপ। পুঁজিবাদী বিশ্বে, ইউরোপে কভিডের অভিঘাতের মাত্রা কম হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কিন্তু অভিঘাতের মাত্রা বেড়েছে। আমাদের এ দেশগুলোয় যে সামাজিক প্রতিরক্ষণ ব্যবস্থা বা সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে, সেখানে অন্তত বড় রকমের চারটি সমস্যা আছে। এক. যার থাকা দরকার, তিনি নেই, মানে ইনক্লুশন এরর ঘটেছে। দুই. যার থাকার দরকার নেই, তিনি আছেন, অর্থাৎ এক্সক্লুশন এরর। তিন. কর্মসূচিগুলো বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। কো-অর্ডিনেশন মানে সমন্বয় নেই, ফ্রাগমেন্টেড, বিভিন্ন খণ্ডে বিভক্ত এবং চার. আমাদের সঠিক তালিকাসহ কার্যকর ব্যবস্থা নেই। যেমন প্রধানমন্ত্রী চেয়েছেন ৫০ লাখ লোককে নগদ সহায়তা দিতে, কিন্তু ৩৫ লাখের বেশি লোককে তালিকার অভাবে নগদ অর্থ দিতে পারেননি। আমাদের একটা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড পাওয়ার কথা। উন্নয়নের লক্ষ্য হওয়া দরকার কীভাবে জনমিতিক লভ্যাংশ ঘরে তোলা যায়। আয়ু বাড়ার কারণে অবসরকালীনদের সংখ্যাও বাড়ছে। শিশু থেকে লেখাপড়া করছেন বা প্রশিক্ষণে আছেন, এমন জনসংখ্যাও বাড়তির দিকে। তাহলে এদের নিয়ে কী করতে হবে? আমাদের পূর্ণ জীবনচক্রভিত্তিক সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তার মধ্যে যেতে হবে। আমার রাউটলেজ থেকে প্রকাশিতব্য ‘স্টেট বিল্ডিং অ্যান্ড সোস্যাল পলিসি ইন ডেভেলপিং কান্ট্রিজ’ বইতে সর্বজনীনতার কথা বলার চেষ্টা করেছি। উন্নয়নের রাজনৈতিক অর্থনীতি হতে হবে সর্বজনীন। সর্বজনীনতার দিকে না যাওয়া গেলে এ রকম অভিঘাতে আমাদের রেজিলিয়েন্স টিকে থাকবে না। সেই সর্বজনীনতার ভিত্তিতেই কীভাবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে  নতুন রূপান্তরমূলক নীতি কাঠামো হতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে বইটিতে। মূলত সোস্যাল পলিসি ও রাষ্ট্র গঠন—একটার সঙ্গে আরেকটা অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি কেমন হতে পারে, যার মাধ্যমে আমরা ডিসেন্ট এমপ্লয়মেন্ট বজায় রাখতে পারি?

মূল বিষয়, আমাদের সর্বজনীনতার দিকে যেতে হবে। উন্নয়নের মূলশক্তি হচ্ছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান। আমাদের সাসটেইনেবল ট্রানজেক্টরি অব গ্রোথ ইন হিউম্যান পটেনশিয়ালসের দিকে যেতে হবে। সম্ভাবনার বিকাশ ঘটাতে হবে। অর্থাৎ সর্বজনীন হলেই মানুষের সব সম্ভাবনার বিকাশ ঘটতে পারে। কিন্তু খুবই পরিতাপের বিষয় যে উত্তর উপনিবেশকালে আফ্রিকা বা এশিয়া বা লাতিন আমেরিকার রাষ্ট্রগুলো তা অর্জন করতে পারছে না। যেমন লাতিন আমেরিকা একবার উপরে যায় আবার পড়ে যায়। আফ্রিকার ক্ষেত্রে আমরা দেখছি যে আফ্রিকায় সম্পদ আছে কিন্তু আফ্রিকানরা গরিব। আমরা যে সীমিত আয় করি, তা দিয়ে ভোগব্যয় বাড়ানো সম্ভব না। সেজন্য সর্বজনীন শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান বা বেসিক ইনকাম গ্রান্টের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের বড় ভূমিকা থাকা দরকার। 

আমাদের আকাঙ্ক্ষা একটা সাম্যভিত্তিক বা ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা। এসব রাষ্ট্র সংগ্রামের ভেতর দিয়ে তৈরি হয়েছে। সামাজিক রীতিনীতির ক্ষেত্রেও তার প্রতিফলন ঘটানো দরকার এবং বিশেষ করে বাংলাদেশে যখন আমরা ৫০তম সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছি তখন তো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন হতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হচ্ছে সমতা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদাসম্পন্ন একটা সমাজ গড়া। এসব নরমেটিভ প্রিন্সিপাল দিয়ে আমরা আমাদের দেশে তাত্ত্বিকীকরণ করিনি এবং তাত্ত্বিকীকরণের মাধ্যমে নীতিমালাগুলোও গঠন করিনি। এগুলোই আমার বইগুলোয় তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। যাতে ভবিষ্যতে আবার এ ধরনের ধাক্কার ক্ষেত্রে যেন নতুন দরিদ্র তৈরি না হয়। আসলে সামাজিক নীতিমালার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করতে হবে। রাষ্ট্রের একটা বড় ভূমিকা আছে। অর্থাৎ রাষ্ট্র গঠন ও জাতি গঠনের একটা বড় ভূমিকা আছে। কেউ যদি ১২ টাকা পায় আর কেউ যদি ৮ টাকা পায় তাহলে গড় আয় হবে ১০ টাকা। আবার ১৮ টাকা আর ২ টাকা আয়ের গড় করলেও ১০ হবে। গড় নয়, মধ্যকে নজর দিতে হবে। অর্থাৎ অধিকাংশ মানুষের পরিবর্তন ও রূপান্তরের দিকে যেতে হবে।

কভিড-১৯ অতিমারীর ক্ষতি থেকে উত্তরণে রাষ্ট্র গঠন ও অর্থনীতি ব্যবস্থাপনায় তথা ফিসক্যাল ও মনিটারি পলিসিতে বড় রকমের পরিবর্তন আনতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক নীতিমালায় পরিবর্তন ঘটানো দরকার। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে পরিবর্তন ঘটলেই রেজিলিয়েন্স সোসাইটি গড়ে তোলা এবং সামনের দিকে যাওয়া সম্ভব। আমাদের স্বপ্ন হলো উন্নত বাংলাদেশ। স্বল্পোন্নত থাকতে চাই না। উন্নয়নশীল থেকে উন্নত দেশের দিকে যেতে চাই।

এখন আমাদের নীতি কাঠামোর কোন দিকে নজর দেয়া দরকার? 

নীতি কাঠামোর তিনটি দিকেই আমাদের এখন নজর দেয়া দরকার—১. রাজস্ব ও মুদ্রানীতি, ২. সামাজিকনীতি আর ৩. পরিবেশনীতি। থ্রি পিলার হিসেবে দেখা দরকার। কভিডকালে আমরা দেখলাম নতুন ভ্যারিয়েন্ট তৈরি হচ্ছে। কেন হচ্ছে? যার যেখানে আবাস, সেগুলো আমরা ধ্বংস করে ফেলেছি। ফলে নতুন ধরনের ভাইরাস সংক্রমণ ঘটাচ্ছে। আমাদের চিন্তা করতে হবে যে মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক কী হবে এবং মানুষের সঙ্গে শুধু প্রকৃতির সম্পর্কের মধ্যে থাকলেই চলবে না। আসলে দেখতে হবে মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির ওয়েলবিংয়ের সম্পর্ক। অর্থাৎ দুজনের ওয়েলবিং নির্ভর করবে পৃথিবীর আবাসযোগ্যতার ওপর। যেভাবে গ্লাসগো আলোচনায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রির তাত্পর্য, একইভাবে ২০২০ পরবর্তী যে জীববৈচিত্র্যের বৈশ্বিক কাঠামো নিয়ে চীনের কুনমিংয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে বৈশ্বিক চুক্তি হবে কুনমিংয়ে আগামী বছরের এপ্রিলে। পানির ক্ষেত্রেও উজান-ভাটির সমস্যা, লবণাক্ততা, তার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক, অর্থাৎ এটা হাইড্রোলজিক্যাল। আমরা এগুলো লক্ষ করে একটা বই লিখেছি। স্প্রিঙ্গার নেচার এটি বের করবে। বইটির নাম ‘ন্যাচারাল রিসোর্স ডিগ্রেডেশন অ্যান্ড হিউম্যান নেচার ওয়েলবিং—কেসেস অব বায়োডাইভার্সিটি রিসোর্সেস, ওয়াটার রিসোর্সেস অ্যান্ড ক্লাইমেট চেঞ্জ’। প্রথমেই বলার চেষ্টা করেছি, পানিকে আমরা যেভাবে চিন্তা করি বা যে আলোচনাগুলো আছে সেগুলো এখনো সেভাবে ফল দেয়নি। আমরা বলার চেষ্টা করেছি আলোচনার ভিত্তিটা হতে হবে হাইড্রোলজিক্যাল সাইকেল বেজড। অর্থাৎ পানির উৎস থেকে শেষ পর্যন্ত। আলোচনাটা দ্বিপক্ষীয় হলেও চলবে না, এটাকে হাইড্রোলজিক্যাল সাইকেলের মধ্যে নিতে হবে। মানে বিজ্ঞানকে বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখতে হবে। রাজনৈতিক ক্ষীণ স্বার্থ নিয়ে ওয়াটার সাইকেলের আলোচনা করা যাবে না।

বায়োডাইভার্সিটি রিসোর্সের ক্ষেত্রে আমি একটা ছোট উদাহরণ দিই। আমাদের যে বন আইন আছে, তৃতীয় বিশ্বের সব দেশেই আইনগুলো উপনিবেশ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। আইনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে সরকার কীভাবে ওই সম্পদ থেকে রাজস্ব আদায় করবে। কীভাবে টেকসই বন সংরক্ষণ বা সাসটেইনেবল ইউজ অব বায়োডাইভার্সিটি রিসোর্সেস করব এবং অ্যাকসেস অ্যান্ড বেনিফিট শেয়ারিং করব, তা নিয়ে ভাবতে হবে। এটাই আমাদের বায়োডাইভার্সিটির মূল বার্তা। মানে আমাদের রাজস্বভিত্তিক কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে মানুষ ও প্রকৃতির মাঝে সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। আমাদের আলোচনা বিজ্ঞানের থেকে এসেছে; তবে একে আমরা ইকোনমিক পলিসির মধ্যেও নিয়ে এসেছি। দুটো অংশ। একটা বায়োটিক রিসোর্সেস ও অ্যাবায়োটিক রিসোর্সেস। বায়োটিকের বা লিভিং অর্গানিজমের মধ্যে তিনটা অংশ—প্রডিউসার, কনজিউমার ও ডিকম্পোজার। এ চক্রের সঙ্গে অ্যাবায়োটিক বা ফিজিক্যাল একটা সিস্টেম জড়িত। যেমন মাটি, জলবায়ু ও সূর্য। এ দুটো সিস্টেমের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হলে উৎপাদক উৎপাদন করতে পারবেন না, ভোক্তারা ভোগ করতে পারবেন না, পচন হবে না। খুব সহজ একটা উদাহরণ, মৌমাছি না থাকলে পরাগায়ন ঘটবে না, ফসলও ফলবে না। কীটনাশক বেশি ব্যবহার করলে মৌমাছি থাকবে না, ফলে পরাগায়ন হবে না। আবার কীটনাশক পানিতে গেলে মাছের প্রজাতি কমে যাবে। মানুষই এসব সমস্যা তৈরি করেছে, মানুষই এ সমস্যা থেকে উত্তরণ ঘটাতে পারে। আমরা বায়োডাইভার্সিটির ক্ষেত্রে এগুলো বলার চেষ্টা করেছি।

কভিড-১৯ সময়ে একটা বিষয় আমরা বড় আকারে দেখেছি, আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদের বড় রকমের ক্ষতি হয়েছে। জীববৈচিত্র্য পরিবর্তনের কারণে বিশাল ক্ষতি হয়েছে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শ্বাসমূল বন আমাদের ভালোবাসার ও গর্বের সুন্দরবন। অনেকেই আলোচনা করে না, সুন্দরবন স্বাদু পানির শ্বাসমূল বন। কিন্তু গর্বের এ বনের অবস্থা সংকটাপন্ন। সুন্দরবন নিয়ে আমাদের এক যুগের কাজ নিয়ে পালগ্রেভ ম্যাকমিলান থেকে প্রকাশিত করছে ‘সুন্দরবনস অ্যান্ড ইটস ইকোসিস্টেম সার্ভিসেস ট্র্যাডিশনাল নলেজ, কাস্টমাইজ সাসটেইনেবল ইউজ অ্যান্ড কমিউনিটি বেজড ইনোভেশন’। পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে আমাদের আবাসযোগ্য পৃথিবী আজ হুমকির সম্মুখীন। পৃথিবী আর আবাসযোগ্য থাকবে কিনা! এটা নিয়ে বিশদ আলোচনা করা দরকার।

জলবায়ু পরিবর্তনের সংলাপে কোন ধরনের আলোচনা প্রাধান্য পাওয়া উচিত?

কার্যকারণের আলোচনা কম। সমাধান জানা থাকলেও কার্যকরী পদক্ষেপ কম। আলোচনা আছে কীভাবে হেডলাইন করা যায়। এ আলোচনার ভয়ংকর দিক হলো, বাজারের কাছে ছেড়ে দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের সমাধান খোঁজা। প্যারিস চুক্তির আর্টিকেল ৬-এর মধ্যে এ বাজারের কায়দার কথাগুলোই আছে। কিন্তু আমরা অতীত অভিজ্ঞতায় দেখেছি কিয়োটো প্রটোকলকালে বাজার এ সমস্যাগুলোকে সমাধান করতে পারেনি। আবার অনেকে বলার চেষ্টা করেছে, আমরা যদি লেভি দিই তাহলে লেভি থেকেই অর্থায়ন হবে। কিন্তু আসলে মূল সমস্যাটা তা নয়। হ্যাঁ অর্থায়ন দরকার কিন্তু সমস্যার মূলে আছে মানুষ, তারাই এ পরিবর্তন ঘটিয়েছে। আর সেটা ঘটিয়েছে বাজার ব্যবস্থা।

জেমস ওয়াটের উদাহরণটা দিই, তিনি কিন্তু বাষ্পীয় ইঞ্জিন উদ্ভাবন করেননি। তিনি এটার গতিশীলতা অর্জন করে ইফেকটিভনেস বাড়িয়ে ছিলেন। প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আমাদের লক্ষ্যটা জেমস ওয়াটের আশা-আকাঙ্ক্ষার মতো হতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে এমন অবস্থায় যাওয়া, যাতে পরিস্থিতির ক্রমাবনতি না ঘটে। কিন্তু বিজ্ঞান থেকে দূরে আসার কারণেই এ ঘটনা ঘটছে। সেজন্য রাষ্ট্রের ভূমিকাকে বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়া ঠিক হবে না।

প্রতিষ্ঠান নিয়ে আপনার ভাবনা কী?

আমাদের ধারণা আছে যে আমরা উৎপাদনের উপকরণের একটা ইনপুট দেব তাহলে আমরা আউটপুট পাব। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে তত দেখা যাচ্ছে এ ঘটনা ঘটছে না। তবে ঘটছে না বলে থেমে গেলে চলবে না। এর একটা বিশদ অনুসন্ধান দরকার। অর্থাৎ উৎপাদনের উপকরণে জমি, শ্রম, পুঁজি, প্রযুক্তি আছে। এসব খুবই প্রয়োজনীয় উপকরণ। আমাদের যেটা নেই, সেটা সাফিশিয়েন্ট কন্ডিশন। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা প্রতিষ্ঠান নিয়ে কথা বলছি। অধিকাংশ আলোচনাই সীমিত আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানসংক্রান্ত। অর্থাৎ ফরমাল রুলস বা রাষ্ট্রের বিভিন্ন অংশ নিয়ে কথাবার্তা। খুব জরুরি কিন্তু যে কথা জারি নেই। উন্নয়নের অভিজ্ঞতা ইনফরমাল ইনস্টিটিউশন নিয়ে। যদি জাপান, চীন, কোরিয়া, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার উন্নয়নের  দিকে নজর দিই তাহলে দেখব ইনফরমাল ইনস্টিটিউশন বা অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান বেশ প্রভাব ফেলেছে। ইনফরমাল ইনস্টিটিউটকে মোটাদাগে ভাগ করলে নর্মস ও ভ্যালুস পাওয়া যাবে। রীতি-রেওয়াজ হচ্ছে ব্যক্তির বিষয় আর মূল্যবোধ হচ্ছে সমাজের বিষয়। যেকোনো বড় পরিবর্তন আকাঙ্ক্ষী সমাজের ক্ষেত্রে আমাদের বেশি দরকার হচ্ছে রীতি-রেওয়াজ ও মূল্যবোধের পরিবর্তন। এটাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানই নিয়ন্ত্রণ করে আসলে আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান কীভাবে হবে। উদাহরণ দিই। জাপান, কোরিয়া বা চীনে যে নিয়ম মানা বা লাইন দাঁড়ানো বড় আকারে উল্লম্ফন ঘটিয়েছে তাদের উৎপাদনশীলতা ও বহুমুখীকরণে। ঠিক উল্টোদিকে যদি আমরা চিন্তা করি, ধরা যাক ঢাকা শহরের ময়লা ব্যবস্থাপনায় একটা সংস্কার পরিকল্পনা আনলাম, প্রতিটা বাড়ির সামনে আমরা তিনটা কনটেইনার রাখলাম। বাড়ি থেকে একটা ইফিশিয়েন্ট সিস্টেম তৈরি করলাম, যেখানে ময়লাটা প্রসেস করা হবে। দেখা গেল আমাদের নর্মসের কারণে রান্নাঘর থেকেই ময়লা ফেলে দিচ্ছি। এক্ষেত্রে আমার সোর্সেই গলদ। এটা নর্মসের বিষয়। আবার ভ্যালুসের বিষয়। এ ব্যাপারে একটা উদাহরণ দিই। যেমন আমাদের সবারই দরকার রাজমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি, রঙমিস্ত্রি। কিন্তু অভিবাসী আয় বাড়াতে সেমিস্কিল মানুষের বিরাট একটা বাজার আছে। আমরা খুবই চেষ্টা করছি যে কীভাবে কারিগরি বিদ্যালয়ে ভর্তি বাড়ানো যায়। কিন্তু যাচ্ছে না। কেন যাচ্ছে না? আমরা সব কর্মই সম্মানের এবং ওই কর্ম না থাকলে যে পুরো প্রক্রিয়া চলবে না, সেটা মানতে রাজি না। আমরা কোনো ক্যাম্পেইন করছি না যে সব কর্মই সম্মানের। যিনি রাস্তা পরিষ্কার করেন, তিনি ওটা না করলে রাস্তাটা পরিষ্কার থাকত না। সব কর্মই সম্মানের এ মূল্যবোধ যতক্ষণ না আসবে ততক্ষণ মানুষ কোনোভাবেই কারিগরি শিক্ষায় যেতে অনুপ্রাণিত হবেন না। আমরা সব পেশাকে সম্মানের চোখে দেখি না, সব কর্মকে সম্মানের চোখে দেখি না।

এক্ষেত্রে আমাদের বড় রকমের ঘাটতি হচ্ছে একাডেমিক প্রক্রিয়ায়। এটা বোঝার জন্য আমাদের এক্সপেরিয়েন্সিয়াল লার্নিং নেই। আমাদের বিভিন্ন রকম ক্লাব, সভা, সমিতি ও সমাজসেবামূলক কার্যক্রম চালু আছে। কিন্তু এক্সপেরিয়েন্সিয়াল লার্নিংয়ের জন্য সেগুলোর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছি না। যুক্ত হয়ে তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা, যুক্ত হয়ে তার অ্যাবস্ট্রাকশন করা, থিওরাইজেশন করা দরকার। আমরা লক্ষ করি— বিদ্বৎ সমাজ প্রতিবাদে থাকে বা বিবৃতি দেয় বা এক ধরনের দান-খয়রাতের সঙ্গে হয়তো থাকে, আমাদের বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হলে বোঝা যায় কী ধরনের নর্মস ও ভ্যালুসগুলো আছে। এক্সপেরিয়েন্স লার্নিংয়ের ক্ষেত্রে জনবুদ্ধিজীবীদের বড় রকমের যুক্ত হওয়া দরকার। সেজন্য তাদের বেশি মাত্রায় সামাজিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে।

 

শ্রুতলিখন: শর্মিলা সিনড্রেলা