নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চ আয়ের দেশে পৌঁছতে হলে আমাদের কৃষি খাদ্য খাতে একটা বড় পরিবর্তন প্রয়োজন। আর কৃষি খাদ্য খাতে পরিবর্তন মানে শুধু খাদ্যের পর্যাপ্ততা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ নয়, সেই সঙ্গে খাদ্যের গুণগত মানও সুরক্ষা করা। বাংলাদেশের ৫০ বছর: কৃষির রূপান্তর ও অর্জন শীর্ষক সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী আলোচকরাও এ বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন। পাঁচ দশকে বাংলাদেশের কৃষি অনেক দূর এগোলেও উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তির ব্যবহার, খাদ্যের মানসহ বেশকিছু ক্ষেত্রে উন্নতির আরো সুযোগ রয়েছে। ২০৪১ সালের মধ্যে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশের কাতারে পৌঁছতে হলে কৃষি খাদ্য খাতের উন্নয়ন দর্শনটা কী হবে, সেটাই এখন আমাদের ঠিক করতে হবে। ভিশন হতে হবে এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক কৃষি খাত প্রতিষ্ঠা করা, যা কিনা নিরাপদ, লাভজনক ও টেকসই কৃষি খাদ্য ব্যবস্থার পাশাপাশি পুষ্টিকর খাদ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করে এবং একই সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে প্রয়োজনীয় সংযোগ রক্ষা করে একটি উচ্চ আয়ের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হয়।

কৃষিকাজের প্রতি অনীহা, ফলনে আশানুরূপ লাভবান না হওয়ায় বর্তমানে কৃষি পেশা হিসেবে যথেষ্ট অপছন্দে পরিণত হয়েছে। কৃষির এমন দুরবস্থার পেছনে ব্যক্তিগত ও সামাজিক বেশকিছু কারণ বিদ্যমান। এছাড়া খাদ্যশস্য উৎপাদন বৃদ্ধি, মোট জাতীয় আয় ও উৎপাদনে ব্যাপক ভূমিকা রাখার সঙ্গে সঙ্গে সর্বাধিক কর্মসংস্থানের উৎস হওয়া সত্ত্বেও কৃষি পেশা হিসেবে এখনো অনীহার শিকার। চলমান সমস্যার মধ্যে প্রথমত কৃষি ব্যবস্থা প্রকৃতির খেয়ালখুশির ওপর নির্ভরশীল। কেননা কৃষিজাত ফসল অতিদ্রুত পচে যায়। আমাদের দেশে সাধারণত মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে অতিবৃষ্টির কারণে প্রতি বছর ব্যাপক ফসল নষ্ট হয়ে যায়। তাই নতুন প্রজন্মের কাছে কৃষিকাজ পেশা হিসেবে ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। আবার আবাদযোগ্য ভূমির পরিমাণ দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। দ্রুতগতিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও তাদের আবাসস্থল তৈরিতে দেশের মোট আবাদকৃত জমির একটি বড় অংশ প্রতি বছর কমে যায়। ফলে কৃষি বিপ্লব হুমকির মুখে ও অসম্ভব মনে হয়। কৃষিকাজে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে অধিকাংশই দরিদ্র ও বর্গাচাষী। ফলে পর্যাপ্ত মূলধনের অভাবে অনেক সময় কৃষকের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ফসল ফলানো সম্ভব হয় না। অনেক সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা তাদের ঋণে সমঝোতা করলেও শর্তাবলির দুর্বোধ্যতা, গ্রহণে আপত্তি, ঋণ গ্রহণের কৌশল না বোঝা ও অশিক্ষিত হওয়ায় ঋণ দেয়া বা পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

২৫ বছর আগেও ভিয়েতনামের কৃষি বাংলাদেশ থেকে পিছিয়ে ছিল। আজ প্রতি হেক্টরে উৎপাদনশীলতায় দেশটি বেশ এগিয়ে। আর পেছনে কাজ করেছে যান্ত্রিকীকরণ, নতুন প্রযুক্তির সন্নিবেশ ও উন্নত জাত। বাংলাদেশে হেক্টরপ্রতি ফলন এখনো মাত্র ২ দশমিক ৭৪ টন। যেখানে জাপান হেক্টরে পাঁচ টন আর চীন সাড়ে ছয় টন ধান পায়। এমনকি ভিয়েতনামের ফলন ৫ দশমিক ৮৪ টন। আমরা চীন-জাপানের মতো উন্নত নই কিন্তু ভিয়েতনামের মতোও ফলন ফলাতে পারি না। ছোট্ট একটি দেশ, যা আয়তনে বাংলাদেশের অর্ধেকের কম, তারা ৯৪ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য রফতানি করছে। আমরা পাঁচ বিলিয়নে আটকে রয়েছি। যেখানে আমরা কৃষিপ্রধান দেশ।

এ কথা সত্য, চাষীদের জন্য সরকার কয়েক ডজন প্রকল্প তৈরি করেছে। কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে। কৃষি উপকরণে ভর্তুকি, সহজ শর্তে ঋণ, সহায়ক মূল্যে ফসল কিনে নেয়াসহ কৃষি প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে সরকার যেন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। এটা আশ্চর্য নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো ধনী দেশেও সরকার চাষীদের বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলার ভর্তুকি দেয়। কিন্তু বাংলাদেশে এত কিছু সত্ত্বেও চাষীদের একটা বড় অংশই চাষ ছেড়ে দিতে পারলে যেন বেঁচে যায়। আজ প্রযুক্তির বহু উন্নতি হয়েছে, চাষীর কাছে নানা প্রযুক্তি ও সুবিধা সরকার পৌঁছে দিয়েছে। কিন্তু চাষীকে আত্মনির্ভর হতে দেয়া হয়নি। কম খরচে উন্নতমানের অধিক ও পুষ্টিমানসম্পন্ন ফসল ফলিয়ে বাজারে চড়া দামে বিক্রির ক্ষমতা, এটাই চাষে স্বনির্ভরতার উপায়। প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, বিপণন—এসবেরই উদ্দেশ্য শেষ পর্যন্ত উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং বাজারে লাভ বাড়ানো। সরকারি সহায়তার লক্ষ্যও হতে হবে চাষীর সঙ্গে বাজারের মজবুত বোঝাপড়া। তাকে নতুন প্রযুক্তি, নতুন বিপণন ব্যবস্থা, নতুন বাজারের খোঁজ দেয়া। সরকারের কাজ বিস্তর। উন্নত কৃষি খামার তৈরি ছাড়াও কৃষিকে নিবিড়ভাবে যুক্ত করতে হবে খাদ্যশৃঙ্খলের সঙ্গে, ক্ষেতখামারের সঙ্গে যুক্ত হবে ফসলের প্রক্রিয়াকরণ, খাদ্যগুণ বৃদ্ধি, বিপণনের পরিকাঠামো তৈরি।

সুষ্ঠু কৃষি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে পুষ্টিসমৃদ্ধ নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এজন্য খাদ্যের মূল জোগানদাতা কৃষককে সচেতন করার পাশাপাশি প্রয়োজন বিপণন পর্যায়ে নজরদারি করা। আমাদের নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে যে কৃষকটি কাজ করছেন, তিনি যাতে বালাইনাশকের সঠিক প্রশিক্ষণ পান, সহজে ও কম খরচে নিরাপদ বালাইনাশক ব্যবহার করতে পারেন, হতাশ হয়ে যেন কীটনাশকে ঝুঁকে না পড়েন সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। আবার বিপণন পর্যায়ে গিয়েও খাদ্যে যাতে ফরমালিনের মতো রাসায়নিক মিশে না যায় তার নজরদারিও দরকার। এছাড়া খাদ্যনিরাপত্তায় আরো কিছু চ্যালেঞ্জ হলো ক্রমহ্রাসমান জমি, ক্রমহ্রাসমান কৃষি শ্রমিক ও এর বিপরীতে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা। অল্প জমিতে বেশি ফসল ফলানো ও নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনে বর্তমানে সারা বিশ্বেই বায়োটেকনোলজি অনুশীলন করা হচ্ছে। এ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য ও এ ধরনের খাদ্যে পুষ্টির গুণাগুণের বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ ও জ্ঞানসম্পন্ন ভিত্তি স্থাপন করতে হবে। দেশে কৃষি শ্রমিকের সংখ্যা কমছে। তাই ক্রমহ্রাসমান কৃষি শ্রমিকের চাহিদা মেটাতে এখন কৃষির যান্ত্রিকীকরণও জরুরি। সম্প্রতি করোনা মহামারী শুরুর পর প্রধানমন্ত্রীও এ উদ্যোগ নেয়ার কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘পুষ্টির জোগান বাড়াতে হবে। তাছাড়া করোনাভাইরাসের কারণে সারা বিশ্বে যে সংকট দেখা দিয়েছে, খাদ্যের অভাব যেন না হয় সেদিকে লক্ষ রেখে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে হবে। কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণে আরো উত্কর্ষ চাই। পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা চাইছি প্রতিটি ক্ষেত্রে বিজ্ঞানসম্মত উন্নত একটা প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে এগিয়ে যেতে।’

২০৪১ সালের জন্য কৃষি খাতের লক্ষ্য স্থির করার ক্ষেত্রে প্রধানত চারটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, উন্নত খাদ্য ও পুষ্টি সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ। দ্বিতীয়ত, প্রতিযোগিতামূলক পণ্য উৎপাদন ও উন্নত বাজারজাতের ব্যবস্থা করা এবং কৃষি ক্ষেত্রে ক্লাস্টার ও ভ্যালু চেইনের বিকাশ করা। তৃতীয়ত. ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের স্বার্থ মাথায় রেখে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদার করার পাশাপাশি চাহিদা সম্প্রসারণমূলক সেবাগুলোর প্রতি গুরুত্ব প্রদান। এক্ষেত্রে বিকেন্দ্রীভূতকরণের ভূমিকা অনস্বীকার্য। চতুর্থত, চাল, শাকসবজি, ফলমূল ও মসলা, প্রাণিজ প্রোটিন, দুগ্ধজাত পণ্য, মাছ এবং অন্যান্য পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে হবে। যা কিনা আমাদের সীমিত জমির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি, বৃহৎ পরিসরে খাদ্য উৎপাদন এবং যান্ত্রিক চাষাবাদ ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব। এক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এবং গুরুত্ব অনুযায়ী কৌশল নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি।  বাংলাদেশকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন এবং অন্যান্য পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের বিরুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা রাখা যায়, একই সঙ্গে কৃষিপণ্যের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যতের খাদ্য-পুষ্টির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কৃষিতে দৃষ্টান্তমূলক পরিবর্তন প্রবর্তন করতে সক্ষম হতে হবে। এক্ষেত্রে আমাদের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির প্রাপ্যতা  নিশ্চিতকরণের পাশাপাশি এর গ্রহণযোগ্যতাও নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে কৃষি সম্প্রসারণ ঘটাতে হবে। জমির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি কীভাবে উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে শ্রম উৎপাদনশীলতা বাড়ানো যায়, সেটাও ভেবে দেখতে হবে। মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের প্রযুক্তিগত শিক্ষা সম্প্রসারণের পাশাপাশি উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সুতরাং এসব কার্যক্রমের সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনা করে কৃষি খাতকে আরো কীভাবে সম্প্রসারণ করা যায়, তা ভাবার সময় এসেছে।