সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে খাদ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশে খাদ্য ঘাটতির কোনো আশঙ্কা নেই। তিনি কৃষি মন্ত্রণালয়ের ফসল উৎপাদনের প্রাক্কলিত তথ্য ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) থেকে প্রাপ্ত জনসংখ্যার মাথাপিছু পরিভোগের ভিত্তিতে বিষয়টি ব্যাখ্যাও করেন। হতাশাজনক বিষয় হলেও সত্য, দেশে কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও ভোগের তথ্য নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। কৃষিমন্ত্রী থেকে শুরু করে পরিকল্পনামন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে কৃষি তথ্যের ঘাটতি ও বিভ্রান্তি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে কথা বলেছেন। ফলে খাদ্যমন্ত্রীর দাবি কতটা যৌক্তিক তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। বৈশ্বিক খাদ্য পরিস্থিতিও সুখকর নয়। করোনা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত ও খাদ্য শৃঙ্খল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশেই খাদ্য ঘাটতি দেখা গেছে। বিশ্ব খাদ্য সংস্থাও খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কা ব্যক্ত করেছে। ফলে এ মুহূর্তে খাদ্য ঘাটতি নেই বলে ভবিষ্যতে হবে না—এমন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যাবে না। এর পরিণতি কতটা খারাপ হতে পারে তা নিকট অতীতে বাংলাদেশ খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছে। কাগজে-কলমে বাংলাদেশ খাদ্য উদ্বৃত্ত থাকলেও প্রতি বছরই বিপুল পরিমাণ খাদ্য আমদানি করতে হচ্ছে। চলতি বছর তার ব্যতিক্রম হবে—এমন আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। তাই খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কা না থাকলেও পর্যাপ্ত প্রযুক্তি নেয়া দরকার।
শস্য, সার ও শক্তির অন্যতম উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয় রাশিয়া ও ইউক্রেনকে। কিন্তু করোনা মহামারীর প্রভাব কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই এবার দেশ দুটির মধ্যে চলমান যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী খাদ্য সরবরাহ সুরক্ষিত করার ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। করোনা মহামারীর আগেও পরিস্থিতি ভালো ছিল না, ক্ষুধা ধীরে ধীরে বাড়ছিল। এর মধ্যেই মহামারী আঘাত হানে। জাতিসংঘ মহাসচিব বলেছেন, ‘মহামারীর আগের তুলনায় বর্তমানে নতুন করে অনাহারে পড়েছে ১৬ কোটির বেশি মানুষ।’ ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা খাদ্যের প্রাপ্যতা ও দামের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে, যা বিশ্বব্যাপী খাদ্যনিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ চাহিদার প্রায় অর্ধেক গম ইউক্রেন ও রাশিয়া থেকে আমদানি করে। যদিও বিশ্বব্যাপী গম সরবরাহে এখন পর্যন্ত ব্যাঘাত ঘটেনি কিন্তু ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার কয়েক সপ্তাহে পণ্যটির দাম ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ গম ও বার্লি রফতানি হয় রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে। এছাড়া ইউক্রেন ভুট্টা ও সূর্যমুখী তেলের অন্যতম সরবরাহকারী, যা খাদ্য প্রক্রিয়াকরণে ব্যবহূত হয়। ২০১১ সালের পর থেকে দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকা অনেক পণ্যের সরবরাহ যুদ্ধের ফলে হ্রাস পাচ্ছে। বৈশ্বিক খাদ্য ব্যবস্থা সহসাই স্বাভাবিক হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে বাংলাদেশকেও তার খাদ্যনিরাপত্তার ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে। অধিক উৎপাদন হবে বলে বসে থাকার সুযোগ নেই।
জুনে চলতি বছরের শস্য আহরণ ও বাজারজাত নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে ইউক্রেনে। যুদ্ধের দরুন বাস্তুচ্যুতি দেশটির কৃষি ও শ্রমিকের সংখ্যা হ্রাস করেছে। সীমাবদ্ধ রয়েছে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন এবং ফলমূল ও শাকসবজি উৎপাদনও। সামরিক সংঘাতে বন্ধ হয়ে গেছে কৃষ্ণ সাগরে ইউক্রেনের বন্দরগুলো। অভ্যন্তরীণ পরিবহন পরিকাঠামো, যেমন রেল ব্যবস্থা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। পরিবহনের এমন নাজুক পরিস্থিতি খাদ্য আমদানির খরচ বাড়িয়ে দেবে। এছাড়া স্পষ্ট নয় স্টোরেজ ও প্রক্রিয়াকরণ সুবিধাগুলো অক্ষত থাকবে কিনা। সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব কৃষি খাতে পড়ছে। রাশিয়া বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারে একটি প্রধান খেলোয়াড়। বিশ্বব্যাপী কয়লা রফতানির ১৮ শতাংশ, তেলের ১১ শতাংশ এবং গ্যাসের ১০ শতাংশের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে দেশটি। সার, কীটনাশক ও লুব্রিক্যান্টের মতো কৃষিতে শক্তি প্রস্তুতে প্রয়োজন জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ। বিশ্বের জনসংখ্যার ৩৫ শতাংশের বেশি মানুষের জন্য গম প্রধান খাদ্য। চলমান সংঘাতের ফলে রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় দেশ থেকে গম রফতানি হঠাৎ কমে যেতে পারে। অন্য রফতানিকারকরা এ শূন্যতা পূরণ করতে সক্ষম হবেন কিনা তা এখনো স্পষ্ট নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, আর্জেন্টিনা এবং অন্যান্য দেশ থেকেও রফতানির পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। মিসর, তুরস্ক, বাংলাদেশ ও ইরান বিশ্বব্যাপী শীর্ষ গম আমদানিকারক। তাদের গমের ৬০ শতাংশেরও বেশি জোগান দেয় রাশিয়া ও ইউক্রেন। গমের উচ্চমূল্যের কারণে বিশ্বব্যাপী ভুট্টার বাণিজ্য সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সূর্যমুখী তেল ও অন্যান্য বিকল্প তেলের রফতানির সম্ভাবনাও অনিশ্চিত। ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, ইরান, তুরস্কসহ প্রধান সূর্যমুখী তেল আমদানিকারকদের অবশ্যই অন্যান্য সরবরাহকারী বা অন্যান্য উদ্ভিজ্জ তেল খুঁজে বের করতে হবে। উদ্ভিজ্জ তেলের উচ্চ চাহিদা পাম, সয়া ও রেপসিড তেলের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্যসংক্রান্ত পরিসংখ্যান নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। ২০১৬ সালের মাথাপিছু দৈনিক চাল ভোগের পরিমাণ নিয়ে একটি জরিপ চালিয়েছিল ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ইফপ্রি)। ওই জরিপে উঠে আসে সে বছর দেশে দৈনিক মাথাপিছু চাল ভোগের পরিমাণ ছিল ৪২৬ গ্রাম। যদিও বিবিএসের খানা আয়-ব্যয় জরিপের হিসাব বলছে, ওই বছর দেশের জনগণের দৈনিক মাথাপিছু চাল ভোগের পরিমাণ ছিল ৩৬৭ গ্রাম। কোনো পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি মানেই ঘাটতির সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু সঠিক তথ্য পাওয়া না গেলে সুন্দরভাবে লিখিত পরিকল্পনাও বাস্তবায়নে গলদ দেখা দিতে পারে। জনপ্রতি চালের যে ভোগ দেখানো হচ্ছে, তাতে উৎপাদনের সঙ্গে বড় ধরনের চাল উদ্বৃত্তের তথ্যও থাকতে হবে। কিন্তু বাজার তথ্য সেটি বলছে না। ফলে উৎপাদন বা ভোগের তথ্যে গরমিল রয়েছে। বাজার তথ্যের সঙ্গে আমাদের প্রকাশিত সব তথ্যের এক পর্যায়ে মিল থাকা প্রয়োজন। তা না হলে নীতি প্রণয়নে বিশেষ করে চাল আমদানি কিংবা রফতানির বিষয়ে সঠিক পদক্ষেপ নেয়া মুশকিল হয়ে পড়বে। আমরা তথ্যের বিষয়ে বিবিএসের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হতে চাই। প্রয়োজনে আরো সঠিকতার জন্য বৈজ্ঞানিক বিকল্প পদ্ধতি প্রয়োগের উদ্যোগ বিবিএসকেই নিতে হবে। অপরাপর উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশেও এখনো টেকসই খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, অনিয়ন্ত্রিত বাজার ব্যবস্থা, খাদ্যের অপচয় ও ক্ষতি, উৎপাদিত খাদ্যপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে সীমিত প্রবেশাধিকার—এসবই বাংলাদেশে টেকসই খাদ্য ব্যবস্থার অন্তরায় হয়ে আছে। কৃষি ও শিল্প খাতে বরাদ্দকৃত প্রণোদনার সুষ্ঠু বণ্টন, অর্থনৈতিক অঞ্চলে শ্রমঘন শিল্প স্থাপনের কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়ন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো বাহ্যিক ঝুঁকি হ্রাসকরণ, জমি, মাটি ও জলের মতো প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ ব্যবহারই নিশ্চিত করতে পারে টেকসই খাদ্য ব্যবস্থা।
ভারত প্রায় ৩০ শতাংশ লোককে ২ টাকা কেজিতে মাসের চাহিদা অনুসারে চাল বা গম সরবরাহ করছে নিরবচ্ছিন্নভাবে। এ কার্যক্রমে ভারত সরকারের পাশাপাশি রাজ্য সরকারগুলো সংশ্লিষ্ট রয়েছে। ওয়েবসাইটে পাওয়া তথ্যানুসারে ভারতের সরকারি খাদ্য মজুদ ক্ষমতা ৮ কোটি ৭৭ লাখ টন। এর মাঝে রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকারের গুদাম ও সাইলো রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের এ-বিষয়ক এজেন্সি ফুড করপোরেশন অব ইন্ডিয়া। তারা নিজস্ব গুদামের পাশাপাশি ব্যক্তি খাতকে উৎসাহ দিয়ে ৮-১০ বছরের জন্য ভাড়া নেয়ার চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থা করে। জমি কেনা ও গুদাম নির্মাণ নির্দিষ্ট উদ্যোক্তার কাজ। এভাবে ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করে চলছে। গুদামগুলোয় সময়মতো শস্য কেনা এবং নিয়মিত তা থেকে বণ্টনের জন্য বিশাল নেটওয়ার্ক রয়েছে সে দেশটিতে। এ বিষয়ে আমাদের নেটওয়ার্কও নেহাত ছোট নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে সিভিল সাপ্লাই নামের একটি প্রতিষ্ঠান বাংলা সরকার গড়ে তোলে। সেটা আমাদের আজকের খাদ্য অধিদপ্তরের পূর্বসূরি প্রতিষ্ঠান। তবে তারা নীতি নির্ধারণ করে না। যারা নীতি নির্ধারণ করে, তারা দেশে উৎপাদন মোটামুটি সন্তোষজনক হওয়া সত্ত্বেও কেন বিদেশ থেকে কিনতে হবে, এর গভীরে যায় না।
খাদ্যনিরাপত্তা একটি অতিগুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ বিষয়ে সরকার সচেতন রয়েছে। তবে সংকটের সময়ে অনেকেই দরজা বন্ধ করে দেয়। এ অভিজ্ঞতা রয়েছে আমাদের। খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য কৃষককে বিভিন্ন ধরনের উৎসাহ দেয়ার জন্য সরকারের প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়। তবে ভালো ফসল উৎপাদনের পরও সরকারের গুদামে মজুদের জন্য বিদেশ থেকে খাদ্য কেনার যুক্তি যথেষ্ট দুর্বল। এখন সামনে যে সুযোগটা আসছে, তাকে কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন বাস্তবমুখী তত্পরতা। হাওরের ফসল উৎপাদনের ব্যবস্থাটা কত নাজুক তা অনেকেই জানেন। একটি আগাম বন্যায় তলিয়ে দিতে পারে সবটাই। নিকট অতীতেও এমনটা হয়েছে। সে রকম হলে প্রভাব পড়বে গোটা বাজারে। আশা করছি তেমন হবে না। পরপর গত কয়েকটি বোরো ফসল সফলভাবে তুলে আনা গেছে। তবে তা এলেও তো সরকার বাস্তবমুখী কার্যক্রম না নিলে তাদের ভাণ্ডারে আসবে না। প্রকৃতি বৈরী না হলে ভালো ফসল ফলবে বলে অনেকেই আশাবাদ ব্যক্ত করছেন। আমরা চাই সে ফসল ফলানো কৃষক থাকুন হাসিমুখে। পাশাপাশি তাদের উৎপাদিত পণ্যের একটি ছোট অংশ দিয়ে গড়ে উঠুক নিরাপদ সরকারি মজুদ। সে মজুদ কাজ করবে চালের দামকে স্থিতিশীল রাখতে।










