সম্প্রতি ঝড়ে পড়ে একটি কবুতর আমাদের বাসার ব্যাক ইয়ার্ডে কাঠের ডেকে এসে আশ্রয় নিয়েছিল। ডান দিকের পাখাটি ভেঙে গেছে। উড়তে গিয়েও উড়তে পারছে না। আমার মেয়ে লুনা, সানিয়া ও তাদের মা বুলবুল চেষ্টা করেও তাকে কিছু খাওয়াতে পারেনি। পাখিটাকে ওভাবে রাখতেও তারা ভরসা পাচ্ছিল না। কারণ পাশের বাড়ির বিড়ালটা আসে প্রায়ই আমাদের ব্যাক ইয়ার্ডে ইঁদুর কিংবা পাখির ছানার খোঁজে। বিপদে পড়া কবুতরটাকে দেখলে বিড়ালটা নির্ঘাত ঘাড় মটকাবে। কাজেই ইন্টারনেট খোঁজাখুঁজি করে লুনা বের করল আমাদের বাসা থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে প্রেস্টন এলাকায় একজন ভলান্টিয়ার আছেন, যিনি এ-জাতীয় বিপন্ন পাখির সেবা-যত্ন করেন। কভিডজনিত কারণে নিজের বাসস্থান থেকে ১৫ কিলোমিটারের বেশি ড্রাইভ করা যায় না। কাজেই পুলিশের কাছ থেকে বিশেষ অনুমতি নিয়ে পাখিটাকে তার নতুন আশ্রয়ে পৌঁছে দিয়ে আসে লুনা। আমি ভাবলাম কী সৌভাগ্য আমাদের! আমার মেয়ে বাংলাদেশে জন্মানোর পরও একটি অস্ট্রেলিয়ান বিপন্ন পাখির উদ্ধারকাজে নিজের সময় ও শ্রম দান করতে কুণ্ঠাবোধ করছে না। কিন্তু দুর্ভাগ্যের ব্যাপার হলো, এ দেশের বিপন্ন পাখি কিংবা কুকুর-বিড়াল যে সেবা পাচ্ছে, আমাদের নিজের দেশে ছোট ছোট মানবশিশু, কিশোর ও যুবকরাও সে রকম সেবা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারে না।

সন্ধ্যায় খাওয়ার টেবিলে আজও রোজকার মতো বিভিন্ন দেশের জীবনমান নিয়ে কথা হচ্ছিল। সব আলোচনাই অবশেষে বাংলাদেশের অগণিত মানুষের মানবেতর জীবনযাপনের বর্ণনায় গিয়ে শেষ হয়। লুনা জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা বাবা, ওয়েলফেয়ার স্টেট হিসেবে অস্ট্রেলিয়া এত পরিচিত, বর্তমান অবস্থানে আসতে দেশটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কোন কোন জায়গায় কী সংস্কার করেছে, যা আমরা করতে পারিনি?

আমি বললাম, অস্ট্রেলিয়া অনেক বড় একটি দেশ। খেয়াল করলে দেখবে দেশটির বিভিন্ন রাজ্যের রাজধানীগুলো সাধারণত সমুদ্রতীরে অবস্থিত। মাঝখানের এলাকাগুলো সাধারণত মরুভূমি এবং সেগুলো খনিজ সম্পদে পরিপূর্ণ। সে কারণেই তারা খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলনের দিকে বেশি মনোযোগ দিয়েছে। এসব এলাকায় কৃষি উৎপাদন হয় না বললেই চলে। যা হয় তা ওই উপকূলীয় এলাকাগুলোতেই। দেশটিতে নগরবাসী মানুষই বেশি। গ্রামে বসবাসকারী মানুষ তেমন নেই। এ দেশে সম্পদের কোনো অভাব নেই। সম্পদ অনুপাতে জনসংখ্যা কম। সেজন্য তারা সবসময়ই উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিয়েছে। এখানে একটি বিষয় বলে রাখা ভালো, ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের দিক থেকে তারা বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় পিছিয়ে আছে। এর দুটি কারণ—এক. স্থানীয় চাহিদা কম, দুই. উচ্চ নৈতিকতাসম্পন্ন উৎপাদন প্রক্রিয়া। দ্বিতীয় বিষয়টি আরো স্পষ্ট করে বলা যায়, এখানে শ্রমিকদের বেতন দিতে হয় অনেক বেশি। পরিবেশসংক্রান্ত বিষয়গুলোর প্রতি তারা খুব সচেতন। পরিবেশ দূষণের কথা ভেবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তারা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। এসব শ্রমঘন শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের দিয়েই গঠিত হয়েছে অস্ট্রেলিয়া। দেশটিতে এত শ্রমিক আগে ছিল না। তাদের আনা হয়েছে ইংল্যান্ড থেকে। ওখানে অপরাধের শাস্তি হিসেবে যাদের যাবজ্জীবন জেল হতো, তাদের অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে এসে কাজে লাগিয়ে দেয়া হতো। দেশটিতে কর্মরত শ্রমিকদের মধ্যে এমন লোকের সংখ্যাই বেশি। ভূস্বামী হিসেবেও অনেকে এসেছেন। তারা এসে এ দেশে কৃষিকাজ শুরু করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে গরু, ভেড়া ও তুলা চাষ। এসব কাজের ভিত্তি ছিলেন শ্রমিকরা। আগেই উল্লেখ করেছি, অস্ট্রেলিয়ায় উৎপাদন প্রক্রিয়া উচ্চ নৈতিকতাসম্পন্ন। এ দেশে শ্রমিকের স্বার্থ সুরক্ষার ক্ষেত্রে কোনো রকম ছাড় দেয়ার অবকাশ নেই। সরকার যেকোনো পার্টিরই হোক, লেবার, লিবারেল কিংবা ন্যাশনাল—সবাইকেই শ্রমিকদের স্বার্থ দেখতে হয়। এভাবেই অস্ট্রেলিয়া ক্রমে পরিণত হয়েছে ওয়েলফেয়ার স্টেটে।

লুনা জানতে চাইল এখানকার আদিবাসীরা চাষাবাদ করত কিনা। চমত্কার প্রশ্ন, আমি বললাম। এতদিন আমরা জানতাম আদিবাসীরা চাষাবাদ জানত না। প্রাগৈতিহাসিক নর-নারীর মতো তারাও শিকার ও ফলমূল খেয়ে দিন কাটাত। কিন্তু সম্প্রতি অতি উচ্চমানের গবেষণার মাধ্যমে পরিষ্কারভাবে জানা গেছে যে ব্রিটিশরা এ দেশে আসার বহু আগে থেকেই এখানে অনেক উঁচু মানের কৃষি খামার প্রচলিত ছিল।

ব্রিটেন ও ইউরোপের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষির ভূমিকা ব্যাপকভাবে পরিচিত। তবে কৃষি উন্নয়নের জন্য যে পাঁচটি উপাদান দরকার তা হচ্ছে—উৎপাদনশীল বীজ চয়ন, জমি প্রস্তুতকরণ, বীজ বপন, উত্পন্ন পণ্য সযত্নে সংরক্ষণ এবং নিজেদের থাকার জন্য স্থায়ীভাবে আবাস নির্মাণ। আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে আদিবাসী কৃষির প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল মরুভূমির উপযুক্ত বীজ নির্বাচন, বপন ও আগাছামুক্তকরণ। আদিবাসীদের বেশির ভাগ ফসলই অস্ট্রেলিয়ার মতো রুক্ষ ও বেলে মাটিতে সেচ ছাড়াই ভালো জন্মাত। সরকার পরীক্ষামূলকভাবে এ-জাতীয় চাষাবাদের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ইউরোপ থেকে আসা শ্বেতাঙ্গরা আদিবাসীদের প্রতি যে অন্যায় করেছিল এবং তাদের জায়গাজমি কেড়ে নিয়েছিল, তার বিনিময়ে বর্তমান সরকার তাদের প্রতি এখন অনেক বেশি সদয়।

বাংলাদেশের তুলনায় অস্ট্রেলিয়ার অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা কীভাবে উন্নত?

মোটাদাগে অস্ট্রেলিয়ার অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা যেকোনো পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের মতোই। তবে নিয়মকানুনগুলো প্রণয়ন এমনভাবে করা হয়েছে যেন প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। উৎপাদনশীল খাতে যারা নিয়োজিত, তারা যেন তাদের আগ্রহ না হারায়; ভালো মুনাফা পায়। কোনো ব্যক্তি টাকা অলসভাবে না রেখে যেন উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করেন। বিনিয়োগকৃত অর্থের যে সুযোগ ব্যয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো সেদিকেও লক্ষ রাখে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করে যেন তাতে উৎপাদনকারীদের স্বার্থ ক্ষুুণ্ন না হয়।

লুনা জিজ্ঞেস করল, এখানে যে মানুষ আইন মেনে চলে, এটা কি এ দেশের আইনের কারণে, নাকি সততা তাদের সহজাত?

আমি বললাম, আমার মনে হয় আইন গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার। আইনে ব্যক্তিকে যথেষ্ট স্বাধীনতা দেয়া আছে এবং কিছু ফাঁকফোকরও রাখা হয়েছে। আইনপ্রণেতারা তো জানেন, একজন করদাতা কখন এবং কোন ক্ষেত্রে ফাঁকি দিতে চাইতে পারেন। সেসব ফাঁকফোকরও রাখা হয়েছে ইচ্ছে করেই, যাতে উদ্যোক্তাদের প্রেষণা নষ্ট না হয়। কেননা চূড়ান্তভাবে সরকার কর কম পেলেও ব্যবসাটা যদি সচল থাকে তাহলে অনেক দিক দিয়ে লাভ। উদাহরণস্বরূপ কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথাই বলা যায়। এসব ব্যবসা যদি সচল না থাকে তাহলে কর্মসংস্থান হবে কোত্থেকে? এখানে দেয়ালে একটা কথা প্রায়ই লেখা দেখা যায়, ‘বাই অস্ট্রেলিয়ান প্রডাক্ট অ্যান্ড গিভ ইওর চাইল্ড এ জব।’ আসলে এটা হচ্ছে তাদের মনের কথা। কোনো পণ্যে মেড ইন অস্ট্রেলিয়া লেখা থাকলে সবাই সেটা আগ্রহভরে কেনে। এসব পণ্যের দাম হয়তো কিছুটা বেশি কিন্তু খুব বেশি নয়। একদিকে সন্তানের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে দেশীয় পণ্য কেনার ব্যাপারে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে, অন্যদিকে মনোপলি কিংবা দাম বাড়ানোর ক্ষমতা রোধ করার জন্য আমদানি সহজ করে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ বাজারে প্রতিযোগিতা বজায় রাখার সব রকম ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ক্রেতারা দামের পাশাপাশি মানটাও দেখেন। এখানে আমদানীকৃত ইলেকট্রনিক পণ্যও অনেক পাওয়া  যায়। এসব পণ্য আসে মূলত চীন, ইতালি, ফ্রান্স থেকে। বাংলাদেশ থেকেও কিছু পণ্য আসে। বাংলাদেশের শাইনপুকুর ও মুন্নু সিরামিকের পণ্য অনেক নাম করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারত এখানে ওষুধের বাজারে প্রবেশের চেষ্টা করছে। উল্লিখিত কয়েকটি দেশের পাশাপাশি ইউরোপ ছাড়া আর কোনো দেশের পণ্য অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশ করতে পারে না। অর্থাৎ মানের দিকটাকে তারা খুব বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু এটা ঠিক, আউটসোর্সিং করতে গিয়ে কখনো কখনো মানের অবনতি ঘটছে। 

লুনা জানতে চায়, ভোক্তার অধিকার রক্ষার ব্যাপারে অস্ট্রেলিয়া আর বাংলাদেশের মধ্যে কি তুলনা করা যায়?

আমি বললাম, একটি দেশের আইনকানুনের ওপর কিন্তু অনেক বিষয় নির্ভর করে। কেউ অপরাধ করলে সাধারণত ধরে নেয়া হয় যে তার শাস্তি হবে। যদি না হয়, তাহলে অপরাধ বেড়ে যাবে। যেকোনো দেশের ক্ষেত্রেই একথা সত্য। অস্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে বড় পার্থক্য এখানেই। আমাদের দেশে ফাঁকি দেয়ার সুযোগ রয়েছে। মানুষ যে ইচ্ছাকৃতভাবে ফাঁকি দিচ্ছে তা নয়। সুযোগ রয়েছে বলেই তারা ফাঁকি দিচ্ছে। বলব না যে অস্ট্রেলিয়ায় অন্যায় হচ্ছে না। এ দেশের পুলিশও ঘুষ খায়; কিন্তু বাংলাদেশের মতো ব্যাপকভাবে নয়। যদি আমাদের মধ্যে সততা থাকত, এই অল্প সম্পদ দিয়েও আমরা ভালো করতে পারতাম। কিন্তু আমরা পারিনি দুটি কারণে—এক. আমরা সবসময় এক ধরনের অনিশ্চয়তায় ভুগি। অর্থাৎ আমি এখন যে রকম দিন যাপন করছি, আমার সন্তান যদি ভালো একটা চাকরি জোটাতে না পারে, তাহলে তার দিন কীভাবে চলবে। এ ধরনের অনিশ্চয়তামূলক চিন্তা থেকেই আমরা সন্তানের জন্য কিছু রেখে যেতে চাই। অস্ট্রেলিয়ায় এটা নেই বললেই চলে। তারা বরং মনে করে, মা-বাবা জন্ম দিয়ে পড়ালেখা শিখিয়েছে, এটুকুই যথেষ্ট। এর পরও তারা যদি কিছু করতে না পারে, সেটা রাষ্ট্র দেখবে। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও সম্পদ পুঞ্জীভূত করা কিন্তু ভালো বিষয় নয়। বিনিয়োগ না করে মানুষ যদি শুধু সম্পদ পুঞ্জীভূত করার চেষ্টায় লিপ্ত থাকে, অর্থনীতির জন্য সেটা ভালো ফল বয়ে আনে না। বিনিয়োগের সুফল তার পরিবার পাবে কিনা, এ নিয়ে কোনো ব্যক্তির মনে যদি সন্দেহ থাকে তাহলে তিনি তো বিনিয়োগই করবেন না।

একপর্যায়ে আমার মেজো মেয়ে সানিয়া জানতে চায়, বাংলাদেশে খনিজ সম্পদের মালিক কে—সরকার না ব্যক্তি?

আমি বললাম বাংলাদেশে গ্যাস, কয়লা, তেল বা চুনাপাথর ইত্যাদি যা খনিজ সম্পদ আছে, তার সবই সরকারি মালিকানাধীন। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ায় এগুলো ব্যক্তিমালিকানাই বেশি। সরকারি মালিকানায় নেই বললেই চলে। তবে খনিজ সম্পদ উত্তোলন করতে গেলে সরকারের অনুমতি লাগে। এজন্য নির্দিষ্ট হারে সরকারকে কর দিতে হয়। এক্ষেত্রে লোকদের ব্যবসা বাড়ানোর সুযোগ আছে। যেমন ধরো, যারা স্বর্ণ উত্তোলন করে, তাদের অনেক বড় অংকের বিনিয়োগ করতে হয়। এর মধ্যে কিছু আছে বড় করপোরেট, আর কিছু আছে লিমিটেড কোম্পানি। আর কিছু আছে প্রাইভেট লিমিটেড। 

সাম্প্রতিক বিশ্বমন্দার সময় অস্ট্রেলিয়া কী নীতি অনুসরণ করেছিল—বুলবুল (আমার স্ত্রী) জিজ্ঞেস করল।

আমি বললাম, অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অনেকভাবেই সম্পৃক্ত। সে সময় লেবার পার্টি ক্ষমতায় ছিল। সরকার অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে বিষয়টি মোকাবেলা করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বিশ্বমন্দার সময় অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতি অতটা সমস্যায় পড়েনি। কারণ এখানকার ম্যানুফ্যাকচারিং খাত খুবই ছোট। এ কারণে বিশ্বমন্দার প্রভাব এখানে সেই মাত্রায় পড়েনি, যতটা ইউরোপের দেশগুলোর ওপর পড়েছে। রিসোর্স খাতে কিছুটা ভাটা পড়েছিল যদিও। খাতটি যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেজন্য কর ও সুদের হার কমানো হয়েছে। ফেডারেল সরকার উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অনেক ব্যয় করেছে। এর মধ্য দিয়ে নতুন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বিশ্বমন্দার প্রভাব মানুষের ওপর ততটা পড়েনি। যুক্তরাষ্ট্রেও এটা  করা হয়েছে।  বুশ সরকার প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার এবং ওবামা সরকার প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার অর্থ বাজারে ছেড়েছে, শুধু মানুষকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে চাঙ্গা রাখার জন্য।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কেমন প্রভাব পড়েছিল?

বাংলাদেশ তো টেরই পায়নি। যুক্তরাষ্ট্রে যখন প্রবৃদ্ধির হার অনেক কম ছিল, সে সময় বাংলাদেশ ৬ থেকে সাড়ে ৬ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের প্রবৃদ্ধির হার ছিল নেতিবাচক। সে হিসাবে আমরা খুব ভালো করেছি। ভারত ও চীনও ভালো করেছে। আমরা আরো ভালো করতে পারতাম যদি আমাদের পরিকল্পনা আরো মজবুত হতো।

অস্ট্রেলিয়ার মার্কেটটা গড়ে উঠেছে পরিকল্পনা অনুযায়ী। এখানে চাহিদা ও জোগানের মধ্যে খুব বেশি ব্যবধান সৃষ্টির সুযোগ নেই। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, এখন অস্ট্রেলিয়ায় ডাক্তারের চাহিদা বেশি। সেই অনুযায়ী ডাক্তারও তৈরি হচ্ছে। তবে সেটা অতিরিক্ত নয়। কতজন লোককে ডাক্তার হিসেবে তৈরি করা হবে কিংবা বিদেশ থেকে কতজন ডাক্তার দেশটিতে অভিবাসন করবেন, সেটাও মেডিকেল কাউন্সিল অব অস্ট্রেলিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। এই কর্তৃপক্ষ চিন্তা করে, এসব লোক এসে আমাদের ওপর বোঝা হবে নাকি সেবা দিয়ে নিজেরা কিছু অর্জন করবে। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, বাংলাদেশে এ ধরনের ভারসাম্য রক্ষা করা হচ্ছে না। মার্কেটে কী ধরনের এবং কতসংখ্যক গ্র্যাজুয়েট প্রয়োজন, এ ব্যাপারে কোনো নির্দেশিকা আমাদের কাছে নেই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাছেও নেই। এ অসামঞ্জস্যই একটা বড় কারণ। গ্র্যাজুয়েট হয়ে অনেকে চাকরি পাচ্ছেন না এবং অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত মানের লোক পাওয়া যাচ্ছে না। বিদেশ থেকে লোক আনতে হচ্ছে। এটা আমাদের পরিকল্পনার দুর্বলতা।

আমার মনে হয়, দক্ষ জনবল তৈরির ক্ষেত্রে প্রকৃতপক্ষে কোনো চেষ্টাই আমাদের দেশে হয়নি। যদি হতো, এর কিছু না কিছু সুফল আমরা দেখতাম। অনেকটা  অপরিকল্পিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে এবং কোন বিষয়ে কতজন ভর্তি হচ্ছে, এ নিয়ে কেউ ভাবছে না। এ শিক্ষা শেষ করে সে কী করবে? যার মা-বাবার সামর্থ্য আছে, সে হয়তো পড়ালেখা শেষ করে ব্যবসা-বাণিজ্য করছে। কিন্তু যারা গরিব ঘর থেকে আসে, যাদের মা-বাবা অনেক আশা নিয়ে সন্তানকে পড়ালেখা করান, তাদের উপায়টা কী? তারা না পাবে দেশে চাকরি, না পাবে বিদেশে।

এ পর্যায়ে লুনা মন্তব্য করে, আমাদের সরকার তো অনেক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান চালায় বাবা। এ সম্পর্কে কিছু বলো। আমি বললাম, এসব প্রতিষ্ঠানের দুর্দিনে সরকার এগুলো চালানোর দায়িত্ব নিয়েছিল। এখন সরকার যদি মনে করে তাদের জন্য যে পরিমাণ লোকসান দেয়া হয়েছে, সেই পরিমাণ টাকা মুনাফা করে ওগুলো বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া হবে, অর্থনৈতিক বিচারে এটাকে সুবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত বলা যাবে না। যেহেতু এ-খাতসংশ্লিষ্ট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো মুনাফা করতে পারছে, সেহেতু এগুলো বেসরকারি খাতেই ছেড়ে দেয়া উচিত। অতীতে লক্ষ করেছি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিতে গিয়েও এক ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়। এগুলো চলে যায় দলীয় ও পরিবারের লোকজনের হাতে। এ ব্যাপারে বিশ্বমন্দার সময়ে নরওয়ে ও ফিনল্যান্ডের একটা উদাহরণ দিতে পারি। যেসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভালো করছিল না, মন্দার সময়ে সরকার সেগুলো নিজের আয়ত্তে নিয়ে নেয়। এরপর প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাভজনক করার মতো সংস্কার করে সেগুলো পুনরায় ছেড়ে দেয়া হয় বেসরকারি মালিকানায়। আর যেগুলোকে কোনোভাবেই লাভজনক করা সম্ভব নয়, সেগুলো ক্রমে বন্ধ করে দেয়া হয়। কিন্তু আমাদের দেশে হয়েছে কী? পাকিস্তান চলে যাওয়ার পর কিছু প্রতিষ্ঠান সরকার নিজের আয়ত্তে নিতে বাধ্য হয়েছিল। পরে বেসরকারি মালিকানায় দেয়ার সময় সেগুলো বিক্রি করা হয়েছে পানির দামে। আমি নির্দিষ্ট কোনো সরকারের নাম বলব না। শুধু বলব, এ ধারা যদি অব্যাহত থাকে তাহলে এসব প্রতিষ্ঠান কখনো লাভের মুখ দেখবে না। 

বেকার সমস্যা সমাধানের জন্য শিল্পায়নের কোনো বিকল্প  নেই। আর শিল্পের বিষয়টি বিশ্ব প্রতিযোগিতার ওপর নির্ভরশীল। আমরা যদি আরো কম দামে ও দক্ষভাবে বেশি উৎপাদন করতে না পারি, তাহলে ক্রেতারা সস্তা দামে যেখানে পণ্য পাবে সেখানেই যাবে।

আমরা দেখতে পাচ্ছি, নিজের দেশে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিবর্তে সরকারের মধ্যে বিদ্যুৎ আমদানির প্রবণতা বেশি। গ্যাসও হয়তো আমদানি করা হবে। এর মধ্য দিয়ে বিদেশের প্রতি নির্ভরশীলতা আমাদের আরো বাড়ছে। গুটিকয়েক ছাড়া দেশে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হচ্ছে না। তার মধ্যে আবার কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাত্ত্বিকভাবে বলা হয়, বিদ্যুৎকেন্দ্র যত ছোট হবে, তার উৎপাদন খরচ তত বেশি হবে। আমরা যদি এসব ছোট কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা বাড়াই তাহলে দেশে বিদ্যুতের দাম কখনই কমবে না। এর মধ্য দিয়ে হাতেগোনা কিছু লোকের ভাগ্যের উন্নতি হতে পারে। কিন্তু দেশের উন্নয়ন হবে না।

অস্ট্রেলিয়া এ সমস্যাগুলো কীভাবে সমাধান করেছে?

এ প্রশ্নের উত্তরে একটা উদাহরণ উল্লেখ করতে হয়। সাউথ অস্ট্রেলিয়া ও ভিক্টোরিয়া প্রতিবেশী রাজ্য। সাউথ অস্ট্রেলিয়া একসময় ভিক্টোরিয়া থেকে কয়লা আমদানি করত। পরে একসময় তারা ভাবল, আমাদের নিজেদেরই তো কয়লা আছে। আমরা সেখান থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করি না কেন? প্রকৌশলীদের সঙ্গে পরামর্শ করে জানা গেল, ভিক্টোরিয়ার কয়লার মান অনেক ভালো। অন্যদিকে সাউথ অস্ট্রেলিয়ার কয়লায় সালফারের পরিমাণ বেশি। তা সত্ত্বেও রাজ্যটির সরকার সিদ্ধান্ত নিল নিজ রাজ্যেও কয়লা ব্যবহারের। এর পেছনে সরকারের যুক্তি ছিল, তাদের স্বনির্ভর হতে হবে। এছাড়া নিজ রাজ্যের কয়লা তুলতে এবং সেগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করতে পারলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যাবে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টা বাংলাদেশ কেন করছে না, সেটা আমার বুঝে আসে না।

আমরা দেখতে পাচ্ছি, প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ হারে হলেও বৈষম্য বাড়ছে। অর্থাৎ একশ্রেণীর মানুষের আয় বাড়লেও আরেক শ্রেণীর তা হচ্ছে না। এ থেকে বোঝা যায়, আমাদের প্রবৃদ্ধির বণ্টনও ঠিক নেই। বৈষম্য থাকা সত্ত্বেও সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি উন্নতি করতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটা ভালো কোনো নীতি নয়। কারণ বৈষম্য বাড়িয়ে শেষ পর্যন্ত আমরা লাভবান হব না। যেকোনো সরকারেরই উচিত জনগণের প্রতি ‘কমিটেড’ থাকা। জনগণের প্রতি সরকারের বিভিন্ন ধরনের কমিটমেন্ট থাকে। এগুলো যদি সরকার ঠিকঠাকভাবে পূরণ করতে চায় তাহলে দেখা যাবে আপাতদৃষ্টিতে অলাভজনক হলেও সেটা ‘লাভজনক’ হবে; অন্যদিকে আপাতদৃষ্টিতে লাভজনক হলেও সেটাকে ‘অলাভজনক’ মনে হবে। উদাহরণস্বরূপ, এখন যদি আমরা সবাইকে স্বাস্থ্যসেবা দিতে চাই সেজন্য আমাদের একটা বড় বাজেট লাগবে। এ অবস্থায় আমাদের চিন্তা হবে যে বিদ্যমান বাজেট দিয়ে কীভাবে সর্বোচ্চসংখ্যক মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দিতে পারি। তখন সবাই যদি বেশি খাই, বেশি ঘুমাই এবং হাঁটাহাঁটি না করি, তাহলে এক্ষেত্রে সরকারেরও ব্যয় বাড়বে। অন্যথায় কমসংখ্যক মানুষকে যাতে হাসপাতালে যেতে হয়, সরকারকে সে ব্যবস্থা করতে হবে। মানুষ যাতে নির্বিঘ্নে হাঁটতে পারে সেজন্য রাস্তা এবং প্রয়োজনীয় ব্যায়াম যাতে করতে পারে সেজন্য পার্ক নির্মাণ করতে হবে। মূল রাস্তার পাশে হাঁটার জন্য জায়গা রাখতে কিংবা পার্ক নির্মাণ করতে খরচ অনেক বেশি হয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে ভিন্ন বিষয়টিই বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। একজন মানুষ যদি বেশি হাঁটে কিংবা ব্যায়াম করে, তাহলে সে কম হাসপাতালে যাবে। ফলে চিকিৎসা ব্যয়ও কমে আসবে। এ অবস্থায় চিকিৎসার জন্য বরাদ্দ কমিয়েও এসব অবকাঠামো উন্নয়ন সম্ভব হবে। জনগণের প্রতি কমিটমেন্ট থাকলেই কেবল এসব সম্ভব। এটা না থাকলে কোনো পরিকল্পনাই কাজে আসবে না।

অস্ট্রেলিয়ায় দক্ষ জনশক্তি তৈরির ব্যবস্থা কেমন?

আগেই উল্লেখ করেছি, জনশক্তি তৈরিতে যে ভারসাম্য থাকা এবং রাখা দরকার, সেটা তারা করছে। শিক্ষাকে তাত্ত্বিক কিংবা সম্মানের পরিবর্তে এটাকে তারা গ্রহণ করেছে ব্যবহারিক একটি বিষয় হিসেবে। এখানে সেবামূলক পেশাসংক্রান্ত শিক্ষার চাহিদা বেশি। আমাদের দেশের মতো সেখানে মাস্টার্স ক্লাসে হাজার হাজার শিক্ষার্থী নেই। উন্নত যেকোনো দেশেই মাস্টার্স ক্লাসে আমাদের মতো এত বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থী দেখা যায় না। দক্ষ জনশক্তি তৈরির জন্য যে রকম ওরিয়েন্টেশন দরকার, সেটাই আমাদের দেশে নেই। তাহলে এটা তৈরি হবে কীভাবে? শুধু পাঠ্যবই মুখস্থ করে কেউ দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে ওঠে না।

আমরা নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছি। জীবনমান উন্নয়নের জন্য আমাদের কোন বিষয়গুলোয় আরো নজর দিতে হবে?

এটা এমন বিষয়, যা একটিমাত্র বিষয়ের ওপর নির্ভর করে না। এটি অন্য আরো অনেক বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। একদিনের চেষ্টা কিংবা কোনো ব্যক্তির একক প্রচেষ্টায় জীবনমান উন্নয়ন হয় না। ধরো, যার সম্পদ আছে আর যার নেই, বাইরে বের হলে দুজনকেই একই বাতাস থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করতে হচ্ছে। অর্থাৎ সম্পদ থাকা সত্ত্বেও একজন ব্যক্তি এখানে মানসম্পন্ন জীবনযাপন করতে পারছে না। বলতে চাইছি, মানসম্পন্ন জীবন শুধু অর্থের ওপরই নির্ভর করে না। এক্ষেত্রে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার। আমাদের গড় আয়ু হয়তো বাড়ছে। কিন্তু জীবনযাত্রার মান যদি কমে যায়, তাহলে সেই বাঁচা অর্থহীন। মরার মতো ঘরে চোখ বুজে পড়ে থাকার নাম জীবন নয়।

 

আলী আহমাদ রুশদী: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক

অস্ট্রেলিয়ান কম্পিটিশন অ্যান্ড কনজিউমার কমিশনের সাবেক অর্থনৈতিক উপদেষ্টা