ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক। তিনি ২০০৫ সালের মে থেকে ২০০৯ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষকতা করছেন, ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক সংস্থায়ও কাজ করেছেন। বর্তমানে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্কুলে অধ্যাপনা করছেন। বণিক বার্তা ও বিএলএফসিএ আয়োজিত ‘এনবিএফআই মেলা ২০২২’ উপলক্ষে আর্থিক খাতের বিভিন্ন বিষয় এবং আসন্ন বাজেট নিয়ে সাবেক এ গভর্নর ও অর্থনীতিবিদ বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এম এম মুসা
বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণের সুদ
মওকুফ সম্পর্কিত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন?
সুদ
মওকুফে কঠোরতা
দেখিয়ে একটা
সার্কুলার জারি
করেছে কেন্দ্রীয়
ব্যাংক। এটা
ভালো। তবে
কথা হলো,
এতদিন পরে
এ ধরনের
সার্কুলার জারি
তেমন গুরুত্ব
বহন করে
না। কেননা
এরই মধ্যে
অনেক ঋণ
বা সুদ
মওকুফ করে
দেয়া হয়েছে।
যারা ঋণ
মওকুফ করেছে,
সেটিকে স্বাভাবিকভাবে
গ্রহণ না
করে বিষয়গুলো
তদন্ত করে
দেখতে হবে।
কিছুদিন পরে
এটা অনেকেই
ভুলে যেতে
পারেন। কাজেই
কঠোর ব্যবস্থা
নিতে হবে।
আমরা দেখছি
দেশের অনেক
ব্যাংক কেন্দ্রীয়
ব্যাংকের দিকনির্দেশনা
পরিপালনই করে
না। এখানে
বিভিন্ন ধরনের
সংজ্ঞা দেয়া
হয়েছে, যা
আগেও ছিল।
প্রকৃতপক্ষে বর্তমান
সময়ের অজুহাত
দিয়ে ঋণ
মওকুফ করা
হয়েছে। যেসব
বড় বড়
গ্রাহকের ঋণ
মওকুফ করেছে,
তাদের ব্যবসা
চলছে না,
মন্দা চলছে,
দুর্যোগ চলছে—এসব
অজুহাতে মওকুফ
করেছে। কথা
হলো, ব্যবসা
করলে তো
বিভিন্ন ধরনের
ঝুঁকি থাকবেই।
এ ধরনের
অজুহাতে ঋণ
মওকুফের দৃষ্টান্ত
মোটেই ভালো
নয়। এর
আগেও সার্কুলারের
মাধ্যমে বাংলাদেশ
ব্যাংক যে
মরিটরিয়াম বাড়িয়েছে,
সেটা ব্যবসায়ীদের
একটার পর
একটা সুযোগ-সুবিধা
দেয়ার জন্য।
এটা আর্থিক
শৃঙ্খলার পরিপন্থী।
আমার মনে
হয়, এসব
বিষয় এখন
বাংলাদেশ ব্যাংককে
কঠোরভাবে দেখতে
হবে।
ঋণের সুদ
মওকুফের সুবিধা
সবার সমানভাবে
পাবেন না।
যারা সত্যিকার
অর্থে ঋণ
পরিশোধের চেষ্টা
করেছেন, শেষ
পর্যন্ত পারেননি,
তাদের অনেকেই
সুবিধাটা পাবেন
না। ব্যাংক
থেকে বলা
হবে, আদায়
করার চেষ্টা
করছি, পারছি
না। চেষ্টা
না করেও
এসব কথা
বলবে অনেকে।
কাজেই এটা
ব্যাংকের মূলধন
ও ক্যাপাসিটির
ওপর একটা
নেতিবাচক প্রভাব
ফেলবে।
ঋণ খেলাপি হওয়ার
বিষয়টি আগে
থেকে রোধ
করা কী
সম্ভব নয়?
বাংলাদেশ
ব্যাংকের অডিট
অ্যান্ড ইনস্পেকশন
বিভাগের এটা
দেখার কথা।
মাঝেমধ্যে তারা
পরিদর্শনে যেতে
পারে। দেখতে
পারে কত
টাকা ঋণ
নিয়েছে, এখন
কত টাকা
অনাদায়ী আছে
আর কত
টাকা সুদ
দিয়েছিল, কত
টাকা ছিল—এসব
উদাহরণ তো
বের করতে
পারে। বের
করে তাত্ক্ষণিক
ব্যবস্থা নিতে
পারে। নিয়ম
হলো বড়
ঋণ ও
ব্যাংকের পরিচালকদের
ঋণ হলে
বাংলাদেশ ব্যাংকের
ক্লিয়ারেন্স নিতে
হবে। ঋণগুলোর
ব্যাপারে ক্লিয়ারেন্স
নিয়েছে কিনা
তা দেখতে
হবে। অনেক
সময় হয়তো
ক্লিয়ারেন্স নেয়াই
হয় না।
এক্ষেত্রে বিষয়টি
খতিয়ে দেখে
দায়ীদের বিরুদ্ধে
শাস্তিমূলক ব্যবস্থা
না নেয়া
হয়, তবে
পরিস্থিতি আরো
খারাপ হবে।
তেমনটি হলে
সার্কুলারের কোনো
মূল্য থাকবে
না।
বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সুদহার বেেঁধ দিয়ে
একটা সার্কুলার দিয়েছে। বেড়ে
চলা মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় এটাকে
কীভাবে দেখেন?
আমি
বলব, ব্যাংকবহির্ভূত
আর্থিক প্রতিষ্ঠানে
সুদহার বেঁধে
দেয়ার বিষয়টি
অনেকটা অপ্রয়োজনীয়।
কারণ ব্যাংক
নয়-ছয়
সুদহার বেঁধে
দিয়েছে, এটাও
আমি সমর্থন
করি না।
ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক
প্রতিষ্ঠানে সাত-এগারো
করে বাংলাদেশ
ব্যাংক ফিক্সেশন
অব ইন্টারেস্ট
বিষয়টিকেই আবার
সাপোর্ট করেছে।
আমি মনে
করি, এটা
বরং ছেড়ে
দেয়া উচিত।
আমার আবেদন
হলো, নয়-ছয়
থেকেও বেরিয়ে
আসতে হবে।
আগে নয়-ছয়
করা হয়েছে,
এবার সাত-এগারো
করা হলো।
পরে বলা
হবে আরেকটা
সংখ্যা করি।
এসব ব্যবস্থা
নিয়ে মোটেই
অবস্থার উন্নতি
করা যাবে
না। দ্বিতীয়ত,
এখন ৬
দশমিক ৩
হলো মূল্যস্ফীতি।
এটা আরো
বাড়ছে। কাজেই
৭ শতাংশ
সুদহার যথেষ্ট
নয়। সাত
তো দিচ্ছেই,
দরকার হলে
আট-নয়
দিতে হবে।
এটা করেও
লোকের উন্নতি
হবে তা
নয়। যেসব
আর্থিক প্রতিষ্ঠানের
ব্যবস্থাপনা ভালো,
যাদের প্রতি
লোকের আস্থা
আছে সেসব
আর্থিক প্রতিষ্ঠানের
দিকে যাবে
মানুষজন। অন্যদিকে
১১ শতাংশ
সুদ দিয়ে
ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক
প্রতিষ্ঠান থেকে
ঋণ নেবে
বলে মনে
হয় না।
কারণ যারা
এসব প্রতিষ্ঠানে
যান তারা
ব্যাংক থেকে
ঋণ না
পেয়েই অথবা
ব্যাংকঋণের অতিরিক্ত
পেতেই এখানে
আসেন। নানা
রকম ফি
যোগ করলে
১৪-১৫
শতাংশ হয়ে
যাবে। সাত-এগারো
সুদহার নির্ধারণ
কতটা সুফলদায়ক
হবে তা
নিয়ে আমার
যথেষ্ট সংশয়
আছে। বরং
যেসব এনবিএফআই
খারাপ করছে
সেগুলোকে ব্যবস্থাপনা
ও কার্যক্রম
উন্নয়ন করার
জন্য কেন্দ্রীয়
ব্যাংক কিছু
সময় দিতে
পারে; প্রয়োজনে
বিভিন্ন প্রকল্পে
ঋণ দেয়ার
জন্য কেন্দ্রীয়
ব্যাংক পুনঃঅর্থায়ন
করতে পারে।
এনবিএফআইয়ে সুশাসন
নিশ্চিতে উদ্যোগ
নিতে হবে।
যেসব এনবিএফআই
একেবারেই খারাপ
করছে সেগুলোকে
ভালো আর্থিক
প্রতিষ্ঠান বা
ব্যাংকের সঙ্গে
মার্জ করার
উদ্যোগ নিতে
হবে। ব্যাংক
ও আর্থিক
প্রতিষ্ঠানের উন্নতি
করতে হলে
দীর্ঘমেয়াদি টেকসই
ব্যবস্থা নিতে
হবে
আমরা দেখেছি বিশ্বের অনেক
সংকট আর্থিক ব্যবস্থা বা
আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের কি সতর্ক
হওয়ার সময়
আসেনি?
নিশ্চয়ই
এসেছে। কারণ
আর্থিক ব্যবস্থা
থেকে সৃষ্ট
যেকোনো সংকট
রিয়েল সেক্টরসহ
সবখানে ছড়িয়ে
পড়ে। এমনকি
মানুষের যে
স্বাভাবিক লেনদেন,
সেটিও ব্যাহত
হয়। কিছু
আর্থিক প্রতিষ্ঠানে
অনেক মানুষের
টাকা আটকে
গেছে। কোনো
ব্যাংক বা
আর্থিক প্রতিষ্ঠান
বিপর্যয়ে পড়লে
গ্রাহকদের অবস্থাও
খারাপ হয়।
আর্থিক খাতের
ব্যাধি দ্রুত
ছড়িয়ে পড়ে।
কেননা এ
খাত হলো
ইন্টারমিডিয়ারি। এর
মধ্য দিয়ে
সব ধরনের
লেনদেন সম্পন্ন
হয়। এটা
খারাপ হলে
মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্যেও
প্রভাব পড়বে।
২০০৮ সালে
যুক্তরাষ্ট্রে যে
আর্থিক সংকট
হয়েছিল, এর
শুরু আর্থিক
খাত থেকে।
আর্থিক খাত
থেকে দ্রুত
এটি অন্যান্য
খাতে ছড়িয়ে
পড়েছিল। শুধু
তাই নয়,
যুক্তরাষ্ট্রের গণ্ডি
ছাড়িয়ে ইউরোপসহ
অন্য অঞ্চলেও
ছড়িয়ে পড়িয়েছিল।
আমাদের এখনই
সতর্ক হতে
হবে।
শ্রীলংকার অর্থনৈতিক সংকট সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
শ্রীলংকার
সংকটকে অনেকেই
বাংলাদেশের সঙ্গে
তুলনা করছেন।
আবার অনেকে
বলছেন, একেবারে
না। আমাদের
কিছু হবে
না। দুটো
মতই কিন্তু
কট্টর। নিশ্চয়ই
শ্রীলংকার অর্থনৈতিক
সংকট থেকে
আমাদের শিক্ষা
নেয়ার বিষয়
আছে। কিছু
হবে না
বলে একেবারে
উড়িয়ে দেয়া
চলবে না।
শ্রীলংকায় শিক্ষার
হার বেশি,
সামাজিক সূচকে
ভালো অগ্রগতি
হয়েছে। কিন্তু
তাদের সমস্যাটি
হঠাৎ করে
হয়নি। বেশ
দীর্ঘদিন ধরে
এটা পুঞ্জীভূত
হয়েছে। সঠিক
সময়ে নজর
না দেয়ায়
এ সমস্যা
সৃষ্টি হয়েছে।
এটি আমাদের
জন্য শিক্ষণীয়।
আমাদের সমস্যাগুলো
যদি আমরা
এড়িয়ে যাই
এবং বলি
কোনো সমস্যাই
নেই, তবে
সেটি সবচেয়ে
বিপজ্জনক প্রবণতা।
তাদের জাতিগত
কিছু দ্বন্দ্ব
ছিল, পারিবারিক
শাসন ছিল।
অভ্যন্তরীণভাবে টেনশন
ছিল। এটা
তেমন প্রকাশ
পায়নি। বাইরেও
একটা ব্যাড
রেপুটেশন ছিল।
বিশেষ করে
কভিড আসার
আগে মসজিদে,
গির্জায় বোমা
হামলা হয়েছে।
এর মধ্যে
শ্রীলংকার রফতানি
ধীরে ধীরে
ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আমাদের দেশের
মতো স্বল্পমূল্যের
পোশাক নয়,
তারা অপেক্ষাকৃত
বেশি মূল্যের
পোশাক রফতানি
করে। সেটি
ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তৃতীয়ত, প্রায়
১০-১২
বছর একটা
পারিবারিক শাসনের
মধ্য দিয়ে
শ্রীলংকা যাচ্ছিল।
ফলে সেখানে
সুশাসনের প্রচণ্ড
অভাব বিদ্যমান।
জবাবদিহিতা নেই।
এরপর তারা
চীন ও
ভারত থেকে
বিপুল ঋণ
নিয়ে অবকাঠামো
তৈরি করেছে।
ঋণ নেয়া
খারাপ নয়।
কিন্তু সময়-ব্যয়
বাড়িয়ে নেয়া
প্রকল্প, তার
ওপর দুর্নীতি
সব মিলিয়ে
অর্থনীতিতে চাপ
পড়েছে। প্রকল্পগুলোর
উপযোগিতা আছে
কিনা তা
খতিয়ে দেখা
হয়নি। সময়ান্তরে
দেনা বেড়েছে।
অতএব, শ্রীলংকা
আমাদের জন্য
একটা বড়
উদাহরণ।
অনেকটা জিম্বাবুয়ের
মতো অবস্থা
কিংবা অনেক
আগে আর্জেন্টিনা
বা মেক্সিকোয়
একই রকম
পরিস্থিতি সৃষ্টি
হয়েছিল। অতএব,
মিসম্যানেজমেন্ট, মিস
গভর্ন্যান্স সব
মিলিয়ে এ
অবস্থা সৃষ্টি
হয়েছে। কভিড
আসার পর
অর্থনীতির চালক
পর্যটন খাত
বড় ধাক্কার
মুখে পড়েছে।
সেটি পুনরুদ্ধারে
অবশ্য তেমন
প্রচেষ্টা নেয়নি
তারা। দেশটার
ট্যুর অপারেটরা
বলতে পারত,
প্লেনের ভাড়া
অর্ধেক, হোটেল
ভাড়া অর্ধেক
কিংবা যাতায়াত
খরচ কমিয়ে
দিয়েছি, তোমরা
আসো। এটা
তো করেনি
তারা। এটা
করলে বৈদেশিক
মুদ্রা আয়ের
ধারা কিছুটা
অব্যাহত রাখত
পারত, এতটা
চাপে পড়ত
না অর্থনীতি।
বাংলাদেশের জন্য
এখন চ্যালেঞ্জ কী?
বাংলাদেশে
এখন আস্তে
আস্তে চাপ
বাড়ছে। আমদানি
ক্রমেই বেড়ে
চলছে। আমাদের
বৈদেশিক মুদ্রার
রিজার্ভ আছে
মাত্র সাত-আট
মাসের আমদানি
বিল মেটানোর
মতো। আগে
ছিল ১০-১২
মাসের আমদানি
বিল মেটানোর
মতো। সুতরাং
আমদানির ব্যাপারে
আমাদের আরো
সতর্ক হতে
হবে। আমদানি
কমাতে হবে,
রফতানি বাড়াতে
হবে। মনে
রাখতে হবে
কোনো কোনো
দুর্যোগ আসে
আকস্মিকভাবে। কিন্তু
সেটি নামতে
অনেক সময়
লাগে। সেজন্য
বলছি, সমস্যাগুলোয়
দ্রুত নজর
না দিলে
অবস্থা খারাপ
হবে। কথাবার্তা
বলে, নানা
রকম সার্কুলারের
মাধ্যমে আদেশ-নির্দেশ
দিয়ে কাজ
হবে না।
বাংলাদেশের জন্য
এটা একটা
বড় শিক্ষা।
বাংলাদেশ ব্যাংক বিলাসপণ্য আমদানি নিরুৎসাহিত করার
নির্দেশনা দিয়েছে। আপনার কি
মনে হয়
এটা কাজ
করবে?
এটা
আংশিক কাজ
করতে পারে।
পুরোপুরি নয়।
স্বল্প প্রয়োজনীয়
পণ্য আমদানির
ক্ষেত্রে ব্যাংকে
এলসি মার্জিন
দেয়া হয়েছে,
সেটি হয়তো
কিছুটা কাজ
করবে। তবে
এটা খুব
কঠোরভাবে প্রয়োগ
করা দরকার।
অনেকেই নানা
অজুহাত দেবে
যে এই
এই কারণে
আমদানি করতে
হবে। এটা
ভালোভাবে খতিয়ে
দেখতে হবে।
এমনিতেই তো
বাংলাদেশ একটা
আমদানিনির্ভর দেশ।
দরকারি কাঁচামাল
ও যন্ত্রপাতি
আসবে। কিন্তু
বাড়তি কিছু
জিনিস আমরা
বাজারে দেখতে
পাচ্ছি, যেগুলো
আমাদের দেশীয়
শিল্পকে হুমকিতে
ফেলছে। এমনকি
দেশীয় শিল্পে
মূল্য সংযোজনে
প্রয়োজনীয় উপকরণ
আমদানি বাড়ছে
না। এটাই
আমাদের উন্নয়নের
একটা দুর্বলতার
দিক যে
ক্ষুদ্র ও
মাঝারি উদ্যোগ-শিল্পগুলো
যথেষ্ট বিকাশ
লাভ করেনি।
এটা বেশি
করে গড়ে
তোলা উচিত।
দ্বিতীয়ত, আমদানির
বৈধতা-ন্যায্যতা
নিশ্চিত করতে
হবে। আমদানি
মূল্য খতিয়ে
দেখতে হবে।
আজকাল ইন্টারনেটের
সুবাদে বিশ্ববাজারে
প্রতিটি পণ্যের
দাম যথাযথভাবে
জানা যায়।
এ সুবিধা
কাজে লাগাতে
হবে। ঘোষিত
পণ্য যথাযথভাবে
আসছে কিনা
দেখতে হবে।
আমদানি-রফতানিতে
ওভার ইনভয়েসিং
বা আন্ডার
ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে
অনেক ক্ষেত্রে
অর্থ পাচার
হয়। এসব
বিষয় অনুপুঙ্খভাবে
দেখতে হবে।
নইলে ব্যাংকে
শুধু এলসি
মার্জিন দিয়ে
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ
করা যাবে
না।
নেপালের সংকটটা কীভাবে দেখেন?
প্রথমত,
নেপালে রাজনৈতিক
অস্থিতিশীলতা অনেক
দিনের। রাজতন্ত্র
থেকে প্রজাতন্ত্র
হলো। কিন্তু
সেখানে খুব
ভালো লিডারশিপ
সেভাবে দৃশ্যমান
হয়নি। বিভিন্ন
নীতি এবং
সেগুলো বাস্তবায়নেও
খুব একটা
সুফল ফুটে
ওঠেনি। রাজনৈতিক
দলগুলোর মধ্যেও
বেশ কোন্দল
আছে। ওখানে
আবার রিজিয়ন,
মাউন্টেন রিজিয়ন—এ
ধরনের বিভিন্ন
রাজনৈতিক ও
অর্থনৈতিক সমস্যা
আছে। আঞ্চলিক
যে বৈষম্য
আছে তাতে
নেপালের রাজনীতিবিদরাও
তেমন নজর
দেননি। প্রকৃতপক্ষে
দেশটিতে বহু
আগে বিকেন্দ্রীকরণের
পদক্ষেপ নেয়া
হয়েছে, সেটাও
থেকে গেছে।
বিভিন্ন জায়গায়
ডিস্ট্রিক্ট ডেভেলপমেন্ট
প্রকল্প গ্রহণ
করা হয়েছে।
চাহিদা অনুসারে
প্রয়োজনীয় সেবা
দেয়া হচ্ছিল।
কিন্তু ইদানীং
সেগুলো অব্যাহত
নেই। তার
মানে রাজতন্ত্র-পরবর্তী
রাজনৈতিক নেতৃত্বের
সিদ্ধান্তগুলো র্যাশনাল
ছিল না
এবং বাস্তবায়নে
বেশ দুর্বলতা
ছিল। এছাড়া
অর্থনীতিকে বহুমুখী
করে যে
চাঙ্গা করা,
তার জোরালো
প্রচেষ্টা ছিল
না। তাদের
রাজনীতিতে এখনো
ভারত ও
চীন ফ্যাক্টর
কাজ করে।
আমার মনে
হয় না,
নেপালে শিল্প
বা রফতানি
সক্ষমতা খুব
বেশি বেড়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে
কিছুটা সক্ষমতা
বেড়েছে কিন্তু
অর্থনীতি তেমন
বিকাশ লাভ
করেনি। লোকসংখ্যা
দিন দিন
বাড়ছে। এদিকে
রাজনৈতিক অস্থিরতা
বেশি, বারবার
সরকার পরিবর্তন
হয়। সেই
তুলনায় বাংলাদেশে
ধারাবাহিকতা বা
স্থিতিশীলতা রয়েছে।
নিত্য অনিশ্চয়তা
বাংলাদেশে নেই,
যা নেপালে
দেখা যায়।
রাজনৈতিক সংকট
অর্থনৈতিক সংকটকে ত্বরান্বিত করে
নাকি অর্থনৈতিক সংকট রাজনৈতিক সংকটকে ত্বরান্বিত করে?
আমার
মতে, বেশির
ভাগ ক্ষেত্রে
রাজনৈতিক সংকট
অর্থনৈতিক সংকটকে
ত্বরান্বিত করে।
অর্থনৈতিক সংকট
রাজনৈতিক সংকটকে
প্রভাবিত করতে
সময় বেশি
লাগে। কিন্তু
রাজনৈতিক সংকট
দ্রুত অর্থনীতিকে
অস্থিতিশীল করে।
রাজনৈতিক অস্থিরতা
থাকলে ব্যবসায়ীরা
তো কাজ
চালাতে পারবেন
না। অর্থনৈতিক
সংকট তৈরি
হয়। তবে
অর্থনৈতিক সংকট
রাজনৈতিক সংকটকে
প্রভাবিত করে।
শুরুটা মনে
হয় রাজনৈতিক
সংকট থেকে।
এজন্য আমরা
সবসময় বলি
যে সুশাসন,
আইনের শাসন,
গণতন্ত্র এগুলো
নিশ্চিত করলে
লোকজন নিজেরাই
নিজেদের তাগিদে
কাজ করবে।
আমাদের দেশে
বিশেষ করে
বিদ্যুৎ ও
জ্বালানি খাতে
বিপুল ভর্তুকি
দিতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন
সক্ষমতা বাড়ছে
ঠিকই কিন্তু
তার পুরোপুরি
ব্যবহার হচ্ছে
না। অন্যদিকে
ঋণ করে
হলেও জ্বালানি
প্রকল্পে অর্থায়ন
করা হচ্ছে।
এগুলো কি
ভবিষ্যতে সংকট
তৈরি করবে
না?
সরকার ভর্তুকি
দিয়ে আইপিপিগুলো
চালিয়েছে। এখন
সময় এসেছে
পর্যালোচনা করার।
এখন যে
ক্যাপাসিটি আছে
তা ব্যবহার
করতে হবে।
ক্যাপাসিটি ব্যবহারের
জন্য বিদ্যুৎ
বিতরণ ব্যবস্থার
উন্নতি করতে
হবে। স্টোরড
ক্যাপাসিটি দিয়ে
কোনো লাভ
নেই। সেটি
খরচ করতে
হবে। ভর্তুকিগুলো
যে দিচ্ছে
তা পর্যালোচনার
সময় এসেছে।
সবচেয়ে বড়
বিষয়, ভর্তুকি
অব্যাহত রাখাটা
কতটা টেকসই
হবে তা
ভেবে দেখা
দরকার। অতএব,
জ্বালানি নীতিতে
পরিবর্তন আনা
এখন প্রয়োজন।
এটা না
করলে ভবিষ্যতে
অনেক সমস্যা
হবে। ব্যয়
বেড়ে যাবে।
বড় কথা,
বেসরকারি উদ্যোক্তাদের
হাতে সরকার
জিম্মি হয়ে
যেতে পারে।
তারা বলতে
পারে, আমরা
আর কিছুই
করব না।
এখনো তো
বলে, সাবসিডি
না দিলে
প্রডাকশন আর
করব না।
আমার মনে
হয়, রাষ্ট্রায়ত্ত
খাতের বড়
বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র
স্থাপন এবং
বর্তমান কেন্দ্রগুলো
যদি কাজে
লাগানো যেত,
সেখানে বিদ্যুৎ
উৎপাদন রাখা
যেত, সেটি
অনেক ভালো
হতো। বর্তমানে
জ্বালানি নীতিতে
আমাদের সবচেয়ে
দুর্বলতা এবং
এখানেই সবচেয়ে
বেশি অপচয়
হচ্ছে।
কর-জিডিপি অনুপাত তো কমে
৮ শতাংশে ঠেকেছে। আপনার
কি মনে
হয়, আগামীতে সেটা বাড়ানো যাবে?
কর-জিডিপি
অনুপাত যে
কমছে, এটা
সমস্যাজনক। এটা
প্রতিফলন ঘটায়
যে দেশে
সমতাভিত্তিক উন্নয়ন
হচ্ছে না।
এটা আয়,
সম্পদ ও
ব্যবসা-বাণিজ্যের
সুযোগের বৈষম্যেরই
বহিঃপ্রকাশ। বৈষম্য
দূর করতে
হলে যাদের
আয়-সম্পদ
বেশি, তাদের
ওপর বেশি
করে কর
আরোপ করতে
হবে। ঠিকভাবে
আহরণও করতে
হবে। ট্যাক্স
লিকেজ কমাতে
হবে। ভ্যাট
যা আহরণ
করে, তার
কতটা রাষ্ট্রীয়
কোষাগারে যায়?
বেশির ভাগই
তো নানাভাবে
নয়-ছয়
হয়। এটা
একটা দুঃখজনক
ব্যাপার। সুতরাং
আর্থিক ব্যবস্থাপনা
শক্তিশালী করতে
হবে। এটা
ঠিক না
করলে শুধু
বাজেট করে,
বরাদ্দ দিয়ে
কোনো লাভ
হবে না।
নেপালের মতো
দেশেও কর-জিডিপি
অনুপাত আমাদের
চেয়ে বেশি।
অন্য দেশগুলোর
কথা না-ইবা
বললাম। তারা
করও দেয়
আবার সুবিধাও
ভোগ করে।
আসন্ন বাজেটে আপনার পরামর্শ কী থাকবে?
আমার
পরামর্শ থাকবে
আসন্ন বাজেটে
দৃষ্টি দিতে
হবে আমাদের
চ্যালেঞ্জগুলো হলো—
বিশেষ করে
জ্বালানি, পরিবহন,
কর্মসংস্থান, ছোট-মাঝারি
শিল্প ও
কৃষির ওপর।
সব চ্যালেঞ্জ
এক বছরে
সমাধান করা
সম্ভব নয়।
কিন্তু শুরুটা
হোক। আর
বাজেটে গাণিতিক
হিসাব না
দিয়ে কোন
খাতে কীভাবে
কৌশল বাস্তবায়ন
করবে, সেদিকে
দৃষ্টি দিতে
হবে। বাজেটের
আকার বেশি
হলে আপত্তি
নেই। কিন্তু
কোথা থেকে
অর্থ আসবে
এবং কীভাবে
খরচ করা
হবে তার
একটা রূপরেখা
থাকতে হবে।
সামাজিক নিরাপত্তা
খাতে, স্বাস্থ্য
ও শিক্ষা
খাতে বরাদ্দ
বাড়াতে হবে।
আর এডিপির
ব্যাপারে আরো
সংযমী হতে
হবে। নির্বাচিত
কিছু প্রকল্প
নিতে হবে,
যেগুলো মানুষের
জন্য সত্যিকার
অর্থে কল্যাণ
বয়ে আনবে।
অপেক্ষাকৃত কম
প্রয়োজনীয় প্রকল্প
বাদ দিতে
হবে। মোদ্দাকথা
হলো, রুটিন
বাজেট দেয়া
ঠিক হবে
না। এখন
যে বিশেষ
একটা সময়
যাচ্ছে তা
মাথায় রেখে
বিশেষ বাজেট
করতে হবে।
শ্রুতলিখন: হুমায়ুন কবির










