নীরবে নিভৃতে যে নীতিমালা ব্যাংক উদ্যোক্তাদের মাথাব্যথার কারণ হচ্ছে তা হলো ক্যাপিটাল চার্জ।  দুনিয়া অনেকখানি বদলেছে। ব্যাংক ব্যবসার সেই জো আর থাকবে না। ক্যাপিটাল চার্জ ব্যাংক উদ্যোক্তাদের ঘুম হারাম করবে এটা নিশ্চিত। অন্যদিকে ব্যাংক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আধা আধা জ্ঞান নিয়ে ব্যাংক চালানোয় গুড়েবালি। হয়তো কোনো কোনো উদ্যোক্তা পেরে উঠবেন । তবে অধিকাংশ উদ্যোক্তা কতটুকু পারবেন তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। যেসব উদ্যোক্তা শুরু থেকে ক্যাপিটাল চার্জ সম্পর্কে সজাগ এবং সেই অনুসারে ব্যাংক পরিচালনা করছেন, তাদের জন্য কোনো সমস্যা হবে না।

কী এই ক্যাপিটাল চার্জ? এর প্রভাব কী? এর গুরুত্বই-বা কতটুকু? খুব সহজে বলতে গেলে, ক্যাপিটাল চার্জ হলো নতুন ও অতিরিক্ত ক্যাপিটাল (মূলধন) তৈরি করা; যা উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে চার্জ করা হয় ডকুমেন্টারি ঝুঁকি নিরূপণ করে। ক্যাপিটাল চার্জ হলো নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা, যা শেয়ারহোল্ডারদের বার্ষিক লভ্যাংশ থেকে নিয়ে অথবা তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত সংগ্রহ করে ক্যাপিটালের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এই অতিরিক্ত ক্যাপিটাল তৈরি করতে হয় ব্যাংক ব্যবসার ডকুমেন্ট-জনিত রিস্ক পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে। যত বেশি ডকুমেন্ট-জনিত রিস্ক তত বেশি পরিমাণ ক্যাপিটাল উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে চার্জ করে অতিরিক্ত কোর ক্যাপিটালে যুক্ত করা হয়।

ক্যাপিটাল চার্জ হলো এক ধরনের প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে যেকোনো ব্যবসার সম্ভাব্য ঝুঁকির পরিমাণ হিসাব করা হয় এবং টাকার পরিমাণে তা পরিবর্তন করা হয়। ওই টাকা উদ্যোক্তাদের লভ্যাংশ থেকে সংগ্রহ করে মূলধনে যোগ করা হয়। ব্যাংক ব্যবসায় বিষয়টি আরো কঠিন। কারণ ঝুঁকিপূর্ণ টাকার পরিমাণ ব্যাংকটির লভ্যাংশ থেকে পরিপূর্ণ না হলে উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে নগদ সংগ্রহ করে মূলধনে যোগ করতে হয়। তাও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে এ সংগ্রহ করতে হয়। পরবর্তী সময়ে যদি সম্ভাব্য ঝুঁকি ক্ষতিতে পরিণত না হয় তাহলে চার্জ করা টাকা মালিকরা ফেরত পান।

ক্যাপিটাল চার্জ শব্দটি এসেছে মূলত ব্যাসেল কমিটির ব্যাসেল অ্যাকর্ড (আইন) থেকে। ব্যাসেল ২-এ ক্রেডিট রিস্ক নিয়ে যে আলোচনা হয়েছে, তাতে ক্যাপিটাল চার্জ করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ক্রেডিট রিস্ক হলো ঋণগ্রহীতা বা ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের গুণগত মান নিম্ন হওয়ার কারণে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য ক্ষতি। ব্যাংকগুলোয় এ ক্ষতির উদ্ভব হয় ঋণগ্রহীতা যদি ঋণ সময়মতো পরিশোধ করতে ব্যর্থ হন বা ঋণ পরিশোধ না করেন। এছাড়া এ ক্ষতির জন্ম হয় ক্রেডিট কোয়ালিটির অবনতির কারণে। ক্রেডিট কোয়ালিটির অবনতি ঘটে যদি ঋণগ্রহীতার প্রদানকৃত ডকুমেন্টেশনে সমস্যা থাকে। ডকুমেন্টেশন প্রক্রিয়া সাধারণত চার্জ ও সিকিউরিটি এভিডেন্সের ওপর ভিত্তি করা হয়। ডকুমেন্টেশনের সমস্যার কারণে ব্যাংকগুলো কোর্টে কেস করার জন্য সঠিক এভিডেন্স তৈরি করতে পারে না। ঋণ দেয়ার হয়তো চার-পাঁচ বছরের মধ্যে ধরা পড়ে ঋণের ডকুমেন্ট এভিডেন্স হিসেবে শক্ত ছিল না। ফলে সিকিউরিটি হিসেবে যেসব এভিডেন্স নেয়া হয়েছিল, তা কোনো না কোনোভাবে কোর্টে রাইট স্টাবলিস্ট করতে পারে না। ডকুমেন্টগুলো আইনগত ঢাল তৈরিতে ব্যর্থ হলেই ঋণের ঝুঁকি বেড়ে যায় এবং ক্যাপিটাল চার্জের প্রসঙ্গ এসে যায়। 

ব্যাসেল চুক্তির নির্দেশনা মতে, ব্যাংকগুলো তার ঝুঁকির পরিমাণের সাপেক্ষে ঋণ-সম্পদ হিসাব করবে। যে ঋণকে এখন সম্পদ মনে হচ্ছে, তা দায়ে পরিণত হতে পারে। যেমন ক্যাশ ব্যাক ঋণগুলোর ঋণ ঝুঁকির ওজন শূন্য শতাংশ, অথচ কোনো করপোরেশনকে দেয়া ঋণ ১০০ শতাংশ ঋণ ঝুঁকিতে নিমজ্জিত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাসেল ২-এর চুক্তি অনুসারে ঋণ ক্যাটাগরি অনুযায়ী ভাগ করতে হবে, ঝুঁকির পরিমাণ অনুযায়ী ঋণকে পর্যালোচনা করতে হবে এবং ক্রেডিট রেটিং প্রদান করে এমন স্বীকৃত তৃতীয় পক্ষ দ্বারা তা যাচাই-বাছাই করে প্রাপ্ত ক্রেডিট রেটিং প্রকাশ করতে হবে।

পরিমাপন

ঋণ সম্পদ ঝুঁকির ওজন অনুযায়ী কতটুকু ক্যাপিটাল সরিয়ে রাখা প্রয়োজন তা পরিমাপের জন্য দুটি বড় পদ্ধতি রয়েছে। যথা—আদর্শায়িত পদ্ধতি ও ইন্টারনাল রেটিং বেজড (আইআরবি) পদ্ধতি। সাধারণত আদর্শায়িত পদ্ধতি ব্যবহার করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক (সুপারভাইজরি) বা রেগুলেটরি বডি। ইন্টারনাল রেটিং বেজড (আইআরবি) পদ্ধতি অধীন, ব্যাংকগুলো নিজেদের অভ্যন্তরীণ রেটিং সিস্টেমের মাধ্যমে ঋণ ঝুঁকির পরিমাণ ও ঋণ সম্পদের হিসাব করতে পারে। এটা নির্ভর করে সুপারভাইজরি ব্যাংকের অনুমোদন সাপেক্ষে। ব্যাসেল ৩-এ ক্রেডিট মার্কেট অনুযায়ী ক্রেডিট ভ্যালুয়েশন অ্যাডজাস্টমেন্ট বা সিভিএ পদ্ধতিতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বর্ণনা করা হয়েছে। পদ্ধতি যা-ই হোক না কেন, মূল বিষয়টা হলো সম্ভাব্য ঝুঁকির পরিমাণ হিসাব করা এবং সেই অনুযায়ী ক্যাপিটাল সঠিক মাত্রায় রাখা। যেকোনো ঋণের সম্ভাব্য ঝুঁকির পরিমাণ নির্ভর করে ঋণটির ডকুমেন্টেশনের ওপর। নিম্নমানের ডকুমেন্টেশন ঋণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

ক্রেডিট ডকুমেন্টেশন ও ঋণ ঝুঁকি

ঋণ ঝুঁকির প্রথম ধাপ হলো নিম্নমানের ডকুমেন্টেশন করা, নিয়মিত ডকুমেন্ট মনিটরিং না করা এবং নিয়মিত ঋণগ্রহীতার হিসাব মনিটরিং না করা। পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য ডেরিভেটিভসের ডকুমেন্ট জটিল হলেও বাংলাদেশের জন্য ভূমির কাগজপত্রগুলো মূলত জটিল ডকুমেন্ট। সঠিক ডকুমেন্টেশন ক্রেডিট কোয়ালিটি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। ঋণ ঝুঁকি কমিয়ে দেয়। দীর্ঘ ১৫-১৬ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি ভালো ঋণগ্রহীতার জমির কাগজ ভালো থাকে।

প্রভাব ও ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য পদক্ষেপ

ক্যাপিটাল চার্জ প্রক্রিয়ায় ক্যাপিটাল নিরাপদ রাখার জন্য বিনিয়োগকৃত ঋণের সম্ভাব্য ঝুঁকির সমপরিমাণ অর্থ মালিকদের কাছে চার্জ করা হয়। এ চাপ প্রতিনিয়ত ঘটতে থাকলে মালিকরা হয়তো ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করতে পারেন। (১) তখন এমনও হতে পারে যে ক্যাপিটাল চার্জ হবে শাখাভিত্তিক। অর্থাৎ সম্ভাব্য আয় থেকে প্রতিটি শাখা তার ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের সমপরিমাণ অর্থ আয় থেকে বাদ দিয়েই শাখার আয় প্রদর্শন করবে। এতে একটি মহাবিপত্তি ঘটতে পারে। শুরুতে অধিকাংশ শাখার আয় নেগেটিভ আয়ে পরিণত হবে।

(২) আরেকটি ব্যাপারও ঘটতে পারে, সেটা হলো সব ঋণ পুরোপুরি আদায় না হওয়া পর্যন্ত লভ্যাংশ ঘোষণা না করা। অর্থাৎ একটি ঋণ পরিপূর্ণভাবে পরিশোধ হওয়ার পর ঋণ থেকে প্রাপ্ত সুদ আয় হিসেবে দেখানো। এটা অনেকটা ব্যক্তিগত ঋণ হিসাবের মতো হতে পারে। 

প্রতিরোধ

ক্যাপিটাল চার্জ নামে বিড়ম্বনা প্রতিরোধ করার জন্য বেশ কতগুলো বিষয়কে জোরদার করা যেতে পারে—

১. যেহেতু ঋণগ্রহীতার ঋণসংক্রান্ত ডকুমেন্টের দুর্বলতার ওপর ভিত্তি করে ক্যাপিটাল চার্জ নির্ধারণ করা হয় সেহেতু ঋণ প্রশাসন বিভাগকে (ক্রেডিট অ্যাডমিন ডিভিশন) আধুনিকায়ন করা যেতে পারে। ভালো  অভিজ্ঞতাসম্পন্ন  মানবসম্পদ দিয়ে এ বিভাগ গঠন করা যেতে পারে।

২. উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে প্রতিটি স্তরে ক্রেডিট সিকিউরিটি ডকুমেন্টসহ অন্যান্য বাধ্যতামূলক ডকুমেন্ট সম্পর্কে জ্ঞান থাকতে হবে।

৩. স্বতন্ত্র ঋণ মনিটরিং ডিভিশন গঠন করা যেতে পারে।

৪. ডকুমেন্টেশনসহ আইনের এভিডেন্স অ্যাক্ট, লিমিটেশন অ্যাক্ট, কস্টকাট অ্যাক্টসহ প্রয়োজনীয় আইন সম্পর্কে জ্ঞান রাখতে হবে।

৫. ঋণ হিসাব পরিপূর্ণভাবে পরিশোধ হওয়ার পর অর্জিত সুদ মুনাফা হিসেবে দেখানো যেতে পারে।

৬. যেহেতু জমি বন্ধক রেখে ঋণ প্রদান করা হয় সেহেতু ব্যাংকের ঋণ প্রশাসন বিভাগের জমিজমা-সংক্রান্ত বিষয়ে ভালো জ্ঞান থাকতে হবে।

৭. যেহেতু ডকুমেন্টশনের সঙ্গে উদ্যোক্তাদের অতিরিক্ত ক্যাপিটাল প্রদানের বিষয়টি জড়িত সেহেতু ক্রেডিট অ্যাডমিন বিভাগ ম্যানেজমেন্টের অধীনে রাখা হবে কিনা বিষয়টি ভেবে দেখার মতো।

৮. বাংলাদেশের সার্ভে কোম্পানি ও আইন ফার্মগুলো লাগামহীন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে সার্ভে কোম্পানি ও আইন ফার্মকে নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন। এ প্রস্তাব ২০১২ সালে সরকারকে দেয়া হয়েছে, যা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।

৯. আইনজীবীরা যেহেতু বার কাউন্সিলের আওতাভুক্ত সেহেতু বার কাউন্সিল আইনে আইনজীবীদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য শাস্তির বিধান থাকা প্রয়োজন। 

ক্যাপিটাল চার্জ এখন ক্যাপিটাল বিড়ম্বনা। এর প্রভাবে হয়তো একসময় অনেক প্রাইভেট ব্যাংকের ব্যবসা বাধাগ্রস্ত হবে। নতুন প্রাইভেট ব্যাংক গঠন করতে নিরুৎসাহিত হতে পারে। তবে ক্যাপিটাল চার্জ নীতির কারণে অনেক মামলা কমে যাবে। ব্যাংকগুলোর ভেতর করপোরেট প্রভাব ও অস্থিরতা কমে যাবে।

 

কাজী মাহমুদুর রহমান: ব্যাংকার