বিশ্ব পানি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী পানিসম্পদ বাঁচাতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে উপরিভাগের পানি ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। দেশে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার খবর নতুন নয়। প্রায়ই এমন খবর পাওয়া যায় যে নলকূপ থেকে পানি মিলছে না, দেখা দিয়েছে সুপেয় পানির সংকট। মানুষ বাড়ছে, সুপেয় পানির চাহিদাও বাড়ছে। ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে নির্ভর করা হচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর। কিন্তু এ পানি উত্তোলনে অদূরদর্শিতার খেসারত দিতে হচ্ছে মানুষকে। দিন দিন সুপেয় পানির প্রাপ্যতাই যে কমছে তা নয়, পানি উত্তোলনে ব্যয়ও বেড়েছে। প্রাকৃতিক পরিবেশে ভারসাম্য ক্ষুণ্ন হওয়া, ভূগর্ভস্থ পানিতে দূষণের ঝুঁকি তৈরি হওয়া ও ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে। পরিস্থিতি উন্নয়নে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। এরই মধ্যে সরকার কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
মাটির নিচে পানির আধার সুরক্ষা ও গুণাগুণ বজায় রাখতে ভূ-উপরিস্থ ও ভূগর্ভস্থ পানির সমন্বিত ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ। ভূগর্ভস্থ থেকে অপরিকল্পিতভাবে পানি উত্তোলনে প্রতি বছরই এর স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। গভীর ও অগভীর নলকূপের মাধ্যমে অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ফলে এখন বছরের একটা সময়ে, বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে পানি পাওয়া যাচ্ছে না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভূগর্ভস্থ পানিদূষণ। নলকূপে উঠে আসছে ক্ষতিকর ভারী ধাতু ও দূষিত পদার্থ, যা পান করায় মানুষ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগের দূষক পদার্থ চুইয়ে মাটির নিচে চলে গিয়ে পানিতে মিশছে। তা নলকূপের মাধ্যমে উঠে আসে। জমি আবাদের ৭৩ শতাংশই ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার হচ্ছে। কৃষিতে মাত্রাতিরিক্ত পানির অপচয় হচ্ছে বলে বিভিন্ন গবেষণায়ও উঠে এসেছে। এমন প্রবণতা বন্ধ করা প্রয়োজন। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার পেছনে শিল্প-কারখানার পানি উত্তোলন এবং প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত ব্যবহারও কোনো অংশে কম দায়ী নয়। পানি উত্তোলন-সংক্রান্ত কোনো ধরনের বাধ্যবাধকতা বা নজরদারি না থাকা এবং এজন্য বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয় না বলেই এর অপচয় হচ্ছে। দেশে কেবল গার্মেন্ট শিল্পই কী পরিমাণ পানির অপচয় করছে, বিশ্বব্যাংকের অন্যতম সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন বা আইএফসির এক প্রতিবেদন থেকে তা জানা যায়। এতে বলা হয়, বৈশ্বিক মান অনুযায়ী প্রতিটি জিন্স ধোয়া ও রঙ করার কাজে পানির ব্যবহার হয় ৬০ থেকে ৭০ লিটার। অথচ দেশে এক্ষেত্রে গড়ে ২৫০ লিটার পানি ব্যবহার করা হয়। এর পুরোটাই মিঠা পানি। বাংলাদেশের আরএমজি খাতে প্রতিদিন ৪১১ কোটি লিটার পানির প্রয়োজন হয়। প্রতি বছর গার্মেন্ট শিল্পের সুতা ও পোশাকে ডায়িং ও ওয়াশের কাজে ব্যবহার হচ্ছে ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি লিটার পানি। বলার অপেক্ষা রাখে না, সহজলভ্য ও পয়সা খরচ ছাড়াই পাওয়ার কারণে কত বেশি পানি খরচ করা হলো, তা কেউই বিবেচনায় নেন না।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশ শ্রীলংকার একটি বড় এলাকা শুষ্ক হিসেবে পরিচিত। দেশটির উত্তরাঞ্চলের অর্ধেক ও পূর্বাঞ্চলের পুরো অংশেই সুপেয় পানির ঘাটতি রয়েছে। যদিও পৃথিবীর যে কয়েকটি দেশে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হয়, তার মধ্যে শ্রীলংকা অন্যতম কিন্তু দেশটির সব এলাকায় সমান বৃষ্টিপাত হয় না। দেশটি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলে সুপেয় পানির চাহিদা পূরণ করছে। বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য শ্রীলংকার গ্রামাঞ্চলে নানা উপায় অবলম্বন করা হয়। এ সংরক্ষণের কাজ ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে চলছে। ২০১৯ সালের তথ্যমতে, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য পুরো শ্রীলংকায় প্রায় ৪৫ হাজার ছোট-বড় ট্যাংক আছে। এছাড়া পুকুর, কুয়া ও জলাধার পরিষ্কার করা হয় এবং মানুষ এগুলো দূষিত করে না। বিভিন্ন হাসপাতাল, শিল্প-কারখানা ও মন্দিরে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য ট্যাংক স্থাপন করা হয়েছে। কলম্বোর মতো বড় শহরগুলোয় পানির প্রধান সরবরাহ আসে ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগ থেকে। এর মধ্যে বৃষ্টির পানি একটি বড় উৎস। বাংলাদেশও নদী পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি ও উজান থেকে নেমে আসা পানি সংরক্ষণপূর্বক কৃষি ও শিল্পে ব্যবহার করতে পারে। সেক্ষেত্রে নদী দখল ও দূষণ বন্ধ করতে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে সর্বাগ্রে।
ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার তাগাদা দিয়েছেন। ভূগর্ভস্থ পানির বিকল্প ব্যবস্থা খোঁজার পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগের ওপর বারবার জোর দিচ্ছেন গবেষকরা। ভূ-উপরিস্থ পানি পরিশুদ্ধ করে ব্যবহার উপযোগী করায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে সরকার। সেচকাজেও ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড় এবং বিশেষ করে ছোট ছোট জলাধার সংস্কারের কাজ এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। রাস্তা-সড়ক নির্মাণের সময়ও যাতে পানিপ্রবাহ ঠিক থাকে, সেভাবে পরিকল্পনা করে কাজ করার নির্দেশনা দিয়েছেন সরকারপ্রধান। যতগুলো জলাধার আছে, সবই সংস্কারের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বা প্রতিষ্ঠান থেকে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সেটি আরো উন্নীত করতে হবে। আর হাওর-বাঁওড় এলাকায় রাস্তা করলে সেগুলো মাটি ভরাট করে যেন করা না হয়, সেগুলো পিলার দিয়ে এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যেন পানিপ্রবাহ কোনোমতেই বাধাগ্রস্ত না হয়। সেদিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি দিতে হবে। পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলোয় প্রকৃতিনির্ভর ব্যবস্থাপনা কৌশল খুঁজে বের করতে হবে। সন্দেহ নেই, একসময় না একসময় ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের চিন্তা থেকে সরে আসতেই হবে। তখন বিকল্প ছাড়া উপায় থাকবে না। তবে যত বিকল্পই গ্রহণ করা হোক না কেন, সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকলে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি সরবরাহ করেও চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে না। তাই মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। সবকিছুর পরও পানি সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য দ্রুতই ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নদী ও জলাশয়ের দিকে নজর দিতে হবে। কৃষি থেকে শুরু করে কলকারখানার রাসায়নিক দূষিত বর্জ্য, পয়োনিষ্কাশন ড্রেনের ময়লা বর্তমানে যেভাবে সরাসরি নদীতে পড়ছে এবং যত্রতত্র দখল করে যেভাবে ব্যাহত করা হচ্ছে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, তাতে নদীর দূষিত পানির বিশোধন ব্যয়সাপেক্ষ। তবে সরকারি উদ্যোগে নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধ এবং দখল করা ভরাট জমি আবার খনন করে প্রবাহ স্বাভাবিক করা গেলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবেই দূষণের মাত্রা কমানো সম্ভব। সেখান থেকে তখন স্বল্প খরচে বিশোধিত করে চাহিদামতো পানি সংগ্রহ করা সম্ভব। পানিদূষণ রোধে এবং নদীর পুনঃসংরক্ষণকল্পে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-৪১-এর মতো দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশলগুলোয় পানির মূল্য অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। প্রধান ইনপুট হিসেবে পানি ব্যবহার করে এমন প্রকল্পগুলোর তুলনামূলক সুবিধা বিশ্লেষণে পুনর্মূল্যায়ন করার জন্য পরিকল্পনা কমিশন পদক্ষেপ নিতে পারে। পাইলট গবেষণা সম্পন্ন করার পর বর্তমানে সংশোধন করতে থাকা উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদনের নির্দেশিকায় পানির মূল্য বিবেচনায় নেয়া উচিত। এর সবচেয়ে ভালো উপায়গুলোর মধ্যে রয়েছে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ, পানির চক্রাকার ব্যবহার, সেচের বিকল্প ভেজা ও শুকনো পদ্ধতি, ওয়াটার স্মার্ট নগর উন্নয়ন ও সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা। বাংলাদেশ যে বিশ্বের শীর্ষ ১০ বৃষ্টিবহুল দেশের একটি, বৃষ্টির পানির ব্যাপারে আমাদের সাংস্কৃতিক ও কারিগরি প্রবণতা দেখে তা বোঝার অবকাশ নেই। অথচ এত পরিষ্কার ও সুপেয় পানি আর কোনো উৎস থেকে পাওয়া যায় না বলে বিশ্বজুড়েই বৃষ্টির পানির কদর সবচেয়ে বেশি। খাল, বিল, পুকুর ও শহরে ভবনে ভবনে সংরক্ষণাগার বাধ্যতামূলক করে বৃষ্টির পানি কীভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবহার করা যায়, তার উপায় সন্ধান করতে হবে। রোধ করতে হবে পানির অপচয়ও। নিত্যব্যবহার্য পানি আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশুদ্ধ করে পুনরায় ব্যবহার সিঙ্গাপুরসহ কিছু দেশে হচ্ছে। পানির অপচয় রোধ ও পুনর্ব্যবহারে এ ধরনের প্রযুক্তি বিনিময় করা যেতে পারে।
ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। মাটির ওপরের পানি ব্যবহারে মনোযোগী হতে হবে। তবে দেশের মাটির ওপরের পানি ভয়াবহ দূষণের শিকার হচ্ছে। নদ-নদীগুলো দূষিত হয়ে পড়েছে। শিল্প ও গার্হস্থ্য বর্জ্যের পাশাপাশি কৃষিতে রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে পানিদূষণ ঘটছে। এ অবস্থায় সুপেয় পানি সরবরাহ করা বড় একটি চ্যালেঞ্জ। এজন্য প্রয়োজন অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জরুরি ভিত্তিতে পানি পরিশোধনাগার গড়ে তোলা দরকার। কিছু পরিশোধনাগার অবশ্য গড়ে উঠেছে। পানি পরিশোধনে সরকারের মহাপরিকল্পনা রয়েছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা জরুরি। দু-একটি শহর-নগরকে কেন্দ্র করে এ পরিকল্পনা করলে চলবে না। দেশের অন্যান্য অঞ্চলকেও এ পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা দরকার।










