ড. আহমেদ কামাল ইতিহাসবিদ। ইতিহাসের সাবেক অধ্যাপক। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পড়াশোনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। পিএইচডি অর্জন করেন অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে। ভিজিটিং স্কলার ছিলেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস)। পোস্ট ডক্টরাল ফেলো এক বছর কাটিয়েছেন ইয়েল ইউনিভার্সিটির অ্যাগরেরিয়ান স্টাডিজ প্রোগ্রামে। দায়িত্ব পালন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড রিসার্চ ইন আর্টস অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সের পরিচালক হিসেবে। পূর্ববঙ্গের রাজনীতিতে মফস্বলের উত্থান, তখনকার রাজনৈতিক তত্পরতা, রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা এবং মফস্বলের মানুষের লড়াইয়ে বঙ্গবন্ধুর সম্পৃক্তি এসব বিষয় নিয়ে তেমন গবেষণা হয়নি। ৫০ পেরিয়ে বাংলাদেশ। জাতি গঠন ও স্বাধিকার  চেতনার সুলুক সন্ধানে এসব বিষয় নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে বণিক বার্তা। আজ ১০ এপ্রিল ঐতিহাসিক মুজিব সরকার গঠনের দিন। ধারাবাহিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে আজ প্রকাশ হলো এ সাক্ষাৎকার। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এম এম মুসা 

১৯৪৭ সালের পরবর্তী সময়ে পূর্ববঙ্গের রাজনীতিতে মফস্বলের অভ্যুত্থান কখন ঘটল এবং কোন পরিপ্রেক্ষিতে এটি ঘটেছিল?

মফস্বল বলতে আমরা সাধারণত ঢাকার বাইরেকেই বুঝি। রাজনীতিতে মফস্বলের অভ্যুদয় প্রথম ঘটে ১৯৩৭ ও ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে। এ নির্বাচনে মুসলিম লীগ বিপুলসংখ্যক আসনে জয়লাভ করে। এ নির্বাচনের মাধ্যমে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবি গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। নির্বাচনটি ছিল পাকিস্তানের জন্য নির্বাচন। মুসলিম লীগ নির্বাচনের ইস্যুই করেছিল যে তাদের ভোট দিলে পাকিস্তান পাবে। ফলে সে নির্বাচনে গ্রামগঞ্জের মানুষ বিশেষ করে মুসলমান ছাত্ররা, যারা শহরে লেখাপড়া করছিল, তারা ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করে। গ্রামের মানুষের মধ্যে এ নির্বাচনটা কত গুরুত্বপূর্ণ সেটা তারা ব্যাখ্যা করে এবং ভোটদানে মানুষ প্রভাবিত হয়। এটাই প্রথম রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড যেটা গ্রামগঞ্জে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল।

শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক যখন কৃষক-প্রজা পার্টি গঠন করেন, সেখানে কি মফস্বলের কোনো ভূমিকা ছিল?

১৯৩৭-এর নির্বাচনে শেরেবাংলা ভালোভাবে বিজয়ী হন। তারপর মুসলিম লীগের সঙ্গে কোয়ালিশন করেন। সেখানে ভোটার সংখ্যা ছিল অনেক কম। তাছাড়া গ্রামের মানুষরা ওই নির্বাচনকে তাদের নির্বাচন হিসেবে মনে করেনি। তাদের তো ভোটই ছিল না, ভোট না থাকলে তাদের নির্বাচন মনে করবে কেন? জনগণ যেহেতু অংশ নিতে পারেনি, তাই ’৩৭ সালের নির্বাচন গ্রামে ব্যাপক প্রভাব রাখতে পারেনি, যেটা ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে হয়েছে। ’৪৬ সালের নির্বাচনের ক্যাম্পেইনটাই ছিল পাকিস্তান। জিতলে পাকিস্তান, না জিতলে পাকিস্তান নয়।

মফস্বলের মানুষের জন্য পাকিস্তান তৈরি করা কি খুব
জরুরি ছিল?

তখন পাকিস্তান বলে কিছু ছিল না। পাকিস্তান একটা বায়বীয় ব্যাপার ছিল। পাকিস্তান কী, কোথায়, পাকিস্তান হলে কী হবে ইত্যাদি বিষয়ে অস্পষ্টতার মধ্যেই মানুষ নিজেদের মতো করে পাকিস্তান ভেবে নিয়েছে। কৃষক ভেবেছে এবং মুসলিম লীগের নেতারা বলেছে আমরা জিতলে তুমি জমি পাবে, কীসের তে-ভাগা—পুরো জমিই তোমাদের দিয়ে দেয়া হবে, জমিদারি থাকবে না ইত্যাদি প্রতিশ্রুতি। শ্রমিকদের বলা হয়েছে, তাদের বেতন বেড়ে যাবে। এসব বক্তব্য নির্বাচনের প্রতি মানুষকে অনেক আগ্রহী করেছে। এর সঙ্গে তারা নিজেদের মতো করে ভেবে নিয়েছে। যেমন মেয়েরা ভেবেছিল, পাকিস্তান হলে স্বামী আর প্রহার করবে না। তখন গ্রামগঞ্জে স্বামীর প্রহারের ব্যাপক অনুশীলন ছিল। কৃষক ভেবেছে জমি পাবেন। এ ধরনের নানা আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, যার কোনো অঙ্গীকার রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে আসেনি। কিন্তু নেতারা বক্তৃতায়, যেমন—খাজা নাজিমুদ্দিন বক্তব্য দিয়েছেন, ‘কীসের তে-ভাগা, পাকিস্তান এলে চৌ-ভাগাই পাবা তোমরা, পুরো জমি পাবা।’ কৃষকরা বিশ্বাস করেছেন। বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণও ছিল। জমিদাররা হিন্দু ছিল, মুসলিম লিগ এলে এবং পাকিস্তান হলে সেই জমিদারি থাকবে না। ফলে ব্যাপকভাবে মানুষ উৎসাহিত হয়েছে মুসলিম লীগকে ভোট দেয়ার জন্য।

আরেকটি বড় কারণ ছিল, মুসলিম ছাত্ররা ব্যাপকভাবে মুসলিম লীগের পক্ষে প্রচারণায় গ্রামে গেছে। এটা ১৯৫৪ ও ১৯৭০ সালেও হয়েছে। রাজনৈতিক দিক থেকে ছাত্রদের এ ভূমিকা গ্রামীণ সমাজে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এ কারণেই গ্রামের মানুষ উদ্বুদ্ধ হয়েছে এবং ভোট দিতে এসেছিল।

নেতারাও কি তখন গ্রাম থেকে এসেছে?

গ্রাম থেকে নেতা আসেনি। মফস্বল শহর থেকে এসেছে। ঢাকার বাইরে ছোট শহর থেকেই নেতারা এসেছেন। প্রাথমিকভাবে আইনি ব্যবসায় যারা জড়িত, তারাই রাজনীতিতে এসেছেন। বেশির ভাগ আইনি ব্যবসায়ীর রাজনীতির দিকে ঝোঁক ছিল। আইন ব্যবসায় সম্পৃক্তদের সঙ্গে গ্রামের মানুষের যোগাযোগ ছিল অনেক। কারণ মামলা-মোকাদ্দমা করতে আইনজীবীর কাছেই গ্রামের মানুষকে আসতে হতো। এ সূত্রে তৎকালীন আইনজীবীরা ব্যাপকভাবে গ্রামবাসীর কাছে তাদের রাজনীতি নিয়ে যেতে পেরেছেন। ফলে গ্রামের মানুষের ভোট থাকুক আর না থাকুক, নির্বাচনের ব্যাপারে তাদের একটা আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

এর পরের নেতৃত্ব কীভাবে এল?

১৯৫৪-এর নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবি হলো। এর মধ্যে মানুষ নতুন একটা দেশ পেয়েছে—পাকিস্তান পেয়েছে। পাকিস্তান পাওয়ার পরে মুসলিম লীগেরই আরো ক্ষমতায় থাকার কথা ছিল। কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার এবং পূর্ব বাংলাকে বঞ্চিত করার রাজনীতির কারণে তাদের পতন হতে সময় লাগেনি। তখনকার বিরোধী দলের নেতারা মানুষের বঞ্চনার বিষয়গুলোকে খুব ভালোভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরতে পেরেছিলেন। আর জনগণও দেখতে পেল পাকিস্তান হওয়ার পর যা যা হওয়ার কথা ছিল, তার কিছুই হচ্ছে না। ফলে প্রচুর অসন্তোষ তৈরি হয়। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে সাফল্য লাভের পেছনে যেসব নেতাদের অবদান ছিল তারাই মুসলিম লীগ ছেড়ে যুক্তফ্রন্ট গঠন করেন। যুক্তফ্রন্টের নেতা হিসেবে আসেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। দেশের কাছে গ্রহণযোগ্য একজন নেতা। তরুণ নেতারাও আওয়ামী লীগ গঠন করেন—শেখ মুজিবুর রহমান, আতাউর রহমান প্রমুখ।

মুসলিম লীগের নেতৃত্বে ছিল খাজা পরিবার অর্থাৎ ঢাকার নবাব পরিবার। এ পরিবারের প্রতি বাংলার মানুষের আগ্রহ ও সমর্থন অনেক কমে গিয়েছিল। প্রথমত, তাদের ভাষা আলাদা, তাদের জীবনযাপন আলাদা, তারা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন ইত্যাদি। এসব কারণে নবাব পরিবারের গ্রহণযোগ্যতা সে অর্থে ছিল না। আগে জমিদারি দিয়ে গ্রহণযোগ্যতা পেত। জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে তাদের গ্রহণযোগ্যতাও কমে যায়।

১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা উঠে যায়। জমিদাররাই ছিল মুসলিম লীগের ঘাঁটি। এ প্রথা উঠে যাওয়ায় নতুন কর্মী তৈরি হলো। কৃষকদের আর জমিদারদের কথা শোনার দরকার থাকল না। ফলে কৃষকরা শেরেবাংলা একে ফজলুল হকের যুক্তফ্রন্টের পক্ষে ভোট দিল।

যুক্তফ্রন্টও তো বেশি দিন ক্ষমতায় থাকতে পারল না?

যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পর ভেঙে যায়। আওয়ামী লীগ, হক সাহেবের কৃষক-প্রজা পার্টি, নেজামে ইসলামসহ যেসব দল মিলে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়েছিল তারা একসঙ্গে বেশি দিন কাজ করতে পারেনি। আওয়ামী লীগ পূর্ব বাংলার স্বার্থের প্রতি আরেকটু শক্ত অবস্থান নিতে শুরু করে, বিশেষ করে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে। যদিও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আতাউর রহমান তখন উপরের নেতা। কিন্তু সংগঠনটি ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে। তিনি এতটুকুতে সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি পূর্ব বাংলার জন্য আরো কিছু আদায়ের চেষ্টা করছিলেন। ফলে যুক্তফ্রন্টের মধ্যে ভিন্ন চিন্তা তৈরি হলো। যারা চেয়েছিলেন যুক্তফ্রন্ট থাকুক তাদের ধারণা ছিল, কেন্দ্রের সঙ্গে লড়াইটা আরো জোরদার হবে। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে সেটা মনে হয়নি। তিনি তখন থেকেই পূর্ব বাংলার স্বার্থ নিয়ে আলাদাভাবে রাজনীতিক দল, রাজনৈতিক কর্মসূচি চালানোর জন্য মনস্থির এবং কাজ শুরু করেন। ফলে যুক্তফ্রন্ট ভেঙে গেল। এটার পরিণতি কী হতো, সেটা ১৯৫৮ নির্বাচনটা হলে বোঝা যেত। এর আগেই মার্শাল ল জারি হয়ে যায়।

মওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমানের মতো নেতারা মফস্বল থেকে কীভাবে উঠে এলেন?

বাংলার নেতারা গ্রাম থেকেই এসেছেন এবং তারা অধিকাংশই ছিলেন মুসলিম। বাংলার মুসলিমরা পাটের ব্যবসার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে সন্তানদের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে শুরু করে। এতে মুসলমানদের মধ্যে একটি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী তৈরির সূচনা হয়। মুসলমান ছাত্রদের একটা প্রভাব গ্রামীণ রাজনীতি, শহুরে রাজনীতি, প্রাদেশিক রাজনীতির ওপর পড়তে শুরু করে।

প্রায় সব নেতাই গ্রাম থেকে এসেছেন। অধিকাংশ ছিলেন আইনজীবী। এ দেশে ব্রিটিশ যে রাজনীতির সূচনা হয়েছিল, যেটাকে আমরা লিবারেল পলিটিকস বলি, সেটি ছিল মূলত সংবিধানভিত্তিক নিজেদের স্বার্থের লড়াই। তখন রাজনীতিকদের মূল কথা ছিল—সংবিধানে আমাকে যতটুকু ক্ষমতা দিয়েছে, আমি অতটুকুই চাইতে পারি এবং অতটুকুই আদায় করব, যদি সেখানে কমতি থাকে। রাজনীতিটা বিপ্লবী আন্দোলনের দিকে না যায়, সেটি রোধ করাই ছিল ব্রিটিশদের মূল ইচ্ছা। বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্ত যারা তৈরি হচ্ছিল লেখাপড়া করে, আইন পেশায় এসে তারা এটাই বুঝতেন—সংবিধানের মধ্য দিয়ে দাবি আদায় করা সম্ভব। সংবিধানকে জনগণের পক্ষে কীভাবে আনা যায়, তারা সে চিন্তাও করতেন। সেটা করতে হলে নির্বাচন করতে হবে। নির্বাচনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে হবে।

ফলে যে মুসলমান নেতৃত্ব তৈরি হলো, তারা মূলত গ্রাম থেকে আসা রাজনৈতিক কর্মী। তারা মূলত আইন পেশায় জড়িত ছিলেন। ফলে গ্রামের সঙ্গে একটা যোগাযোগ থাকতেই হবে, কারণ তারা সেখান থেকেই উঠে এসেছেন। সেই আইন ব্যবসার সূত্রেও গ্রামের লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে ওঠে। গ্রামের লোকজনও পলিটিকসটা গ্রামে নিয়ে গেছে। কারণ যখন মামলা-মোকদ্দমার আলোচনা করেন উকিলরা, তখন মক্কেলদের সঙ্গে রাজনীতিক আলোচনাও করেছেন। কারণ তাদের নির্বাচন করতে হবে। সাপোর্ট তৈরির জন্য নিয়মিত এগুলো চলত। এ কারণে গ্রামে রাজনীতিটা যাচ্ছিল নিয়মিত। যদিও খবরের কাগজ ঠিক সে অর্থে ছিল না, গ্রামের মানুষ খবরের কাগজ পড়তেও পারত না। রেডিওতে বিরোধী দলের কোনো কথা বলার সুযোগই ছিল না। রেডিওর সংখ্যা ছিল খুবই কম। তখনো টেলিভিশন ছিল না। ফলে শহর থেকে গ্রামে রাজনীতি নিয়ে যাওয়ার কাজটি প্রধানত উকিলরা করেছেন।

নির্বাচন সবসময় গ্রামের মানুষের জন্য একটা আশা নিয়ে আসে। এটা একটা উৎসবের মতো। তারা ব্যাপকভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। তারা মনে করে ভোট দেয়াটা তাদের একটা অধিকার। তাই তারা এটা আদায় করতে চায়। ফলে নির্বাচনের প্রতি গ্রামের মানুষের আগ্রহ এক ধরনের ‘ফিলিং অব পাওয়ার’।

এক্ষেত্রে তারা আশা করে তাদের উন্নয়ন হবে। হয়তো এমন প্রত্যাশা থেকে নতুন দল নতুন কথা নিয়ে এলে তাদের ভোট দেয়। তবে অনেকে এলাকার বিভিন্ন কাজে জড়িত থাকেন, মানুষের খোঁজখবর রাখেন, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ থাকে, তারাও নির্বাচিত হন।

প্রকৃতপক্ষে গ্রামের মানুষ চায় রাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগের একটা সুযোগ। যেমন তাদের জমিসহ বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের সঙ্গে একটা বিরোধ হচ্ছে। এ জায়গায় মানুষ একটা সাপোর্ট চায়। আমাদের আইন ব্যবস্থা পুরোটাই ব্রিটিশদের তৈরি। ফলে বিচারকাজে একজন উকিল তার মক্কেলের পক্ষে ইংরেজিতে বিভিন্ন যুক্তিতর্ক করছেন কিংবা বিচারক প্রশ্ন করছেন তার কোনো কিছুই কিন্তু গ্রামের মানুষ বোঝে না। উপস্থিত থাকে শুধু। এতে উকিলদের সঙ্গে গ্রামের মানুষের একটা অর্গানিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।

এর কারণে প্রথম দিকে অনেক উকিল নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। আবার যারা নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন তারাও উকিল। আর যারা হেরেছেন তারাও উকিল ছিলেন। পরবর্তী সময়ে আইয়ুব খানের সময় উকিল ছাড়া আরেকটা পেশার মানুষের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা তৈরি হয়েছে, তারা হলো ঠিকাদার। তাদের হাতে টাকা ছিল। তারা তখন রাজনীতিতে আসা শুরু করে।

তখন পাটের ব্যবসায়ীরা কী রাজনীতিতে আসতেন না?

এটাও আইয়ুব খানের সময় থেকে আসা শুরু হয়েছে। তার আগে ব্যবসায়ীরা রাজনীতি করতে পারে এমনটি মনে করা হতো না।

সংবিধান ও সংসদের ভাষা ছিল ইংরেজি। ফলে অপেক্ষাকৃত শিক্ষিতরাই রাজনীতিতে আসতেন। এরপর রাজনীতিতে অর্থবান লোকজন আসতে থাকেন। এখন তো শুধু ধনীরাই আসেন। তাদের হাতে চলে গেছে সবকিছু।

গ্রাম থেকে যখন কোনো নেতা নির্বাচিত হয়ে শহরে আসেন, তখন গ্রামের মানুষ আশা করে ওই প্রতিনিধি গ্রামের উন্নয়নের জন্য কিছু করবেন। কিন্তু নির্বাচিত নেতারা শহরে আসার পর গ্রামের সমস্যা নিয়ে খুব একটা কথা বলেন না। তারা কেন গ্রামের সমস্যার কথা ভুলে যান?

কেন ভুলে যান এটা বলা মুশকিল। তারা আসলে অনেক কিছু করতে পারেননি। এটা মূলত কোয়েশ্চেন অব রিসোর্স। গ্রামের মানুষের চাহিদা কী থাকে? তারা চাচ্ছে তাদের এলাকায় রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ, স্কুল, হাসপাতাল, মেডিকেল সেন্টার তৈরি করা হোক। সবটাই টাকার ব্যাপার। যদি সারা দেশের জন্য চিন্তা করা হয়, তাহলে টাকার অংক হবে অনেক বিশাল। এটার সিদ্ধান্ত শুধু বাজেটের সময় আসতে পারে। বাজেটের এত শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে যাবে। এত শতাংশ শিক্ষায় বরাদ্দ করা হবে। সেটা জাতীয় আয়ের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। আমাদের জন্য সমস্যা যেটা ছিল সেখানে একটা বৈষম্য ছিল। ন্যায্যভাবে বরাদ্দ দিলে যতটা সম্পদ আমাদের পাওয়া উচিত ছিল বা যতটা পাওয়া যেত ততটা দেয়া হচ্ছিল না। এটা পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যাচ্ছিল।

আমাদের ক্ষোভের একটা কারণ ছিল এটাই। সে সময় জাতীয় পর্যায়ে বিরাট একটা উপার্জন আসত পাট থেকে। আর পাটের পুরোটাই উৎপাদন হতো পূর্ব বাংলায়। পূর্ব বাংলার আয়ের প্রায় পুরোটাই পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যেত। অর্থাৎ আয়টা ছিল আমাদের। খরচ হতো পশ্চিম পাকিস্তানে। সে সময় শেখ মুজিবুর রহমান বক্তৃতায় বলতেন ‘গরুকে ঘাস খাওয়াই আমরা, দুধ নিয়ে নিচ্ছে তারা’। এটা এমন একটা উদাহরণ, যা মানুষ বুঝত।

রূপক হলেও জাতীয় পর্যায়ে বিষয়টি তা-ই ছিল। আয় হতো বাংলার (পূর্ব পাকিস্তান)। আর উন্নত হতো পশ্চিম পাকিস্তান। শেখ মুজিবুর রহমান আরেকটি উদাহরণ দিতেন। ইসলামাবাদ তখন দ্বিতীয় রাজধানী। করাচি থেকে ইসলামাবাদে রাজধানী চলে গেল। কত দ্রুত আমাদের পাটের টাকা দিয়ে ইসলামাবাদ উন্নত হয়ে গেল। অথচ দ্বিতীয় রাজধানী ঢাকার কিছুই হয়নি। এ বৈষম্যটা খুবই
স্পষ্ট হলো।

শিল্পের জন্য কলকারখানা নির্মাণের উদ্যোগ পাকিস্তান আমলেই তো নেয়া হয়েছিল...

মূল কথা হলো, আমরা যা আয় করেছি, সেই পরিমাণ আমাদের দেয়া হতো না। আইয়ুব খানের সময় রাজনৈতিকভাবে এ বৈষম্য তীব্র হতে শুরু করে। তখন পূর্ব বাংলার উন্নতি দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। কিন্তু পরে তিনি (আইয়ুব খান) এর শেষ দেখে যেতে পারেননি। কারণ পশ্চিম পাকিস্তানে তার জনপ্রিয়তা না থাকার কারণে তাকে ক্ষমতা হারাতে হয়েছে। আমাদের এখানেও বিভিন্ন কারণে তার (আইয়ুব খান) জনপ্রিয়তা কমে গিয়েছিল। ষাটের দশকের শেষের দিকে কিছু উন্নয়ন হয়েছিল। কারণ তারা (পশ্চিম পাকিস্তান) বুঝতে পেরেছিল উন্নয়ন না হলে পূর্ব বাংলা আলাদা হয়ে যাবে। দুই বছর পর তিনি ক্ষমতাই হারায়।

পাটের ব্যবসায়ী বাংলাদেশী ছিলেন। পাট বিক্রি করে টাকা তিনি নিজেই নিতেন। তাহলে এ কথা কেন বলা হতো যে পাট বিক্রি করে টাকা তারা নিয়ে যাচ্ছে?

কোনো পণ্য রফতানি করলে একটি দেশের আয় হয়। ট্যাক্স ও ফরেন এক্সচেঞ্জ থেকে সরকার ও জাতীয় পর্যায়ে কিছু আয় হয়। এছাড়া রফতানি বাণিজ্য সাধারণত বৈদেশিক মুদ্রার মাধ্যমে হয়ে থাকে। সেখান থেকেও সরকার কিছু আয় করে। এসব আয় পশ্চিম পাকিস্তানেই ব্যয় হতো। এছাড়া কর রাজস্ব থেকে প্রাপ্ত অর্থের প্রায় পুরোটাই পাকিস্তানের উন্নয়নের জন্য ব্যয় করা হতো।

কোন পরিপ্রেক্ষিতে পূর্ব বাংলায় সংগঠিত আন্দোলনগুলোতে বঙ্গবন্ধুর সম্পৃক্ততা তৈরি হলো?

শেখ মুজিবুর রহমান রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকে পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে লড়াই করেছেন। ভাষা, সংস্কৃতি নিয়ে আন্দোলন করেছেন। যে পেশাজীবী সমাজটা পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে সামনে ছিল—সাংবাদিক ও আইনজীবীসহ তারা প্রায় সবাই শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ছিলেন। কারণ তিনি পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন দাবি নিয়ে রাজনীতি করেছেন, জেলে গিয়েছেন। বহুবার কারাবরণ করেছেন, বিভিন্ন সময় নির্যাতিত হয়েছেন, নিপীড়িত হয়েছেন, এ বিষয়গুলো মানুষের সামনে ইতিবাচকভাবে ফুটে উঠেছে।

আরেকটা কথা বলা দরকার, তা হলো তিনি খুব সাহসী বক্তা ছিলেন। তার বক্তৃতার মধ্যে সরকারবিরোধী বিভিন্ন কাজের সমালোচনা থাকত। ফরিদপুরের ভাষায় তাকে বলা হতো ‘ব্যাটা একখান’। আমার মনে আছে ফরিদপুরে একটি সভায় শেখ মুজিব আইযুব খানকে উদ্দেশ করে বলেছেন, তুমি কী ভাবছো, তুমি যা ইচ্ছা তাই করতে পারো? শরীরটা আমারও তোমার মতো বড়। আমি যদি তোমার মতো ইংরেজের সেনাবাহিনীতে লেফট রাইট করতাম, তোমার আগে জেনারেল হইতে পারতাম। এ ধরনের কথা বা বক্তৃতাগুলো মানুষের হূদয়ে দাগ কেটেছে।

আসলে এ দেশের মানুষ বিরোধী দলের নেতার কাছে
সাহসী বক্তৃতা আশা করে। আর সরকারি দলের কাছে বিনয় আশা করে। এখানে গোলমাল হলে তার রাজনৈতিক সফলতার সুযোগ খুব কম। আরেকটি বিষয় হলো, বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতার ভঙ্গি ও ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ দেখে মানুষ তার প্রতি আকৃষ্ট হতো।

বঙ্গবন্ধু কীভাবে গণমানুষের নেতা হয়ে উঠলেন?

’৪৬-এর নির্বাচনে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি সারা পূর্ব বাংলায় ঘুরেছেন। তিনি (সোহরাওয়ার্দী) শেখ মুজিবুর রহমানকে দিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে যোগাযোগ করতেন। এতে সবার সঙ্গে অনেক বেশি পরিচিত ছিলেন শেখ মুজিব। যেহেতু তিনি অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী সাহেবের বাড়িতে থাকতেন, এতে যারাই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে আসতেন তারা শেখ মুজিবের মাধ্যমে যোগাযোগ করতেন। সোহরাওয়ার্দী উর্দুতে কথা বলতেন। শেখ মুজিবুর রহমান অনুবাদক হিসেবেও কাজ করতেন। তিনি সোহরাওয়ার্দী সাহেবের ডান হাত ছিলেন। এটাই তাকে জনপ্রিয় হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।

আওয়ামী লীগে সে সময় শেখ মুজিবুর রহমানের চেয়েও অনেক বড় নেতা ছিলেন। আবুল মনসুর, আতাউর রহমান খান, আব্দুস সালাম খানসহ বড় বড় নেতা সে সময় রাজনীতি করতেন। কিন্তু মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার অসামান্য ক্ষমতা শেখ মুজিবুর রহমানকে ওপরে উঠতে সাহায্য করে, তাকে জননায়কে পরিণত করে। তিনি আওয়ামী লীগের একমাত্র নেতা ছিলেন যিনি ফুল টাইম পলিটিকস করতেন। অন্যদের মধ্যে কেউ ব্যবসা, কেউ ওকালতি নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন আর সময় পেলে রাজনীতি করতেন, মানুষের কাছে তেমন যেতেন না।

’৫৪-এর নির্বাচনে অল্প বয়সেই শেখ মুজিব সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেন। সেই নির্বাচনে তাকে অনেক কাজ করতে হয়েছে। একদিকে সোহরাওয়ার্দীর প্রতিনিধি, আরেক দিকে ফুল টাইম রাজনীতিতে থাকা, ভালো এবং সাহসী বক্তা, কারাবরণকারী রাজনীতিবিদ সবকিছু মিলিয়ে বঙ্গবন্ধু সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন।