বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তি জাপান। এশিয়ার এ দেশ শান্তিতে বিশ্বাসী। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এজন্য দেশটির সুনামও রয়েছে। শান্তির পথে থাকা জাপান এবার ভয়ংকর সামরিক পরিকল্পনা করেছে। বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাপকাঠিতে এর অবস্থান নবম। দেশটির দূরপাল্লার বোমারু বিমান কিংবা পারমাণবিক অস্ত্রও নেই। নতুন পরিকল্পনা নিয়ে জাপান এখন প্রতিরক্ষা ব্যয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কাতারে শামিল হতে চাইছে।
নতুন পরিকল্পনায়
যা রয়েছে
জাপানের প্রধানমন্ত্রী
ফুমিও কিশিদার পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে প্রতিরক্ষা ব্যয় দ্বিগুণ করে মোট
দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) ২ শতাংশে উন্নীত করা হবে। বর্তমানে এ ব্যয় ১ শতাংশ। রয়টার্সের
খবরে বলা হয়েছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপান সবচেয়ে বেশি ৩২ হাজার কোটি মার্কিন
ডলার (৩২০ বিলিয়ন) ব্যয়ের পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্বোচ্চ।
পঞ্চবার্ষিক এ
পরিকল্পনা অনুযায়ী, চীনে আঘাত হানতে পারবে এমন ক্ষেপণাস্ত্র কিনবে জাপান। যেন তারা
সংঘাতেও টিকে থাকতে পারে। এতদিন জাপানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে মাথাব্যথা ছিল
না। অন্য রাষ্ট্রে আঘাত করার মতো অস্ত্রও তাদের তেমন নেই। জাপানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম
এনএইচকের মতে, তাদের ‘সবচেয়ে কৌশলগত প্রতিবন্ধক’ হলো
চীন এবং দিন দিন তা প্রকট হয়ে উঠছে।
চীনের ওপর চড়াও
কেন
অর্থনীতি ও সামরিক
দিক থেকে চীনের ক্রমবর্ধমান উত্থান জাপানকে অস্বস্তিতে ফেলছে। এর আগে পূর্ব চীন সাগরের
কয়েকটি ক্ষুদ্র দ্বীপের মালিকানা নিয়ে দুই দেশ বিবাদে জড়িয়েছে। জাপান বলছে, দ্বীপগুলো
তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অন্যদিকে চীনের দাবি, দ্বীপগুলোর মালিকানা বেইজিংয়ের। এছাড়া
তাইওয়ানে চীনের জবরদস্তিও জাপানকে ক্ষুব্ধ করেছে। কারণ তাইওয়ানে হামলা হলে জাপানের
কাছের একটি দ্বীপ হুমকিতে পড়বে। এতে সাগরপথে জাপানের বাণিজ্য ব্যাহত হবে।
শুধু চীন নয়, উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান হুমকি মোকাবেলায় জাপান সামরিক কৌশল ঢেলে সাজাচ্ছে। জাপান বলছে, বৈশ্বিক বাস্তবতায় তারা এখন বসে থাকবে না। নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে তারা খুচড়া যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য অস্ত্র মজুদ, সামরিক সরঞ্জাম ও সাইবার যুদ্ধের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য পদক্ষেপ নেবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রসহ ও অন্য মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক গাঢ় করার দিকে জোর দেবে।
এতে লাভ বেশি
যুক্তরাষ্ট্রের
বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের
প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীন। যুক্তরাষ্ট্র চায় চীনকে দমাতে। আবার জাপানও চীনের জন্য
তাদের সামরিক অবস্থান পরিবর্তন করছে। অর্থাত্ এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র-জাপান নতুন করে
একযোগে কাজ করতে পারে। এর আগে জাপানকে কোয়াড জোটে যুক্ত করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি
গত বছর জাপানের ন্যাটোয় যোগ দেয়ার গুঞ্জন ওঠে। জোটটির সঙ্গে জাপানের সম্পর্ক রয়েছে।
ন্যাটোয় যোগ দেয়ার ব্যাপারে জাপানের কোনো আপত্তিও নেই। তবে জাপানি সংবিধানের অনুচ্ছেদ-৯-এর
(যুদ্ধে জড়াতে পারবে না) কারণে দেশটি সামরিক জোটে যোগদানে বিরত রয়েছে। জাপানের এখন
যে প্রত্যাশা তাতে সংবিধানের বাধাও হালকা হয়ে যাবে।
এদিকে জাপানের
প্রতিরক্ষা শক্তি বৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে কোয়াডের আরেক সদস্য অস্ট্রেলিয়া।
অস্ট্রেলিয়াও ধীরে ধীরে নিজেদের সশস্ত্র করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। জাপান
ও অস্ট্রেলিয়া শক্তিশালী হলে কোয়াড শক্তিশালী হবে। যেহেতু কোয়াডের মূল লক্ষ্যই হলো
চীনের উত্থান ঠেকানো। এতে যুক্তরাষ্ট্র খুশি হবে। আর জাপান যদি কখনো ন্যাটোয় যোগদান
করে তাহলে এশিয়ায় জোটটির শক্তি বাড়বে এবং সামরিক ব্যয়ের কিছু ভার জাপানের ওপর পড়বে।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রির সুযোগ বাড়বে।
জাপানের মূল লক্ষ্য
জাপানের জাতীয়
কৌশলপত্র অনুযায়ী, তারা পাল্টা হামলার সক্ষমতার জন্য সামরিক প্রকল্পে অর্থ ব্যয় করছে।
সেক্ষেত্রে সম্ভাব্য বড় হুমকি হিসেবে চীন ও উত্তর কোরিয়াকেই দেখা হচ্ছে। এর আগে জাপানের
জাতীয় কৌশলপত্রে বলা হয়েছিল, বেইজিংয়ের সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট কৌশলগত অংশীদারত্ব
রাখবে টোকিও। কিন্তু এখন জাপানের সে অবস্থান বদলে গেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় চীন বলেছে,
জাপান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গেছে এবং চীনকে অপমান করেছে।
তবে জাপানের সিদ্ধান্তকে
সমর্থন জানিয়েছে দেশটির সাধারণ মানুষ। বেশকিছু জরিপে দেখা গেছে, ৭০ শতাংশ নাগরিক এতে
সমর্থন দিয়েছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদা জানিয়েছেন, তারা এমন একটি ব্যবস্থা
গড়তে চান যেটি আক্রমণাত্মক নয়, প্রতিরক্ষামূলক হবে।
আগে ভাবেনি কেন
জাপানের সুদূরপ্রসারী এ সামরিক বাজেট পরিকল্পনা একসময় অকল্পনীয় ছিল। এতদিন নিজেদের প্রতিরক্ষার ভার তারা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অনেকাংশে ছেড়ে দিয়েছিল। প্রতিরক্ষা অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র আর নিজেদের সেলফ ডিফেন্স ফোর্সেই (এসডিএফ) জাপান সন্তুষ্ট ছিল। দেশটি প্রতিরক্ষা বাজেট ১ শতাংশের মধ্যে রাখত এবং অস্ত্র রফতানিতে নিষেধাজ্ঞাও ছিল। জাপানের কোনো সামরিক বাহিনী নিজ দেশে ছাড়া অন্য কোনো ভূখণ্ডে নিযুক্ত নেই। সবকিছু ভুলে গিয়ে জাপান এখন সামরিক আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে ব্যস্ত। এতদিন তারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জেরে সামরিক শক্তি বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেয়নি। ইতিহাসের পটপরিবর্তনের এক মোড়ে দাঁড়িয়ে ফুমিও কিশিদা বলেছেন, আমরা যেসব নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি, সেসব চ্যালেঞ্জের জবাব দেয়ার জন্য এ পরিকল্পনা হচ্ছে।
পুরনো শক্তি ভোলেনি
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের
আগে জাপান ছিল দুর্ধর্ষ। জাপান যে কত আক্রমণাত্মক, তা হাড়ে হাড়ে জানে চীন, রাশিয়া,
যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র। চীনের সঙ্গে পরপর দুটি ও রাশিয়ার সঙ্গে একটি যুদ্ধে জাপান
জয়ী হয়েছিল। এরপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জয়লাভ করায় জাপান হয়ে ওঠে আরো আধিপত্যশীল। প্রথম
বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দা থেকে বাঁচতে জাপান ১৯৩১ সালে চীনকে আক্রমণ করে।
সে সময় জাপানের এ আক্রমণাত্মক মনোভাব যুক্তরাষ্ট্র ভালোভাবে নেয়নি। এ নিয়ে জাপান-যুক্তরাষ্ট্রের
পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপে দুই দেশের সম্পর্কের পারদ বাড়তে থাকে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে
জাপানের ঐতিহাসিক যুদ্ধ শুরু হয়।
১৯৪১ সালের ৭
ডিসেম্বর জাপান যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় নৌঘাঁটি পার্ল হারবারে হামলা করে। ওই হামলায়
নিহত হয় ২ হাজার ৪০০ জন সামরিক ও বেসামরিক নাগরিক। আহত হয়েছিল প্রায় ১ হাজার ২০০ জন।
জাপানি বাহিনী বিপুলসংখ্যক মার্কিন সামরিক যান ধ্বংসও করেছিল। তবে সে সময় মার্কিন বাহিনী
অপ্রস্তুত ছিল এবং পাল্টা হামলা তো দূরের কথা, নিজেদের প্রতিরোধও করতে পারেনি। জাপান
সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা না দিয়ে হঠাত্ যুক্তরাষ্ট্রকে আক্রমণ করে, যার লক্ষ্য ছিল সামরিকভাবে
যুক্তরাষ্ট্রকে দুর্বল ও মনোবল ভেঙে দেয়া। যুক্তরাষ্ট্রে আক্রমণের পর যুক্তরাষ্ট্র
ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে জাপান। পরদিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন
আলাদাভাবে জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন নতুন মাত্রা
পায়।
ছয় মাস পর দ্বিতীয়বার জাপান পার্ল হারবার আক্রমণের পরিকল্পনা করে। জাপানের সেই পরিকল্পনা তখন যুক্তরাষ্ট্র জেনে যায়। পরে জাপানি হামলা ঠেকাতে প্রস্তুত যুক্তরাষ্ট্র চরম প্রতিশোধ নেয়। যুক্তরাষ্ট্র অতর্কিত হামলা করে জাপানিদের চারটি যুদ্ধজাহাজ ও ৩৩২টি বিমান ধ্বংস করে। নিহত হয় প্রায় পাঁচ হাজার জাপানি সেনা। এর পরও ক্ষান্ত ছিল না যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে পারমাণবিক বোমা হামলা চালিয়ে দুই লাখের বেশি মানুষ হত্যা করে এবং শহর দুটি ধ্বংস করে দেয়। পরে পারস্পরিক স্বার্থ বিবেচনায় দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়ন ঘটে।
লেখক : সাংবাদিক










