চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে রফতানি কনটেইনার ওঠানামায় নতুন রেকর্ড গড়েছে চট্টগ্রাম বন্দর। এ সময়ে কনটেইনার ওঠানামার পরিমাণ ২ লাখ ৮১ হাজার ৯২৭ একক, শুধু অক্টোবরে ৭২ হাজার ৬৪২ একক কনটেইনার হ্যান্ডলিং করেছে; যা ২০২১ সালের মধ্যে সর্বোচ্চ। সার্বিক বিচারে বিষয়টি চট্টগ্রাম বন্দর ও দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। তবে এখানেই থেমে থাকলে চলবে না। অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আমদানি ও রফতানি উভয়ই আরো বাড়বে। সেক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা আরো বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নেয়া পরিকল্পনার দ্রুত বাস্তবায়নও কাম্য।

কনটেইনার পরিবহনে মাস হিসেবে রেকর্ড গড়লেও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সমুদ্রবন্দর হিসেবে চট্টগ্রাম এখনো নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। চীন, সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়ার বন্দরগুলোর তুলনায় কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে অনেক পিছিয়ে বাংলাদেশ। বন্দরে উৎপাদনশীলতা বা সক্ষমতা পরিমাপ করা হয় কনটেইনার ওঠানো-নামানোর সংখ্যা হিসাব করে। যে বন্দর দিয়ে যত দ্রুত তা ওঠানো-নামানো যায়, সেই বন্দরই অধিক সক্ষম। ২০২০ সালে সারা বিশ্বের বন্দরগুলোর ব্যস্ততা, অর্থাৎ কনটেইনার পরিবহনের সংখ্যা হিসাব করে শীর্ষ ১০০টি বন্দরের তালিকা তৈরি করেছে লয়েডস লিস্ট। বাংলাদেশের গেটওয়ে খ্যাত চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান নেমে গেছে ৬৭তম স্থানে। তালিকার ওপরে রয়েছে চীনের সাংহাই বন্দর, দ্বিতীয় সিঙ্গাপুর বন্দর। সুতরাং চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে আরো অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে। জার্মানির হামবুর্গ পোর্ট কনসাল্টিংয়ের গবেষণা বলছে, ২০৩৬ সালে ২০ ফুট দীর্ঘ ৫৬ লাখ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করতে হবে চট্টগ্রাম বন্দরকে। ক্রমবর্ধমান সমুদ্র বাণিজ্য সামাল দিতে বন্দর কর্তৃপক্ষকে সক্ষমতা বাড়ানোরও তাগিদ দিয়েছেন তারা। তাদের এ পরামর্শ আমলে নেয়া প্রয়োজন। বিশ্বের দ্বিতীয় পোশাক রফতানিকারক হিসেবে শীর্ষস্থানীয় মেইন লাইন অপারেটর কিংবা ভেসেল কোম্পানিগুলোকে চলমান সমস্যা বিবেচনায় আনতে হবে। সুদূর চীন থেকে মাদার ভেসেলগুলো বাংলাদেশমুখী হওয়ার সময় যদি পর্যাপ্ত জায়গা বরাদ্দ না নিয়ে আসে তাহলে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। পিক বা অফ পিক যেকোনো সময়ের জন্য মাদার ভেসেলে বাংলাদেশের জন্য চাহিদা অনুযায়ী পরিসর দরকার। তৈরি পোশাক শিল্পের প্রতিটি ধাপে প্রতিটি দিন, প্রতি ঘণ্টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জড়িত দেশের অগণিত মানুষ। বাংলাদেশের অধিকাংশ বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন হয় এ খাত থেকেই। ফলে সংশ্লিষ্ট সমস্যার দ্রুত ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কনটেইনার জট হ্রাস, জাহাজের গড় অবস্থান সময়কাল কমিয়ে আনার প্রচেষ্টা আরো জোরদার করতে হবে।

এ অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর সিঙ্গাপুর। ছোট্ট একটি দেশ। যার আমদানি-রফতানি পণ্যের পরিমাণ খুবই নগণ্য হওয়ার কথা। অথচ এটি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে বিশ্বের দ্বিতীয়। কারণ এ অঞ্চলের সবচেয়ে পুরনো গভীর সমুদ্রবন্দর এটি। এরপর রয়েছে মালয়েশিয়ার পোর্ট ক্লেং ও তেনজান পিলিপাস বন্দর, থাইল্যান্ডের চ্যাবং বন্দর ও ইন্দোনেশিয়ার তেনজান প্রিয়ক বন্দর। প্রতিবেশী সব দেশের তুলনায় খুব ছোট একটি দেশ শ্রীলংকা তার প্রতিবেশীদের টেক্কা দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে এগিয়ে আছে। শ্রীলংকার হাম্বানটোটা বন্দর ভারতের মতো বড় দেশের সবচেয়ে বড় বন্দর মুম্বাই জহরলাল নেহেরু বন্দর থেকেও এগিয়ে। চীন নিজের দেশেই ৬০টি গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপন করেছে। ২০১৬ সালে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে গাউদারে ডিপ সি পোর্ট তৈরি হয়েছে। যে দেশের সমুদ্রবন্দর যত উন্নত তার অর্থনৈতিক উন্নয়নও দ্রুত হয়েছে। বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গায় অবস্থিত। বাংলাদেশের বন্দরগুলো থেকে ভারতের উত্তর-পূর্বের প্রদেশগুলো খুব কাছে। চীনেরও দক্ষিণভাগের স্থলবেষ্টিত অঞ্চলের জন্য বাংলাদেশের বন্দরগুলো সুবিধাজনক। এছাড়া নেপাল, ভুটান তো আছেই। এদিকে বাংলাদেশে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে। গোল্ডম্যান স্যাকসের হিসাবে বাংলাদেশ ১১ উদীয়মান অর্থনীতির দেশের একটি। উন্নয়নের এ ধারা অব্যাহত থাকলে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা আরো বাড়াতে হবে।

আশার কথা, জাহাজ জট ও কনটেইনার জট দূর করে বন্দরকে আরো গতিশীল করতে ২২টি উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। গত এক দশকে বন্দরে কোনো টার্মিনাল না বাড়লেও এখন কর্ণফুলীর মোহনায় বে-টার্মিনাল, পতেঙ্গায় কনটেইনার টার্মিনাল, লালদিয়া টার্মিনাল ও কর্ণফুলী কনটেইনার টার্মিনাল নামে চারটি স্বতন্ত্র টার্মিনাল নির্মাণের প্রকল্প চূড়ান্ত করা হয়েছে। ১২৯ বছরে যে বন্দরে চারটি কি গ্যান্ট্রি ক্রেন এসেছে, সেই বন্দরে এখন একসঙ্গে আনা হচ্ছে ছয়টি কি গ্যান্ট্রি ক্রেন। বন্দরে কনটেইনার জট কমাতে ৩৭ একর জায়গার ওপর নির্মাণ করা হচ্ছে নতুন ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ড। আবার সাউথ কনটেইনার ইয়ার্ড চালু করে তাতে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে নিলাম পণ্যের কনটেইনার। বন্দর সম্প্রসারণ করতে সীতাকুণ্ড এলাকায়ও আরেকটি টার্মিনাল নির্মাণের ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হচ্ছে। বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন, নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পগুলোর কাজ শুরু ও শেষ করা গেলে গতি বাড়বে চট্টগ্রাম বন্দরের। কমবে কনটেইনার ও জাহাজ জট। উদ্যোগগুলো অবশ্যই ইতিবাচক, তবে বাস্তবায়ন গতি ধীর। কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ এরই মধ্যে পার হয়েছে, বেড়েছে ব্যয়ও। এটি বাণিজ্যের ব্যয় বাড়িয়ে তুলছে। বড় বিষয় হলো, বন্দর ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন। এরই মধ্যে চট্টগ্রাম পোর্ট অথরিটি অধ্যাদেশ ১৯৭৬ রহিত করে সময়োপযোগী বিধান সংযোজন করে নতুন আইন প্রণয়নের জন্য সংসদে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বিল-২০২১ উত্থাপন করা হয়েছে। পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে সংসদে রিপোর্ট প্রদানের জন্য বিলটি নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। আশা করা যায়, বিলটি পাস হলে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবস্থাপনায় গতি আসবে। যাচাই-বাছাই শেষে দ্রুতই এটি পাস ও কার্যকরের পদক্ষেপ নিতে হবে। 

বন্দরের যে সক্ষমতা আছে, তাতে আরো এক-দুই বছর হয়তো চাহিদা মেটানো যাবে। কিন্তু যে হারে কনটেইনার পরিবহন বাড়ছে, তাতে বন্দর সম্প্রসারণ করতেই হবে। প্রথমত, চট্টগ্রাম বন্দরে আরো জেটি ও কনটেইনার ওঠানো-নামানোর জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি জোগান দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, পতেঙ্গা টার্মিনালের কাজ দ্রুত শেষ করতে হবে। বে টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী টার্মিনাল স্থাপনের কাজও দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে। উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে যত পণ্য পরিবহন হয়, তার অধিকাংশই আনা-নেয়া হয় কনটেইনারবিহীন সাধারণ জাহাজে। সাধারণ জাহাজের (বাল্ক, ব্রেক বাল্ক ও ট্যাংকার) খোলে আমদানি হয় মূলত সিমেন্ট, ইস্পাত ও সিরামিক কারখানার কাঁচামাল এবং পাথর, কয়লা, ভোগ্যপণ্য ও জ্বালানি তেল। পরিমাণে এক-চতুর্থাংশ পণ্য পরিবহন হলেও কনটেইনারে বেশির ভাগ শিল্পের কাঁচামাল, বাণিজ্যিক পণ্য ও ভোগ্যপণ্য আমদানি হয়। অন্যদিকে সমুদ্রপথে রফতানির পুরোটাই যায় কনটেইনারে। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশীয় পণ্যের আমদানি-রফতানির বাইরে সম্প্রতি ভারত দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পণ্য পরিবহনে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করছে। প্রাথমিকভাবে পণ্য পরিবহনের পরিমাণ কম হলেও ভবিষ্যতে তা বাড়বে। নেপাল ও ভুটানও সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের জন্য বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহারে আগ্রহী। সেক্ষেত্রে চট্টগ্রামসহ তিনটি সমুদ্রবন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। আর সেটি সম্ভব হবে আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ অধিক জেটি ও অধিক টার্মিনাল স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের মধ্য দিয়ে।

আগামী অন্তত ৫০ বছরের ব্যবসা-বাণিজ্যের ভলিউম মাথায় রেখেই পদক্ষেপ নেয়া দরকার। তা না হলে একসময় চরম বন্ধ্যাত্ব দেখা দিতে পারে। দেশের অর্থনীতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বড় বন্দরে সমস্যা দেখা দিলে ঠেকা কাজ সারানোর প্রবণতা বাস্তবসম্মত নয়। চট্টগ্রামসহ সারা দেশে তিনটি অর্থনৈতিক জোন প্রতিষ্ঠার কথা রয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের আকার বাড়বে। অর্থাৎ ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি মাথায় নিয়েই বন্দরটি ক্রমান্বয়ে সাজাতে হবে।