আঞ্চলিক বাণিজ্যের হাব হিসেবে সৈয়দপুর বিমানবন্দর গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। শনিবার বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রংপুর বিভাগের একমাত্র বিমানবন্দরটি শুধু অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচলের জন্য উপযোগী। তবে ভারত-নেপাল-ভুটান-মালদ্বীপের সঙ্গে বাণিজ্য বিস্তারে এটিকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে গড়ে তোলা হবে। উদ্যোগটি ইতিবাচক হলেও বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি সাপেক্ষে এক্ষেত্রে সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাই বাঞ্ছনীয়। বাণিজ্য সম্ভাবনার বিষয়টি আরো যাচাই-বাছাই এবং প্রকল্পটির লাভ-লোকসান সঠিকভাবে হিসাব করেই এগোনো উচিত। বিনিয়োগের আগেই সম্ভাব্য রিটার্ন বিবেচনায় নিতে হবে। শুধু বিমানবন্দর নির্মাণ করলেই সেটি আঞ্চলিক বাণিজ্যের হাব হয়ে উঠবে না, তার জন্য আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা এবং সেবার মান বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশ অবস্থানগত কারণে এ অঞ্চলের ইকোনমিক হাব বা অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ হাব বিস্তৃত করা গেলে দেশও লাভবান হবে। এজন্য আকাশপথ যথেষ্ট ভালো ও সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। নৌপথের বিদ্যমান সুবিধা বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি এবং সড়ক ও রেলপথ কাজে লাগাতে হবে। আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি বৃদ্ধির জন্য এ মুহূর্তে নদী ও সমুদ্রবন্দরের ওপর খুব জোর দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে পায়রা সমুদ্রবন্দর অন্যতম। সন্দেহ নেই, এদিকে যথেষ্ট মনোযোগ দেয়া উচিত। তবে আঞ্চলিক বাণিজ্যের হাবে পরিণত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রতিবন্ধকতাগুলোও চিহ্নিত করা দরকার। কানেক্টিভিটির জন্য আমাদের যে বাধাগুলো আছে, সেগুলো অতিক্রম করতে না পারলে লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে। বাংলাদেশের এক নম্বর হলো শুল্ক ও অশুল্ক বাধা। বিশ্বের অন্যান্য দেশের বাণিজ্যের তুলনায় এশিয়ার এ অঞ্চলে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা বেশি। তাই এ বাধা দূর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বিশেষ করে রাজস্ব ও শুল্ক কর ইস্যুতে যথেষ্ট নজর দিতে হবে যেন বাণিজ্যবান্ধব হয়। নানাভাবে সৈয়দপুর বিমানবন্দর থেকে লাভবান হতে পারে বাংলাদেশ। এ বিমানবন্দরকে প্রবেশপথ হিসেবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশগুলোর ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতা দূর করতে হবে। ভিসা ছাড়া ভ্রমণের ক্ষেত্রে এয়ারসাইট ট্রান্সফার পদ্ধতি প্রয়োগ করা হতে পারে। বিমানবন্দর চালু করার আগে এ বিষয়ে নীতিমালা করতে হবে।
দার্জিলিং থেকে ৫৮ কিলোমিটার দূরে বাগডোগরা বিমানবন্দর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তরের জেলাগুলোর যাত্রীসেবা দেয়। ওই বাগডোগরা বিমানবন্দর থেকে কলকাতা, দিল্লি, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, চেন্নাই ও গুয়াহাটি ছাড়াও ভুটানের থিম্পু ও থাইল্যান্ডের ব্যাংককে বিমানে প্রতি বছর ১০ লাখ যাত্রী চলাচল করে। অথচ ভারতের পশ্চিম দিনাজপুরের ওই বাগডোগরা বিমানবন্দরে সব উড়োজাহাজ নামতে পারে না। বাগডোগরায় যে উড়োজাহাজ নামতে পারবে না, সৈয়দপুরে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হলে সেটি সুবিধা পাবে। আবহাওয়া খারাপ ও কারিগরি সমস্যা হলে ভুটানের থিম্পু বিমানবন্দরে নামতে না পারা বিমান এখন পাঠিয়ে দেয়া হয় দিল্লি বিমানবন্দরে। সৈয়দপুর বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক মানের হলে সে বিমান অনায়াসে সৈয়দপুর বন্দর ব্যবহারের সুযোগ পাবে। উড়োজাহাজ ল্যান্ড করলেই নেভিগেশন চার্জ, হ্যান্ডলিং চার্জ, পার্কিংসহ আরো অনেক চার্জ দিতে হয়। এতে বাণিজ্যিকভাবে বিমান কর্তৃপক্ষ, যাত্রী ও সৈয়দপুর বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ সবাই লাভবান হবে। ভুটান কয়েক বছর আগেই সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক করার প্রস্তাব দিয়েছে। বিবিআইএন ইনিশিয়েটিভ তথা বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপালের মধ্যে উপ-আঞ্চলিক সংযুক্তির যে উদ্যোগ, তা এগিয়ে নিতে এ বিমানবন্দর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল থেকে ভারতের ওপর দিয়ে অতিসহজেই নেপালের সঙ্গে ভৌগোলিক সংযোগ তৈরি করা সম্ভব। এ সংযোগ তৈরির জন্য জোর দিতে হবে। একই এলাকা দিয়ে ভুটানের সঙ্গেও সংযোগ গড়ে তুলতে হবে। আর দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্কের বিদ্যমান কাঠামোর ভেতরেই এ সংযোগ গড়ে তোলা উচিত। এক্ষেত্রে আসিয়ানের দিকে দৃষ্টি দেয়া যেতে পারে। তারা শক্তিশালী সংযোগ তৈরি করতে পেরেছে। আসিয়ান বিভিন্ন সদস্যের মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নানা জটিলতা সত্ত্বেও একটি শক্তিশালী বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পেরেছে। খেয়াল করলে দেখা যাবে, ভারত কিন্তু বাণিজ্য সম্প্রসারণে অন্যান্য দেশের সঙ্গে অনেক বেশি উন্মুক্ত। পূর্ব এশিয়ার কোরিয়া, হংকং ও সিঙ্গাপুরের সঙ্গে ভারতের প্রচুর বাণিজ্য রয়েছে। আঞ্চলিকতার বাইরে আফ্রিকার দেশগুলো এবং ব্রাজিল ও জার্মানির সঙ্গে ভারতের অনেক বেশি বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে।
সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক রূপ দিতে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগে অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে—রানওয়ে থেকে শুরু করে ট্যাক্সিওয়ে, কার্গো টার্মিনাল, আবাসিক ভবন, সড়ক, লাউঞ্জ, পানি সরবরাহ, উন্নত মানের রাডার প্রভৃতি। এক্ষেত্রে বিনিয়োগের আগে সবকিছু যাচাই করে নেয়া প্রয়োজন। কী পরিমাণ বিনিয়োগে কতটা রিটার্ন বাংলাদেশ পেতে পারে, তার সুচারু তথ্য-উপাত্ত থাকা আবশ্যক। ফুলিয়ে নয়, প্রকৃত তথ্যই জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। এরই মধ্যে দেশে কক্সবাজার বিমানবন্দর তৈরি ও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের নির্মাণকাজ চলছে। এসব কাজ শেষে তাদের ফলাফল দেশে সৈয়দপুর বিমানবন্দর উন্নয়নে বিনিয়োগে যাওয়া যেতে পারে। তাছাড়া কোন কোন দেশ পণ্য ও যাত্রী পরিবহনে বিমানবন্দরটি ব্যবহার করবে তারও নিশ্চয়তা প্রয়োজন। সৈয়দপুর বিমানবন্দরের যেন শ্রীলংকার বিমানবন্দরের মতো অবস্থা না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। বিপুল বিনিয়োগের অর্থ উঠে না এলে সেটি শ্বেতহস্তীতে পরিণত হতে পারে। এটিও আমলে নিতে পারে। বাংলাদেশের ব্যস্ত হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সেবার মান নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন রয়েছে। এজন্য বিভিন্ন সময়ে শাস্তির সম্মুখীনও হতে হয়েছে। সৈয়দপুরের ক্ষেত্রে তেমনটি যেন না ঘটে, সেজন্য এর ব্যবস্থাপনাও উন্নত করতে হবে। নতুবা অন্য দেশকে সেবা দেয়ার যে লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ অগ্রসর হচ্ছে, তা হোঁচট খেতে পারে। এক্ষেত্রে বড় বিনিয়োগের আগে যথাযথভাবে সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে।










