ঢাকার চারপাশের চার নদী রক্ষায় একের পর এক প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। খরচ করা হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। কিন্তু প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ সমাপ্তির বছর না ঘুরতেই পাল্টে যাচ্ছে দৃশ্যপট। ফিরে আসছে দখলদাররা, বাড়ছে দূষণ। এ অবস্থায় নতুন করে আবারো ২ হাজার ২০০ কোটি টাকার প্রকল্প নেয়ার খবর মিলছে। এতে নদী রক্ষায় আদৌ কতটুকু সাফল্য আসবে, তাতে যথেষ্ট সংশয় থেকে যায়। বণিক বার্তার সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে আগের প্রকল্পের আওতায় নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও স্থাপনা অল্প সময়েই নষ্ট হয়ে গেছে। কাজেই শুধু দফায় দফায় প্রকল্প বাস্তবায়ন নয়, নিশ্চিত করতে হবে পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণও। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নজরদারি ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।

আমাদের রাজধানীর ইতিহাস-ঐতিহ্যে বড় জায়গাজুড়ে আছে এর চারপাশের নদীগুলো। সুদীর্ঘ সময় ধরে নদীকে কেন্দ্র করেই ঢাকা ও সংলগ্ন এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আবর্তিত হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার এবং বিদেশী বণিকদের আসার অন্যতম কারণও ছিল ঢাকার নৌপথ। ১৬১০ সালে ঢাকা রাজধানী হিসেবে মর্যাদা লাভের পর এ অঞ্চলে নৌপথের গুরুত্ব আরো বাড়ে। কিন্তু এর ধারাবাহিকতা ধরে রাখা যায়নি। ভূমিদস্যুদের বেপরোয়া দখল, ভরাট, ক্রমবর্ধমান দূষণ ও অব্যাহত আগ্রাসনের ফলে ৪০০ বছরের বেশি সময়ের গুরুত্বপূর্ণ নদী বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, ধলেশ্বরী ও শীতলক্ষ্যা আজ হুমকির মুখে। এভাবে চলতে থাকলে একসময় নদীগুলোর ঠাঁই মিলবে মানচিত্রে, বাস্তব অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। সুতরাং নদীগুলো রক্ষা এবং দখল-দূষণ বন্ধে ঘোষিত শূন্য সহনশীলতা নীতি বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। 

বিশ্বের বিভিন্ন শহরে জলবায়ুগত অভিঘাত ও গড় তাপমাত্রা  বেড়ে চলছে। এ প্রেক্ষাপটে প্রতিটি দেশের নীতিনির্ধারকরা নদ-নদীর গুরুত্ব নতুনভাবে উপলব্ধি করতে শুরু করেছে। বিভিন্ন দেশের নগর কর্তৃপক্ষগুলো এখন চেষ্টা করছে সংলগ্ন নদীগুলোকে আবারো পুনরুজ্জীবিত করতে। যেমন দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল। একসময় শহরটির সিউনগাইচিয়ন নদী দখল-দূষণে বিপর্যস্ত ছিল। কর্তৃপক্ষ ১১ কিলোমিটার খাল খনন করে, চারপাশের অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করে এবং দূষণ রোধ করে নদীটিকে পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছে। ফলে নদীটি আবার প্রাণ ফিরে  পেয়েছে, পানির গুণগত মান বেড়েছে, জনজীবনে রাখছে  ইতিবাচক প্রভাব। একইভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় স্পেনের মাদ্রিদ শহরের মানজানারেস নদী, প্যারিসের শেন, চীনের হেবেই প্রদেশের কিংহোয়াংডাও শহরের টাংয়ে, মস্কোর মস্কোভা, সিঙ্গাপুরের কালাঙ্গ ও নিউইয়র্কের হাডসন নদী পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এ উদ্যোগে তারা স্থপতি, পরিকল্পনাবিদ, ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইনার ও রাজনীতিবিদদের সম্পৃক্ত করেছে। সুসমন্বিত পরিকল্পনায় তারা নগরগুলোকে ঢেলে সাজাচ্ছে। জলাধার-নদীকে পুনরায় সংযুক্ত করেছে পরিবহনে, যাতায়াতে, পর্যটনে। নদীর তীরভূমি ধরে তৈরি করেছে দৃষ্টিনন্দন হাঁটাপথ, তৈরি করেছে গণপরিসর। ওইসব শহরের অভিজ্ঞতা, নীতি-উদ্যোগের পর্যালোচনা আমাদের নগর বিন্যাসে সহায়ক হবে বৈকি।

ঢাকার চারপাশের নদী রক্ষায় দীর্ঘ এক যুগ ধরে নানা চেষ্টা-প্রচেষ্টা চলছে। তবে এক্ষেত্রে অগ্রগতি সামান্য। বিআইডব্লিউটিএ আগে দুই দফায় প্রায় ২ হাজার টাকা ব্যয়ে এসব নদী রক্ষা ও অবৈধ দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছিল। তৈরি করেছিল ওয়াকওয়েসহ বিভিন্ন অবকাঠামো। এতে নদ-নদীর অবয়বেও এসেছিল কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন। কিন্তু সেই পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা যায়নি। অর্থ খরচ হয়েছে, অথচ মেলেনি এর উপযোগ। স্থানীয়দের ভাষ্যে উঠে এসেছে, নির্মিত ভৌত অবকাঠামো তাদের জীবনযাত্রায় কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি; বরং কয়েক দিন পরপর দখল ও উচ্ছেদ হয়। আর তাতে সমস্যায় পড়তে হয় সাধারণ মানুষকেই। মূলত বিআইডব্লিউটিএর নজরদারির অভাবে এমনটি হচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক এ দুর্বলতা দূর করতে হবে। 

বলা হচ্ছে, নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে ঢাকার চারপাশের নদ-নদীর তীরভূমিতে পিলার স্থাপন, তীর রক্ষা, ওয়াকওয়ে, জেটিসহ আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। এটি বাস্তবায়ন হলে অবৈধ দখলমুক্ত থাকার পাশাপাশি সংলগ্ন নদীগুলোর তীরভূমির সৌন্দর্য বাড়বে। সর্বোপরি, শহরের সার্বিক চেহারাই আমূল বদলে যাবে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য সুখকর নয়।  দেশে নতুন নতুন প্রকল্প গ্রহণের একটা নেতিবাচক প্রবণতা বিরাজমান। এর উপযোগিতা যথাযথভাবে যাচাই করা হয় না। ব্যয় ধরা হয় অনেক বেশি। বাস্তবায়নও হয় দায়সারাভাবে। সবচেয়ে বড় বিষয়, বাস্তবায়নের পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। তদারক করা হয় না। ফলে প্রকল্পাধীন অবকাঠামো, স্থাপনা দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। আগের দুই দফায় যেমনটা হয়েছে। কাজেই শুধু প্রকল্প গ্রহণ বা বাস্তবায়ন করলে হবে না, নিশ্চিত করতে হবে পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণও। রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সংস্থাটির প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়াতে হবে। অবহেলায় ও অযত্নে যেন মূল্যবান অবকাঠামো নষ্ট না হয়, তার জন্য বাড়াতে হবে নৌ-পুলিশের নজরদারি। নইলে নতুন প্রকল্পেরও পরিণতি হবে আগের মতো, যা মোটেই কাম্য নয়।

চারপাশে নদীর অস্তিত্ব ঢাকার একটি বড় প্রাকৃতিক সুবিধা। এটা বিশ্বে বিরল। বেশির ভাগ শহরে একটি নদী থাকে, বড়জোর দুটি। কিন্তু ঢাকার চারপাশে যে চারটি নদী জড়িয়ে আছে, সেটি নগরবাসীর জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ভারসাম্যের জায়গা থেকে বিপুল তাত্পর্যের। সুতরাং নদীগুলোকে বাঁচাতে হবে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, নৌপথে পরিবহন, শহরে পানি সরবরাহসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগুলোকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তার পথ সন্ধান করতে হবে। প্রয়োজনে অন্য দেশগুলোর কর্মপ্রক্রিয়া অনুসরণ করা যেতে পারে। বিভিন্ন সময়ে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরী নদ-নদীর দখল ও দূষণ রোধে নির্দেশনা চেয়ে উচ্চ আদালতে রিট হয়েছে। আদালত রায় ও নির্দেশনা দিয়েছেন। তবে বছরের পর বছর পার হলেও দখলকারীদের নানা উদ্যোগ ও আইনি জটিলতায় নির্দেশনার পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। বর্তমানে নদীগুলোর বাঁচা-মরা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সরকার, নগর কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্টদের সম্মিলিত প্রয়াসে নদীগুলোর পুনরুজ্জীবন ঘটবে, এটিই প্রত্যাশা।