দেশ থেকে রফতানি হওয়া পণ্যের বিপরীতে প্রাপ্ত অর্থের পরিসংখ্যানে নিয়মিতই তারতম্য থাকে। কভিডকালে এর পরিমাণ অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেড়েছে। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত আড়াই বছরে রফতানি ও অর্থপ্রাপ্তির ব্যবধান ১২ বিলিয়ন ডলার। কারণ হিসেবে উঠে এসেছে কভিডের প্রভাবে ক্রেতা ও রফতানিকারকদের বাণিজ্য বিরোধ, রফতানির বিপরীতে মূল্যহ্রাস, ঋণপত্রের বিপরীতে অর্থ পরিশোধে প্রলম্বিত সময়সীমার মতো বিষয়। একই সঙ্গে অর্থ পাচারের আশঙ্কাও করছেন কেউ কেউ। কয়েক বছর ধরেই বড় অংকের গরমিল থেকে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হিসাবে। এক্ষেত্রে  প্রতি রফতানির ক্ষেত্রে ঘোষিত মূল্য বা এলসির বিপরীতে সমান পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসছে কিনা, তা প্রাথমিক পর্যায়েই যাচাই-বাছাই করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক, এনবিআর, ইপিবিসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি স্বয়ংক্রিয় সমন্বিত পদ্ধতি চালু করা প্রয়োজন।

প্রতি বছর দেশ থেকে কী পরিমাণ পণ্য ও সেবা রফতানি হয়, তার হিসাব রাখে ইপিবি। আর এ রফতানির বিপরীতে দেশে কী পরিমাণ ডলার আসে সে হিসাব রাখে বাংলাদেশ ব্যাংক। সমস্যা তৈরি হয়েছে তথ্য যাচাই-বাছাই এবং যথাসময়ে আপডেট করা নিয়ে। এলসির বিপরীতে অনেক সময় কম অর্থ আসে। কোনো কোনো রফতানি পণ্যের ক্ষেত্রে ফ্রেইড চার্জ রফতানিকারককেই পরিশোধ করতে হয়। আবার পথে কোনো বাড়তি ব্যয় হলেও তা রফতানিকারককে পরিশোধ করতে হতে পারে। এছাড়া পণ্য পাওয়ার পর ক্রেতা কম অর্থ পরিশোধ করতে পারেন। পণ্য ফেরত পাঠানোসহ অন্যান্য কারণেও এলসি খোলার চেয়ে কম অর্থ প্রত্যাবাসন হয়। ইপিবি ফাইনাল অ্যাডজাস্টমেন্টে এসব বিষয় হিসাব করা হয় না। আর বাংলাদেশ ব্যাংক হিসাব করে রফতানি করে কী পরিমাণ অর্থ দেশে এসেছে তার পরিমাণ। ফলে উভয়ের তথ্যে গরমিল থেকে যায়। বিদ্যমান অবস্থায় ইপিবিসহ দায়িত্বশীল সরকারি দপ্তরগুলোকে রফতানি আয়ের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি কীভাবে রফতানি আয় বাড়ানো এবং স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেয়া ও প্রয়োজনীয় লিংকেজ শিল্প গড়ে তোলা যায়, সে বিষয়ে সুপারিশ এমনকি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।  রফতানির তথ্য প্রকাশ করা হয় শুল্ক কর্তৃপক্ষ পর্যায়ের পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে। রফতানি ও রফতানির বিপরীতে প্রাপ্ত অর্থের মধ্যে গরমিল থেকে যাওয়ার বেশকিছু কারণ আছে। এর মধ্যে প্রথমেই আছে সময়সীমা। ইপিবির পরিসংখ্যানগুলো বন্দরে পণ্য জাহাজীকরণ ও শিপমেন্টভিত্তিক। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানগুলো বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থপ্রাপ্তির হিসাব অনুযায়ী। অর্থাৎ রফতানি হওয়া পণ্য আমদানিকারকের নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছার পর যে অর্থ পরিশোধ হয়, সেই অর্থ বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকে প্রত্যাবাসন হলে সেটিকেই এক্সপোর্ট রিসিপ্ট হিসেবে বিবেচনায় নেয়া হয়। এক্ষেত্রে পণ্য শিপমেন্ট ও অর্থপ্রাপ্তির সময়ে পার্থক্যের প্রভাবে প্রাপ্ত অর্থ কম হওয়ার সুযোগ রয়েছে, যা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

রফতানির পর ডিসকাউন্টের ঘটনা ঘটছে। ক্রয়াদেশ বাতিলের ঘটনা ঘটে। কভিডকালে এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটেছে। বিধান আছে, ১০ শতাংশের বেশি ডিসকাউন্ট করা যাবে না। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় রফতানিকারকদের দরকষাকষির সক্ষমতায় ঘাটতির কারণে ডিসকাউন্টের হার অনেক বেড়ে যায়। এ বিষয়ে রফতানিকারকের স্বার্থে ব্যাংকারদের কঠোর ভূমিকাও অনেক সময় পালন করা কঠিন হয়ে পড়ে বলে খবর মিলছে। রফতানি আয়ের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরার মাধ্যমে সবকিছু নির্ভুলভাবে বিচার-বিবেচনাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কোনো অসাধু ক্রেতা ও রফতানিকারকের যোগসাজশে অর্থ পাচারের ঘটনা ঘটেছে কিনা, বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআর কমিটি গঠনপূর্বক তা খতিয়ে দেখবে বলেই প্রত্যাশা। পণ্য রফতানি ও প্রত্যাবাসনকৃত অর্থের পার্থক্যের একটা কারণ হতে পারে পরিসংখ্যানগুলো রেকর্ড হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে। ডিসকাউন্টের কারণেও পার্থক্য হতে পারে, তবে তাতে এত বড় পার্থক্য তৈরি হওয়ার কারণ নেই। রফতানি বাবদ প্রাপ্য অর্থের একটি অংশ সবসময়ই স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দেরিতে আসে। কভিডের সময়ে অর্থ পরিশোধের সময়সীমা অনেক ক্ষেত্রে বাড়ানো হয়েছে, যার প্রতিফলন দেখা যেতে পারে প্রাপ্ত অর্থে। প্রত্যাবাসন সক্ষমতা বাড়াতে রফতানিকারকদের চুক্তিগুলোর আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করা জরুরি। সেজন্য দ্রুত এ-সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সনদ বা ভিয়েনা কনভেনশনে স্বাক্ষর করা প্রয়োজন। বাণিজ্য বিরোধের কারণেও অনেক সময় এলসি অনুযায়ী অর্থ প্রত্যাবাসন হয় না। এক্ষেত্রে অর্থ যেন সঠিকভাবে প্রত্যাবাসন হয় তা নিশ্চিত করতে সরকারও সহায়তা জোগাতে পারে।

রফতানিতে ডিসকাউন্টের চর্চাও রফতানি ও প্রাপ্ত অর্থের গরমিলের বড় কারণ বলে জানিয়েছে ইপিবি। যা অনুসরণে নির্ধারিত পণ্যের সঙ্গে রফতানি হওয়া পণ্যের মানে কোনো ব্যত্যয় ঘটলে ক্রেতারা ডিসকাউন্টেড মূল্যে পণ্য গ্রহণ করেন। এ প্রক্রিয়ায় জাহাজীকরণ হওয়া পণ্যের বিপরীতে প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ কম হওয়ার সুযোগ রয়েছে। ইপিবি যে পরিসংখ্যান প্রকাশ করে, সেখানে ডিসকাউন্টের কোনো হিসাব থাকে না। তবে প্রাপ্ত অর্থে ডিসকাউন্টের প্রতিফলন দেখা যায়। আবার অনেক সময় মূল ঋণপত্রের বিপরীতে আংশিক রফতানি হয় আমদানিকারকের অনুমতি নিয়ে। এক হাজার পিস পণ্যের ঋণপত্রের রফতানির বিপরীতে রফতানি হয়েছে ৬০০ পিস। কিন্তু বিল অব এন্ট্রির ঘোষণা অনুযায়ী রফতানি হয় এক হাজার পিস হিসেবে। কিন্তু যখন অর্থ পরিশোধ হয় ৬০০ পিসের, স্বাভাবিকভাবেই তা কম হয়। সময়ের পার্থক্যটা রফতানির বিপরীতে প্রাপ্ত অর্থের গরমিলের বড় কারণ। এর পরই আছে ইন্টারন্যাশনাল কমার্শিয়াল টার্মস। দেখা গেল রফতানির বিল অব এন্ট্রিতে ঘোষিত মোট মূল্যের একটি অংশ ক্রেতা চালানের বীমা বা পরিবহন খরচ বাবদ কেটে রাখার কথা রয়েছে। এ কারণে যখন অর্থ প্রত্যাবাসন হয়, তা একটি নির্ধারিত অংশ বাদ দিয়ে আসে। সব মিলিয়েই রফতানি ও প্রাপ্ত অর্থের মধ্যে পার্থক্য থেকে যাচ্ছে। এ পার্থক্য কমিয়ে আনার জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বয় প্রয়োজন।