গত দুই দশকে দেশে চমকপ্রদ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন হয়েছে। করোনায় কিছুটা হোঁচট খেলেও এর ধারাবাহিকতা বহমান। যদিও চলমান উন্নয়ন প্রক্রিয়া এবং তার সুফল নিয়ে রয়েছে নানা তর্ক-বিতর্ক। বলা হচ্ছে, উন্নয়নের সুফল মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে কুক্ষিগত। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে এর আশানুরূপ প্রভাব পড়ছে না। এ প্রেক্ষাপটে সঠিক ও গণমুখী উন্নয়নের কথা বলছেন অর্থনীতিবিদরা। তার জন্য পর্যাপ্ত গবেষণার ওপর জোর দিচ্ছেন তারা। কিন্তু দেশের গবেষণা খাতের অগ্রগতি অনেকটা ধীর। খাতটি এখনো অনুন্নয়নের ঘেরাটোপে বন্দি। উন্নয়নকে সঠিক পথে এগিয়ে নিতে এ অবস্থায় গবেষণা খাতের উন্নতিতে কার্যকর নীতি গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান। সম্প্রতি শেষ হওয়া এক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ পরামর্শ দেন তিনি। এটি আমলে নিয়ে সরকারি-বেসরকারি প্রচেষ্টা ও বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।

সামনে এলডিসি উত্তরণ, এসডিজি অর্জন, সর্বোপরি ২০৪১ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে খামতি নেই। তারা বহুমাত্রিকভাবে দেশকে এগিয়ে নিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কিন্তু গৃহীত উন্নয়ন দর্শন ও নীতিগুলো অনেক ক্ষেত্রে গবেষণালব্ধ ফলাফলভিত্তিক না হওয়ায় এর সুফল সমাজের সর্বস্তরে ন্যায্যভাবে বণ্টন হচ্ছে না, একটা ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে। কাজেই সমতামূলক উন্নয়ন নিশ্চিতে গবেষণার বিকল্প নেই। বাস্তবতা হলো, দেশের গবেষণা খাত এখনো বেশ পিছিয়ে। এক্ষেত্রে বেশকিছু কারণ বিদ্যমান। স্বাভাবিকভাবে প্রথমে আসে বরাদ্দের বিষয়টি। বাজেটে বিভিন্ন খাত, এমনকি প্রতিরক্ষা খাতেও বিপুল বরাদ্দ রাখা হলেও শিক্ষা ও গবেষণায় বরাদ্দ যৎসামান্য। আবার যতটুকু বরাদ্দ দেয়া হয়, সেটিও যথাযথভাবে ব্যবহার হয় না। অনেক অর্থ বেহাত হয়ে যায়। আছে নীতি মনোযোগের ঘাটতি। আমাদের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে দৃশ্যমান উন্নতিতে প্রবলভাবে দৃষ্টি দেয়ার একটি প্রবণতা বিরাজমান। তার তুলনায় গবেষণার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে মনোযোগ নেই বললেই চলে। উন্নয়ন, পরিকল্পনায় এর যে একটা দীর্ঘমেয়াদি সুফল আছে, সেটি অনেক ক্ষেত্রে মনোযোগের বাইরে থেকে যায়। একইভাবে সংকট রয়েছে পেশাদার গবেষক শ্রেণীর। এ খাতে ক্যারিয়ার গঠন ও ব্যক্তিগত আর্থিক উন্নতি সময়সাপেক্ষ হওয়ায় অনেকেই এ খাতে সহজেই আসতে চায় না। আবার অনেকেই আগ্রহী হলেও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কম থাকায় একটা অংশ এ খাতে ক্যারিয়ার গঠন করতে পারে না। শুধু সরকারি নয়, বেসরকারি পর্যায়েও প্রতিষ্ঠানের ঘাটতি বিদ্যমান। অর্থনীতির কলেবর বৃদ্ধির সঙ্গে বেসরকারি খাত বড় হয়েছে। শিল্পায়নে ঘটেছে উল্লম্ফন। কিন্তু তার সঙ্গে সংগতি রেখে ব্যক্তি খাত উদ্ভাবন, বাজার পর্যালোচনা, পণ্য বৈচিত্র্যায়ণ, নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাড়ায়নি। গবেষণায় তারা বিনিয়োগে খুব একটা আগ্রহীও নয়। সব মিলিয়ে ঘটছে না দেশের গবেষণা খাতের আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি।

পশ্চিমা উন্নত দেশগুলো আজকের অবস্থানে পৌঁছার ক্ষেত্রে গবেষণার একটা বড় ভূমিকা রয়েছে। গবেষণার মাধ্যমেই তারা সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে টেকসই ও কার্যকর নীতি প্রণয়নে সমর্থ হয়েছে। যার সুফল আজ দৃশ্যমান। দেশগুলো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে গড়ে তুলেছে বিপুলসংখ্যক গবেষণা প্রতিষ্ঠান। বেসরকারিভাবে গড়ে তোলা হয়েছে অনেক গবেষণা প্রতিষ্ঠান। সেখানে কাজ করছে পেশাদার গবেষক দল। জাপান, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া ও আজকের চীনের উত্থানের পেছনেও আছে গবেষণার ভূমিকা। দেশগুলো সরকারি-বেসরকারিভাবে গড়ে তুলেছে নানা গবেষণা প্রতিষ্ঠান—নীতি প্রণয়নে যারা প্রভূত অবদান রাখছে। প্রতিবেশী ভারতেও গবেষণা একটা প্রাতিষ্ঠানিক অবয়ব লাভ করেছে। সরকার তো বটেই, বড় বড় শিল্পোদ্যোক্তাও শিক্ষা-স্বাস্থ্য, উন্নয়ন নীতি পর্যালোচনা, বাজার বিশ্লেষণ, শ্রমবাজার নিরীক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশটিতে প্রতিষ্ঠা করেছে খ্যাতিমান অনেক গবেষণা প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান দেশটির সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় নীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। ওইসব দেশের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য অনুসরণীয়।

বাংলাদেশে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব আজ দূরের কোনো বিষয় নয়। এটি এখন বাস্তবতা। ধারণা করা হচ্ছে, পুরো জীবন ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করবে এটি। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের মধ্য দিয়ে প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষ, প্রযুক্তি ও সমাজের সম্পর্কে বড় রূপান্তর হতে পারে। ডিজিটাল এ ব্যবস্থার মধ্যে সবার ন্যায়সংগত অংশ ভোগ করার পরিসর থাকতে হবে। অন্যথায় প্রান্তিকীকরণ বেড়ে যাবে। কোন ধরনের নীতি, অ্যাপ্রোচ নিলে সব জনগোষ্ঠী লাভবান হবে, প্রান্তিকীকরণ অনেকটা এড়ানো যাবে, সেটি গবেষণা ছাড়া সম্ভব নয়। কাজেই এ ধরনের চ্যালেঞ্জ ও সমস্যা মোকাবেলা সহজতর করতে গবেষণা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

আমরা দেখছি বিগত বছরগুলোয় দেশের লক্ষণীয় উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও তার সঙ্গে সংগতি রেখে বাড়েনি কর্মসংস্থান। এর মধ্যে কভিডের অভিঘাতে আর্থিকভাবে নাজুক জনগোষ্ঠী নতুন করে বেড়েছে। তাদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা প্রয়োজন। অন্যদিকে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, আমাদের জাতীয় আয়ের ১৬ শতাংশ ১ শতাংশ ধনীর হাতে। এটা স্পষ্টতই চলমান উন্নয়ন প্রক্রিয়ার দুর্বলতা ও ত্রুটিকেই ইঙ্গিত করে। কোন ধরনের সামাজিক সুরক্ষা নীতি, শ্রমবাজার নীতি, দক্ষতা উন্নয়ন নীতি, রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা নীতি নিলে সর্বসাধারণ উপকৃত হবে, তার জন্য অবশ্যই গবেষণা বাড়াতে হবে। নইলে সঠিক উন্নয়ন পরিকল্পনা ও কার্যকর নীতি গ্রহণ করা সম্ভব নয়। গবেষণালব্ধ তথ্য-উপাত্তের অভাবে অতীত নীতিগুলোর বৃহত্তর সামষ্টিক প্রভাব মেলেনি। বিপরীতে বেড়ে চলছে অসমতা। এটা মোটেই জনবান্ধব রাষ্ট্রের লক্ষণ নয়। এ অবস্থায় সুষম উন্নয়ন নিশ্চিতে অধ্যাপক রেহমান সোবহান যে গবেষণা খাতের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন, সেটি যথার্থ। এটিকে অনুধাবনপূর্বক এ খাতের উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

উন্নয়নের পরবর্তী ধাপে যাত্রার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। এ ধাপে এগিয়ে যেতে সনাতনী কায়দায় চললে হবে না। বৈশ্বিক পরিবর্তিত দৃশ্যপটের সঙ্গে তাল রেখে চলতে হবে। গবেষণানির্ভর উন্নয়ন নীতি গ্রহণ না করলে অভ্যন্তরীণ ও বহিস্থ অভিঘাত মোকাবেলা সহজ হবে না। সেটি রাষ্ট্রীয়ভাবে যেমন সত্য, তেমনি বেসরকারি পর্যায় থেকেও সত্য। সুষম উন্নয়ন ও রাষ্ট্রের সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিতে সরকারি-বেসরকারি যৌথ প্রয়াসে দেশের গবেষণা খাতের উন্নয়ন ঘটবে, এটিই প্রত্যাশা।