বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো মামলা পরিচালনায় অদক্ষ ও ঋণ আদায়ে অমনোযোগী হওয়ায় খেলাপি ঋণের মামলাগুলো দশকের পর দশক ঝুলে থাকছে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকই পরাজিত হচ্ছে। অথচ ব্যাংকগুলো ঋণ আদায়ে মনোযোগী হলে মামলার গতি আরো বেড়ে দায় আদায় সম্ভব হতো। এ ব্যর্থতার কারণে ব্যাংকের পাশাপাশি আর্থিক খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। পাশাপাশি সাধারণ আমানতকারীর টাকা খেলাপিদের হাত থেকে উদ্ধারের জন্য গঠিত অর্থঋণ আদালতের উদ্দেশ্যও সফল হচ্ছে না। এ বিষয়ে ব্যাখ্যাও চেয়েছেন অর্থঋণ আদালত। বিভিন্ন সময়ে আদালত সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে ভর্ত্সনাও করেছেন। কিন্তু অগ্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না। খেলাপি ঋণের স্ফীতি রোধে ব্যাংকগুলোকেই বড় ভূমিকা রাখতে হবে। ঋণগ্রহীতার তালিকা অনুযায়ী আলোচনা, মামলা, বিরোধ নিষ্পত্তিসহ নানা প্রক্রিয়ায় অর্থ আদায়ে সচেষ্ট হতে হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থঋণ আদালত সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে শুধু, মূল কাজটি ব্যাংককেই করতে হবে। যেসব ব্যাংক খেলাপি ঋণ আদায়ে অমনোযোগী, তাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নিতে পারে। কারণ বাণিজ্যিক ব্যাংকে রক্ষিত অর্থ সাধারণ জনগণের আর আইন অনুযায়ী এটি রক্ষার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরও।
খেলাপি ঋণ আদায়ে যুগোপযোগী আইন প্রণয়নের ব্যাপারে বিভিন্ন মহল থেকে বহুবার গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতার পাশাপাশি সুশাসনের প্রভাব ব্যাংক খাতের অন্যতম প্রধান সমস্যা, এও নতুন কথা নয়। দেশের অর্থনীতির চাকা আরো গতিশীল করতে ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা উন্নত করার দিকে আরো মনোনিবেশ জরুরি। ঋণ যাতে খেলাপি না হয়, সেজন্য বিদ্যমান নীতিমালার ব্যাপারেও নতুন করে ভাবতে হবে। গ্রাহকের আস্থা ও বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে ব্যাংক ব্যবস্থা পরিচালিত হয়। সুতরাং ব্যাংকারদের সৎ থাকা ছাড়া উপায় নেই। পেশিশক্তির প্রভাবমুক্ত থেকে বস্তুনিষ্ঠভাবে ব্যাংকাররা যাতে কাজ করতে পারেন, তা নিশ্চিত করতেই হবে। কেউ কেউ সম্যকভাবে জেনে বা না জেনে কখনো কখনো আইনগত প্রক্রিয়ার অপব্যবহার, বিশেষ করে খেলাপিদের দ্বারা হাইকোর্ট ডিভিশনে রিট মামলা করাকে ঋণ আদায়ে দীর্ঘসূত্রতার একটি মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। কিন্তু রিট পিটিশন বা অন্যান্য মামলা কখনই মূল সমস্যা হওয়ার কথা নয়। স্বাভাবিকভাবেই খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের আইনজীবীরা তাদের মক্কেলের স্বার্থ রক্ষার জন্য সম্ভাব্য সব পদক্ষেপই নেবেন। কিন্তু আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আইনজীবীদের দায়িত্ব তাদের মক্কেলের মামলা যথাযথভাবে পরিচালনা করা এবং বিচারকদের দায়িত্ব কেউ যাতে অনর্থক মামলা করে ন্যায়বিচারের গতি শ্লথ করতে না পারেন তা নিশ্চিত করা। শুধু কঠোরতর আইনগত বিধানের মাধ্যমে এ ব্যাপারে কিছু অর্জন করার আশা সুদূরপরাহত। বেসরকারি ও সরকারি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হারের তারতম্য এটাই নির্দেশ করে, উভয় ক্ষেত্রে একই ধরনের পেশাদারিত্ব বজায় রাখা হয় না। এ সংস্কৃতির যদি অবসান না করা যায় তাহলে খেলাপি ঋণ আদায়ে যেকোনো কঠোর প্রক্রিয়ারই কাজ করা দুরূহ।
বিশ্বের সব দেশেই খেলাপি ঋণ আছে। কোথাও বেশি আবার কোথাও কম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবপ্রাইম মর্টগেজ-সংক্রান্ত খেলাপি ঋণ কেলেঙ্কারির কথা সবার জানা। আবার মাত্র কিছুদিন আগে ভারতের ব্যাংক খাতে যে খেলাপি ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা ফাঁস হয়েছে, তা সবাইকে অবাক করে দিয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যথেষ্ট শক্তিশালী এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তদারক করার ক্ষেত্রে তাদের রয়েছে যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতা। তাই সেখানে উচ্চহারের খেলাপি ঋণ মোটেই প্রত্যাশিত ছিল না। তবে দেশটি খেলাপি ঋণ আদায়ে বেশ তত্পর। ভারত সরকার বিদেশে অবস্থানরত ভারতীয় ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে চুক্তি করেছে। এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংক সেখানে অবস্থানরত ভারতীয় ঋণখেলাপিদের অর্থ বাজেয়াপ্ত করার মাধ্যমে ফেরত দেয়ার পদক্ষেপও নিয়েছে। বাংলাদেশের এমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না। দেশের ভেতরে ঋণখেলাপিরা ঘুরে বেড়ালেও অর্থ আদায়ে তেমন সক্রিয়তা লক্ষ করা যাচ্ছে না। ভারত সরকার তাদের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে আনার লক্ষ্যে একাধিক ব্যাংককে মার্জারের উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশও এমন উদ্যোগ নিতে পারে।
ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালাতে এবং মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে চলতি বছরের এপ্রিলে একটি বিশেষ সেল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ সেল থেকে নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণখেলাপিদের করা মামলাসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে কাজ করা হবে। এ সেলের কাজ হবে মামলাসংক্রান্ত সব বিষয় নিয়ে। সংশ্লিষ্ট শাখার সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় তথ্য ও মতামত সংগ্রহ করবে। সেগুলো পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। নিয়োগকৃত আইনজীবীকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান ও আইনজীবীর পক্ষ থেকে দেয়া বিভিন্ন বিল যাচাই-বাছাই করে তা পরিশোধের ব্যবস্থা করবে। ঠিক একইভাবে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ আদায়েও সেল গঠন করা যেতে পারে।
দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ নির্ধারণ করার পদ্ধতিটিও আধুনিক নয়। এখন পর্যন্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী সিএল (ক্ল্যাসিফিকেশন অব লোনস) তৈরি করে, যার মাধ্যমে তাদের প্রদত্ত ঋণের শ্রেণীবিন্যাস করা হয় এবং সে অনুসারে প্রভিশন সংরক্ষণ করা হয়। এতে দেখা যায় খেলাপি ঋণের বিপরীতে সম্পূর্ণ বা শতভাগ প্রভিশন কখনই রাখা হয় না। ফলে শুরু থেকেই এক ধরনের প্রভিশন ঘাটতি আমাদের দেশের ব্যাংকগুলোয় বিরাজ করে। অথচ সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংকের কোনো ঋণ খারাপ হতে পারে এমনটা মনে হওয়ামাত্র তার বিপরীতে সম্পূর্ণ প্রভিশন রেখে দেয়া হয়। যাতে ভবিষ্যতে যদি সত্যিকার অর্থেই সেই ঋণ খেলাপি হয় এবং আদায় করা সম্ভব না হয়, তাহলে যেন খেলাপি ঋণ খুব সহজেই অবলোপন করা যায়। কিন্তু এই মানসম্মত নীতির অনুসরণ আমাদের দেশের ব্যাংক ব্যবস্থায় একেবারে অনুপস্থিত।
দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ছদ্মবেশী খেলাপি ঋণ একটি মারাত্মক সমস্যা। নানা রকম নিয়মের ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে, বিশেষ করে তথাকথিত পুনঃতফসিলের সুযোগ নিয়ে এসব নিম্নমানের ঋণকে ভালো ঋণ হিসেবে দেখিয়ে দুই ধরনের ক্ষতি করা হয়। একদিকে এসব ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করা হয় না, অন্যদিকে এ ঋণের ওপর অর্জিত সুদ নগদে আদায় না হওয়া সত্ত্বেও ঋণস্থিতির সঙ্গে যোগ করে ব্যাংকের মুনাফা হিসেবে দেখানো হয়। এতে ব্যাংকের প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ তো কমেই না, উল্টো দিনের পর দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে। কেননা এসব ছদ্মবেশী খেলাপি ঋণ যখন সত্যিকার অর্থেই খেলাপি ঋণ হিসেবে চিহ্নিত হয়, তখন ব্যাংকের হাতে পর্যাপ্ত প্রভিশন থাকে না, যা দিয়ে এ খেলাপি ঋণ অবলোপন করা হবে।
খেলাপি ঋণসংক্রান্ত অনিয়মগুলো বন্ধ করে দেশের খেলাপি ঋণের পরিমাণ সন্তোষজনকভাবে কমিয়ে আনতে হলে দেশের ব্যাংক খাতে ঋণ প্রদান ও ঋণ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। এগুলোকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তুলতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকগুলোর এ রকম নমনীয়তা ও উদাসীনতা ব্যাংক খাতকে নাজুক অবস্থায় নিয়ে গেছে। জাতীয় অর্থনীতির ভিত্তি দুর্বল করে দিচ্ছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি আরো বাড়ানো প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে খেলাপির টাকা আদায়ে একটি স্বতন্ত্র শাখা বা কর্মকর্তা নিয়োগ করতে হবে। যার কাজই হবে ঋণ আদায়ে সচেষ্ট থাকা এবং পূর্ণশক্তিতে কাজ করা। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোকে মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে অনুরোধ করা যেতে পারে। মামলা দ্রুত নিষ্পত্তিতে ঢাকার বাইরে অর্থঋণ আদালতে শুধু এ-সংক্রান্ত মামলা ছাড়া অন্য যেকোনো মামলা পরিচালনা থেকে বিরত রাখা যেতে পারে।










