চলতি বছর নানা দিক থেকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বছর। উদযাপন হয়েছে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। এর মধ্যেই কড়া নাড়ছে বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী। শুধু তা-ই নয়, বছরটি বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্কেরও ৫০ বছর। ৫০ বছর আগে ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছিল ভারত। এ প্রেক্ষাপটে প্রথমবারের মতো গত সোমবার পালন হলো ‘মৈত্রী দিবস’। এ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত ভার্চুয়াল সভায় দুই দেশের সরকারপ্রধান দ্বিপক্ষীয় অংশীদারিত্ব আরো বাড়ানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। সমতা-আস্থার ভিত্তিতে পারস্পরিক মৈত্রী আরো সুদৃঢ় করতে উভয় রাষ্ট্রের উদ্যোগী ভূমিকা জরুরি।

৬ ডিসেম্বর রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিলেও আমাদের সঙ্গে ভারতের সংযুক্তিটা তারও আগে। মূলত মার্চে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর পরই বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ায় দেশটি। এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়া ও খাদ্য সরবরাহ, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সরবরাহ, কূটনৈতিকভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায়সহ প্রবাসী সরকারকে যাবতীয় সহায়তা প্রদান করে। এর পর থেকে ধারাবাহিকভাবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটেছে। বিশেষ করে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পায়। আমাদের প্রধানমন্ত্রী ভারত সফর করেছেন একাধিকবার। দেশটির প্রধানমন্ত্রীও এসেছেন বারকয়েক। সর্বশেষ এসেছেন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়ে। এর বাইরেও বিভিন্ন পর্যায়ে দুই দেশের মধ্যে মতবিনিময় হয়েছে, ইস্যুভিত্তিক আলোচনা হয়েছে। প্রকৃত প্রস্তাবে গত বেশ কয়েক বছরে বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্ব আরো টেকসই, সম্প্রসারিত ও নতুন উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে। অর্থনীতি, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা প্রভৃতি ক্ষেত্রে গভীরতর হয়েছে পারস্পরিক সম্প্রীতি।

এর মধ্যে বহুপ্রতীক্ষিত স্থলসীমা চুক্তির মাধ্যমে ছিটমহল সমস্যার সমাধান হয়েছে। বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোয় পণ্য পরিবহন ট্রানজিট সুবিধা পেয়েছে ভারত। চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অর্থনীতিকে গতিশীল করতে দুই দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে আনা হয়েছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। ঢাকা-কলকাতা ও খুলনা-কলকাতা যাত্রী রেলসেবা এবং নীলফামারীর চিলাহাটি থেকে পশ্চিমবঙ্গের হলদিবাড়ী ও ঢাকা-শিলিগুড়ি পণ্য পরিবহনের জন্য রেলসেবা ও ঢাকা-কলকাতা, ঢাকা-আগরতলা, ঢাকা-শিলিগুড়ি-দার্জিলিং বাস সার্ভিস চালু করা হয়েছে। ফেনী নদীর ওপর মৈত্রী সেতু নির্মাণের মধ্য দিয়ে খাগড়াছড়ির রামগড় যুক্ত হয়েছে ত্রিপুরার সঙ্গে। বাংলাদেশের জন্য কিছু ক্রেডিট লাইনও দিয়েছে ভারত। বিদ্যুৎ আমদানি ও উৎপাদনেও পারস্পরিক সহযোগিতা চলমান। সর্বোপরি, করোনা অতিমারী মোকাবেলায় অক্সিজেন পাঠিয়েছে; বাংলাদেশের মানুষের জন্য ২০ লাখ ডোজ টিকা উপহার দিয়েছে ভারত সরকার। দুই দেশের সম্পর্কের দিক থেকে এগুলো বিশেষ তাত্পর্যপূর্ণ বৈকি।

তবে দুই দেশের সম্পর্কের ভারসাম্যের জায়গা থেকে কিছু অস্বস্তি এখনো তিরোহিত হয়নি। ভারতের চাওয়াগুলোর বেশির ভাগই পূরণ হলেও বাংলাদেশের কিছু অপ্রাপ্তি রয়ে গেছে। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পানির গুরুত্বপূর্ণ উৎস তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তির অনিশ্চয়তা দূর হয়নি এখনো। আন্তর্জাতিক নদী হিসেবে ন্যায্য হিস্যা পাওয়ার অধিকার থাকলেও শুকনো মৌসুমে তিস্তার পানি তেমন পাচ্ছে না বাংলাদেশ। এটা একটা অস্বস্তির ক্ষেত্র। একই ভাবে বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও এক ধরনের অসমতা ও বৈষম্য বিরাজমান। ভারতীয় পণ্যের বিশাল বাজার বাংলাদেশ। কিন্তু বাংলাদেশী পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়েও আবার অশুল্ক বাধার বেড়াজালে বন্দি দেশটিতে আমাদের রফতানি বাণিজ্য। ফলে প্রত্যাশিত মাত্রায় কমেনি দুই দেশের বাণিজ্য ব্যবধান। ট্রানজিটের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ট্রানজিট সুবিধা পেলেও নেপালে পণ্য পরিবহনে শিলিগুড়ি করিডর ব্যবহারের সুবিধা এখনো দেয়া হয়নি বাংলাদেশকে। এছাড়া দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত হত্যা একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ সত্ত্বেও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের গুলিতে নিয়মিত বিরতিতে মারা যাচ্ছে মানুষ। এতে সময়ে সময়ে আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে। রোহিঙ্গা সংকটে স্বাধীনতার পর সবচেয়ে গুরুতর সমস্যায় জর্জরিত বাংলাদেশ। এ ইস্যুতে ভারতের সমর্থন যেভাবে পাওয়ার কথা, সেভাবে পায়নি বাংলাদেশ, এটা হতাশাজনক।

নিঃসন্দেহে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের সুবর্ণজয়ন্তীর যে উদযাপন হলো সেটি এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্বীক্ষণেরও সময়। আমাদের প্রধানমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী গতিশীল অংশীদারিত্ব আরো শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রীও সমরূপ প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন, এটা ইতিবাচক। তবে শুধু প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করলে হবে না। বিশেষ করে ভারতের দিক থেকে অনিষ্পন্ন ইস্যুগুলোর মীমাংসা ও অস্বস্তির ক্ষেত্রগুলো নিরসনে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

ভারতের কাছে বাংলাদেশের জন্মের ঋণ এবং দেশটি আমাদের নিকট প্রতিবেশী ও বন্ধুরাষ্ট্র। কাজেই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে প্রকাশ্যে কোনো নেতিবাচক ছাপ যেন না পড়ে, সেই ব্যাপারে উভয় রাষ্ট্রেরই সজাগ থাকাটা জরুরি। শীর্ষ পর্যায়ের ধারাবাহিক ও আন্তরিক সংলাপ, বিভিন্ন পর্যায়ে কূটনৈতিক উদ্যোগ, পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে অমীমাংসিত বিষয়গুলোর অর্থবহ অগ্রগতি সম্ভব, নিকট অতীতের অভিজ্ঞতা অন্তত তা-ই বলে। বর্তমান বাস্তবতায় কোনো দেশের সম্পর্ক আর কূটনৈতিক চৌহদ্দিতে আটকে নেই; বহুদিকে প্রসারিত। বাংলাদেশ-ভারতের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য। আমাদের প্রধানমন্ত্রী যথার্থই তার বক্তব্যে জনগণের মধ্যে সংযুক্তি, বাণিজ্য, ব্যবসা ও যোগাযোগসহ প্রভৃতি ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা ও সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে উভয় দেশের সরকার ভারসাম্যপূর্ণ ও বহুমাত্রিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে আরো মনোযোগী হবে, এটিই প্রত্যাশা।