অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও সম্পত্তিতে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এক্ষেত্রে বৈষম্য যেমন রয়েছে, তেমনি আছে সম্পত্তি ব্যবহারে প্রতিবন্ধকতা। শনিবার ‘সম্পত্তির ওপর নারীর নিয়ন্ত্রণ’বিষয়ক এক অনলাইন বৈঠকে আলোচকরা সম্পত্তিতে নারীর নিয়ন্ত্রণে সামাজিক, আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধার কথা বলেছেন। আইনের সীমাবদ্ধতার কারণে নারীরা সম্পত্তির ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছেন। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রাপ্ত সম্পত্তি ব্যবহার ও পরিভোগের সমস্যা। সম্পত্তি থাকলেই নারী সেটি নিজের ইচ্ছামতো ব্যবহার করতে পারছেন না। পরিবার, সমাজ এমনকি রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে বাধা আসছে। নারী নিজের সম্পত্তি ব্যবহার করে ব্যাংকঋণ গ্রহণ বা ক্ষুদ্র উদ্যোগও নিতে পারছেন না। এমন প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ ও অবদান আরো বাড়াতে হলে এসব বাধা অপসারণ জরুরি। আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে নানা পদক্ষেপ নিতে হবে।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জনশুমারির তথ্যানুযায়ী জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী। দেশের উন্নয়নকল্পে গৃহীত সব স্বল্প ও দীর্ঘকালীন পরিকল্পনা এবং কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হলে নারীকে সর্বস্তরে সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার গুরুত্ব এরই মধ্যেই স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত সত্য। কিন্তু নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করার উপায় প্রশ্নে দেশের সামাজিক প্রেক্ষিত, বাস্তবতা, সংস্কৃতি, পারিবারিক কাঠামো, সম্পদের মালিকানা, নারী শিক্ষা, ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির নিয়ামকগুলো বিবেচনায় নেয়া অত্যন্ত জরুরি। যে পারিবারিক কাঠামো ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে নারীরা বেড়ে ওঠে, সেই সামাজিক পরিবেশ কতটা তাদের প্রকৃত অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সহায়ক বা কতটা অন্তরায়, তা বিশ্লেষণ ও বিবেচনার অভাবে নারীর ক্ষমতায়নে গৃহীত অধিকাংশ পদক্ষেপ খুব বেশি আলোর মুখ দেখে না। ক্ষমতা কাঠামোর মূল ধারায়, অর্থাৎ আর্থিক কার্যক্রম ও সম্পত্তি ব্যবস্থাপনায় নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে না পারলে প্রকৃত ক্ষমতায়নে গৃহীত কর্মসূচি কার্যকর ও স্থায়ী সমাধান দেবে—এমন আশা করা কঠিন। সম্পত্তির ওপর নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা ‘নারীর ক্ষমতায়নের’ অন্যতম মৌলিক স্তম্ভ। কিন্তু আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামোয় নারীর প্রাপ্য সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিতকরণের পথে অনেক বাধা বিদ্যমান, যা নারীর অন্যান্য অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে অন্যতম প্রধান অন্তয়ায় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। উত্তরাধিকারসংক্রান্ত আইন/বিধিতে নারীর সম্পত্তির অধিকার প্রশ্নে আলোচনা বা সমালোচনার শেষ নেই। কিন্তু যতটুকু অধিকার এরই মধ্যে প্রচলিত বিধিতে আছে, সেটুকু কি আদৌ রাষ্ট্র বা এ সমাজ নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে? সত্যিকার অর্থে নারীর ক্ষমতায়নের জন্য সর্বস্তরে নারীর অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ সৃষ্টি আবশ্যক। প্রকৃত ক্ষমতায়ন নিশ্চিতকরণের নিমিত্তে নারীদের প্রাপ্য সম্পত্তির ওপর মালিকানা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা প্রশ্নাতীত। দেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় অর্থ, সঞ্চয়, পুঁজি, বিনিয়োগ, সম্পদের বণ্টন প্রভৃতি নিয়ামকগুলোয় নারীকে তার স্পেস তৈরি করে দিতে পারাটাই মূল চ্যালেঞ্জ। আর এটা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
নারীরা আর্থিক ও সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণে খাটো হয়ে থাকায়, অন্যান্য ক্ষেত্র, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা বলয়, ব্যবসায়িক উদ্যোগ, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল, সামাজিক আন্দোলন এবং উন্নয়নে নেতৃত্ব প্রভৃতি ক্ষেত্রে নারীদের অবস্থান সংকুচিত হয়ে আসে। সম্পত্তির (ভূমি) মালিকানার অন্যতম প্রধান শর্ত ও নিয়ামক হলো, দখল ও নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু বিবাহিত নারীদের দ্বারা নিজেদের সম্পত্তির ওপর দখল ও নিয়ন্ত্রণ রাখা কঠিন, পিতা/ভাইদের বা তাদের সন্তানদের ওপর নির্ভর করতে হয়। একসময় ভাইয়েরা বা ভাইদের সন্তানরা নিজেদের ‘সম্পত্তি’ হিসেবে ভাবতে শুরু করে। অধিকাংশ পরিবারে ভাইদের মধ্যে সম্পত্তির বণ্টনকালে বোন ও বিধমা মাদের বণ্টনের বাইরে রেখে বঞ্চিত করা হয়েছে। এ দেশের বাস্তবতায় নারীরা সম্পত্তির অধিকার চাইলে, তাদের সম্পর্ক ছিন্নকারী ও অসামাজিক হিসেবে দেখা হয়। এই অন্যায্য ‘মূল্যবোধ’ বা দৃষ্টিভঙ্গির জাঁতাকলে পড়ে অনেক মাকে পিতার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির অধিকার থেকে চিরকাল বঞ্চিত হয়ে থাকতে হয়েছে। এমনকি সম্পত্তির দাবি করে স্বত্বের প্রতিষ্ঠায় আদালতের আশ্রয় নিয়ে অনেক নারীকে তাদের ভাইদের বা পিতা-মাতার পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে আশ্রয়হীন হয়ে বাঁচতে হয়েছে। এমন উদাহরণ অনেক।
মালয়া ইউনিভার্সিটির ‘দ্য রাইটস অব উইমেন ইন প্রপার্টি শেয়ারিং ইন বাংলাদেশ: ক্যান দি ইনহেরিট্যান্স সিস্টেম এলিমিনেট ডিসক্রিমিনেশন’ শীর্ষক গবেষণায় নারীরা কীভাবে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সে চিত্র দেখানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, অধিকাংশ নারীই তাদের উত্তরাধিকার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হন। যারা সম্পত্তি পান, তারা স্বাধীনভাবে ভোগ করতে কিংবা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। যারা ভাইদের কাছ থেকে সম্পত্তির অধিকার চান, তাদের অনেক সময় একঘরে করে ফেলা হয়। এক্ষেত্রে আইনি অধিকার না চাওয়া এবং না পাওয়ার প্রবণতা আছে। বিশ্বব্যাংকের এক রিপোর্টেও সেই বৈষম্যের চিত্র উঠে এসেছে। ‘নারী, ব্যবসা এবং আইন-২০২২’ শিরোনামের ওই রিপোর্টের তথ্য মতে, পৃথিবীর যেসব দেশে পুরুষের তুলনায় নারীর অর্থনৈতিক সুযোগ কম, বাংলাদেশ তার অন্যতম। বিভিন্ন আইনি বাধা এবং আইন না থাকাই এর কারণ। বিশ্বের ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর একেবারেই পেছনের দিকে। বাংলাদেশের স্কোর একশর মধ্যে মাত্র ৪৯ দশমিক ৪ এবং দেশগুলোর মধ্যে অবস্থান ১৭৩তম। আফগানিস্তান ছাড়া বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের চেয়ে পিছিয়ে। বৈশ্বিক এবং দক্ষিণ এশিয়ার গড় স্কোরের চেয়েও বাংলাদেশ পিছিয়ে। যে আটটি নির্দেশকের ওপর ৩৫টি প্রশ্নের ভিত্তিতে এ বিষয়ে স্কোর নির্ণয় করা হয়েছে এগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি ছিল সম্পত্তিতে অধিকারের বিষয়টি। বাবা বা মায়ের সম্পত্তিতে পুরুষের সমান অধিকার নারীর নেই।
সম্পত্তির সমঅধিকারে ধর্মীয় রাজনীতি একটা বড় ভূমিকা পালন করছে। শত বছরের পুরনো আইন সংস্কার হওয়া প্রয়োজন। ব্রিটিশ শাসনামলেও অভিন্ন পারিবারিক আইনে পরিবর্তন এসেছে। হিন্দু পারিবারিক আইন সংস্কার হয়ে বিবাহ আইন, সতীদাহ প্রথা রদ আইন, বাল্যবিবাহ বন্ধ আইন হয়েছে। পাকিস্তান আমলেই মুসলিম পারিবারিক আইনে বেশকিছু পরিবর্তন হয়। তবে অভিন্ন পারিবারিক আইন না থাকায় সবক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমতা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। চারটি প্রধান ধর্মাবলম্বীর পারিবারিক আইনে পার্থক্য থাকার কারণে সম্পদ-সম্পত্তিতে নারীরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। কাজেই সম্পদ-সম্পত্তিতে নারী-পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা বর্তমান সময়ের দাবি। আইন থাকলেই যে সব হয় তেমনটা কিন্তু নয়। কারণ খ্রিস্টান পারিবারিক আইনে সম্পত্তিতে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলা হলেও সামাজিকতা হলো এমন যে তারাও নারীকে সমান ভাগ দিতে চায় না। তবে আইন থাকলে যেটি হয় সেটি হলো, নিজের অধিকার সম্পর্কে যিনি সচেতন তিনি ওই আইনের সাহায্য নিতে পারবেন। আর যারা ধর্মীয় আইন মানতে চান তিনি সেটিই মেনে চলবেন। পারিবারিক আইনটি হবে অভিন্ন এবং অসাম্প্রদায়িক। এটি কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের জন্য হবে না। আমাদের সিভিল আইন, ব্যবসা-বাণিজ্য, ফৌজদারি আইন ইত্যাদি ধর্ম দ্বারা পরিচালিত নয়। কিন্তু পারিবারিক আইন ধর্ম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। ধর্মের নামে অসাম্য ও বঞ্চনার সম্পর্কগুলো জিইয়ে রাখা হচ্ছে, যার পরিবর্তন বাঞ্ছনীয়। একবিংশ শতাব্দীতে শতপ্রতিকূলতা পেরিয়ে এগিয়ে চলছে নারীর জয়রথ—এ কথা অনস্বীকার্য। এ পথ প্রশস্ত করতে সংবিধান থেকে শুরু করে বিভিন্ন আইন ও নীতিমালায় খুব জোরেশোরেই বলা হয়েছে নারী-পুরুষের সমতার কথা। সমতা নিশ্চিতে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সনদ, আইনেও স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ সরকার। তবু অনগ্রসরতার পাঁক, যেন মুক্তি নেই নারীর। এর প্রধান কারণ সম্পদ-সম্পত্তিতে নেই সমঅধিকার। ১৯৯৭ সালে নারী উন্নয়ন নীতিতে ভূমির অধিকারে নারী-পুরুষের সমানাধিকারের কথা বলা হলেও পরে তা স্পষ্টাক্ষরে সংযুক্ত হয়নি। এমনকি নতুন আইনের উদ্যোগ নেয়া হয়নি এত বছরেও, যা দুঃখজনক।
আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে নারীদের আর্থিকভাবে আত্মনির্ভরশীল করে তুলতে রাষ্ট্রীয়ভাবে দেয়া বিশেষ ভাতা বা অন্যান্য কর্মসূচি তাদের ভরণ-পোষণের জন্য প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপর্যাপ্ত। নারীদের সম্পত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ ও অধিকার না থাকার দরুন অনানুষ্ঠানিক উৎস বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান (ব্যাংক, বীমা) মর্টগেজ প্রদানের মাধ্যমে ঋণ বা অর্থায়ন সুবিধা পায় না। অধিকাংশ সামাজিক পরিমণ্ডলে সমিতি ও পার্টনারশিপের মাধ্যমে সুযোগের অভাবে নারীদের মধ্যে ব্যবসায়িক উদ্যোক্তা হিসেবে আভির্ভূত হওয়ার সুযোগও অনেক সীমিত। সম্পত্তির অধিকার বঞ্চিত নারীরা এক ধরনের মানসিক দৈন্যের ‘দুষ্টচক্রে’র বাইরে বের হতে পারে না। বিপত্তি শুধু এখানেই না, পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামোয় পুরুষের প্রয়োজনের তুলনায় নারীর প্রয়োজন খুব কমই গুরুত্ব পায়। এমন সামাজিক বাস্তবতায় নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়নের জন্য নারীদের সামাজিক পরিমণ্ডল ও পরিবেশ বিবেচনায় নিয়ে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী নারীদের প্রাপ্য সম্পত্তি ও সম্পদের ওপর অধিকার এবং নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। শুধু আইনি কাঠামো দিয়ে ও কোটা ব্যবস্থা বা ক্ষমতা কাঠামোয় সংরক্ষিত আসনের অধিকার সৃষ্টির মাধ্যমে প্রকৃত টেকসই ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠা খুব কঠিন। নতুন প্রজন্মের মধ্যে নারীর প্রাপ্য সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিতকরণের মানসিকতা সৃষ্টিতে সচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।










