সমুদ্রসীমানা নির্ধারণের পর বাংলাদেশের সামনে অপার সম্ভাবনা দেখা দেয় সেই সম্পদ ব্যবহার করে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করার। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আট বছর পার হলেও সমুদ্র সম্পদ কাজে লাগাতে বড় কোনো পদক্ষেপই নেয়া হয়নি; ছোটখাটো যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তার ফলাফল আশাব্যঞ্জক নয়। প্রতিবেশী দুই দেশ যেখানে তাদের সমুদ্র অঞ্চল থেকে তেল ও গ্যাস তুলছে এবং মত্স্য আহরণ করছে, সেখানে নিজেদের সমুদ্র সম্পদ সম্পর্কে পর্যাপ্ত গবেষণা ও তথ্য-উপাত্তই নেই বাংলাদেশের। এমন পরিস্থিতিতে দ্য চিটাগং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি এবং বাংলাদেশ সেন্টার অব এক্সিলেন্স আয়োজিত এক সেমিনারে অংশগ্রহণকারী বিশেষজ্ঞরা ব্লু ইকোনমি সম্প্রসারণে সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগের পরামর্শ দিয়েছেন। সন্দেহের অবকাশ নেই, সমুদ্র অর্থনীতির সুফল পেতে এবং তা সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে বিপুল বিনিয়োগ ও আধুনিক প্রযুক্তির সন্নিবেশ ঘটাতে হবে। এক্ষেত্রে বেসরকারি খাত আকর্ষণে সমুদ্র সম্পদ অনুসন্ধান ও আহরণে সরকারকে প্রণোদনা দিতে হবে।

সামুদ্রিক সম্পদ আহরণ ও উত্তোলনে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনার অভাব রয়েছে। সর্বাগ্রে বাংলাদেশকে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এসব খাতে অনুসন্ধানের জন্য প্রচুর বিনিয়োগ দরকার। ব্লু ইকোনমি হলো টেকসই সমুদ্র অর্থনীতি, যেখানে সমুদ্রকে প্রাণবন্ত ও সুস্থ রাখতে সহায়তা করতে এর ইকো-সিস্টেমের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতার সঙ্গে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ভারসাম্য রাখতে হয়। বাংলাদেশের সমুদ্র অর্থনীতি এর ব্যতিক্রম নয়। এর সাগরের নীল পানির নিচে রয়েছে ব্যাপক সম্পদ। এ সম্পদের ব্যবহার ও সংরক্ষণের জন্য দরকার নীতি সহায়তা। এটি প্রায় স্বীকৃত সত্য যে সমুদ্র থেকে বাংলাদেশের আয়ের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সমুদ্র সম্পদ অনুসন্ধান ও আহরণের জন্য দরকার প্রণোদনা ও বিনিয়োগ। সমুদ্র সম্পদ অনুসন্ধানে এখনো তেমন প্রণোদনা নেই, আবার দেশের বড় উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরাও এত কঠিন ক্ষেত্রে বিনিয়োগে উৎসাহী নন। বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য কার্যকর পরিকল্পনা দরকার। মত্স্য আহরণ ও অ্যাকুয়াকালচারে পূর্ণ ও খণ্ডকালীন মিলিয়ে অনেকের কর্মসংস্থান হয়েছে। অন্যদিকে লবণ উৎপাদন এবং জাহাজ নির্মাণ ও ভাঙা শিল্পে নিয়োজিত বিপুল মানুষ। সম্ভাবনা রয়েছে কর্মসংস্থান তৈরি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের। প্রাকৃতিক গ্যাসসহ অন্যান্য খনিজ সম্পদের প্রাপ্তির সম্ভাবনাও রয়েছে। দেশকে সমুদ্র অর্থনীতিমুখী করতে সমন্বিত পরিকল্পনা ও কৌশলগত উদ্যোগ নেয়া জরুরি। এছাড়া সামুদ্রিক সম্পদ আহরণের পথে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা দূর করাও জরুরি।

সমুদ্র ও এর সম্পদকে কতভাবে ও কীভাবে ব্যবহার করা যায়, তা নিয়ে বিভিন্ন দেশে চলছে গবেষণা ও কর্মযজ্ঞ। ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিশ্বের বিভিন্ন উপকূলীয় দেশ ও দ্বীপের সরকারগুলো অর্থনীতির এক নতুন ক্ষেত্র হিসেবে সমুদ্রের দিকে নজর দিচ্ছে এবং ব্লু ইকোনমির ওপর নির্ভর করে দেশের প্রবৃদ্ধি নীতি গ্রহণ করেছে। ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতি এখন সমুদ্র অর্থনীতির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। খাদ্য, খনিজ, জ্বালানি ও ওষুধের কাঁচামালের উৎস হিসেবে সমুদ্রের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। চীন, জাপান, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলো বহু বছর ধরে সামুদ্রিক অর্থনীতির ওপর নির্ভর করে আসছে। চীনে সমুদ্র অর্থনীতির টেকসই উন্নয়ন অর্জনের জন্য কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল। এগুলো হলো সমুদ্র কৌশলকে জাতীয় কৌশল হিসেবে গড়ে তোলা, জমি ও সমুদ্রকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, সামুদ্রিক সম্পদ বিকাশে অত্যাধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার, সামুদ্রিক পরিবেশের জন্য উপযুক্ত আইন প্রণয়ন এবং সমুদ্র রক্ষার নতুন ধারণা তৈরি করা। বাংলাদেশও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে পারে।

সমুদ্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পরিবেশ সংরক্ষণ, জীবিত ও জড় সম্পদের সংরক্ষণ, দূষণ রোধ, জলদস্যু দমন, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান এবং মানব পাচার রোধসহ সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো আধুনিক পদ্ধতি গ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের আগের চেয়ে উন্নত করেছে। ফলে সমুদ্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন কাজ হবে না। বাংলাদেশের দরকার বিস্তৃত গবেষণা এবং অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ জনবল। পাশাপাশি যথোপযুক্ত নীতি সহায়তা এবং দেশী-বিদেশী বিনিয়োগের প্রয়োজন। বর্তমানে সমুদ্রবিজ্ঞান ও সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানের ওপর সরকারের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ফলে সুযোগ কাজে লাগানো বাংলাদেশের জন্য সহজ হবে। তবে সম্ভাবনার তুলনায় পদক্ষেপ গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নের গতি ধীর। এক্ষেত্রে সামুদ্রিক সম্পদ আহরণে ভারত ও মিয়ানমার আমাদের জন্য উদাহরণ হতে পারে।

বাংলাদেশের অর্জন বলতে মালয়েশিয়া থেকে একটি জাহাজ কেনা, মন্ত্রিসভায় সমুদ্র অঞ্চল আইনের নীতিগত অনুমোদন, বঙ্গবন্ধু মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সমুদ্রবিজ্ঞানের ওপর কোর্স চালু, বেশ কয়েকটি কর্মশালার আয়োজন এবং রাজধানীর কারওয়ান বাজারে পেট্রোবাংলা ভবনে ব্লু ইকোনমি বা নীল সমুদ্র নিয়ে আলাদা একটি সেল চালু। তবে এ অর্জনেও আছে ফাঁকফোকর। মালয়েশিয়া থেকে কেনা জাহাজ ‘আরভি মীন সন্ধানী’র গভীর সমুদ্রে যাওয়ার সামর্থ্য নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই জাহাজ সীমিত পরিসরে সমুদ্র সম্পদ অনুসন্ধান করতে পারে। সমুদ্র অঞ্চল আইনের এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন মেলেনি। আর সমুদ্র অর্থনীতি নিয়ে চালু করা আলাদা সেলটি হলো ঢাল-তলোয়ার ছাড়া নিধিরাম সর্দারের মতো। কোনো ক্ষমতা নেই তাদের হাতে। একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সমুদ্রবিজ্ঞানের ওপর চালু করা কোর্সের কার্যকারিতা নিয়ে আছে প্রশ্ন।

বিস্তৃত সমুদ্র তলদেশ ও উপরিভাগ থেকে সর্বোচ্চ সুযোগ কাজে লাগাতে সরকারি কর্মকর্তা, বিশেষজ্ঞ ও বেসরকারি খাতের অর্থায়নে সমুদ্রের নৈকট্য পরিমাপসহ জরিপ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে এবং এ প্রাকৃতিক পুঁজির অর্থনৈতিক মূল্য পরিমাপের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য গ্রহণ করতে হবে। সম্পদ আহরণে গভীর সমুদ্রের দিকে মনোযোগ বাড়াতে হবে। এ অঞ্চল সম্পর্কে জানার পরিধি এখনো অনেক কম। মাছ ধরার জন্য ৬৬০ কিলোমিটার সমুদ্রসীমা প্রাপ্তির পরও বাংলাদেশ এখনো সুযোগটি কাজে লাগাতে পারেনি। মাছ ধরার যান্ত্রিক নৌকা, ট্রলার ও জাহাজগুলো উপকূল থেকে মাত্র ৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত মাছ ধরতে পারে। বাকি অংশটি আমাদের মাছ ধরার আওতার বাইরে পড়ে আছে। এক্ষেত্রে গভীর সমুদ্রে মত্স্য সম্পদ আহরণে বড় জাহাজ প্রয়োজন। সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হওয়ার পর তেল ও গ্যাস সম্পদের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় আসছে। কিন্তু মিয়ানমার ২০১২ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির বছর দুয়েকের মাথায় শুধু গ্যাসের মজুদ আবিষ্কারই নয়, বাংলাদেশ সীমান্ত ঘেঁষে নিজস্ব ব্লক থেকে গ্যাস উত্তোলন করছে। সেই গ্যাস তারা নিজেরা ব্যবহার ও রফতানিও করছে। বঙ্গোপসাগরের ভারতীয় অংশে তেল-গ্যাসের জন্য জোর অনুসন্ধান চলছে এবং বিপুল পরিমাণে প্রাপ্তির আশা করা হচ্ছে। বাংলাদেশই অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে রয়েছে। এক্ষেত্রে বিনিয়োগ ও পরিকল্পনাগত শূন্যতা পূরণে সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগ সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। 

দেশে এ মুহূর্তে নীল অর্থনীতি নিয়ে আরো বেশি সচেতনতা তৈরি করা দরকার। সামুদ্রিক সম্পদ কাজে লাগানোর লক্ষ্যে আমাদের দিগন্ত আরো বিস্তৃত করা দরকার। দেশের মানুষের জীবনে আর্থসামাজিক পরিবর্তন আনতে এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য নীল অর্থনীতি বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে। বিভিন্ন সামুদ্রিক শিল্পে সুপ্রশিক্ষিত, দক্ষ ও শিক্ষিত মানবসম্পদ না থাকলে টেকসই ও গতিশীল নীল অর্থনীতিতে কোনো দেশের পক্ষেই সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়। সরকারি-বেসরকারি কাঠামোগত সহযোগিতার দিকে দৃষ্টি দিয়ে নীল অর্থনীতিতে সাফল্যের জন্য সরকারের ভবিষ্যতের নীতি-কাঠামো হাতে নেয়া প্রয়োজন।