কর আদায়ে উৎসে ভ্যাট কর্তন একটি বহুল প্রচলিত পদ্ধতি। উৎসে ভ্যাট কর্তন ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলো করযোগ্য লেনদেন সম্পর্কে সরকারকে অবহিত রাখা (to enable the government to have a trail of transactions and to monitor and verify the compliances.), যা কর পরিচালন যাচাইয়ে সহায়ক। উৎসে ভ্যাট কর্তন পদ্ধতির কারণে কর আদায় জটিল কিংবা কর ফাঁকির ঝুঁকি রয়েছে এমন ক্ষেত্রে কর আদায় নিশ্চিত করা সহজ হয়। তবে বিদ্যমান ব্যবস্থায় উৎসে কর/ভ্যাট কর্তনের ক্ষেত্রে কতিপয় সমস্যা বিরাজমান। এ প্রবন্ধে কতিপয় প্রায়োগিক সমস্যা তুলে ধরা হলো: যেমন—

১. সরকারি দপ্তরগুলো (হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার অফিসের মাধ্যমে পরিশোধকৃত বিলের বিপরীতে) ভ্যাটদাতাদের অনুকূলে উৎসে মূসক কর্তন সনদ (মূসক ৬.৬) ইস্যু করে না। ফলে সরবরাহকারী (ভ্যাটদাতারা) সরবরাহের বিপরীতে উৎসে কর্তিত করের হ্রাসকারী সমন্বয় নিতে পারে না। এতে সরবরাহকারী আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার দেরিতে (মূসক ৬.৬) প্রাপ্তির কারণে হ্রাসকারী সমন্বয় তামাদি হয়ে যায়। হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার অফিস থেকে উৎসে কর্তিত ভ্যাটের মাসভিত্তিক হিসাব সরবরাহ গ্রহণকারী সরকারি দপ্তরে পাঠালে এবং তার ভিত্তিতে সরবরাহ গ্রহণকারী সরকারি দপ্তর মূসক উৎসে কর কর্তন সনদপত্র (মূসক-৬.৬) ইস্যু করলে এ সমস্যার সমাধান হতে পারে। এ বিষয়ে  মূল্য সংযোজন কর আইন, ১৯৯১-এর ধারার ৬(৪খ) বিধান ছিল: উৎসে মূসক আদায় বা কর্তনকারী ব্যক্তি-সংশ্লিষ্ট সেবা সরবরাহ ব্যক্তিকে অনুরূপ আদায় বা কর্তন সম্পর্কে বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে একটি প্রত্যয়নপত্র প্রদান করিবেন।’ বিধি ১৮ খ (২)-তে ও কর্তনকারী কর্তৃক প্রত্যয়নপত্র জারি ও সেবা সরবরাহকারী বরাবর পাঠানোর বিধান ছিল।

২. উৎসে কর্তনকারী সত্তাগুলো তাদের স্টাফদের খাওয়ানোর জন্য মাছ, মাংস, সবজি ইত্যাদি ক্রয় করে, যা আইনের প্রথম তফসিলভুক্ত হওয়ায় মূসক থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত। তাই এসব অব্যাহতিপ্রাপ্ত ক্রয়ের ক্ষেত্রে উৎসে কর্তন করা হয় না। কিন্তু উৎসে কর্তনকারী সত্তাগুলোর নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এসব ব্যয়কে একত্রে ‘আপ্যায়ন ব্যয়’ হিসেবে দেখানো হলে ভ্যাট কর্তৃপক্ষ উৎসে কর্তন না করার দায়ে ব্যবস্থা নেয়। বিষয়টি ব্যবসায়ীদের জন্য বিড়ম্বনার কারণ।

৩. ভ্যাট আইনে জোগানদারের যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে, তাতে জোগানদার বলতে চুক্তি, টেন্ডার, কার্যাদেশ বা অন্যবিধভাবে উৎসে কর্তনকারী সত্তার কাছে সরবরাহকারীকে বোঝায়। এ সংজ্ঞায় বাহুল্য রয়েছে। ‘অন্যবিধভাবে’ উৎসে কর্তনকারী সত্তার কাছে সরবরাহ করা বলার পর চুক্তি, টেন্ডার, কার্যাদেশ ইত্যাদি উল্লেখ করার আর কোনো প্রয়োজন থাকে না।

ট্রেডার্সকে জোগানদার হিসেবে বিবেচনার কারণে ট্রেডিং/ব্যবসায়ী পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতিপ্রাপ্ত এমন পণ্য ক্রয়ে ভ্যাট বিষয়ে বাস্তবে সমস্যা হচ্ছে। যেমন কম্পিউটার ইকুইপমেন্টের (৮৪৭১৬০১০) ওপর (ফিংগার প্রিন্ট/বায়োমেট্রিক স্ক্যানার ব্যতীত) ট্রেডিং/ব্যবসায়ী পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতিপ্রাপ্ত। কিন্তু ট্রেডিং/ব্যবসায়ী থেকে উৎসে কর্তনকারী সত্তা কর্তৃক ক্রীত/সংগৃহীত কম্পিউটার ইকুইপমেন্টের ওপর কর্তনকারী সত্তা অব্যাহতি পায় না; জোগানদার হিসেবে উৎসে ভ্যাট কাটা হয়। এতে যৌক্তিক কারণে সরকারপ্রদত্ত কর অব্যাহতি সুবিধা প্রকৃত অর্থে কেড়ে নেয়া হয়। কারণ এক্ষেত্রে বিক্রেতাকে (ট্রেডার) জোগানদার হিসেবে বিবেচনা করায় উৎসে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভ্যাট কর্তন/আরোপযোগ্য হয়ে যায়। উৎসে কর্তনের প্রজ্ঞাপনে ব্যবসায়ীকে (ট্রেডার্স) বিবেচনা না করায় ভ্যাট অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্য ক্রয়েও ভ্যাট দিতে হচ্ছে।

৪. আইনের তৃতীয় তফসিলে ১৫ শতাংশের নিম্নে হ্রাসকৃত হারের করের বিপরীতে উল্লিখিত পণ্যগুলো সরবরাহ গ্রহণের ক্ষেত্রে সরবরাহগ্রহীতা উৎসে কর্তনকারী সত্তা হলে সমুদয় ভ্যাট উৎসে কর্তন করবেন। সে হিসাবে ট্রান্সফরমার (৮৫.০৪) আইনের তৃতীয় তফসিলভুক্ত হওয়ায় এর ওপর স্থানীয় সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ভ্যাট হার ৫ শতাংশ। কিন্তু উৎসে কর্তনকারী সত্তার কাছে সরবরাহ করলে ‘জোগানদার’ হিসেবে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভ্যাট হার প্রযোজ্য হয়। এক্ষেত্রে ৫ শতাংশ নাকি ৭ দশমিক ৫ শতাংশ—কোন হারে কর্তন করতে হবে তা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি/বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। এক্ষেত্রে ‘জোগানদার’ যেহেতু পুনরায় বিক্রি করে, তাই প্রকৃত অর্থে জোগানদারও  একজন ব্যবসায়ী। জোগানদারকে ‘ব্যবসায়ী’ হতে আলাদা করে ‘সেবা’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার প্রয়োজন ছিল বলে মনে হয় না। জোগানদারের মাধ্যমে যে পরিমাণ রাজস্ব অতিরিক্ত আদায় হয়, তা উৎসে কর্তনকারী সত্তার কাছে সরবরাহকৃত পণ্য/সেবা সরবরাহকারী থেকে উৎসে কর্তনপূর্বক আদায় সম্ভব। তাতে ভ্যাট আইনের জটিলতা দূরীভূত হবে এবং ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব হবে।

ভ্যাট আইন ও বিধিমালা হতে জোগানদার নামীয় ব্যবস্থাটি বিলুপ্ত করে উৎসে কর্তনকারী সত্তা কর্তৃক ক্রীত/সংগৃহীত পণ্যের উৎপাদন/ট্রেডিং পর্যায়ে যে পণ্যের ওপর যে হারে ভ্যাট প্রযোজ্য, সে হারে উৎসে কর্তন করা যেতে পারে। জোগানদার মূলত একজন ব্যবসায়ী। তাই জোগানদার নামীয় ব্যবস্থাটি বাদ দিয়ে ব্যবসায়ী বা অন্য সাপ্লাইয়ার থেকে গৃহীত পণ্য/সেবার ওপর উৎসে কর্তন করা হলে ‘ভ্যাটের ডিজাইন’ সহজ হবে এবং তা ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব হবে। এক্ষেত্রে অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্যকে উৎসে কর্তনের বাইরে রাখলে করনীতি বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব হওয়ার কারণে সামগ্রিকভাবে রাজস্বনীতির গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে এবং কর আদায়ের ক্ষেত্রে ট্যাক্স কমপ্লায়েন্স বাড়বে। উৎসে কর্তনবিষয়ক প্রজ্ঞাপনে ‘অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে উৎসে কর্তন করতে হবে না’—এমন বাক্য সংযোজন করা হলে ভ্যাট অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্যের ক্ষেত্রে জটিলতা দূর হবে। তাছাড়া যে যুক্তিতে সরকার অব্যাহতিপ্রাপ্ত সুবিধা প্রদান করেছে তা বহাল থাকবে।

৫. উৎসে মূসক কর্তন ও আদায় বিধিমালা ২০২১-এর অনুচ্ছেদ ৬ অনুযায়ী উৎসে কর্তনকারী সত্তাকে উৎসে মূসক কর্তনপূর্বক ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দেয়ার তিনদিনের মধ্যে সার্কেলে মূসক ৬ দশমিক ৬-সহ ট্রেজারি চালানের মূলকপি জমা দিতে হয়। অভিযোগ আছে রিটার্নের কপি ছাড়া ভ্যাট অফিস মূসক ট্রেজারি চালানের রিসিভিং দিতে চায় না। বিষয়টি সমাধা করা প্রয়োজন। তাছাড়া উৎসে মূসক কর্তিত মূসক ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দেয়ার প্রবর্তিত ব্যবস্থাটি মূল্য সংযোজন আইনের ধারা ৪৫-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় প্রতীয়মান হয়। এ ব্যবস্থার ফলে যেসব করদাতা প্রতিষ্ঠানের দাখিলপত্রে ব্যালান্স রয়েছে, তারা ব্যালান্স থেকে উৎসে কর্তিত মূল্য সংযোজন কর বিয়োগ করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় এবং এতে সরকারের কাছে তাদের অর্থ আটকে থাকায় (ব্লকিং অব ফান্ড) তাদের ব্যবসার ব্যয় বেড়ে যায়।

যথাসময়ে রাজস্ব আদায় ও সুরক্ষার ক্ষেত্রে উৎসে কর্তনের অবদান অতি গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে বর্ণিত প্রায়োগিক সমস্যাগুলো সমাধানের প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হলে ভ্যাট আইনের প্রয়োগ সহজ ও অধিকতর গ্রহণযোগ্য হবে বলে প্রতীয়মান হয়।
মোহাম্মদ আবু ইউছুফ: শিক্ষক ও গবেষক