আইনগত ত্রুটি ও দুর্বলতার কারণে দেশে সিগারেটসহ তামাকজাতীয় পণ্যের বিপণন ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। একদিকে তামাকপণ্য নিয়ন্ত্রণে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন রয়েছে, অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নিয়ন্ত্রণ আইনে সিগারেটকে গুরুত্বপূর্ণ দ্রব্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আইনের এমন দ্বৈততায় দেশে সিগারেটের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ছে। সরকার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তামাকবিরোধী কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছে এবং ২০৪০ সালের মধ্যে দেশকে তামাকমুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছে। বিদ্যমান অবস্থায় ৬৫ বছরের পুরনো আইনের ধারা অনুসারে সিগারেটকে প্রয়োজনীয় পণ্য হিসেবে রাখার বিষয়টি সরকারের এ অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। দ্রুততম সময়ের মধ্যে ১৯৫৬ সালের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন করে তামাক পণ্যকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকা থেকে বাদ দেয়া হোক।
আইনের সংশোধন একটি চলমান প্রক্রিয়া। ৫০ বছর আগে যে আইনের প্রয়োজন ছিল আজ তা আর কোনো কাজেই আসবে না। আবার নতুন আইনেরও প্রয়োজন। বাংলাদেশের অধিকাংশ আইন ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে তৈরি। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর এ সময়ে দাঁড়িয়ে অনেক আইনই নতুন করে তৈরি ও সংশোধনের আবশ্যকতা দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নিয়ন্ত্রণ আইন অন্যতম। এরই মধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও স্থিতিশীল রাখতে আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য তালিকা সংশোধন করা হবে কিনা, তা জানা যায়নি। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকাও নতুন করে তৈরি করা প্রয়োজন। সিগারেটের মতো অপ্রয়োজনীয় পণ্য সংশ্লিষ্ট তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে। ভারত সরকার সম্প্রতি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। তাদের আইনটিও ১৯৫৫ সালে প্রণীত। তবে তাদের আইনে সিগারেটকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। বিশ্বের কোনো দেশে এমনটি আছে বলে জানা যায় না। আইনে এমন অসামঞ্জস্যতা রেখে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গঠন সম্ভব নয়।
তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয় ও বিপণন নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশে কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই। এমনকি তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয়ের সঙ্গে সম্পৃক্তদের নির্ধারিত কোনো ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণের ব্যবস্থা নেই। এ কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন বিনোদনকেন্দ্রের আশপাশে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, খাবারের দোকান, রেস্টুরেন্টসহ নানা স্থানে অনিয়ন্ত্রিতভাবে তামাকজাত পণ্য বিক্রয় করা হচ্ছে। সহজলভ্যতা ও সহজপ্রাপ্যতার কারণে বাড়ছে তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারকারীর সংখ্যা। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে নেয়া কার্যক্রম বাস্তবায়নে আরো সক্রিয় হতে হবে। তামাকজাত দ্রব্য উৎপাদনকারী বা কোম্পানি ও বিক্রেতাকে লাইসেন্সের আওতায় এনে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয় নিয়ন্ত্রণে আনা এবং তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন পালনে তামাক কোম্পানি ও বিক্রেতাদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা সম্ভব।
তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয়ে লাইসেন্সিং ব্যবস্থা ইউরোপ, আমেরিকা এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের অনেক রাজ্য এবং নেপালেও অনেক আগে চালু হয়েছে। বর্তমানে ফিনল্যান্ড, হাঙ্গেরি, ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে লাইসেন্সিং ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে। এর কার্যকারিতার প্রভাব এরই মধ্যে এসব দেশে দেখা যাচ্ছে। আবার তামাকজাত দ্রব্যের বিক্রি সীমিতকরণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে লাইসেন্সিং ব্যবস্থা প্রভাব তৈরি করায় তামাক কোম্পানিগুলো নানা ধরনের কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে, যাতে নতুন করে কোনো দেশে লাইসেন্সিং ব্যবস্থা কার্যকর না হতে পারে এবং যেসব দেশে কার্যকর হয়েছে, সেখানে যাতে এটি কার্যকর না থাকতে পারে। ইউরোপের নরওয়ে ও স্কটল্যান্ডে লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু করলেও পরবর্তী সময়ে সেটি অকার্যকর হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষে বাংলাদেশকেও সতর্কভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে।
তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। বিপুল জনসংখ্যা, দরিদ্রতা, শিক্ষা ও সচেতনতার অভাবে বিশ্বের সর্বোচ্চ তামাকজাত পণ্য ব্যবহারকারী ১০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বিশ্বে তামাক নিয়ন্ত্রণ ও তামাকের ব্যবহার কমিয়ে আনার লক্ষ্যে ২০০৩ সালে জেনেভায় অনুষ্ঠিত ৫৬তম বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি) চুক্তি অনুমোদিত হয়। বাংলাদেশ এ চুক্তির প্রথম স্বাক্ষরকারী দেশ এবং ২০০৪ সালে এ চুক্তিকে অনুসমর্থন করে। এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সরকার এফসিটিসির আলোকে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ (সংশোধিত ২০১৩) এবং ২০১৫ সালে এ-সংক্রান্ত বিধিমালা প্রণয়ন করে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট আইনের প্রয়োগে দুর্বলতায় এক্ষেত্রে অগ্রগতি সামান্য। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকায় রেখে তামাকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। সরকারের তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে গতিশীল করার স্বার্থে স্থানীয় সরকার বিভাগ ‘তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন নির্দেশিকা’ প্রণয়ন করেছে। এর আলোকে সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নিজ নিজ নির্দেশিকা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। এ নির্দেশিকা স্থানীয় সরকার বিভাগের তত্ত্বাবধানে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের আওতাভুক্ত সব পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহনে তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের মাত্রা হ্রাস করে জনসাধারণকে পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেবে বলে আশা করা যায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অন গ্লোবাল টোব্যাকো এপিডেমিক ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ধূমপানমুক্ত পরিবেশ ও তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করার বিষয়ে এখনো সর্বোত্তম মান অর্জনের ক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে আছি। জনস্বাস্থ্য, বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের জন্য নতুন হুমকি ই-সিগারেটের মতো ইমার্জিং টোব্যাকো প্রডাক্ট নিষিদ্ধ করার বিষয়ে এখনো বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য গ্রহণ করা হয়নি। আবার সব ধরনের তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কের ৫০ শতাংশ জুড়ে সচিত্র সতর্কবাণী মুদ্রণ বাধ্যতামূলক করা হলেও মোড়কের আকার নির্ধারণ করা হয়নি। ফলে বিড়ি ও ধোঁয়াবিহীন তামাকদ্রব্যের ক্ষুদ্র আকারের মোড়কে সচিত্র সতর্কবার্তা সেভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে না। বিদ্যমান আইনে গণপরিবহন ও রেস্তোরাঁগুলোয় ক্ষেত্রবিশেষে ধূমপানের সুযোগ পরোক্ষ ধূমপান নিয়ন্ত্রণ বাধাগ্রস্ত করছে। তামাক কোম্পানির ‘সামাজিক দায়বদ্ধতা কর্মসূচি’ বা সিএসআর কার্যক্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়নি। নেপাল, ভুটান, থাইল্যান্ডসহ বিশ্বের ৪৩টি দেশে বিক্রয়কেন্দ্রে তামাকজাত দ্রব্য প্রদর্শন নিষিদ্ধ হয়েছে। অনুরূপভাবে বিশ্বের ৮৬টি দেশে সিগারেটের খুচরা শলাকা বিক্রি নিষিদ্ধ। অথচ বাংলাদেশের আইনে বিড়ি-সিগারেটের খুচরা শলাকা বিক্রির বিষয়ে কিছু উল্লেখ নেই। এক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।
সরকারের অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় তামাক নিয়ন্ত্রণ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তবে এ বিষয়গুলো সমাধানের জন্য বিদ্যমান আইনের সংশোধনের বিকল্প নেই। রাজস্ব আহরণের ১০ শতাংশ তামাক ও তামাকজাত পণ্য থেকে আসায় সরকারের পক্ষে দ্রুত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন বলে মনে হচ্ছে। তাছাড়া একটি বহুজাতিক কোম্পাানিতে বাংলাদেশ সরকারের অংশীদারিত্ব রয়েছে, যা সরকারের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলে তামাক কোম্পানির মালিকানা ত্যাগ করতে হবে। তামাক নয়, রাজস্ব আহরণের নতুন নতুন ক্ষেত্র খুঁজে বের করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রত্যাশা থাকবে তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত গাইডলাইনটির যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর ‘আগামী ২০৪০ সালের মধ্যে দেশকে তামাকমুক্ত’ ঘোষণা বাস্তবায়নে সরকার কার্যকর ভূমিকা রাখবে। সেক্ষেত্রে বলা যায়, ভবিষ্যতে একদিন বাংলাদেশে সব ধরনের তামাকজাত পণ্য উৎপাদন, সরবরাহ ও বিপণন বন্ধ হবে। এর পথ তৈরিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকা থেকে সিগারেটকে বাদ দেয়া প্রয়োজন সর্বাগ্রে। নইলে অন্যান্য আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে।










