ভোজ্যতেলের মধ্যে সয়াবিন দেশে রান্নায় ব্যবহূত সবচেয়ে জনপ্রিয়। ক্রমেই এ তেল সর্বসাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। দফায় দফায় বাড়ছে এর দাম। তথ্য বলছে, দেশে বার্ষিক ভোজ্যতেলের চাহিদা ২০ লাখ টন। রোজায় কিছুটা বাড়লেও বাকি মাসে এর চাহিদা ১ লাখ ৩০ হাজার টন। বিপরীতে রিফাইনারিগুলোর বার্ষিক সক্ষমতা রয়েছে ৫০ লাখ টন। অথচ সরবরাহ সংকটের অজুহাতে বাড়তি দামে কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে ভোক্তাকে। ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সম্প্রতি কারসাজি করে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী ভোজ্যতেলের বাজার থেকে প্রায় হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন। একই সঙ্গে তিনি এ অপকর্মের বিরুদ্ধে উচ্চারণ করেছেন কঠোর হুঁশিয়ারি। শুধু সাবধান বাণী উচ্চারণ যথেষ্ট নয়; চিহ্নিতপূর্বক দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।
বেশ অনেক দিন ধরে দেশে ভোজ্যতেলের বাজার অস্থিতিশীল। এরই মধ্যে কয়েকবার দাম বেড়েছে। সর্বশেষ গত ৬ ফেব্রুয়ারি রিফাইনারিগুলোর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রতি লিটার খোলা সয়াবিনের দাম ৭ টাকা এবং বোতলজাত তেলের দাম লিটারপ্রতি ৮ টাকা বাড়ানো হয়। এরপর আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার অজুহাতে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে প্রতি লিটারে আরো ১২ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করে তারা। যদিও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তাদের প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। বিদ্যমান মূল্যহার অনুযায়ী লিটারপ্রতি খোলা সয়াবিন ১৪৩ টাকা আর বোতলজাত ১৬৮ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে তার চেয়ে বেশি দরে সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে। এমনকি কোথাও কোথাও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে খোলা সয়াবিন ৩২ টাকা এবং বোতলজাত সয়াবিন ১২ টাকা বেশি দরে বিক্রি হওয়ার খবর মিলছে। বাজারে চাল, ডাল, মাছ-মাংস, শাকসবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দামই ঊর্ধ্বমুখী। ফলে নিম্ন আয়ের মানুষ সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। তার মধ্যে রান্নার গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ ভোজ্যতেলের বাড়তি দাম তাদের আর্থিক চাপ আরো বাড়াচ্ছে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণহীনতার কারণে আজকের এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় স্থিতিশীলতা ফেরাতে কঠোরভাবে বাজার নজরদারি বাড়ানোই সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।
সরবরাহ ঘাটতিজনিত পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি একটি বৈশ্বিক প্রপঞ্চ। এ ধরনের সংকটে দাম কম-বেশি সবখানেই বাড়ে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, জাপান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া প্রভৃতি দেশে দামের সমন্বয়টা এমনভাবে করা হয়, যাতে বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর অভিঘাত যথাসম্ভব কম পড়ে। মূল্যবৃদ্ধির পেছনে কোথাও বাজার বিকৃতি ঘটছে কিনা, বিপণন ব্যবস্থায় সমস্যা হচ্ছে কিনা, ক্ষুদ্র কোনো গোষ্ঠী সিন্ডিকেট করছে কিনা সবকিছু অনুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হয়। আইন অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়। প্রকৃত কারণে দাম বাড়লে সরকারি উদ্যোগে ওপেন মার্কেট সেলের (ওএমএস) মতো পদক্ষেপ নেয়া হয়, যাতে সর্বসাধারণের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে। আমদানীকৃত পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক কমানোর মতো উদ্যোগ নেয়া হয়। সর্বোপরি, সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাড়ানো হয় বাজার নজরদারি। বহুদূরে যেতে হবে না। প্রতিবেশী ভারতেও মানুষের ওপর দাম অভিঘাত প্রশমনে বহুমুখী পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়। ওইসব দেশের নীতি ও অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার অজুহাতে রিফাইনারি কোম্পানিগুলো হঠাৎ করেই তেল সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। ডিলার ও পাইকারিতে সরবরাহ কমে যাওয়ায় খুচরা বাজারে প্রভাব পড়েছে। বোতলজাত তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। তাদের দাবি মিল বা পরিবেশক পর্যায় থেকে দাম আরেক দফা বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। অন্যদিকে রিফাইনারিগুলোর বক্তব্য হলো, আমদানি কম হওয়ায় সংকট রয়েছে। ফলে চাহিদামতো তেল সরবরাহ করা যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে ভোক্তাদের কিনতে হচ্ছে বাড়তি দামে।
প্রকৃত
চিত্র ভিন্ন।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত
প্রতিবেদনে উঠে
এসেছে বিদেশ
থেকে আমদানি
করা বিপুল
পরিমাণ সয়াবিন
ও পাম
অয়েলবাহী জাহাজ
বাংলাদেশের জলসীমায়
পৌঁছেছে। সেসব
জাহাজ এখন
চট্টগ্রাম বন্দরের
বহির্নোঙরে অবস্থান
করছে। আবার
গত বছর
দেশের উদ্যোক্তাদের আমদানি করা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সয়াবিন ও পাম অয়েলের
শুল্কায়ন করেছে
চট্টগ্রাম কাস্টমস
কর্তৃপক্ষ। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলেও
দেশে এখন
সংকটের কারণে
তেলের দাম
বাড়ার কথা
নয়। তাছাড়া
আন্তর্জাতিক বাজার
কিংবা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ
এসবের কারণে
মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি
সত্য হলেও
আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে এর প্রভাব
অন্তত আরো
দুই মাস
পর পড়বে।
ফলে এ অজুহাতেও দাম
বাড়ানোর যৌক্তিকতা নেই। সুতরাং কৃত্রিমভাবে যে সংকট সৃষ্টি করা
হচ্ছে, তাতে
কোনো সন্দেহ
নেই।
কয়েক দিন ধরে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালাচ্ছে সরকারি সংস্থা ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর। তাদের অভিযানে ভোজ্যতেলের কোনো ঘাটতি না থাকলেও ডিলারদের কারসাজিতে বাজারে সয়াবিন তেলের ‘কৃত্রিম সংকট’ সৃষ্টি হয়েছে বলে প্রমাণ মিলেছে। আমরা দেখছি অভিযানে কোথাও কোথাও বিচ্ছিন্নভাবে জরিমানা করা হচ্ছে। এভাবে সুফল মিলবে না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তেলের আমদানি, বিক্রি ও মজুদের তথ্য চেয়েছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে কোথায় কারা কারসাজিতে জড়িত তা জানা অনেকটা সহজ হবে। সিন্ডিকেট ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা দেশে নতুন নয়। ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রেও এমনটা হচ্ছে। দেশে কার্টেল বন্ধ, বাজার বিকৃতি প্রতিরোধে আইন আছে। দায়ীদের চিহ্নিত করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইন অনুসারে কঠোর ব্যবস্থা নেবে, এটাই প্রত্যাশা।










