প্রতিনিয়ত কলেবর বাড়ছে রাজধানী ঢাকার। তার সঙ্গে সংগতি রেখে উন্নয়ন ঘটছে না পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার। তথ্য বলছে, রাজধানীতে মাত্র ২০ শতাংশ জায়গায় ওয়াসার পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা আছে। ৮০ শতাংশ জায়গাই এর বাইরে। ফলে পয়োবর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। এক হিসাব বলছে, ঢাকায় দৈনিক প্রায় ৩৫০০-৪০০০ কোটি লিটার পয়োবর্জ্য উত্পন্ন হয়। পরিশোধনপূর্বক সুষ্ঠুভাবে নিষ্কাশিত না হওয়ায় সেগুলো জনস্বাস্থ্যের ক্ষতির কারণ হচ্ছে। সুতরাং এ অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। শনিবার ঢাকা ওয়াসার চলমান কার্যক্রম নিয়ে মতবিনিময় সভায় মিলিত হন সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক। ওই অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত তার বক্তব্যে পাইপলাইনের মাধ্যমে ঢাকাকে শতভাগ পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে কিছু উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। গৃহীত উদ্যোগের দ্রুত বাস্তবায়ন কাম্য।
ঢাকাকে কেন্দ্র করেই দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশ সম্পন্ন হচ্ছে। নিত্য আসা-যাওয়া করছে মানুষ। অপরিকল্পিতভাবে নগরের সম্প্রসারণ ঘটছে। গড়ে উঠছে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন। রাজউক আইনে সব আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনে পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে বেশির ভাগ ভবনে সে ব্যবস্থা নেই। কেবল সাধারণ এলাকাগুলোয় নয়, নামিদামি আবাসিক এলাকাগুলোর অবস্থাও তাই। এমনকি সেখানেও অনেক ভবনে সিটি করপোরেশনের নালায় সরাসরি পয়োবর্জ্য নিষ্কাশনের সংযোগ দেয়া আছে। ফলে বিশেষ করে বর্ষাকালে ওয়াসার পানি ও পয়োনিষ্কাশন লাইন অনেক ক্ষেত্রে একাকার হয়ে যায়। এটা একটা দিক। আরেকটি দিক হলো ওয়াসার পয়ঃশোধনাগারের অপ্রতুলতা। দিন দিন ঢাকার আয়তন ও জনসংখ্যা বাড়লেও বাড়ানো হয়নি শোধনাগার। বর্তমানে পাগলায় রয়েছে নগরবাসীর পয়োবর্জ্য শোধনের একমাত্র শোধনাগার। কিন্তু রাজধানীর বেশির ভাগ পয়োনালা ভেঙে অকেজো হয়ে পড়েছে। এ কারণে শোধনাগারে অনেক ক্ষেত্রে বর্জ্য যায় না। তাতে মাত্র দুই ভাগ বর্জ্য শোধন হয়। বাকি ৯৮ ভাগ কোনো না কোনোভাবে নদী, পুকুর বা ডোবায় যাচ্ছে। এতে দূষিত হচ্ছে নদী-জলাশয়ের পানি, হুমকিতে পড়ছে জনস্বাস্থ্য। বর্তমানে যে ডেঙ্গুর প্রকোপ চলছে এর পেছনেও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার ঘাটতির একটা যোগসূত্র বিদ্যমান। পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় পানি চলাচল করতে না পেরে বিভিন্ন জায়গায় আটকে থাকে। ফলে ডেঙ্গুজ্বরের বাহক এডিস মশাসহ নানা ধরনের মশা-মাছি ও কীটপতঙ্গের উপদ্রব রাজধানীতে একটা সাংবৎসরিক সমস্যা রূপে হাজির হচ্ছে। বলতে গেলে সুষ্ঠু পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনার অনুপস্থিতি শহরে ফেলছে বহুমাত্রিক বিরূপ প্রভাব।
পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনার বিষয়টি প্রত্যক্ষভাবে জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে যুক্ত। কাজেই পশ্চিমা উন্নত রাষ্ট্রগুলো নগরে শতভাগ সুসমন্বিত পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে। এশিয়ার উন্নত ও প্রাগ্রসর দেশগুলোও এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, জাপান, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া এক্ষেত্রে লক্ষণীয় উন্নতি করেছে। তথ্য বলছে দেশগুলো আনুমানিক ৮০-৯৫ শতাংশ শহুরে জনগোষ্ঠীকে নিরাপদ পয়োনিষ্কাশন নেটওয়ার্কের মধ্যে আনতে সমর্থ হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরিকল্পিত উদ্যোগে শহরগুলোয় গড়ে তোলে সমন্বিত ও কার্যকর পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা। ওইসব দেশের নগরের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য অনুসরণীয় বৈকি।
ঢাকা ওয়াসার মূল দুটি কাজ হলো রাজধানীতে পানি সরবরাহ করা এবং পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সংস্থাটি প্রথমোক্ত কাজটি করলেও পয়োনিষ্কাশনের দায়িত্ব পুরোপুরি পালন করছে না। ঢাকা মহানগরীতে প্রধান ড্রেন লাইনগুলো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব তাদের হলেও সেখান থেকে অনেকটা সরে গেছে। খাল ও ড্রেন নিয়ে তেমন কোনো কাজই করছে না তারা। সংস্থাটি শুধু পানি সরবরাহের নামে শতকোটি টাকার প্রকল্প নিয়ে ব্যস্ত। এগুলোর ঋণের বোঝা বিভিন্ন সময় চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে নগরবাসীর ওপর। এর অংশ হিসেবে আইন ভেঙে দফায় দফায় পানির দাম বেড়েছে, বাড়ছে। আর প্রকল্পগুলোর বিভিন্ন অনিয়মের চিত্র গণমাধ্যমে নিয়মিত বিরতিতে উঠে আসছে। এটা দুঃখজনক। পয়োনিষ্কাশন সংস্থাটির মনোযোগের কেন্দ্রে না থাকায় চরমভাবে ভুগতে হচ্ছে নগরবাসীকে, মহানগরীতে বিরাজ করছে করুণ পরিস্থিতি। এ থেকে উত্তরণ এখন সময়ের দাবি।
পয়োনিষ্কাশনে অব্যবস্থাপনা দূর করতে পুরো শহরে পাঁচটি পয়ঃশোধনাগার (সিটিপি) তৈরির উদ্যোগ নেয়ার কথা বলা হচ্ছে। সেগুলো করা হচ্ছে দাশেরকান্দি, উত্তরা, রায়েরবাজার, মিরপুর ও নারায়ণগঞ্জে। এর মধ্যে দাশেরকান্দি শোধনাগারের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। নারায়ণগঞ্জের পাগলায় গৃহীত নতুন ট্রিটমেন্ট প্লান্টের কাজ শুরু হয়েছে। অন্যগুলো রয়েছে বাস্তবায়নের প্রাথমিক ধাপে, জমি অধিগ্রহণ পর্যায়ে। প্রকল্পের মেয়াদ অনুযায়ী সেগুলো ২০২৩ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন হওয়ার কথা। তবে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় সময়মতো বাস্তবায়ন হবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় থেকে যায়। আশা করা হচ্ছে, সেগুলো বাস্তবায়ন হলে খাল-নদী দূষণমুক্ত হবে এবং ২০২৭ সালের মধ্যে রাজধানীর শতভাগ এলাকাকে সুয়ারেজ নেটওয়ার্কের আওতায় আনা সম্ভব হবে। কাজেই প্রকল্পগুলো যথাসময়ে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। শুধু বাস্তবায়ন করলে হবে না, সেগুলো ঠিকমতো কাজ করছে কিনা, রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে কিনা তা দেখার দায়িত্বও ওয়াসার। অতীতে এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের যথেষ্ট শৈথিল্য দেখা গেছে। ভবিষ্যতে এর পুনরাবৃত্তি কাম্য নয়।
সুষ্ঠু নগর ব্যবস্থাপনার অন্যতম শর্ত সুয়ারেজ তথা মানসম্মত পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যে ঢাকার চতুর্দিকের খাল ও নদ-নদীর দূষণমুক্ত পানি নিশ্চিত করা এবং পরিবেশের বিষয়টি মাথায় রেখে এক্ষেত্রে জোরালো পদক্ষেপ নেয়ার বিকল্প নেই। আবাসিক এলাকায় সুয়ারেজের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা ছেড়ে দেয়া এবং ভবন নির্মাণের সময় ড্রেনের জায়গা বন্ধ করে ফেলা হচ্ছে কিনা, সেদিকেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি দরকার। ওয়াসার দায়িত্বশীলতা এবং সিটি করপোরেশনের সম্মিলিত উদ্যোগে নগরবাসীর জন্য রাজধানীতে একটি কার্যকর পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে উঠবে—এটিই প্রত্যাশা।










